ক্ষমতা

যুদ্ধের নয় শান্তির ভোর আসুক

যুদ্ধের নয় শান্তির ভোর আসুক Neon Aloy

১.
এই দেশে (যুক্তরাজ্য) আসার পরপরই যেই কাজে যোগ দিয়েছিলাম, সেখানে তখন ছিল বার্মিজদের আধিপত্য।

বার্মিজরা জাতি হিসাবে এতটা অমানবিক সেটা তখন বুঝতে পারিনি (যারা ভাবেন অনেক বার্মিজ তাদের দেশের রোহিঙ্গা অত্যাচার নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন, তারা একটু সেইসব বার্মিজদের প্রোফাইল থেকে একটু ঘুরে আসুন; হয় তারা সু চি’কে সাপোর্ট করছে, না হয় সম্মতিসুচক চুপ করে আছেন), তবে এদের সবচেয়ে নিরীহ দর্শন মানুষটির মাথায়ও যে জটিল প্যাঁচ দিয়ে ২/৪ মণ জিলাপি বানানো হচ্ছে সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম।

লম্বা সময় সেখানে কাজ না করলেও বছরখানেকের মাঝেই দাবার দান ঘুরিয়ে পুরো কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশীদের কর্তৃত্বে নিয়ে এসেছিলাম আমরা শুধু ২/৩ জন ভাই বন্ধু মিলেই!

এতে আমরা গিট-প্যাঁচের খেলা খেলিনি। শুধুমাত্র সহ্য গুণ, আন্তরিকতা আর ভালোবাসা দিয়ে আমরা এই কাজটা করেছিলাম। ওহ, সাথে আরেকটা অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস ছিল, সেটা হলো আমাদের বাঙালীদের মধ্যে একাত্মতা।

শেষদিকে অবস্থা এমন হয়েছিল যে, বার্মিজরা নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতেও আমাদের কাছে আসতো ওদের নিজেদের লোক ছেড়ে!

২.
এবার বর্তমান রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে দুই একটা কথা বলি।

প্রথমে বলি, আমাদের অনলাইন জেনারেল, ফিল্ড মার্শাল, এয়ার ভাইস মার্শাল, এডমিরাল ভাইদের কথা। আপনারা যারা বার্মার ১৮ বার আকাশ সীমা অতিক্রমও এতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে ক্ষুব্ধ।

যারা চরম উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন যে কখন আমরা তাদের একটা বিমান ধ্বংস করে পাল্টা উত্তর দিব আর আপনারা দলে দলে স্টেনগান, একে-৪৭, ৪৮, ৪৯, মর্টার নিয়ে; না পেলে যার যা দা-কুড়াল আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়ে শুধু বার্মিজ কোপাবেন । আপনারা প্রথমে একটু খোঁজ নিয়ে জেনে নিন ঠিক কতটুকু সীমানার ভিতরে আসলে শত্রুপক্ষের বিমান ভুপাতিত করা যায়, এর আন্তর্জাতিক নিয়মটা কি! খালি মারলেই তো হবে না! বার্মা চাচ্ছেই যেন আমরা খালি ওদের একটা বিমান ভূপাতিত করি, তারপরই তো খেলা শুরু হবে।

ঐ যে আন্তর্জাতিক নিয়মের কথা বললাম কেন জানেন? একবার ভালো ক্ল্যাশ অফ ক্লান গেমস থেকে চোখ সরিয়ে দেখুন আমাদের সাথে কয়টা সুপার পাওয়ার আছে, আর বার্মার সাথে কারা কারা আছে! তখন শুধু দেখবেন কত দেশ কত আন্তর্জাতিক নিয়ম দেখিয়ে আপনার ঘরের চালে এ যাবৎ না যতগুলো কামরাঙ্গা পড়েছে, দিনরাত তারচেয়ে বেশী বোমা ফেলে দিয়ে যাবে! সাথে “গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার” ব্যাপারটা কি এবং এর র‍্যাংকিং-এ আমাদের আর বার্মার অবস্থানটা একটু দেখে নিবেন দয়া করে।

৩.
জাতি হিসাবে আমরা খুবই জোশিলা জাতি, এটা প্রমাণিত। কোন কিছুতে আমাদের জোশ আসতেও সময় লাগে না, যেতে তো আরো না। আর সেই জোশ এর সাথে একটু ধর্মীয় সুগন্ধী যদি লাগানো যায়, সে তো হীরায় সোহাগা!

এইবারও ঠিক তাই। একদল জোশিলা ভাই রোহিঙ্গা “মুসলিম” মেয়েদের বিয়ে করে উপকার করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একরকম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসতে চাচ্ছে অবস্থা! আরেক দল দ্বীন দুনিয়ার সমস্ত জোশ নিয়ে তৈরী হচ্ছেন “জিহাদে” যেতে! অবশ্য এদের কাছে চুপেচাপে মানুষের উপকার করার চেয়ে কয়দিন পরপর হালুম-হুলুম “জিহাদি” ডাক দেয়াটা কিছুদিন পরপর একগাদা বন্ধুবান্ধব নিয়ে মামা হালিম খেতে যাওয়ার মতো একটা এক্সাইটিং ব্যাপার। “এরা” সবাইকে ডেকে একসাথে করে, কিন্তু খাওয়া শেষে বিল না দিয়ে সবার আগেই চলে আসে। আমাদের এই জিহাদি ভাইয়ারাও সেই দলের লোক। সুতরাং, যারা এখন বার্মায় জিহাদে যেতে চাচ্ছেন- তারা “খুব খেয়াল কইরা”!

৪.
যারা ভাবছেন রোহিঙ্গারা মুসলিম বলেই শুধু মার খাচ্ছে, একটু খেয়াল করে বার্মিজ সেনাপ্রধানের বক্তব্যটা দেখলে বুঝবেন। সে স্পষ্টতই বলেছে এটা জাতিগত কারণে, ধর্মীয় কারণে নয়। তারপরও যদি বারবার মনে হয় মুসলিম হওয়ার কারণে দুনিয়াজুড়ে মার খাচ্ছেন, তবে সেই দোষটা অন্য ধর্মের লোকজনদের উপর শুধু না চাপিয়ে- নিজ ধর্মের দেশের আয়েশী রাজ-রাজড়াদের দিন।

নিজেরা দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে নিজের জিনিষ খোয়ালে, তাতে চোরের দোষ দিয়ে কি লাভ জনাব!

ইয়েমেনে, মিশরে, সিরিয়ায় মুসলমানদের কারা মারছে- প্রশ্নটার উত্তর খুঁজেছেন কখনো?

সেই তালিকায় কাতার, ইরানের নামও লেখার চেষ্টা হচ্ছে – সেগুলো একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন ব্যাপারটা শুধু ধর্মীয় নয়, ব্যাপারটা চিরকালীন সেই “দূর্বলের উপর সবলের অত্যাচার বা জোর যার মুল্লুক তার”।

৫.
যারা এরদোয়ান সাহেবকে বর্তমান সময়ের মুসলিম উম্মাহ’র সুলতান ভাবেন, তার পত্নীর কান্না দেখে নিজের চোখের পানিতে
নিজ গৃহে নাফ নদীর শাখা বানিয়ে ফেলেন- দয়া করে সুলতান সাহেবকে একটু চিঠি লিখে জিজ্ঞেস করেন উনি যে হুংকার দিয়েছিলেন যা সাহায্য লাগে দিবেন, কিন্তু বাস্তবে যা দিয়েছেন সেটা শরণার্থীদের একদিনের খাবার পরিমাণ।

সেটাও আবার পাঠিয়েছেন আরাকান রাজ্যে!

বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের তো উনার স্ত্রী’র চোখের পানির দরকার নাই। নদীমাতৃক দেশ আমাদের, পানি যথেষ্টই আছে। সুলতান সাহেবকে কারণে অকারণে নিজের মুখ না খুলে, জায়গা মতো চোখ আর তরবারি খোলার অনুরোধটা কেউ করে দেখতে পারেন।

পরিশেষ
যারা যুদ্ধ ব্যাপারটা কে বিয়ে-বাড়ীর রঙ বা কাদা খেলা ভাবছেন, ব্যাপারটা আসলে সে রকম না। একবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে, সেটা শুধুমাত্র শরণার্থীদের মতো শুধু বার্মা-বাংলাদেশ বর্ডারেই হবে না, তখন দেশের কোন অঞ্চলের কেউই নিরাপদ থাকবেন না। নিজের প্রাণভয়ে একদিন নিজ দেশের পুলিশের তাড়া খেয়ে কত এমন জিহাদীদের গর্তে ঢুকে যেতে শুনেছি, আর এতো ভিনদেশী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ।

যুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়। তাকিয়ে দেখুন শুধু আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার দিকে। কি সোনার-তেলের দেশগুলো কি রকম কবরস্থান হয়ে গিয়েছে কয়েক বছরে। সেই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। বুকে হাত দিয়ে বলুন, পারবেন বাংলাদেশ কে সেই চেহারায় দেখতে? আমাদের তো শরণার্থী হয়ে যাওয়ার মতো দেশও নেই! ব্যাপারটা কতটা ভয়াবহ চিন্তা করেছেন একবার?

এই যুদ্ধে বার্মার হারানোর কিছুই নেই- না মানবতা, না কারো বন্ধুত্ব, না অর্থনৈতিক কিন্তু আমাদের সবকিছুই হারানোর আছে। তাই এই উত্তেজনা প্রশমনের দায় আমাদেরই বেশী।

বুদ্ধি, স্থিরতা ছাড়া কেবল জোশ দিয়ে কাজ হলে এতদিনে পৃথিবী নামক গ্রহটা টিকে থাকতো না! তাই জোশটা একটু কমিয়ে সরকার যেভাবে কাজ করছে, সেভাবে কুটনৈতিকভাবে এই সমস্যাটার সমাধান করতে সাহায্য করুন। সরকারের তরফ থেকেও এইসব অনলাইন জেনারেলদের, অহেতুক জোশিলা জিহাদি নেতাদের আর একদল হালচাষী সাংবাদিক- যারা যুদ্ধের জন্য বাতাস দিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে একটু ডলা দিয়ে দেখা যেতে পারে, তারা কতটা প্রস্তুত যুদ্ধের জন্য।

একবার যুদ্ধ শুরু হলে, মানুষ অমানুষ হয়ে যায়, মানব – দানব হয়ে উঠে, অধর্মই তখন ধর্ম হয়ে উঠে। তাই এখন রাজনৈতিক, ধর্মীয় ভেদাভেদ পাশে সরিয়ে মানুষ হিসাবে একাত্ব হয়ে এই অদ্ভুত সময়টা আমাদের পার করতে হবে। তবেই কেবল আমরা নিজেদের মুল্লুকে থাকতে পারবো, নাহলে যার জোর বেশী হবে মুল্লুকও তারই হবে।

আর এখন জোর কার বেশী জানেন তো? আর নিজ মুল্লুকের ভার একবার অন্যের হাতে গেলে কি হয় তার অনেক উদাহরণও আপনার সামনেই আছে।

এবার সিদ্ধান্ত আপনার…

Most Popular

To Top