ইতিহাস

রোহিঙ্গাঃ এক অস্বীকৃত জনগোষ্ঠী এবং মানব সভ্যতার আর এক সংকট

নিয়ন আলোয়- রোহিঙ্গাঃ এক অস্বীকৃত জনগোষ্ঠী এবং মানব সভ্যতার আর এক সংকট- Neon Aloy

ঘরেও নহে, পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে – রোহিঙ্গা এক অস্বীকৃত জনগোষ্ঠী এবং মানব সভ্যতার আর এক সংকট।

সামাজিক মাধ্যম এবং নানাবিধ প্রিন্ট মিডিয়া আর বৈদ্যুতিন মিডিয়ার লক্ষ লক্ষ বাইট বা নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে। হয়েছে প্রচুর ছবির ছাপা এবং ফটোশপের অনেক কাজ। ঘোলা জলে মাছ ধরতে এবং এই অঞ্চলে আর একটি ইসলামী জেহাদ এর কাজ শুরু করার জন্য শুরু হয়েছে কাজ কর্ম। শুধু বাংলাদেশ না , এই ভাসমান জনগোষ্ঠী এখন ভারতের ক্ষেত্রে ও মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। এই লেখায় চেষ্টা করবো ওই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এবং বতর্মান প্রেক্ষাপটের উপর কিছু তুলে ধরা।

এই তুলে ধরার জন্য লেখাটিকে তিনটি ধাপে ভাগ করেছি।

১. আমি নির্ভর করেছি প্রধানতঃ ঐতিহাসিক স্যার আর্থার ফেয়ার এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান গ্রন্থাগারিক এন এম হাবিবুল্লাহর রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস বইটির উপর ,যাতে ওই জনজাতির আগের কয়েকশত বছরের ঐতিহাসিক অবস্থাটা তুলে ধরতে পারি।
২. পরবর্তী অর্থাৎ এই উপমহাদেশে ভারত এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পরের সময় অর্থাৎ ১৯৪৭ পরবর্তী একটি অধ্যায় রেখেছি এদের তৎকালীন অবস্থা আর এই সংকটের সেই সময়ের রূপ তুলে ধরতে। এক্ষেত্রে সাহায্য নিয়েছি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর বিবিধ রিপোর্ট আর ঐতিহাসিক কাগজ গুলোর। এর জন্য আমি আর্কাইভ ডট অর্গ এর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। বিনা পয়সায় বিবিধ বই পড়তে দিয়ে আমার অশেষ উপকার করেছে ওই সাইটটি।
৩. বর্তমান সংকট অর্থাৎ ১৯৪৭ থেকে বর্তমান অবস্থার উপর ঘটনাকর্মের স্বল্প বিবরণ এবং বর্তমান সময় অর্থাৎ আজকের এই ২০১৭ তে এসে এদের অবস্থা নিয়ে বিবরণ রেখেছি একদম যে ভাবে পড়েছি অনেকটাই সেই ভাবে।

লেখার বিভিন্ন অংশে মূলত পাঠক হিসেবে কিছু নিজস্ব ধারণা দিতে চেষ্টা করেছি আর শেষ ধাপে এসে নিজের উপলব্ধি আর এর নিরসনে কি করা যেতে পারে তার কিছু ধারণা রেখেছি। পাঠক এবং পাঠিকার মূল্যবান মতামত আর নতুন কিছু সূত্র পেলে লেখাটি আরো পরিবর্ধন করা সম্ভব হবে।

এই জনগোষ্ঠীর নৃতাত্বিক কিছু পরিচয় দেওয়ার আগে না বলে পারছি না, আজ বাংলাদেশের সুবেহ সাদিক মানে পুত্তুম আলু ভারতের এবং চীনের এর উপর কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অবশ্য মতি আরব গোষ্ঠীর কথা মনে করায় নি, যেমন পাকিস্তানের মহান দায়িত্ব মনে করায় নি। ভারতের কাশ্মীরে কেন ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বসে আছে ওটাও মনে করায় নি। আসুন ওটাও একটু মনে করাই। করাবো, একদম শেষে এসে ওটা ও আলোচনা করবো। অনেকগুলো ফ্যাক্টর আজ এইখানে এসে গিয়েছে তাই অনেক কিছু আলোচনা করার দরকার।

শুরু করবো এক ইন্টারেস্টিং ছড়া দিয়ে। হ্যাঁ, লেখক এন এম হাবিবুল্লাহর বইয়ের ওই প্রথমে থাকা ছড়া দিয়েই করছি:

” ভোয়াঙ ভোয়াঙ ভোয়াঙ
তর বাপ্ গিয়ে রোয়াং
রোয়াং-অর টিয়া বরুণা পান
তর মারে কোইছদে ন কাঁদে পান “

অর্থাৎ একটি ছেলে তার খেলার সাথী আর একটি ছেলেকে বলছে যে তোমার বাবা গিয়েছে উপার্জনের জন্য রোসাং এ, ওই জায়গার টাকা বরুণার মতো। বরুণা হলো ভাতের হাড়ির উপরের মাটির ঢাকনা অর্থাৎ এতো বড় মুদ্রা। সুতরাং ছেলেটির মায়ের কান্নাকাটি করার দরকার নেই। লেখক আরো বলছেন, চট্টগ্রামের মানুষ ওই রোসাং এ যেতো উপার্জনের জন্য। আরো মজার হলো চট্টগ্রাম এক সময় আরাকানের একটি অংশও ছিল। আরাকান একসময় স্বাধীন একটি ভুখন্ডও ছিল, যার বিস্তৃতি সুন্দরবন পর্যন্ত ছিল ওটা ও জানতে পারছি লেখকের লেখা থেকে। যাই হোক আগেই বলেছি , এই ভূখণ্ডের আদিকালের সময়ের থেকে আমরা আলোচনা করবো। আশা করি আন্দাজ করছেন ওই রোসাং আর রোহিঙ্গার মিল আছে ? আসছি সে প্রসঙ্গে। তার আগে খুব ইন্টারেস্টিং একটা জিনিস খেয়াল করুন, মাইগ্রেশন এর কথা কিন্তু এই ছড়ার মধ্যে আপনি পাচ্ছেন।

আমরা যতটুকু জানতে পারছি তাতে বোঝা যায় এই আরাকানের লোকেরা নিজেদের গর্ব করে মগ বলতো। এই মগ এসেছে বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম মূল অঞ্চল মগধ থেকে। এরা নিজেদের ওই মগধের অধিবাসীর উত্তরসূরি ভাবতো। ধারণা করা হয়, হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের সময় ভারত ব্যাপী বৌদ্ধরা এক ধর্মীয় সংকটে পড়েন। অতঃপর এদের এক গোষ্ঠী এই দিকে চলে আসেন আন্দাজ ৮ম শতকে। এরা কিন্তু মঙ্গোলিয়ান গোষ্ঠী ছিলেন না বরং ছিলেন ইন্দো ইউরোপিয়ান মানে ওই আর্য গোষ্ঠীর লোক। পরবর্তীতে এরাই প্রভাবশালী হয়ে ওই অঞ্চলের হিন্দু চন্দ্র বংশীয় রাজার উৎখাত করেন। ক্ষমতায় আসে ওই অঞ্চলের মঙ্গোলিয়ান গোষ্ঠী, উঠে আসে বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষমতায়ন এবং এই মগধের বৌদ্ধরা হয়ে ওঠেন ক্ষমতাশালী। অতঃপর কালের অমোঘ নিয়মে ওই গোষ্ঠী স্থানীয় গোষ্ঠীর সাথে লীন হয়ে যায়।

১৯৭৪ সাল পর্যন্ত রাখাইন ষ্টেট এর নাম ছিল আরাকান ডিভিশন। আরাকানের উপর ঐতিহাসিক বর্ননা গুলো এবং নানাবিধ লেখনী থেকে এর একটা মোটামুটি সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের রেখাচিত্র পেয়ে যাবো এমনকি হিন্দু রাজা থেকে বৌদ্ধ রাজার পরিবর্তন এর বিবরণ ও আছে । এ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার আর্থার ফেয়ার (আর্কাইভ.অরজি এ বইটি পেয়ে যাবেন) এর মত হলো- বৈদিক যুগে আরাকান অঞ্চলকে বলা হতো রক্ষপুরী, কারন সে সময়ের আর্যদের মতে এখানে যারা বসবাস করতো, তারা ছিল রাক্ষস। আন্দাজ করি ওই অঞ্চলে তখনও নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী বসবাস করতো, যাদের পূর্বসূরি এখনকার আন্দামান এমনকি মিয়ানমারেও বসবাস করে। একই ভাবে বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রে ও এই অঞ্চলকে রক্ষপুরী বলা হতো , পালি ভাষায় রচিত প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থে এই নাম পাওয়া গেছে। খুব সম্ভব সেই থেকেই রাখাইন…..। আবার আরাকানীদের মতে রাখাইন শব্দের অর্থ হলো “মাতৃভূমির প্রতি একনিষ্ঠ “। স্যার আর্থারের বই থেকে আরো দেখতে পাই আরাকান ছিল বৃহত্তর ভারতীয় অঞ্চলেরই একটি অংশ। সে সময়ের রাজবংশের নাম গুলো যদি দেখেন তা হলেও ভারতীয় সংস্কৃতির রূপ প্রকাশ পায়। যেমন সূর্য বা চন্দ্র বংশ , কান্যরাজজ্ঞ বা ধরুন ওই সময়ের রাজধানীর নাম ধান্যবতী ,অথবা পরবর্তীতে বৈশালী। আরো মজার হলো ওই রাজবংশ গুলো হিন্দু ধর্মের ধারায়। ঝামেলা শুরু এতদ অঞ্চলে মঙ্গোলীয় মানুষের আগমন এবং ক্রমশ সংখ্যায় ভারী হয়ে যাওয়া। এই পর্যায় থেকেই সংঘাতের সৃষ্টি।

আরাকানীদের ইতিহাসে শেষ আরাকানী রাজবংশ তথা কিংডম অব মারুক-উ হলো আরাকানীদের স্বর্নযুগ, সময়কাল ১৪৩০-১৭৮৫ খৃষ্টাব্দ। এর মধ্যে ১৫৮২ খৃঃ থেকে ১৬৬৫ খৃঃ হলো সুপার স্বর্নযুগ। দস্যু তস্করের দল যদি ধনবান হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে তাদের দ্বারা অন্য অনেক মানুষের চরম সর্বনাশ হয়েছে। বস্তুতপক্ষে এই সময়কালের মগ রাজারা হার্মাদ (পর্তুগীজ) জলদ্যস্যুদের সহায়তায় নিজেরাও একটি মগ দস্যুবাহিনী গড়ে তুলে মধ্য ও দক্ষিন বাংলায় লুন্ঠন ও দস্যুতার এক অবর্ননীয় নজীর সৃষ্টি করেছিল। বাংলার এ অঞ্চল থেকে সম্পদ ও মানুষ লুন্ঠন করে মগ রাজারা সমৃদ্ধির শিখরে আরোহন করেছিল, আর বাংলার বিস্তীর্ন অঞ্চলকে বিরান ভূমিতে পরিনত করেছিল। বাংলার অসংখ্য নরনারীকে তারা দাস হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল, আর তাদের অধিকৃত চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশালে স্থাপন করেছিল চরম নৈরাজ্যকর মগের মুল্লুক। অবশেষে ১৬৬৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ তাদের সম্পূর্নরুপে দমন করে চট্টগ্রাম অধিকার করলে বাংলায় মগের মুল্লুকের অবসান ঘটে। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে মগ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পালিয়ে চলে যায় আরাকানে, নিজেদের কলংক আড়াল করার নিমিত্তে তারা এত সাধের মগ নামটি বিসর্জন দিয়ে রাখাইন এবং মারমা নাম গ্রহন করে।

আরাকানে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটলো কি ভাবে?
আরাকানে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটলো কি ভাবে, এ বিষয়ে সুধী মহলে দুরকম ভাষ্য প্রচলিত। রোহিঙ্গা তরফে বলা হয়ে থাকে একাদশ শতাব্দী আরব বনিকেরা আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ও বসবাস শুরু করে। তারা বানিজ্যের সাথে সাথে ইসলাম প্রচারেও ব্রতী হয়, তাদের আনুকুল্যে অনেক সুফি দরবেশও এ অঞ্চলে আগমন করে। এভাবে যেমন চট্টগ্রামে, তেমনি সমুদ্র তীরবর্তী আরাকানেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিস্তার ঘটে। আজকের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেইসব আরব এবং তাদের দ্বারা ধর্মান্তরিত মুসলমানদেরই পরবর্তী প্রজন্ম। আরাকানী তরফে ভাষ্য সম্পূর্ন অন্যরকম। তাদের মতে রোহিঙ্গা বলতে কোন কিছু নেই, ১৮২৪ সালে বৃটিশরা বার্মা অধিকার করলে আরাকান সন্নিহিত চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বাঙালীরা জীবিকার অন্বেষনে আরাকানে আসতে থাকে, সেই জনস্রোত এমনকি ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরেও বিচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে। বস্তুতপক্ষে এরা হলো বাঙালী মুসলিম। মগ রাজত্বকালে যে বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাদের বিষয়ে উভয় পক্ষই আশ্চর্যরকম ভাবে নিরব-রোহিঙ্গা বুদ্ধিজীবিরা কৌলিন্য হারাবার ভয়ে, আর আরাকানীরা নিজেদের দুস্কর্ম প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে। হতভাগ্য সেইসব বাঙালী বন্দীদের সিংহভাগই অবশ্য বিভিন্ন কারনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু যারা কোনক্রমে প্রানে রক্ষা পেয়েছে, তারা কোথায় গেল? সত্যনিষ্ঠ হলে এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে তারা এখনকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাঝেই বিরাজ করছে।

আরাকান রাজ্যের পতন এবং বার্মার অধিকারে আসা
মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের কাছাকাছি সময়ে এবং ইংরেজদের পূর্বভারতে তথা গোটা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বকলমে ক্ষমতা দখলের ডামাডোলের সময়ে ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে বার্মার রাজশক্তি। এর প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল সেই সময়ের স্থানীয় অধিবাসীরা। এক্ষেত্রে বৌদ্ধ এবং মুসলিম দুই জনগোষ্ঠী চেষ্টা চালালেও ওটা ব্যর্থ হয়। এক বড় জনগোষ্ঠী এরপরে ব্রিটিশ অধীনে থাকা চট্টগ্রাম এবং তার আসে পাশের অঞ্চলে চলে আসে। লক্ষণীয় হলো, এই পালিয়ে আসা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ও ছিল সেই তৎকালীন রোহিঙ্গা বা মুসলিম জনগোষ্ঠী।

এরপরে ১৮২৫ এ ইংরেজ বার্মা পুরোপুরি দখল করলে ওই আরাকান অঞ্চল বার্মার একটি অংশ হয়ে যায়। এই সময়ে ইংরেজ তার নিজের বাণিজ্যিক কারণে এবং পূর্ব এশিয়ার উপর নিজের বাণিজ্যিক আর আঞ্চলি দখলদারি পাকাপাকি করতে ওই আরাকানে নতুন বন্দর (আকিয়াব ) আর পাশ্ববর্তী অঞ্চল সহ গোটা বার্মার একটা শিল্পন্নয়ন এ জোর দেয়। এর ফলে চট্টগ্রামে আর তার আশেপাশের সেই পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠী আবার সুযোগ পায় ভাগ্যান্বেষণের। এর কারণ তাদের নৌশিল্পে দক্ষতা ছিল পুরুষানুক্রমিক এবং শ্রম ছিল সুলভ।

পাঠক এক্ষেত্রে মনে রাখবেন , শুধু রোহিঙ্গারা না , বাংলার সর্বত্র বিশেষত শিক্ষিত পশ্চিম বাংলার ভাগ্যান্বেষণের জায়গা হয়ে গিয়েছিল ওই বার্মা। আমাদের সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র নিজেই ওই কারণে গিয়েছিলেন। তার লেখা “অভয়া -শ্রীকান্ত” পড়লেই বুঝবেন অভিবাসন কত ব্যাপক হয়েছিল। যারা সাহিত্যে আগ্রহী না তারা ইউটিউবে ওই সিনেমা দেখে নিতে পারেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং বর্মী জাত্যওতাবাদ এর সূচনা
বার্মায় ইংরেজ রাজত্ব শুরুর কিছু পরেই পূর্বতন শাসক গোষ্ঠীর মানুষ এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুর বড় জনগোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে যেতে থাকে। ১৯০৬ সালে YOUNG MENS’ BOUDHIST ASSOCIATION (YMBA ) সৃষ্টি হয় যা পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে General Council Of Burmese Association (GCBA ) হয়। এই সংগঠন ক্রমশ রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এদের একটি শাখা সেই সময়ের অভিবাসী বিশেষত ভারতীয় ভাগ্যান্বেষীদের তাড়ানোর একটা সহিংস আন্দোলন শুরু করে। ক্ৰমশঃ এই আন্দোলন পুরো বার্মাতে ছড়িয়ে যায়। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা (রোহিঙ্গা বাদে ) সে অর্থে অতটা ছিল না ফলে তাদের অপসারণ হয়ে যায় খুব দ্রুতই। এরপরের ধাক্কা আসে রোহিঙ্গাদের উপর।

বর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে অং সান (ইনি বর্তমান আং স্যাং সু চি র বাবা ) মূল বার্মার নাগরিকদের সঙ্গবদ্ধ করতে থাকেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই আন্দোলন ওই অভিবাসীদের কোনো সংকট তৈরী না করলেও পরবর্তীতে জাপানের সাহায্যে Burmese Independent Army তৈরী করেন। ১৯৪২ এ নবগঠিত আর্মির প্রবেশ ঘটে বার্মায়। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি আরাকান ত্যাগ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পিছু হটে। এক জাতি দাঙ্গা শুরু হয় আরাকানে। এক পুরোনো পরিকল্পনা ধরে এক পর্যায়ে বাঙালির চেহারার মানুষদের সংঘবদ্ধ ভাবে পুরো অঞ্চল থেকে সহিংস ভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

মূলতঃ একটা জিনিস দেখতে পাই , এই দাঙ্গা কিন্তু কোনো ধর্মীয় সংঘাত না। পুরোনো জনগোষ্ঠীর সাথে নব আগত জনগোষ্ঠীর অধিকারের এক লড়াই। রাখাইন আর রোহিঙ্গাদের এই সংঘাত অতীব প্রাচীন। অনেকেই ওটাকে ধর্মীয় এবং উম্মার উষ্ণ চুম্মা দেওয়ার চেষ্টা করবেন ,তবে লাভ নেই। কারণ এই সহিংসতার কারণ সেই মানুষের মূল সমস্যা অর্থাৎ অধিকার এর বুঝে নেওয়া। এই জন্য আসুন দেখি ইংরেজ আমলের ওই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির পরিসংখ্যান। (সূত্র : Jacques-P-Leider-2012-The_Muslims_in_Rakhine_and_the_political_project_of_the_Rohingyas, পৃষ্ঠা ,১০ )

১৮৯১ সালে আরাকান রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ছিলো ৫৮,২২৫ জন যা কিনা পরবর্তিতে ১৯১১ সালে এসে দাড়ায় ১,৭৮,৬৬৭ জনে। অর্থাৎ ২০ বছরে দ্বিগুনেরও বেশি। এর পেছনে কারণ ছিলো ব্রিটিশ অধ্যুষিত এলাকা থেকে তত্কালীন বার্মা রাজ্যে কম মূল্যে শ্রমিক স্থানান্তর। এক্ষেত্রে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেদের বিরাগভাজন হওয়ার আরও একটি কারণ হচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি।

২৮শে মার্চ, ১৯৪২
মিনব্যা এবং ম্রহুং অঞ্চলের প্রায় ৫,০০০ মুসলিম রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং করেন্নি গোষ্ঠির আক্রমনে নিহত হয়। একই সময়ে উত্তর রাখাইন অঞ্চলের মুসলিমরা প্রায় ২০,০০০ আরাকানী ধ্বংস করে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে তত্কালীন ডেপুটি কমিশনার U Kyaw Khaing তাদের হাতে নিহত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
জাপানের পূর্ব এশিয়ার দিকে আগ্রাসনের সফলতা অতীব চমকপ্রদ ছিল, চীন থেকে মালয় দ্বীপ মানে মালেশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের দখল নেয় কয়েক মাসের মধ্যেই। এইসময় জাপানি সৈন্যরা বার্মা দখল করে।ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী পিছু হটলে, জাপানি সৈন্যরা নির্যাতন শুরু করে স্থানীয়দের উপরে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে রোহিঙ্গা-রাখাইনদের মাঝে, জাপানের সমর্থক বার্মা জাতীয়তাবাদীগোষ্ঠী এবং ব্রিটিশ অনুগত রোহিঙ্গাদের মাঝেও দাঙ্গা শুরু হয়। রোহিঙ্গারা জাপানিদের প্রতিরোধ করতে অংশগ্রহন করে,তাই স্বাভাবিক ভাবেই আগ্রাসী জাপানি সৈন্যবাহিনীর ক্ষোভের শিকার হয় এবং সেসময় অকথ্য হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন এর শিকার হয়। ইতিহাস এর বিবরণ অনুযায়ী এই সময় প্রায় প্রায় হাজার তিরিশেক রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বর্তমান বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে যায়। পরবর্তিতে আরো প্রায় হাজার পঞ্চাশেক রোহিঙ্গা শরণার্থী সীমান্ত পার হয়ে চট্টগ্রাম প্রবেশ করে। যাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য অঞ্চলে কিন্তু অধিকাংশ সেখানেই শরণার্থী বসতি গড়ে তোলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে অং সান জাপানের সহায়তায় স্বাধীনতার লক্ষ্যে BIA গঠন করলে বার্মিজ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী এবং রাখাইনরা তাতে ব্যাপক সাড়া দিয়েছিল, কিন্তু রোহিঙ্গারা সমথর্ন ও সহায়তা দিয়েছিল ইংরেজদের। এই বিষয়টি ইংরেজদের পছন্দ হলেও বার্মিজ এবং রাখাইনদেন চরমভাবে ক্ষুদ্ধ করেছিল।

যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে শেষ দিকে এসে অং সান পার্টি বদল করেন এবং এন্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রীডম লীগ(AFPFL)বলে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে মিত্রশক্তি মানে ইংরেজদের সমর্থন দেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার প্রশ্নে অং সানের সাথে ব্রিটিশদের আলোচনা শুরু হয়। বার্মায় বর্মী ছাড়াও শান, কাচিন, চীন, কারেন ইত্যাদি আরও জাতিগোষ্ঠীর সাথে অং সানকে সমঝোতায় আসতে হয়। এই সময় গোটা বার্মার বাকি জাতিসত্বা এবং রাখাইন গোষ্ঠী সিদ্ধান্তে আসে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানরা আলাদা কোনো জাতি না তারা হয় আরাকানী, নয়তো বাঙালী, তারা রোহিঙ্গা নয়। মজার কথা হলো সমগ্র বার্মার মুসলমানদেরও একই মত ছিল এবং এখনো একই কথার প্রতিদ্বনি পাওয়া যায় । এমতাবস্থায় রোহিঙ্গারা আলাদা ভাবে জাতিসত্বার আলোচনায় অংশ নিতে পারে নি। এর ফলে স্বাধীন বার্মায় আইনসম্মতভাবে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।

এই সময়ে রোহিঙ্গাদের একটি দল পাকিস্তানের প্রবক্তা ও দ্বিজাতি তত্বের জনক জিন্নাহর সাথে দেখা করে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর আরাকানকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করার প্রচেষ্টা গ্রহন করতে অনুরোধ করেন। অং সান এ বিষয়ে জিন্নাহকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে স্বাধীন বার্মা সকল মুসলমানের প্রতি সাংবিধানিক ভাবে সমতা ও মর্যাদাপূর্ন আচরন করবে। ফলে এ বিষয়ে জিন্না আর কোন আগ্রহ দেখান নি। অং সান মোটামুটি ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রোহিঙ্গা ইস্যুটি সমাধানের পক্ষে অবস্থান গ্রহন করেন, কিন্তু বার্মার স্বাধীনতা লাভের আগেই তাঁর মৃত্য হলে বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

১৯৪৮ এর স্বাধীনতালাভ এবং পরবর্তী পর্যায়ে ৭০ এর দশক পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের অবস্থা
১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা পায় এবং অং সানের প্রয়ানের ফলে উ নু বার্মার ক্ষমতাভার গ্রহন করেন। এই সময়ে একটি বড় গন্ডগোলের সূচনা হয় যখন ১৯৪৯ সালে কিছু রোহিঙ্গা জাফর কাওয়ালের নেতৃত্বে একটি মুজাহিদ দল গঠন করে উত্তর আরাকানের বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন গ্রহন করে। এই পর্যায়ে পাকিস্তানি সরকার এর সাথে খুব চতুরতার সাথে একটা উপর উপর সমঝোতা করতে বার্মা একজন মুসলিম মূল ভূখণ্ডের রাষ্ট্রদূত কে পাঠায়। U Pe Kin নামের এই দূত পাকিস্তানকে ওই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটিকে অস্ত্র সাহায্য না করার জন্য প্রয়াস শুরু করেন। পরবর্তীতে তার সুফল আসে। পাকিস্তানি সরকার ১৯৫৪ সালে ওই কাশিম নামের নেতাটিকে চট্টগ্রাম জেলে ঢুকায়। এক্ষেত্রে অবশ্য কোনো মর্দে মুসলিমের আওয়াজ আর পাওয়া যায় নি। পরবর্তীতে ক্ৰমশঃ ওই সামরিক লড়াই এর সাফল্য পায় বার্মার শাসক। ধীরে ধীরে ওই মুজাহিদদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরে, এক পর্যায়ে তারা রোহিঙ্গাদের আস্থা হারিয়ে ফেলে।

তৎকালীন বার্মার প্রধানমন্ত্রী উ নু ১৯৫৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর এক বেতার ভাষনে রোহিঙ্গাদের একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ঘোষনা করেন বার্মার প্রতি একতাবদ্ধ হতে আবেদন করেন । রোহিঙ্গারা এই আহবানে মোটামুটি সাড়াও দেয়। স্বাধীন বার্মায় ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা সংসদে নির্বাচিত হতে থাকেন। সেই সাথে আরাকান ষ্টেট গঠনের আলোচনাও মোটামুটি সন্তোষজনক পথেই এগোতে থাকে। একটা স্বাস্থকর পরিবেশ সৃষ্টি হতে থাকে কিন্তু সব কিছু ভেঙে যায় ১৯৬২ সালে, যখন জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করেন এবং দেশে সামরিক আইন জারী করেন।

বার্মার সামরিক শক্তি এবং রোহিঙ্গাদের পরবর্তী দশা
বার্মার সামরিক শক্তি ক্ষমতা দখলের পর থেকেই নির্যাতন শুরু করে। তারা সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার শুরু করে যার মাঝে রোহিঙ্গারাও ছিলো। পরবর্তীতে কাচিন গেরিলাদের কর্মকান্ড ও শুরু হয় এই কারণে। সামরিক বাহিনীর এই কাজ আর স্থানীয়দের সাথে লেগে থাকা নিত্য অশান্তি কখনই রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেয় নি । আগেও বলেছি সেই দেশের গণতন্ত্রপন্থীরাও রোহিঙ্গাদের অবস্থানগত ভাবে স্বীকার করতে চায় নি এবং আজো চায় না , তাই রোহিঙ্গারা একরকম বহিরাগত ভাবে বসবাস করে এসেছে ।

১৯৭৮, নতুন সংকট আর বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক/ পরবর্তীতে সরকারের প্রধান জিয়াউর রহমান এর ভূমিকা
এই সময়ে মায়ানমার সৈন্যবাহিনী ‘নাগামিন ‘ ( Dragon King ) বলে একটি সাফাই অভিযান চালায়। এর কারণে প্রায় ২ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বার্মার সামরিক শক্তির হাতে বিতারিত হয়ে যে সমস্ত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাদের বার্মা (মায়ানমার ) ফেরত যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই সময়ে কাচিন, চীন, রাঙ্গুন আর আরাকান এ অবৈধ অধিবাসীর সাফাই অভিযান নিয়ে জিয়া উর রহমান এর সাথে সেই সময়ের বার্মার সামরিক সরকারের সম্পর্ক খারাপ হয়। জিয়া সরকার, ভারত, জাতিসংঘ এবং সৌদি আরব ইত্যাদি দেশের এক যৌথ উদ্যোগে বার্মার সামরিক সরকারের সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের একটি সমঝোতা হয় যার ফলে বার্মা আরাকানে ২ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়। এই চুক্তি হয় ১৯৭৮ সালে এপ্রিলে কিন্তু অবস্থার কোনো বিশেষ হেরফের হয় নি কারণ ওই জনগোষ্ঠীর কোনো সম্পত্তির মালিক হওয়া বা ক্রয় বিক্রয়ের অধিকারের সুযোগ ছিল না। অবস্থা একই থেকে যায়। জনশ্রুতি ভালো অর্থকরী একটি ব্যবসা (চাঁদার ) এবং পেট্রো ডলার এর কামাই এর ব্যবস্থা অবশ্য হয়ে যায় বাংলাদেশের ধর্মীয় এবং সামরিক শক্তির মানুষদের।
প্রথমদিকে সমঝোতার পরবর্তী পর্যায়ে এই রোহিঙ্গারা খুব একটা প্রত্যাবর্তন করছিল না ,এরপরে বাংলাদেশের সরকার ওই উদ্বাস্তু ক্যাম্প এর অবকাঠামোগত সুবিধার মান এর অবনতি ঘটান। এর ফলে ধীরে ধীরে ফেরার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
সূত্র : বার্মা লাইব্রেরী

১৯৯১-৯২ এর প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সমস্যা
১৯৯১ এবং ৯২ এ ১৯৯২ সালে এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশে UNHCR এর হিসাব অনুয়ায়ী তিন লক্ষাধীক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রবেশ করে। এবার রাষ্ট্রসংঘের UNHCR এর সাহায্যে এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে তার সাথে বেশ কিছু বেসরকারি উদ্যোগে ১৯ খানা ক্যাম্পে তাদের থাকার ব্যবস্থা হয় কক্সবাজারে।

এই রোহিঙ্গার নতুন করে বাংলাদেশে ঢোকার আগে একটু কয়েকটা ঘটনার দিকে আমাদের দেখতে হবে। ১৯৮৮ সালে স্বাধীন বার্মার রুপকার অং সানের কন্যা অং সান সুকি দেশে এসে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন দল গঠন করেন। গনতন্ত্রের দাবীতে সোচ্চার হয়ে ওঠে বার্মার ছাত্র সমাজ এবং জনগন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে নে উইনের পতন ঘটে, এবং অবশেষে ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সু কির দল বিপুল বিজয় অর্জন করলেও জান্তা নির্বাচন বাতিল করে দেয়, ধরপাকর এবং ব্যাপক নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতেও সক্ষম হয়।জনগনের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য প্রথমে বাংলাদেশে একটা ছোট্ট সামরিক অভিযান চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছু বিডিআর এবং সেনা সদস্য হত্যা ও অপহরন করা হয়। বর্মী সরকারের অভিযোগ- বাংলাদেশ বর্মী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা দিচ্ছে। এরপর পূর্বতন কায়দায় আবার রোহিঙ্গাদের উপর অভিযান চালিয়ে তাদের ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া ১৯৯২ সালে এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশে UNHCR এর হিসাব অনুয়ায়ী তিন লক্ষাধীক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রবেশ করে। এই পর্যায়ে খালেদার সরকার আবার কিছু ট্যাকাটুকা কমানোর উপলক্ষ্য খুঁজে পায়, এর সাথে যুক্ত হয় নতুন দানব “জামায়াতে ইসলামী”। আরো এসে জোটে পাকিস্তানি মদদ এবং সন্ত্রাসবাদের আরো কিছু নতুন খেলোয়াড়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সাম্প্রদায়িক অর্থ নিয়ে এসে কিছু রোহিঙ্গাকে নতুন ধরনের দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের ধান্ধা শুরু করে এই পরনো পাপীরা। এর মধ্যেই আবার আলোচনা ও দেন দরবার শুরু হয়, কিন্তু রোহিঙ্গারা এবার বার্মায় UNHCR এর সরাসরি তত্বাবধান ছাড়া ফিরে যেতে অস্বীকার করে। বর্মী নাগরিকত্ব আইনের সকল বিষয় মেনে নিয়ে UNHCR আরাকানে তাদের কিছু কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি লাভ করে এবং নানা আলোচনার পর অধিকাংশ তালিকাভূক্ত রোহিঙ্গা বার্মায় ফিরে যায়, কিন্তু অনেকে ফিরে যেতে অস্বীকার করে।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১৯৯২ এ বার্মা (মায়ানমার) এবং বাংলাদেশের সমঝোতা হয় এই মানুষদের প্রত্যাবর্তনের। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রসংঘের UNHCR সাহায্য দিতে অস্বীকার করে কারণ তারা অভিযোগ এনেছিলেন যে বাংলাদেশ জোর করে ওই মানুষদের আবার পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই বিষয়ে তারা একটি নিজস্ব জরিপ করে এবং তার ফলাফলে বলে যে মোটে ৩০% রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে আগ্রহী।অতঃপর আবার কিছু টানাপোড়েন এবং ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ এর মধ্যে ২লক্ষ তিরিশ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন করে।

এতো কিছুর পরেও সামগ্রিক ফেরত কোনোদিন হয় নি ফলে সরকারি হিসেবে এখন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রায় ৫,০০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। ১৯৯১-৯২ সালে এদেশে আসা শরণার্থীদের অনেকেই দেশে ফেরত গেলেও যারা এখানে থেকে গেছে তাদের মাঝে মাত্র ৩০,০০০ নথিভুক্ত। বাকি প্রায় ২,০০,০০০ নথিভুক্ত নয়। তাই জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী এই নথিভুক্ত শরণার্থীরাই কক্সবাজারের কুতুপালং এবং নয়াপাড়া এই দুটি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। বাকিদের ব্যাপারে তথ্য অপ্রতুল।

এছাড়াও থাইল্যান্ড-মায়ানমার সীমান্তের থাইল্যান্ড শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১,১১,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। বিভিন্ন সময়ে আরও কিছু শরণার্থী বিক্ষিপ্ত ভাবে সমুদ্র থেকে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশের জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধারপ্রাপ্ত হয়।

এখন কয়েকদিন ধরে সংঘটিত হওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আবারও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি সবার সামনে চলে এসেছে। দাঙ্গার পেছনের কারণ সঠিক ভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মতে একজন রাখাইন তরুণীর ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা ১০ জন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোক হত্যা করে। পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ জন নিহত হয় এবং প্রায় ৩০০রও বেশি বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হয়। চলমান দাঙ্গায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থাগুলো তাদের কর্মীদের এসব অঞ্চল থেকে সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। এমনকি জাতিসংঘের কর্মকর্তারাও ওই অঞ্চল থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। এর পরেই বিভিন্ন জলযানের মাধ্যমে সমুদ্র পারি দিয়ে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকেরা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আর দেশের অভ্যন্তরের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেয়া হবেনা বলে জানিয়ে দেয়া হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে জনমত তৈরী হয়েছে এবং বিতর্ক চলছে। কিন্তু কোনো একটি পক্ষে সহজেই মত প্রদানের আগে “রোহিঙ্গা শরণার্থী” একটি জটিল প্রসঙ্গ এটি ভেবে দেখা উচিত। আবার কিছু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে
বার্মার মানে অধুনা মায়ানমার এর নাগরিকত্বের অধিকারী হওয়ার জন্য কি ব্যবস্থা আছে ?

সত্তরের শেষের দিকের পরপরই বার্মার সামরিক সরকার একটি নাগরিকত্ব আইন প্রনয়নের কাজে হাত দেয় এবং ১৯৮২ সালে তা কার্যকর করে। এই আইন অনুযায়ী বার্মায় তিন ধরনের নাগরিক আছে;

  • এক- যে সমস্ত জাতিস্বত্বা ১৮২৩ সালের পূর্ব থেকে বার্মায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, সেই জাতিস্বত্বার সকল মানুষ বার্মার নাগরিক।
  • দুই- যারা ১৮২৩ সালের পর বার্মায় এসেছে, কিন্তু ১৯৪৮ সালের সিটিজেন এ্যাক্ট অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেছে, তারা সহযোগী নাগরিক।
  • তিন- যারা সহযোগী নাগরিকত্ব গ্রহন করতে পারে নি, তারা ন্যাচারালাইজড নাগরিক, নতুন ভাবে আবেদন করে তারা অপেক্ষমান তালিকাভূক্ত হতে পারে।

নাগরিকত্ব প্রদানের নিয়ন্ত্রণ করছে কাউন্সিল অব ষ্টেটস, তাদের বিবেচনা অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির প্রায় সকল মানুষ ১৮২৩ সালের পরে বার্মায় আগমন করেছে, সুতরাং রোহিঙ্গা যেমন কোন জাতিস্বত্বা নয়, এরা বার্মার নাগরিকও নয়। কেউ একজন বার্মার নাগরিক না হলে সে কোন রকম নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে পারবে না, কোন স্থাবর সম্পদের মালিক হতে পারবে না, সরকারী চাকুরীর জন্য আবেদন করতে পারবে না, কোন রকম ব্যাবসা পরিচালনা করতে পারবে না, উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পারবে না, কতৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে পারবে না, এমনকি বিয়ে করতে হলেও কতৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে, এবং সে অনুমতি লাভের সম্ভাবনা খুবই কম।
অর্থাৎ সরকার আইনগত ভাবে যথেষ্ঠ তৈরী হয়েই ওটা করেছিল।

কেন এরা “ঘরের নহে পারেও নহে “?
মায়ানমারের অন্যান্য গোষ্ঠিও রোহিঙ্গাদের তাদের দেশের বলে স্বীকার করে না। রোহিঙ্গাদের বহিরাগত এবং অনেকাংশে বাঙালি (এবং বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী) বলে প্রচার করে। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ওদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী বলে থাকে। শুনলে অবাক হবেন, সেই দেশের মূল ভূখণ্ডের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বাক্ষাৎকারেও দেখছি সেই একই কথা বলে। বিষয়টা হলো এক নৃতাত্বিক ফারাক। মঙ্গোলয়েড কাঠামোর মানুষ গুলোর সাথে এই আমাদের উপমহাদেশীয় ভূখণ্ডের মানুষের বৈসাদৃশ্য।

এছাড়া অস্বীকার করার কিছু নেই , ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দেওয়া মানুষদের অধিকাংশের শিকড় আছে বাংলায়। আরো আছে সেই জলদস্যুদের হাতে পাচার হওয়া মানুষদের বংশধররা। সীমিত সম্পদ এর কাড়াকাড়ি আর সাংস্কৃতিক ফারাক মানুষকে মানুষের উপর পশুবৃত্তির মাধ্যমে অত্যাচার করতে বাধ্য করে।
মজার কথা হলো, এদের সাহায্যের জন্য কিছু লোক যারা ভারত-নাম উচ্চারণ বা সহ্যই করতেই পারত না, তারা এখন একাত্তরে ভারতের বন্ধুতা আর সাহায্যের কথা বলছে। প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য, বাংলাদেশকে জাতি হিসাবে অকৃতজ্ঞ প্রমাণ করা এবং কোনো একভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ‘ঘুরপথে’ একটা তাৎক্ষণিক রিঅ্যাকশন হিসাবে সাব্যস্ত করা (এইটার একটা জটিল সাইকোঅ্যানালিসিস সম্ভব)। অপরদিকে আমাদের দিকের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মহান আওলাদে মাও, যারা চেঁচামেচি করছে, তাদের অনেকেই্ এখন আমেরিকার রেফারেন্স দেয় – বলে, আমেরিকাও আমাদের আহ্বান জানাচ্ছে তবে কেন করছি না। আরেকদল লোক মুসলিম ব্রাদারহুডের মানে সেই উম্মার চুম্মার কথা তুলছে। এইসব মতলববাজীর মধ্যে মূল সমস্যার সমাধান ঢাকা পড়ে গেছে। সব ইস্যুকে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার এক কৌশল ও দেখা যাচ্ছে।

ভারত এবং মায়ানমার ঐক্যমত এবং এই সমস্যায় ভারতের বর্তমান অবস্থান
ভারতে বর্তমানে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে। রহস্যজনক হলো এদের বড় অংশ আবার জম্মু কাশ্মীরে আছে। কেন? ওটাই প্রশ্ন! স্বভাবতই ভারতের মাথা ব্যাথার কারণ নেই কি? আরো আছে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। এই অবস্থানের কোনো অন্য রূপ দেখবেন না অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো পাবেন চীনের একই ঐক্যমত্য অবস্থান।

মায়ানমার নিজে ও জানে যে মানুষ আর জমির আনুপাতিক হারে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে তারা। এছাড়া ও আছে দর কষাকষির সুযোগ। সুতরাং ভারত এর সমর্থন বা চীনের সমর্থন পাওয়া তার কাছে অনেক সহজ। এই অবস্থায় জগৎ ভিন্ন হলেও ধর্মের অছিলা দিয়ে পৃথিবীকে দেখলে প্রতিক্রিয়া আরো সঙ্গিন হবে।

সমাধান কি সম্ভব না ?
হ্যাঁ, সম্ভব। এর জন্য দরকার আলোচনা এবং কিছুটা হলেও নিজেদের একগুঁয়েমির থেকে সরে আসা। দরকার হলে প্রাথমিক পর্যায়ে আরাকান ভূখণ্ডে ঠাঁই দেওয়ার ব্যবস্থা। দরকার পড়লে , একটা আপাতঃ স্থিতাবস্থার জন্য নিগোশিয়েট করা। এর সাথে আছে আরো কিছু স্বাস্থ্যবিধি কে বাস্তবায়িত করা। যেমনঃ

  •  পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশু জন্ম নিয়ন্ত্রণ
  • শিক্ষার ব্যবস্থা
  •  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং জঙ্গি কার্যবিধির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ

বর্তমান অবস্থায় এই কাজগুলো ‘হয়তো’ কিছুটা হলেও আস্থা ফিরিয়ে দেবে ওই অঞ্চলের মঙ্গোলয়েড (রাখাইন) জনগোষ্ঠীর উপর। ভাবতেই পারেন, এই একপাক্ষিক কথা কেন বলছি। না, কোনো বিশেষ পক্ষের ঝোল টানার জন্য না , বর্তমান অবস্থায় আগে ওই বৈরী মনভাব কে দূর করতে হবে।

যদি ভাবেন কোনো সামরিক সমাধান আছে কি না? ন , নেই। ঠিক ওটাই চাইছে বাংলাদেশের মৌলবাদী কিছু গোষ্ঠী আর মায়ানমারের শাসক গোষ্ঠী। দুঃখ পেলেও চাইছে পরাশক্তিদের কেউ কেউ। সুতরাং যদি কারোর জোশ বেশি হয়, একটু বেশি ভাত খেয়ে নেবেন কিন্তু ওই রাস্তায় সমাধান চাওয়ার দিন শেষ ওটা মাথায় রাখবেন।

এই জনগোষ্ঠীর এক বড় অংশ মালেশিয়া বা থাইল্যান্ডে প্রায় ক্রীতদাসের অবস্থায় আছে ওটা আপাততঃ আলোচনায় আনি নি, অনেকটা ইচ্ছাকৃত ভাবে। তবে ভাবতে বলছি সবাইকে কারণ, ওদের ব্যবহার করছে সবাই কিন্তু সমাধানের জন্য কোনো ফ্লেক্সিবল রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছে না কেউ।

ওরা, অন্তত আমার মতে এই বাংলার আদি জনগোষ্ঠীর একাংশ তাই দায় সবার!

আলোচনা অনেকাংশেই অর্ধসমাপ্ত মনে হচ্ছে কারণ আমার ওই অঞ্চলের উপর কোনো সম্যক অভিজ্ঞতা নেই। যা কিছু ধারণা সব ইন্টারনেটের আর্টিকেল আর বই পড়ে। সুতরাং কোনো বিকল্প ধারণা বা আরো কিছু তথ্য দিলে আমি লেখাটা আরো বড় আরো সঠিক করতে পারি।
সবাইকে ধন্যবাদ !

তথ্যসূত্রঃ
সাম্প্রতিক কাগজ এ উঠে আসা ঘটনা বা ভারত অথবা পাকিস্তানের কাগজ এমনকি বাংলাদেশের কাগজ কে সূত্র করি নি কারণ ওই গুলোর উপর আমার প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর ওয়াকিবহাল। তবে চাইলে ওই গুলো জুড়ে দিতেই পারি।
১. বার্মা লাইব্রেরী
২. বার্মার ইতিহাস
৩. টাইম ওয়ার্ল্ড
৪. আরাকান ইতিহাস
৫. SOAS Bulletin of Burma Research
৬. CNN
৭. Forbes
৮. Jacques-P-Leider-2012-The_Muslims_in_Rakhine_and_the_political_project_of_the_Rohingyas.

Most Popular

To Top