লাইফস্টাইল

ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ

নিয়ন আলোয়- ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ- Neon Aloy

ট্যাটু বা উল্কি আজকালকার তরুণ প্রজন্মের কাছে বেশ জনপ্রিয় বিষয়। কাঁধের একপাশে অর্থপূর্ণ কোনো শব্দ কিংবা বাহুতে আগুনমুখো ড্রাগনের ছবি, পায়ের গোড়ালিকে পেঁচিয়ে আঁকা কিছু ফুল-লতাপাতার ছবি- এসব অনেকেরই পছন্দ। এর চাহিদার কথা বিবেচনা করেই এখন গড়ে উঠছে ট্যাটু পার্লার,যেখানে আঁকানো যাবে মনের মতো ট্যাটু।

ট্যাটুর উৎপত্তি সেই প্রাচীন নিউলিথিক যুগে। তখনকার সময়ের গুহাচিত্র বা যন্ত্রপাতি দেখে এসব ধারণা করা যায়।
তবে সুস্পষ্টভাবে ট্যাটু আঁকা মমি পাওয়া যায় অটজি দি আইসম্যানের বডিতে, যেটি ৩১৭০-৩৩০০ খ্রীষ্টপূর্বের ছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন ইজিপ্টের হাথোর দেবীর পূজারী আমুনেটের শরীরেও মিলে যায় ট্যাটুর ছাপ।

দেশে দেশে ট্যাটুর প্রচলনঃ

প্রাচীন ইজিপ্টে ট্যাটুর ব্যাবহার হত সামাজিক মর্যাদা বোঝানোর জন্য কিংবা রোগের চিকিৎসার কাজে। অনেক মমির গায়েই ট্যাটু দেখা গিয়েছে।

চীনে তারিম বেসিনের কবরস্থানের মধ্যে কয়েকটা ট্যাটু করা মমির খোজ পাওয়া যায়। সেখানে ট্যাটুকে কাজে লাগানো হত ডাকাত, চোর এবং দাসদেরকে চেনার জন্য। অনেকসময় গুরুতর অপরাধ করলে তাদের মুখে ট্যাটু এঁকে দেওয়া হত।

Jōmon বা Paleolithic পিরিয়ডে ট্যাটুকে ঘর সাজানো এবং ধর্মীয় কাজে ব্যাবহার করত জাপানিরা। কিন্তু পরবর্তীতে তারা চীনের মতই অপরাধী শনাক্তকরণের কাজে একে ব্যাবহার করতে শুরু করে।

ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, নর্থ আমেরিকা এসব দেশে ট্যাটুকে মনে করা হত ম্যাজিকাল শক্তির প্রতীক।

এদিকে ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে ট্যাটুকে নিয়ে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ সৌন্দর্যের জন্য আবার কেউ অশুভ শক্তি থেকে রেহাই পেতে ট্যাটু আঁকত।
দক্ষিণ এশিয়ান দেশে তন্ত্র-মন্ত্রের শক্তি কিংবা ধর্মীয় কারণে মানুষ ট্যাটু করে বেড়াত। এখনো থাইল্যান্ড, ভারতের সন্ন্যাসী এলাকায় ট্যাটু আঁকা হয় স্রষ্টার নৈকট্য লাভের আশায়।

তবে এই ট্যাটু জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মুল্যবোধ বহন করে সামোয়া নামক একটা উপদ্বীপে। এমনকি অনেকে বলে থাকেন ট্যাটু শব্দটি এসেছে সামোয়ান শব্দ “টাটাও” থেকে, যার অর্থ হল “কোনো কিছু মার্ক করা”। সামোয়াতে ছেলেদের ট্যাটুকে বলে pe’a আর মেয়েদের ট্যাটুকে বলে malu। ট্যাটু করা তাদের সামাজিক আর ঐতিহ্যের একটা অংশ। ট্যাটু শিল্পীকে ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে এটি শিখতে হয়। ট্যাটু আঁকার যন্ত্র হিসেবে তারা শুকরের দাঁতকে চেঁছে তীক্ষ্ণ বানিয়ে সেটাকে কচ্ছপের খোলসের সাথে বেঁধে কাঠের উপরে প্রাথমিক শিক্ষাটুকু নেয়। যখন এই বিষয়ে দক্ষ হয়ে যায় তখন “Autapulu” নামক চিরুনি দিয়ে বড় লাইন, “Ausogi’aso laititi” দিয়ে ছোট লাইন এবং “Sausau” দিয়ে ফোঁটা এঁকে থাকে। “Aumogo” হচ্ছে এইসব যন্ত্রকে ঠোকার জন্য ছোট হাতুড়ি। বাদামের রঙের সাথে অন্য প্রাকৃতিক রঙ মিশিয়ে “Tuluma” নামক বাটিতে নিয়ে “Tu’I” বা পেষণ যন্ত্র দিয়ে সব উপাদানকে পেষা হয় এবং তাদের ছেঁকে রঙ নিয়ে নেওয়া হয়। সামোয়ান মেয়েরাও ট্যাটু আঁকে শরীরে কিন্তু তা স্রেফ শখের বশে, পুরুষদের মত বাধ্যতামুলক কিংবা মর্যাদার প্রতীক হিসেবে নয়।

নিয়ন আলোয়- ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ- Neon Aloy

একজন সামোয়ার অধিবাসী; যাদের কাছে ট্যাটু একটি বিরাট মর্যাদা বহন করে

সামোয়াদের ট্যাটু আকার প্রক্রিয়া সাধারণত বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে আরম্ভ হয় এবং এটি একটি দশ দিনব্যাপী প্রক্রিয়া। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকেঃ

  • O le Taga Tapulu (back and small of the back): প্রথম ধাপ,কোন জায়গায় ট্যাটু করবে এবং কি ট্যাটু হবে তা নির্ধারণ করে ছোট ছোট ফোঁটার আউটলাইন আঁকা হয়।ট্যাটুর ডিজাইন নির্ভর করে ব্যাক্তির সামাজিক অবস্থানের উপর।
  • O le Taga Fai’aso (the posterior): কোমর থেকে আরম্ভ করে কুঁচকির চারপাশে ট্যাটু করে।
  • Taga Tapau: উরুর একপাশে ছবি আঁকবে।
  • Taga o Fusi ma Ulumanu: এটি চতুর্থ ধাপ এবং এখানে সম্পূর্ণ উরুটাকে ট্যাটু করে ফেলবে।
  • ‘Umaga (the end): এটি শেষধাপ এবং এতে পেটে ট্যাটু করানো হয়। পুরো ট্যাটু হয়ে গেলে মনে হয় কি তারা যেন খুব উজ্জ্বল রঙের সিল্কের কোনো প্যান্ট পরে আছে।
নিয়ন আলোয়- ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ- Neon Aloy

ট্যাটু করানোর আদিম পদ্ধতি

এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি খুব যন্ত্রণাকর এবং এতে অনেক সময় ইনফেকশন হয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ট্যাটু করার সময় আপনি কতটুকু যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেন তার ভিত্তিতে আপনার সাহস নির্ধারণ করা হবে। যদি ট্যাটু করাতে না চান কিংবা অর্ধেক ট্যাটু করে পালিয়ে আসেন তবে তা ভয়ানক অপরাধ। তার জন্য আপনার পরিবারকে একঘরে করা হবে এবং কাপুরুষতার মার্ক আপনার শরীরে এঁকে দেওয়া হবে। তবে সময়ের পরিবর্তনে আজকাল এসব ট্যাটুর নিয়মনীতি কমে গিয়েছে সেখানে।

নিয়ন আলোয়- ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ- Neon Aloy

সেলিব্রেটিরা তাদের শরীরে হরহামেশাই ট্যাটু করান এবং এর থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছে তাদের ভক্তকূল বিশেষ করে তরুণরা

এইতো গেলো প্রাচীন ট্যাটুর ইতিহাস। বলা হয়ে থাকে নাবিক, জিপসি, কয়েদি আর ভবঘুরেদের হাতেই নাকি ট্যাটুর প্রচলন ঘটে নতুনভাবে। আর এখনতো সাধারণ মানুষ থেকে আরম্ভ করে সেলিব্রিটিরা পর্যন্ত ট্যাটু করে বেড়াচ্ছে। আমরা আজকাল যেসব ট্যাটু করে থাকি তার বেশীরভাগই নাবিক আর জিপসিদের করা এবং এসব ট্যাটুগুলোরও যে অর্থ আছে তা জানেন কি?

  • কম্পাসঃ নাবিকরা মনে করত কম্পাসের ট্যাটু তাদেরকে সমুদ্রের পানিতে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।
  • টারটলঃ এটি সমুদ্র দেবতা নেপচুনের প্রতীক; এর মানে হল নাবিকটি ইকুয়েটর রেখা পার করেছেন।
  • ড্রাগনঃ ড্রাগন হল প্রাচীন শক্তি আর যুদ্ধের প্রতীক। নাবিকরা একে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার মার্ক হিসেবে করে থাকতো।
  • শুকর আর মুরগীঃ এক পায়ে শুকর আর এক পায়ে মুরগীর ট্যাটু ব্যাবহার করতো ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে।
  • হোল্ড ফাস্টঃ আঙুলের গাঁটে লেখা এই অক্ষরটি সবসময় জাহাজের দড়িকে শক্ত করে ধরে রাখার কথা মনে করিয়ে দেয়।
  • হৃৎপিণ্ডকে ভেদ করে ছুরিঃ এটি একটি জনপ্রিয় ট্যাটু। এই ট্যাটু নাবিকের কাছে তার দলনেতা বা বন্ধু হারানোর স্মৃতি।
  • ড্রিম ক্যাচারঃ চাকা, পালক আর পাখির ছবি দিয়ে বানানো এই ট্যাটুটি সেলিব্রেটিদের কল্যাণে এখন খুবই জনপ্রিয়। খারাপ স্বপ্নকে দূরে রাখতে ড্রিম ক্যাচার আঁকা হয়।
  • ডানাওয়ালা পরীঃ এই ট্যাটুটি মেয়েরা বেশি করে থাকে। ডানাওয়ালা পরী মানুষের মনের শৈশব স্মৃতিকে তুলে ধরে।
  • পাখির ছবিঃ যারা পাখির মত স্বাধীনতা পছন্দ করেন তারাই এমন ট্যাটু খুব পছন্দ করেন।
  • জাজ্বল্যমান সূর্যঃ এটি ধর্মীয় এবং ফ্যাশন উভয় কারণেই জনপ্রিয়। সূর্যকে ধরা হয় তারুণ্য, সাহস এবং উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।
  • একপেশে চাঁদঃ সূর্যের মত এটিও ধর্মীয় বিষয়ের সাথে সংযুক্ত। চাঁদ আপনার নরম, স্নিগ্ধ মনের পরিচয় দিবে।
  • লাভ বা হার্ট ট্যাটুঃ এটি মনে হয় বিশ্বের সর্বজন ব্যাবহৃত ট্যাটু। কারো প্রতি স্নেহ, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এটি আঁকা হয়।
  • মাথার খুলিঃ লাভ ট্যাটুর মত এটিও সর্বজনবিদিত হলেও এর অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত। রাগ, ক্রোধ, ভয়ংকর কোনো কিছু বুঝাতে এটি ব্যাবহার করা হয়। জলদস্যুরা এটি নিজেদের প্রতীক হিসেবে শরীরে আঁকলেও এখন ক্রিমিনাল, রেসলার, কয়েদিরা এটা শরীরে লাগায়।
  • রাজমুকুটঃ রাজমুকুট একটা মানুষের সার্বভৌম মন মানসিকতার পরিচায়ক।
  • খাপ খোলা তলোয়ারঃ প্রাচীনকালে বীরযোদ্ধা কিংবা নাইটরা একে নিজেদের সাহস আর নৈপুণ্যের চিহ্ন হিসেবে ব্যাবহার করত।
  • পদ্ম ফুল এবং গোলাপ ফুলঃ শ্বেতশুভ্র পদ্মফুল হল ট্যাটুপ্রেমীদের কাছে শান্তি এবং সৌহার্দের প্রতীক আর গোলাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় খাঁটি প্রেমের কথা।
  • বাঘ এবং সিংহঃ সিংহ মানেই অভিজাত কোনো কিছু। কিন্তু বাঘ যেমন মানুষের সাহসের পরিচায়ক, তেমনি এটি নিষ্ঠুরতারও প্রতীক।
    এছাড়াও অনেকে প্রিয় মানুষের ছবি,নাম বা প্রিয় কোনো উক্তি একে নেন নিজের শরীরে।
নিয়ন আলোয়- ট্যাটু এবং তার গোপন সংকেতের অর্থ- Neon Aloy

ট্যাটু বা উল্কি করার আধুনিক পদ্ধতি

আদিমযুগের মত এখন হাঁড় বা গাছের কাঁটা দিয়ে উল্কি বা ট্যাটু আঁকা হয়না। এর জন্য আছে নামি-দামি উল্কি পার্লার, যেখানে আপনার ইচ্ছামত ডিজাইন করতে পারবেন। আমাদের দেশের ঢাকায় এমন কয়েকটা ট্যাটু পার্লার আছে। কিন্তু উল্কির জনপ্রিয়তার সাথে সাথে এর স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও এসে যায়। একজনের জন্য ব্যবহার করা সূঁচ অন্যের শরীরে ব্যাবহার করলে রক্তবাহিত রোগ ও ভাইরাল রোগ (যেমনঃ Hepatitis, Herpes Simplex Virus, HIV, Staph, Tetanus এবং Tuberculosis) হতে পারে। তাছাড়া ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন তো আছেই। এজন্য আমেরিকায় কয়েক দশক আগে বিভিন্ন ট্যাটু পার্লার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া অনেক ধর্মে উল্কি আঁকা নিষিদ্ধ।

তাই, সৌন্দর্যের জন্য উল্কি করার আগে নিজের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং অন্য বিষয়গুলিও মাথায় রাখুন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top