ক্ষমতা

যুদ্ধ, না কূটনৈতিক প্রচেষ্টা?

বাংলাদেশ-মিয়ানমার-যুদ্ধ

যুদ্ধের দামামার মাঝে একটা রোমান্টিসিজম আছে কিন্তু আদতে যুদ্ধ কুৎসিত। আপনি পত্রিকা পড়তে পড়তে, ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে অথবা আড্ডার টেবিলে অবস্থান করে ভাবতেই পারেন নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের বাঁচাবার জন্যে এবং মিয়ানমারের উস্কানির দাত ভাঙ্গা জবাব দেবার জন্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ফাইটার জেট, ট্যাঙ্ক আর ফ্রিগেট নিয়ে রাখাইন রাজ্যে ঢুকে যাবেন এবং বীরের মত পরাজিত করবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে। আপনার এ ভাবনার পেছনে নিবিড় দেশপ্রেম মুখ্য ভুমিকা পালন করছে এবং আপনার মানবিক অনুভুতি, যদিও তা অনেকাংশে শুধু ধর্মানুভুতি দ্বারাই পরিচালিত, এ ভাবনাকে উস্কে দিচ্ছে। আপনি এ নিপীড়নের প্রতিশোধ নিতে চান এবং জানেন একমাত্র বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীই পারবে এই নিপীড়নের প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ এ সময়ে যুদ্ধের দামামা বাংলাদেশের জন্য চূড়ান্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। যুদ্ধ সমাধান আনবে না, আনবে পোঁড়া মাংসের উৎকট গন্ধ, আনবে থ্যাতলানো সৈনিকদের মরদেহ, আনবে ধ্বংসপ্রাপ্ত শস্যক্ষেত্র, আনবে বিধ্বস্ত বাড়ীঘর, আনবে অনাহার ও ক্ষুধা, ছিটাবে লালচে কাল রঙের রক্ত। আর যুদ্ধে সত্য এবং ন্যায়ের জয় হয় না; যুদ্ধে জয় হয় অধিকতর কৌশলী পক্ষের।

অন্যায়ের প্রতিবাদ হিসাবে রাস্তায় ধৃত পকেটমারকে বাগে পেয়ে এক লাথি কসানো কিংবা বাসে কন্ডাকটার ভাড়া বেশি চাওয়াতে এক চড় দেওয়া আর ফাইটার জেট, ট্যাঙ্ক, ফ্রিগেট নিয়ে রাখাইন রাজ্যে ঢুকে যাওয়া এক জিনিষ নয়। সামরিক কলাকৌশল ও প্রতিপক্ষের সামর্থ্য বিচার ছাড়াও  আমলে নিতে হবে বিশ্ব রাজনীতি। এ অঞ্চলের বড় শক্তি চীন ও ভারত। এ দুই শক্তি যাদের সমর্থন ও সহায়তা করবে, তারাই সুবিধা পাবে। চীন ও ভারত একে অপরের শত্রু, এই কিছু দিন আগেও তাদের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শত্রুতা ও বন্ধুত্ব আপেক্ষিক এবং এই আপেক্ষিক সূত্র মেনে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনের ইস্যুতে চীন ও ভারত মিয়ানমারের সাথে একমত ও অনেকাংশে সহযোগী।

বাস্তবতা হলো চীন ও ভারত উভয়ের কাছে, বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের সান্নিধ্য বেশি কাঙ্ক্ষিত। চীনের সাথে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক ভাবেই ভাল সম্পর্ক। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে ২৭১ কিঃমিঃ, ভারতের সাথে রয়েছে ১,৪৬৮ কিঃমিঃ এবং চীনের সাথে রয়েছে ২,১২৯ কিঃমিঃ। চীন সরল হিসাবেই মিয়ানমারের ভাল দেখবে কারণ বাংলাদেশ চীনের কাছে এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি আর মিয়ানমার তার ভাই। চীন আবার রাখাইন রাজ্যে বসিয়েছে ৪৮০ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন, যা তাদের ইউনান প্রদেশের কুনমিং রিফাইনারি থেকে মায়ানমারের কিয়াউক ফিউ পোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পাইপলাইন নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে ২৮ টি সেনা ব্যাটেলিয়ান। শুধু রাখাইনেই এত বড় বিনিয়োগ থাকাতে চীন রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের সাথেই  থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মিয়ানমার ভারতের কাছ থেকে গত কয়েক বছরে কিনছে ৩৮ মিলিয়ন ডলারের গানবোট ও মিজাইল। উপরন্তু, কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রান্সপোর্ট প্রোজেক্টের কাজ দিয়েছে ভারতকে। ভারত ৫০ কোটি ডলার খরচ করে এ প্রোজেক্টের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর বঙ্গোপসাগরের মধ্যে সরাসরি সংযোগ গড়ে তুলবে৷ ভারতের মতলব – বাংলাদেশ যদি কখনো ট্রানজিট দিতে অস্বীকার করে (বিএনপি-জামাত আবার ক্ষমতায় যে আসবে না তার গ্যারান্টি নেই যেহেতু), তাহলে রাখাইনের মধ্য দিয়েই হবে ট্রানজিট৷ মিয়ানমারের সাথে সংঘর্ষ বাঁধলে ভারত আমাদের সাথে থাকবে এ আশা করা স্বাভাবিক এবং এ আশা নিয়েই রাষ্ট্র ছিলও প্রতীয়মান হয়। কিন্তু সেখানে নরেন্দ্র মোদীর সম্প্রতিক সফর আমাদের বলে দিয়েছে ভারত এই ইস্যুতে আমাদের পাশে নেই; মোদী সেখানে যেয়ে বলেছেন রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমারকে সর্বাত্মক সাহায্য করবেন। তার মানে এ অঞ্চলে বাংলাদেশ এখন মোটামুটি একা।

কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ২১,৩০০ বর্গ কি.মি বাংলাদেশের হাতে চলে আসে এবং যার ভিতরে সাতটি তেলের ব্লক আছে। এ রায় মিয়ানমারের জন্য ছিল এক আঘাত। হতে পারে সমুদ্র সীমা নিয়ে বিরোধের অংশ হিসেবে তারা দীর্ঘকালীন পরিকল্পনার অংশ হিসাবে রোহিঙ্গা ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। গত মাসে কয়েকবার মিয়ানমার তার সামরিক হেলিকপ্টার বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকিয়েছে, সীমান্তের একদম পাশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে। এসব হলো উস্কানি। তারা চাইছেই বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া দেখাক, যুদ্ধ বাঁধাক। আর বাংলাদেশীদের মাঝে আছে একদল অতি উৎসাহী ও ‘লাইভ যুদ্ধ’ দেখতে পিপাসু মানুষজন যারা রাষ্ট্রকে আহ্বান করছে সামরিক ভাবে এ বিষয় মোকাবেলা করতে।

তবে বাংলাদেশ, রাষ্ট্র হিসাবে ঠিক কাজটাই করে যাচ্ছে – সমস্যাটি আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার জন্য চেষ্টা চালানো। বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ অথবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালিত একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তোলার। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো এ প্রস্তাবে সায় দিচ্ছে না। তারা বরং মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সু চি’কে আরো সময় দিতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও রোহিংগা ইস্যুতে খুব কঠোর অবস্থান নেবে না কারণ ট্রাম্প প্রশাসন এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়া প্রশ্নে চীনের অকুণ্ঠ সমর্থন চায়। আর চীন ও ভারতের কথাতো হলোই। আপাতদৃষ্টিতে শুধু ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশের সাথে রয়েছে এবং ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে।

তবে এটি নিশ্চিত যে বিশ্বমোড়ল ও চীনবিরোধী পক্ষ চুপ করে বসে থাকবে না, হয়তো নেইও। চীনকে বেকায়দায় ফেলার জন্য তারা মুসলিম উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দেবে এই এলাকায়। মুসলিম উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দিলে রাখাইন রাজ্যে চীনের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সাথে অনৈক্য তৈরী হবে চীন ও মিয়ানমারের, আর কপাল পুড়বে বাংলাদেশের কারণ এসব নব্য জঙ্গী মিলে মিশে যাবে দেশের অন্য জঙ্গী সংগঠনগুলোর সাথে।

আর পাকিস্তান তো বসেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বনাশের পাঁয়তারায়। পাকিস্তানভিত্তিক ধর্মান্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠন অতীতে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের আফগানিস্তানে মুজাহিদ হিসেবে পাঠিয়েছিল। এর অর্থায়নে ছিল সৌদি আরব ও কাতার। আফগান-ফেরত রোহিঙ্গারা পরবর্তী সময়ে রাখাইন রাজ্যে একাধিক জঙ্গী সংগঠন গড়ে তোলে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ভারতে ও বাংলাদেশে সুবিধা করতে পারছে না গত সাত-আট বছর, তাই রাখাইন রাজ্যে ঢুকেছে তারা। বর্তমান রোহিঙ্গা নিপীড়নকে ভিত্তি করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির মাধ্যমে পাকিস্তান যথাসম্ভব চেষ্টা করবে বাংলাদেশকে অশান্তিতে রাখতে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি যা ‘আরসা’ নামে এখন পরিচিত, ‘আতাউল্লাহ আবু আমর জুনুনি’ নামে একজন রোহিঙ্গার নেতৃত্বে পরিচালিত। আতাউল্লাহর জন্ম করাচীতে, এবং বেড়ে উঠা পাকিস্তানের সর্বকালীন মিত্র সৌদি আরবে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমের কারণেই হয়তো ভারত ঘোষণা করেছে এই ‘জঙ্গী-সন্ত্রাস’ প্রতিরোধে তারা মিয়ানমারের পাশে থাকবে।

এই আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিই, হতে পারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার প্ররোচনায়, ২৫ অগাস্ট ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ঘাঁটিতে হামলা করে যার প্রতিক্রিয়াতে মিয়ানমার শুরু করে সেনা অভিযান এবং ফলশ্রুতিতে এখন পর্যন্ত (১৩ সেপ্টেম্বর)  তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ১০ সেপ্টেম্বর এক মাসের অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে কারণ তাদের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’, কিন্তু  মিয়ানমার সরকার অস্ত্রবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ সাথে কোন মধ্যস্থতা করবে না। আসলে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ২৫ অগাস্ট সুযোগ করে দিয়েছে, মিয়ানমার তা থেকে এখন সুবিধা নিচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে শুধু বাংলাদেশের।

এই সমস্যা থেকে উত্তরণ যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, কূটনৈতিকভাবে হতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন কিছুদিন আগে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু সুপারিশ করেছিলেন। বাংলাদেশের উচিত হবে, হয়তো পররাষ্ট্র কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে তা করছেনও, সেই সুপারিশগুলো আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরদারভাবে তুলে ধরা। আমাদের কূটনীতিক পারদর্শিতার উপরই নির্ভর করছে এই সংকটের নিরসন। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী দেশ চীনই পারে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে। তাই জোর কূটনীতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে চীন ও মিয়ানমার উভয়ের সঙ্গে। এবং তা করতে যদি অন্য কোন সম্পর্কে ছাড় দিতে হয়, তবে ছাড় দেয়া হউক।

বাংলাদেশ স্বল্প উন্নত এক দেশ, লাখ-লাখ শরণার্থীদের পোষা আমাদের সম্ভব না। তবুও আমরা  মুখ ফিরিয়ে নেইনি, যতদূর সম্ভব জায়গা করে দিয়েছি রোহিঙ্গাদের এবং তা শুধু এবারই নয়, অতীতেও অনেকবার। তবে স্থায়ী ভাবে এদেরকে যায়গা দেবার অবস্থা আমাদের নেই, যুদ্ধে যাবার অবস্থাতেও আমরা নেই। রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের সাময়িক পুনর্বাসনের। এখন প্রয়োজন অতি দ্রুত রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেশনের, যেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সবাইকে আবার তাদের নিজ বাসভূমে ফেরত পাঠানো যায়।

আবার বলছি, যুদ্ধের প্রতি আপনার রোমান্টিসিজম বাদ দিন। ফাইটারের শব্দ পেলে ভাববেন না যে সেগুলো মিজাইল লোডেড হয়ে কক্সবাজারের দিকে উড়ে যাচ্ছে; হতে পারে সেগুলো যশোর-ঢাকা রুটিন ফ্লাই করছে। আর যুদ্ধ যদি বেঁধেই যায়, তাহলে ফেসবুকে চেতনা ও ইমানী জোশ না দেখিয়ে চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ কিনতে দৌড়ান। মনে রাখবেন দৌড়ালে ব্লাড সুগার ও কোলেস্টেরল- দুইটাই কমে।

লেখক ওয়াসীম সোবহান চৌধুরী পেশায় গবেষক ও বিশ্লেষক। বর্তমানে কাজ করছেন IHS Markit প্রতিষ্ঠানে। লেখালেখি তার নেশা; নিয়মিত লিখেন “ওয়াসীম সোবহানের ভাবনা” নামে তার নিজের ব্লগে।

Most Popular

To Top