ক্ষমতা

উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক সীমালঙ্ঘন থেকে আমরা যে শিক্ষা নিতে পারি…

উত্তর কোরিয়া মিসাইল পরীক্ষা জাপান নিয়ন আলোয় neon aloy

বাংলাদেশ-মিয়ানমার নিয়ে অজস্র লেখা হয়তো আপনি পড়েছেন ইতোমধ্যেই। তারচেয়ে বরং চলুন আমরা মিয়ানমার পার হয়ে একটু পূর্বদিকে ঘুরে আসি।

গতকাল জুম্মার নামাজের পর “বৌদ্ধের সাথে যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ করে বাঁচতে চাই” বলে যারা গলা ফাটিয়েছেন, তারা কি উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ মিসাইল টেস্টের খবর জানেন? জানার কথা না। গতকালকেই উত্তর কোরিয়া তার প্রতিবেশী দেশ জাপানের আকাশসীমা এফোঁড়-ওফোঁড় করে মিসাইল উড়িয়েছে। এবারই এরকম ঘটনা প্রথম নয়, গতমাসের ২৯ তারিখও উত্তর কোরিয়া জাপানের উপর দিয়ে একইভাবে একটি মিসাইলের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালিয়েছিল। একমাসের মধ্যে এই নিয়ে তারা দুইবার জাপানের আকাশসীমা অবৈধভাবে লঙ্ঘন করলো। সর্বশেষ মিসাইলটি পিয়ংইয়ং থেকে উড্ডয়ন করে জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সাগরে পড়েছে। হোক্কাইডো শহরে সেসময় ছিলো তীব্র আতংক, টিভিতে আর শহরের রাস্তাঘাটে একসাথে বেজে উঠেছে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার সতর্কতামূলক সাইরেন।

উত্তর কোরিয়া মিসাইল পরীক্ষা জাপান নিয়ন আলোয় neon aloy

জাপানের আকাশসীমা লংঘন করে উত্তর কোরিয়ার মিসাইলের গতিপথ। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সেভেন নিউজ।

এইবার আসি উত্তর কোরিয়া আর জাপানের সামরিক তুলনায়। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের হিসাবে জাপান সামরিক শক্তিমত্তার দিক দিয়ে পৃথিবীর ৭ম দেশ, যেখানে উত্তর কোরিয়ার র‍্যাংকিং ২৩। জাপানের আঞ্চলিক মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া’র র‍্যাংকিং ১২। এই তালিকায় এক নাম্বারে থাকা যুক্তরাষ্ট্র জাপানের মিত্র, উত্তর কোরিয়ার মিত্র তিন নাম্বারে থাকা চীন। বন্ধুপ্রতীম সুপারপাওয়ার এলাকার ধারেকাছে আছে- এটা ছাড়া আর কোনদিক দিয়েই জাপানের ধারেকাছেও নেই উত্তর কোরিয়া।

কিন্তু এই জাপানীরাও প্রচন্ড বোকা, এদেরও মনেহয় বাংলাদেশীদের মত বেহায়া অবস্থা- আত্মসম্মান বলে কিছু নাই। নাহলে কি এক মাসেরও কম সময়ে দুই দফা নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত আসার পরও এত এত পরাশক্তি বন্ধুরাষ্ট্র নিয়ে বসে বসে আংগুল চুষে আর কূটনৈতিক নিন্দা জানিয়েই ক্ষান্ত দেয়? জাপান কিছু না করলেও দক্ষিণ কোরিয়া এই মিসাইল টেস্টের জবাবে পাল্টা দুইটা মিসাইল সাগরে ফেলে জানান দিয়েছে যে তাদের সাথে উল্টোপাল্টা কিছু করলে তারাও ছেড়ে কথা বলবে না।

বারবার জাপানের আকাশসীমা লংঘনের পরেও কেন তারা তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে গিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে না পুঁচকে উত্তর কোরিয়াকে?

না, জাপানীরা আত্মসম্মানহীন না। বরঞ্চ তাদের মত চড়াসুরে বাঁধা আত্মসম্মান আধুনিক পৃথিবীর অন্য কোন জাতির আছে নাকি আমার জানা নাই। এই আধুনিক যুগেও তাদের কিছু কিছু মানুষ আত্মসম্মানে আঘাত লাগলে হারিকিরি (নিজ তলপেটে ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যা) করে। কিন্তু তাহলে এভাবে বারবার তাদের আকাশসীমা লংঘনের পরেও কেন তারা তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে গিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে না পুঁচকে উত্তর কোরিয়াকে?

উত্তরটা সহজ। জাপানীদের আত্মসম্মানবোধ যেমন চড়া, তেমনি অযথা গোয়ার্তুমী করে যুদ্ধ করতে গেলে পরিণতি কি হয়- সেটাও তাদের থেকে ভাল আর কেউ জানে না। পৃথিবীর ইতিহাসে পারমাণবিক বোমা হজম করা একমাত্র জাতি এই নিপ্পনীরা। তাই তারা জানে, এলাকার বেয়াদব ছোটভাই যতই বেয়াড়া আচরণ করুক না কেন, মাথা গরম করে মারামারি লাগিয়ে গিয়ে চারটা থাপ্পড় বসাতে গিয়ে যদি একটা পাল্টা থাপ্পড়ও খেতে হয়, তাহলে ইজ্জত বড় ভাইয়েরই যায়। তারচেয়ে সময়-সুযোগ বুঝে তাকে ঠান্ডা মাথায় শায়েস্তা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত দু’টা দেশের সৈনিকরা কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে একে অপরের দিকে পাথর ছুঁড়ছে! চিন্তা করা যায়?

পূর্ব দিগন্ত থেকে চোখ ফিরিয়ে এবার যাই আমাদের দেশ থেকে দু’কদম পশ্চিমে। নতুন সুপারপাওয়ার হওয়ার উদ্দেশ্যে জোরেশোরে পাল্লা দেওয়া চীন আর ভারতের মাঝে কয়েকদিন আগে সীমান্তে যুদ্ধ প্রায় লেগেই গিয়েছিলো। অবশ্য বেশ ক’দিন ধরেই ভূ-রাজনৈতিক দাদাগিরি পোক্ত করার জন্য কৌশলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুই দেশই। বাংলাদেশ-নেপাল-শ্রীলঙ্কা-ভুটান-মিয়ানমারসহ এদিককার ছোট ছোট সবগুলো দেশকেই নিজ নিজ বেল্টে নেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চীন আর ভারত উভয়েরই। যে এই এলাকায় বেশি বন্ধু বানাতে পারবে, সে-ই আঞ্চলিক সুপারপাওয়ার হবার দৌড়ে অনেকদূর এগিয়ে যাবে প্রতিপক্ষের চেয়ে।

তো শেষমেষ যেটা হলো- দুইদেশেরই সৈন্যসামন্ত নিজ নিজ সীমান্তে মুখোমুখি হয়ে গেলো ভুটানের ডোকলামে সীমান্ত ঘেঁষে চীনের রাস্তা বানানোর ইস্যুতে। ভুটানের মিত্র হিসেবে ভারতীয় সৈন্যরা বাধা দিলো চীনা সৈন্যদের। এ নিয়ে চীন ও ভারতের মাঝে কূটনৈতিক বাগাড়ম্বর চললো ক’দিন, দুই দেশের মিডিয়াই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালালো, এমনকি চীনা মিডিয়া ১৯৬২ সালের যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সোজা কথায় ফাপড়বাজি চালালো ভারতের মিডিয়ার উপর, নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিও হলো কয়েকদফা। কিন্তু ট্র্যাডিশনাল সম্মুখসমর বলতে যা বুঝায়- তা আর হলো না। সর্বোচ্চ যেটা দেখলাম আমরা, একেবারে উত্তেজনার তুঙ্গে উঠে দুই দেশের সৈন্যরা পাথর ঢিলাঢিলি করলো নিজেদের মধ্যে। চিন্তা করা যায়? পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত দু’টা দেশের সৈনিকরা কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে একে অপরের দিকে পাথর ছুঁড়ছে! আরে ভাই, আমাদের দেশে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মারামারি লাগলেও তো পাল্টাপাল্টি অন্তত ২০-৩০ রাউন্ড গোলাগুলি হয়! দুই দেশের এত-এত ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্রসম্ভার তাহলে কি কাজে লাগলো যদি দেশের আত্মসম্মানই রক্ষা না হলো! শেষে পরিস্থিতি আর বেশিদুর আগানোর আগেই দুই পক্ষ আলাপ-আলোচনা করে সমঝোতায় আসে এবং নিজ নিজ সেনাবাহিনী সরিয়ে নেয় সে এলাকা থেকে।

চীন ভারতীয় ধস্তাধস্তি নিয়ন আলোয় neon aloy

ভুটানের ডোকলামে চীনা ও ভারতীয় সৈন্যদের হাতাহাতি। ছবিঃ টাইমস অফ ইন্ডিয়া

পূর্বে বেড়িয়ে আসলাম, হালকা পশ্চিমেও গেলাম। এবার আসি আমাদের অবস্থানে।

২৫ অগাস্ট থেকে রোহিঙ্গা বিষয়ক ঝামেলা শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার যে শুধু রোহিঙ্গাদের আমাদের সীমান্তে পুশইন করছে- তা নয়। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমা বারবার লঙ্ঘন করছে। বাংলাদেশ এর প্রতিবাদে বারবার কূটনৈতিকভাবে প্রতিবাদলিপি-ই পাঠাচ্ছে, সামরিক কোন জবাব এখনো দেয়নি। কিন্তু কেন?

মিয়ানমারের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করি। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয় না। তাদের ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গারা বাঙালি, তাই তাদের বাংলাদেশেই ফেরত যাওয়া উচিৎ। কিন্তু শত বছর ধরে একটি এলাকায় বাস করে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে এত সহজে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব না, অন্তত আধুনিক যুগে। কিন্তু তারপরেও তারা অত্যন্ত বর্বরতার সাথে রোহিঙ্গা বিতাড়ন শুরু করেছে, এবং একই সাথে আকাশসীমা লংঘন করে বারবার বাংলাদেশকে উস্কানি দিচ্ছে। কেননা আন্তর্জাতিক মহলে একটু-একটু করে শুরু হলেও গত এক সপ্তাহে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বেশ বড় রকমের আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের সম্ভবত আশা ছিলো, ক্রমাগত উস্কানিতে একটা না একটা সময় বাংলাদেশের ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটবে এবং বাংলাদেশ সামরিকভাবে এর জবাব দিবে অনুপ্রবেশকারী একটি বার্মিজ হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে। আর ঠিক যে মুহুর্তে এটা ঘটবে, সে মুহুর্তেই পুরো ঘটনা মোড় নিবে নতুন দিকে। শুরু হয়ে যাবে দু’দেশের সীমান্তযুদ্ধ, যা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে দু’দেশের অভ্যন্তরেও। আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে তখন মূল প্রসঙ্গ হয়ে উঠবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংঘাত, আর রোহিঙ্গা ইস্যু চলে যাবে ব্যাকফুটে। সত্যি বলতে, এক সপ্তাহ পরে রোহিঙ্গাদের কথা আর কারো মনেই থাকবে না আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। আর ঠিক এটাই চায় মিয়ানমার। বাংলাদেশকে কোনভাবে যুদ্ধে টেনে আনা মানেই এই দফায় তাদের স্বার্থ হাসিল হয়ে যাওয়া।

বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ পাশে পাচ্ছে শুধু মধ্যম কাতারের কয়েকটি মুসলিম দেশকে; যাদের মূল ফোকাস শুধুই নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের উপর, বাংলাদেশের উপর না।

আন্তর্জাতিক সমর্থনের হিসাব তুললে মিয়ানমারের পাশে আছে চীন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সশরীরে মিয়ানমার গিয়ে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’, যেখানে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ভারত জানিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে দিয়ে ফোনকলের মাধ্যমে। এ থেকেই পরিষ্কার যে আঞ্চলিক দুই সুপারপাওয়ারেরই সমর্থনের পাল্লা অনেকটাই ভারী মিয়ানমারের পক্ষে। আমেরিকা এখনো চুপচাপ, পরিষ্কার কিছু না বললেও আখেরে তারাও মিয়ানমারের দিকেই ঝুঁকবে (এই আর্টিকেলটি প্রকাশের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে মিয়ানমার সরকারের প্রতি)। ক’বছর আগে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্রাত্য হয়ে থাকা সামরিক জান্তা-শাসিত দেশটির হঠাৎ এত কদর কেন? কেননা বেশ কয়েক দশক নিজেদের একঘরে করে রাখার পর ক’ বছর আগেই তারা তাদের বাজার খুলে দিয়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য।আর সে সুযোগে বানের পানির মত বিনিয়োগ ঢুকছে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দেশটিতে। বিনিয়োগকারীর এই লম্বা লিস্টে কে নেই? আমেরিকা, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, ভারত, পাকিস্তান আর সেই সাথে তাদের সবসময়ের বন্ধু চীন। এ কারণেই প্রায় সব সুপারপাওয়ারের কাছেই এ মুহুর্তে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি আরাধ্য মিয়ানমার। প্রত্যেকেরই বিনিয়োগের টাকা ঢুকছে দেশটিতে, যার কয়েকগুণ সবাই উসুল করে নিবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই। উল্টোদিকে বাংলাদেশ পাশে পাবে মধ্যম কাতারের কয়েকটি মুসলিম দেশকে শুধু; যাদের মূল ফোকাস শুধুই নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের উপর, বাংলাদেশ না। তারা ঘরহারা রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে চায়, কিন্তু এর জের ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যুদ্ধ লাগলে তারা যে আমাদের সামরিকভাবে সাহায্য করবে বা করতে পারবে তা কিন্তু না, কেননা এতে মিয়ানমারের সমর্থনে থাকা সুপারপাওয়ারদের সাথে তাদের ব্যবসায়িক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনতির ভয় থাকে। তাই পূর্ণমাত্রার সামরিক সমরে বাংলাদেশ হয়ে পড়বে একেবারেই আন্তর্জাতিক বন্ধুহীন।

একটু আগে আলোচনা করেছি সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা জাপান কেন উত্তর কোরিয়াকে শায়েস্তা করছে না, এবং শক্তিমত্তায় কাছাকাছি থাকা পারমাণবিক শক্তিধর চীন ও ভারত কেন সীমান্তে পাথর ঢিলাঢিলি করছে তা নিয়ে। এবার আসি মিয়ানমারের চেয়ে সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের আলাপে। আমাদের অনেকের হয়তো ধারণা একবার যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের সেনাবাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে শায়েস্তা করে ফিরতে পারবে। কিন্তু পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ারের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের র‍্যাংকিং যেখানে ৩১, বাংলাদেশের ৫৭। এবং এখানে শুধু যে সৈন্যসংখ্যা, অস্ত্রসংখ্যা ইত্যাদি’র গণনা করে র‍্যাংকিং করা হয়েছে তা না, বরং সর্বমোট ৫০টির মত প্যারামিটার পর্যালোচনা করে এ হিসাব করা হয়েছে। হ্যাঁ, যুদ্ধের ময়দানে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল খাটিয়ে বড় প্রতিপক্ষকে কাবু করেছে অপেক্ষাকৃত ছোট যোদ্ধাদল- এমন ইতিহাস ভুরি-ভুরি আছে। কিন্তু এই আশায় বুক বেঁধে অঘটন ঘটার কল্পনায় যুদ্ধে নামবে না কোন পেশাদার সামরিক বাহিনী।

দুইটি দেশই সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশের কাতার থেকে উঠে আসার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় যুদ্ধে জড়ানো হবে নিজ পায়ে কুড়াল মারার চেয়েও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত।

সেই সাথে আছে MAD-এর আশংকা। MAD এর পূর্ণ রুপ “Mutually Assured Destruction”, যার সহজ বাংলা তরজমা দাঁড়ায়- “তুইও মরবি, তোকে মারতে গিয়ে আমিও মরবো”। যদিও এই Mad Doctrine পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তবে এখানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বর্তমান অর্থনীতিতেও যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত একই প্রভাব রাখতে পারে। দুইটি দেশই সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশের কাতার থেকে উঠে আসার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় যুদ্ধে জড়ানো হবে নিজ পায়ে কুড়াল মারার চেয়েও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ যেমন রক্তপাতের হিসাবে সস্তা না, তেমনি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও অকল্পনীয়। শুধু যে খরচের খাতা ভারী হবে, তা না। বিবদমান দু’টি দেশেরই লক্ষ্য থাকবে প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, যেন অদূর ভবিষ্যতে তারা আবার একে অপরের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে না পারে। আর এর জের ধরে প্রতিপক্ষের আক্রমণে ধংস হবে দুই দেশেরই অর্থনীতির চালিকাশক্তি দেশীয় সম্পদ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগগুলো। মুখ ফিরিয়ে নিবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিনিয়োগকারীরা। যার প্রভাবে মাথা গরম করে শুরু করে দেওয়া এক যুদ্ধের কুপ্রভাব কয়েক দশকেও কাটিয়ে ওঠা কষ্টকর হয়ে উঠবে দেশ দু’টির জন্য।

সুতরাং, যেখানে জাপান ১৬ ঘর পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে জবাব দিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চিন্তাভাবনা করছে এত এত সুপারপাওয়ারের প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকার পরেও, সেখানে আমাদের চেয়ে ২৬ র‍্যাংকিং এগিয়ে থাকা প্রতিবেশী’র সাথে যুদ্ধে নামাটা কতটা সমীচিন হবে একেবারেই আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া- সেটা যথেষ্ঠ চিন্তাভাবনার দাবী রাখে। আর এমন যদি হতো যে এই যুদ্ধ শুরু করলেই আমাদের প্রাথমিক যে লক্ষ্য- রোহিঙ্গাদের ঘরে পাঠানো, সেটা সফল হবে তা-ও কিন্তু না, যেটা উপরেই আলোচনা করেছি। বরং রোহিঙ্গাদের সাথে সাথে আমাদেরও দুর্দশা বাড়বে। আর যুদ্ধ যে শুধু সেনাবাহিনীর সাথে সেনাবাহিনীর হবে, তা কিন্তু না। বোমা পড়বে আপনার বাড়িতে, আপনার পরিবারের উপরও। আর অবস্থা খারাপের দিকে গেলে হয়তো আপনাকেও শরণার্থীর খাতায় নাম লেখাতে হতে পারে অচিরেই।

[বাংলাদেশ বনাম মিয়ানমার যুদ্ধ যদি লেগেই যায়, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তা কি প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুনঃ “যুদ্ধ, না কূটনৈতিক প্রচেষ্টা?”]

Most Popular

To Top