লাইফস্টাইল

বেশি সময় ধরে কাজ করলেই কি বেশি কাজ করা যায়?

নিয়ন আলোয়- বেশি সময় ধরে কাজ করলেই কি বেশি কাজ করা যায়?- Neon Aloy

চাকুরীজীবী বলতেই চিন্তা করে ফেলা যায় ৯-৫টা কর্মকালের ছকে বাধা জীবন। ৮ ঘন্টা (বিশেষ ক্ষেত্রে ৯ এমন কি ১০ঘন্টা) কর্মকাল ঠিক করা হয় ১-২ ঘন্টার বিরতির সমন্বয়ে। নামি-দামি সরকারি বা প্রাইভেট অফিস গুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন এই ৮ ঘন্টা কাজের সময়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। যে অফিস গুলো ২৪ ঘন্টা সেবা দান করে; যেমন: কল সেন্টার, হাসপাতাল, আইটি ফার্ম প্রভৃতি। তাদের কার্যদিবস ভাগ হয় ৮ ঘন্টার ৩টি সিফটে।
কর্পোরেট অফিসের প্রশাসনের একটি বদ্ধ পরিকর ধারণা থাকে, কর্মচারীরা যত বেশি সময় অফিসের কাজে ব্যয় করবে ততই কোম্পানীর মঙ্গল। এমন বিশ্বাসের দরূণ নব্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের কপালে জোটে অনাকাঙ্ক্ষিত ওভারটাইম। একবিংশ শতাব্দীর চাকুরীজীবীদের ব্যক্তিগত জীবনের অনেকটা সময় গ্রাস করে কাজের চিন্তা। আশ্চর্যজনক হলেও এটা এখন বেশ স্বিকৃত যে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উর্ধতন কর্মকর্তাদের সত্যিকার অর্থে কোন ব্যক্তিগত জীবন থাকে না। স্মার্টফোন আর থ্রিজি ইন্টারনেট অফিসের প্রেসেন্টেশন আর ওভারসিস মিটিং গুলোকে নিয়ে আসছে চাকুরীজীবীদের শোবার ঘর পর্যন্ত।

পেশাগত দায়িত্ব কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা আসলে কতটুকু লাভজনক তা নিয়ে দ্বিমতের ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রগতিশীল কর্পোরেট অফিস গুলোতে। এই দ্বিমতের সূত্রপাত (যথাযথ বিশেষণ প্রয়োজন) যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালী থেকে। দ্বিমতের শুরু “বেশি সময় কাজ করলেই কি কাজ বেশি হবে!” এই প্রশ্নের উদ্ভব থেকে। এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে একটি প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন সিলিকন ভ্যালীর কন্সাল্টেন্ট ও স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার Alex Soojung-kim Pang। বইটির নাম দিয়েছেন “Rest: Why you get more done when you work less”। আ্যলেক্স ১৫ বছর সিলিকন ভ্যলীর নামিদামি কোম্পানি গুলোতে কন্সালটেন্সি করেন যার সুবাদে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প, মাল্টি টাস্কিং আর কর্ম ভ্রমন তার জীবনের নৈমিত্তিক সঙ্গী হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তিনি সব কাজ সম্পূর্ণ করাতে হিমসিম খেতে থাকেন এবং আমাদের আর দশ জনের মত তারও এই ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ ছিল দিনে কাজের পরিমান বাড়ানো। তবে তার ভ্রান্তি দূর হয় Cambridge Microsoft গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করার সময়। সেখানে তিনি অনেক কাজের চাপে ছিলেন ঠিকই কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যথাযথ সময়টাও দিতে পেরে ছিলেন। আ্যলেক্স এই সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে কাজের সময় আর কাজের পরিমানের সম্পর্কটাকে আমরা আসলে ঊল্টো করে ফেলেছি। তিনি বলেন, “আমাদের ধারনা কাজ আর সময়ে সম্পর্কটা সমানুপাতিক সরলরেখার মত আগায়। বেশি সময় ধরে কাজ করলে অবশ্যই বেশি কাজ হবে এবং এটা আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। এখন শতাব্দী ব্যাপী গবেষণার সুবাদে আমাদের কাছে প্রমান আছে যে, দীর্ঘমেয়াদী চিন্তায় অতিশ্রমের উপকারিতার চেয়ে অপকারিতাই আসলে বেশি।”

কাজের প্রতি কেমন মনোভাব থাকা উচিত এই ব্যাপারে আ্যলেক্স বলেন সব ধরনের কাজেই কম বেশি বুদ্ধিমত্তা আর চাতুর্যের প্রয়োজন হয়। হোক সেটা কর্পোরেট অফিস বা কোন শৈল্পিক কর্মক্ষেত্রে এবং সকল ক্ষেত্রেই অতিশ্রমের একটি নেতিবাচক প্রভাব থাকে। প্রযুক্তিগত আগ্রাসন বলতে একটি শব্দচয়ন আ্যলেক্স ব্যবহার করেন যার প্রতিপাদ্য হল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আমাদের কাজের সময়কে সহজ করে আমদের সন্তানদের সাথে সময় কাটানোর বিষয়টিকে সহজ করে না। বরং আমাদের কাজকে একটি মিহি পাঊডারে মত করে ফেলে যা আমদের জীবনে আষ্ঠে পৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। তার এই মতামতটি সিলিকন ভ্যালীর অনেক অফিসে প্রতিফলিত হচ্ছে। অফিস পরবর্তি সময়ে যোগাযোগ নূন্যতম করা হয়েছে এবং দৈনিক কার্যকালও কময়ে আনা হয়েছে। এই চিন্তা ধারা জন্মদাতা প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি হেনরি ফোর্ডের কথা বলেন যিনি প্রমান করেছিলেন শ্রমিকদের ১০ ঘণ্টার পরিবর্তে ৮ ঘন্টা কাজ করালেও যথেষ্ট কর্মদক্ষতা আনা সম্ভব।

মার্কিন আর ইউরোপিয়ান কর্ম চর্চার ধরনের তফাৎের কারণে এটা বলা হয়ে থাকে ইউরোপিয়ানরা কর্মদক্ষ নয়। আ্যলেক্সের মতে এটি একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। প্রমান স্বরুপ তিনি জার্মানী, ফ্রান্সের সাথে মেক্সিকো আর দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনা দেন। জার্মানী আর ফ্রান্স দুই দেশে কার্যদিবস মেক্সিকো আর কোরিয়ার চেয়ে ছোট। সপ্তাহে কার্যদিবসও তাদের কম। তবুও জার্মান আর ফ্রেঞ্চরা প্রোডাক্টিভিটিরর দিক থেকে অন্যদের থেকে এগিয়ে আছে। আ্যালেক্সের মতে, আমেরিকান বিশ্বাস যাই থাকুক না কেন ইউরোপিয়ান কর্মশৈলী তাদের জন্য মঙ্গলজনক বই অন্য কিছুই নয়।
ঘুম আর অবসরের ব্যপারে আ্যলেক্স বলেন, “জীব ও জড় সকল কার্যকরি সিস্টেমের ঘুমের প্রয়োজন হয় এবং এই ঘুমের অভাবে কাজের মান ও পরিমান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অবসরের ব্যাপারে আমদের ভ্রান্তি আছে কিছু। টিভির সামনে শুয়ে বসে থাকা সত্যিকার অর্থে অবসর নয়। অবসরের সময়টা পার করা উচিৎ দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে এমন সখের চর্চা দিয়ে। সেটা খেলাধূলা, ভ্রমন বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো যে কোন কিছু হতে পারে।”

আ্যলেক্স তার বইটি প্রকাশের গবেষণায় যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি পেয়েছেন তা হল সৃজনশিলতা সম্পর্কিত। তিনি সাধারনের মত মনে করতেন সৃজনশিলতা আকস্মিক ভাবে মানুষের মধ্যে আসে যার থেকে মানুষ কাজে নেমে পড়ার স্পৃহা পায়। ভ্রান্ত এই ধারনা কে আ্যলেক্স প্রতিস্থাপন করেন, “সৃজনশিলতা থেকে স্পৃহা আসে না, কাজের স্পৃহাই সৃজনশিলতার জন্ম দেয়। এবং পৃথিবীতে সফলতা তারাই পেয়ে থাকেন যারা এই ভাবেই প্রতিদিন কাজ করার স্পৃহা থেকে সৃজনশীল কিছুর উদ্ভাবন করেন।”

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top