টেক

কামরাঙ্গীচরের ছোট্ট গবেষণাগার থেকে বিশ্বের দরবারে যাওয়া এক বাংলাদেশী

কামরাঙ্গীচরের ছোট্ট গবেষণাগার থেকে বিশ্বের দরবারে যাওয়া এক বাংলাদেশী

“জিন-জিনোম” এখন সারা বিশ্বের মধ্যে অতিপরিচিত এবং বহুল ব্যাবহরিত শব্দের মধ্যে অন্যতম। কারণ জীবের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনের কার্যক্রম দ্বারা। জিন নিয়ন্ত্রণ করে আপনার গায়ের রং, উচ্চতা থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন রোগের প্রতি আপনার সেনসিটিভিটি পর্যন্ত। তাই এই জিনকে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারলেই উদ্ভিদ ও প্রানীর নানা রোগ-ব্যাধি এবং আরো অনেক কিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব।

বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই মানব-দেহ সহ অন্য প্রানী এবং বৃক্ষের এই জিনের কোড জানার চেষ্টা করছিলো। অবশেষে তারা সফল হয় মানবদেহের সম্পূর্ণ জেনেটিক কোডকে ডিকোড করতে। এরপর আস্তে আস্তে তারা বিভিন্ন প্রানী এবং অর্থকরী উদ্ভিদের জেনেটিক রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশ, এদেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রতিবছর বরাদ্দ করা হয় অপ্রতুল টাকা, এর মধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সব কিছু ম্যানেজ করে নিতে হয়। আর উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা কি আর বলব, সেসব জায়গায় গবেষণার জন্য যে টাকা বরাদ্দ থাকে তা সত্যিই ন্যুনতম। এত সব সংকটের মাঝেও আমাদের বিজ্ঞানী-গবেষকরা চেষ্টা করেন দেশকে নতুন কিছু দিতে। আবার অনেকেই চলে যান বিদেশে, তাদের মধ্যে কেউ সেখানেই রয়ে যান আবার অনেকেই দেশের জন্য কিছু করার উদ্দ্যেশ্যে চলে আসেন নিজ মাতৃভূমিতে।

এমনই একজন ছিলেন বিজ্ঞানী মাকসুদ আলম, আমাদের দেশের গর্ব।

নিয়ন আলোয়- কামরাঙ্গীচরের ছোট্ট গবেষণাগার থেকে বিশ্বের দরবারে যাওয়া এক বাংলাদেশী- Neon Aloy

বিজ্ঞানী মাক্সুদ আলমের লিখা বই

১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফরিদপুরে এই অসাধারণ মানুষের জন্ম হয়। বাবা ছিলেন বিডিআরের একজন কর্মকর্তা তাই তার ছেলেবেলা কাটে পিলখানাতেই। সেই কৈশোরকাল থেকেই মাকসুদুল আলম ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির, উনার বড় ভাই মঞ্জুরুল আলম এক দৈনিক পত্রিকায় সাক্ষাতকারে বলেছিলেন যে মাকসুদুল আলম ছেলেবেলায় অন্যদের সাথে খেলাধুলা করার সময়ও মাঝেমাঝে উধাও হয়ে যেতেন আশে-পাশের বাগানে। অনেক খুঁজাখুঁজির পর উনাকে পাওয়া যেত কোনো গাছগাছালি বা লতাপাতার সামনে তন্ময় অবস্থায়।

গবেষণার শুরু সেই ছোটবেলাতেই

উদ্ভিদের বৈচিত্র্য নিয়ে মাকসুদুল আলমের চিন্তা-ভাবনা আর গবেষণার বীজ বপন হয় সেই শৈশবেই। তিনি যখন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়তেন, তখন উনার বাবা কামরাঙ্গীচরে একখণ্ড জমি কিনে একটি ঘর তৈরি করেন। সেই ঘরের এক কোণাতেই মাকসুদুল আলমের প্রথম গবেষণাগার স্থাপিত হয়। বিভিন্ন উদ্ভিদের একটার সাথে আরেকটা মিশিয়ে দেখতেন কি হয়।

এছাড়া ছোট ভাই এবং বন্ধুর সাথে মিলে তিনি বাসার ছাদে বানিয়েছিলেন “অনুসন্ধানী বিজ্ঞান ক্লাব”। এখানে তারা তিনজন মিলে গাছ পর্যবেক্ষণ করতেন, গাছের চারা লাগাতেন, পাতা সংগ্রহ করে সেই পাতাগুলোকে এলব্যামে সাজিয়ে বের করতেন গাছের বৈজ্ঞানিক নাম।

জিন নকশা উন্মোচনে মাকসুদুল আলম প্রথম আগ্রহী হয়েছিলেন কামরাঙ্গিচরে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরে লাগানো ঢ্যাঁড়শগাছের দ্বিগুণ ফলন দেখে। এত বড় আকৃতির ঢ্যাঁড়শ দেখে উনার মনে হয়েছিল যে এই ফলন হওয়ার পেছনে সেখানকার মাটি-পানি কিংবা গাছেই কোনো না কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। এভাবেই প্রাণরসায়ন এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতি উনার আগ্রহ জাগে।

বাবার মৃত্যু এবং মায়ের সংগ্রাম

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে থমকে যায় এই পরিবারটির স্বপ্নগুলো, এপ্রিলের তিন তারিখে বাবা দলিলুদ্দিন পাকবাহিনীর হাতে মারা যান। সংসারের চাকা থমকে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। কিন্তু মা লিরিয়ান আহমেদ শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরে আট সন্তানকে আগলে রাখেন নিজের মমতা দিয়ে। তিনি নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করলেও পড়ালেখার মর্ম বুঝতেন। নিজে কাপড় সেলাই করে সংসার চালাতেন আর সন্তানরা টিউশনি করে করে নিজেদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে মাকেও সাহায্য করতেন। পরবর্তীতে বড় বোন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে পাশ করে যখন চাকরি নেন তখন সংসারে একটু সচ্ছলতা আসে।

এই বড় বোনের কথা মাকসুদুল আলম আজন্ম মনে রেখেছিলেন এবং মা সম্পর্কে একটি দৈনিক পত্রিকায় তিনি বলেন,

“একজন সচেতন মা পারেন একটি শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে। আমার মা পড়াশোনা কম জানলেও তিনি শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। বাংলাদেশকে বিজ্ঞানে এগিয়ে নিতে হলে নারীদের বিজ্ঞানমুখী করতে হবে। তারাই মা হয়ে তার সব সন্তানদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে পারবে।এর প্রভাব হবে বহুমুখী। এই যেমন, মালয়েশিয়ার ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বেশি এগিয়ে।”

ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মাকসুদুল আলম চলে যান মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, সেখানে মাইক্রোবায়োলজিতে মাস্টার্স এবং পিএইচডি শেষ করে তিনি জার্মানি চলে যান। সেখানে ম্যাক্স প্লাংক ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয়বার পিএইচডি শেষ করে মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন।

কর্মক্ষেত্র এবং সাফল্যঃ  

১৯৯৭ সালে ক্ষতিকর হেলো ব্যাকটেরিয়ামের জীবনরহস্য আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের জগতে মাকসুদুল আলমের সফল পদযাত্রা শুরু। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন সেখানে পেঁপের জেনেটিক কোড উন্মোচন করার জন্য যে টিম গঠন করা হয় সেখানে মাকসুদুল আলম ছিলেন। হাওয়াইতে পেঁপে ছিল অন্যতম প্রধান ফসল, কিন্তু নানা রোগে এবং পোকা ধরে অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যেত। তখন বিজ্ঞানীদের টিম পেঁপের রোগ এবং পোকা’র জন্য দায়ী জিনগুলো শনাক্ত করে এবং এসবের পরিবর্তন করে নতুন জাতের কয়েকধরণের পেঁপে উদ্ভাবন করে। এর ফলে হাওয়াইতে পেঁপের উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয় এবং অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব আসে।

এরপর ২০০৮ সালে ডাক আসে মালয়শিয়া থেকে, সেখানের সরকার জিন-গবেষণার জন্য আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন একটি ল্যাব স্থাপন করে। সেই ল্যাবে মাকসুদুল সহ আরো কয়েকজন বিজ্ঞানীকে আমন্ত্রন জানানো হয় রাবারের জেনেটিক কোড আবিষ্কার করতে। ২০০৯ সালের মধ্যেই এই প্রজেক্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। মাকসুদুল আলমের সাফল্যের মুকুটে যোগ হয় আরেকটি পালক।

দেশের টানে,মাটির টানে

বিদেশে বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম অনেক গবেষণা করেছেন, অনেক দেশের জেনেটিক গবেষণা টিমে যোগ দিয়ে তিনি সে দেশকে সাহায্য করেছেন নানা আবিষ্কার দিয়ে। কিন্তু এরপরও উনার মনে হতো কিছুর যেন কমতি রয়ে গিয়েছে। দেশের প্রতি কিছু করার ইচ্ছা অনবরত উনাকে তাগিদ দিত। দেশের ফল-ফসলের জেনেটিক কোড উন্মোচন করে তাদের আরো উন্নত করে এই দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করাই ছিলো উনার লক্ষ্য। বয়সের ঘড়ি ধীড়ে ধীরে বয়ে যাচ্ছে, কোনদিন মহাকালের ডাক এসে যাবে, মনস্থির করলেন এবারই কিছু করবেন। তাই যোগাযোগ করলেন বায়োকেমিস্ট্রি এবং টেকনোলোজিতে দক্ষ বাংলাদেশী গবেষক বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করলেন, তারা প্রত্যেকেই একবাক্যে সায় দিলেন।

অপারেশন সপ্নযাত্রা

দেশের জন্য কিছু করার তাগিদে ২০০৮ সালের জুন মাসে তৈরি হয় ‘অপারেশন স্বপ্নযাত্রা’ নামে একটি উদ্যোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান ও জেবা সিরাজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধাপক ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সহ নবীন-প্রবীন মোট ৭২ জন মেধাবী গবেষক ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ যোগ দেন এই টিমে। এই একঝাক দেশ পাগলরা নিজেদের অর্থ আর কারিগরি সহায়তা দিয়ে কাজ আরম্ভ করেন আর এই জাহাজের প্রধান ক্যাপ্টেন হন বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম, কিন্তু কাজের মাঝপথে এসে অর্থের অভাবে কাজ থেমে যায়। তখন দৈনিক পত্রিকায় এই সম্পর্কে খবর প্রকাশ হলে আমাদের মাননীয় কৃষিমন্ত্রী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন এবং অর্থসাহায্য করেন। এরপর আর কিসের অপেক্ষা, অপারেশন স্বপ্নযাত্রা এগিয়ে চলল তরতর করে। গবেষকরা গবেষণা শুরু হওয়ার আগে গবেষণা শেষ হওয়ার আগ-পর্যন্ত সব তথ্য গোপন রাখার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন।

নিয়ন আলোয়- কামরাঙ্গীচরের ছোট্ট গবেষণাগার থেকে বিশ্বের দরবারে যাওয়া এক বাংলাদেশী- Neon Aloy

অপারেশন স্বপ্নযাত্রা টিম

এখানে একটি কথা না বললেই নয়, বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম তার গবেষণার মাসিক বেতন ১৬ লক্ষ টাকা থেকে একটি টাকাও নেননি। অনেক পরিশ্রমের পরে তিনবছরের সাফল্য এসে ধরা দেয় একবছরের মধ্যেই, ১৬ই জুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন পাটের জিন-রহস্য উন্মোচনের।

নিয়ন আলোয়- কামরাঙ্গীচরের ছোট্ট গবেষণাগার থেকে বিশ্বের দরবারে যাওয়া এক বাংলাদেশী- Neon Aloy

পাটের জিন আবিষ্কারের ঘোষনা

সম্মাননা এবং স্বীকৃতি

কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ মাকসুদুল আলম নানা পুরস্কার পেয়েছেন। এদের মধ্যে ১৯৯৭ সালে এনাইএইচ শ্যানন এওয়ারড অন্যতম, ২০০১ সালে পান সম্মান্সুচক বোরড অফ রিজেন্স পদক।

বাংলাদেশে বিজ্ঞান জগতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে মাকসুদুল আলমকে ভূষিত করা হয়।

মাকসুদুল আলমের স্বপ্ন ছিল এদেশের বিজ্ঞান জগতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, তিনি ছেলে-মেয়ে সবাইকেই বিজ্ঞানে আগ্রহী করতে চেয়েছিলেন। পাটের পাশা-পাশি তুলসী, ধান সহ আরো নানা উদ্ভিদ নিয়ে তিনি কাজ করতে চেয়েছিলেন, স্থাপন করতে চেয়েছিলেন গবেষণাগার। কিন্তু নিভৃতচারী মহান এই বিজ্ঞানী ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর হাওয়াই এর কুইন্স হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

মাকসুদুল আলম মারা গিয়েছেন, কিন্তু তার তার স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছেন এদেশের মানুষদের চোখে। হয়তোবা আর বেশিদিন নেই, যেদিন মাকসুদুল আলমের দেখানো পথ ধরে আমাদের বাংলার বিজ্ঞানীরা নিয়ে আসবে সাফল্যের সোনার মুকুট।

Most Popular

To Top