টুকিটাকি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি খুলনার গল্লামারিস্থ ময়ূর নদীর তীরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বদ্ধ্যভূমির উপর গড়ে ওঠে খুলনাবাসী ও এতদাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়’। মাত্র ১০৬ একরের ছায়াঘেরা মধুর ক্যাম্পাসটি ‘খুবিয়ান’দের কাছে এক আবেগের জায়গা। ১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট দেশের নবম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মাত্র ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা খুবি হাটি-হাটি পা করে আজ ২৬ বছর পর এক বিশাল পরিবারে রূপ নিয়েছে। এই ২৬ বছরে খুবির সাফল্য ও অর্জন অতুলনীয়। খুবি’ই দেশের এক মাত্র ছাত্ররাজনীতি ও সেশনজট মুক্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যা কিনা এটিকে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর  একটি করে তুলেছে।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গেইট। ছবিঃ মীর হাসিব

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ৬টি স্কুলে ২৫ টি ডিসিপ্লিন ও ১টি ইন্সটিটিউটে ৩টি ডিসিপ্লিন সহ মোট ২৮টি ডিসিপ্লিনে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী ও ছয়শত’র বেশি শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামে একটি ইনস্টিটিউটসহ আরও ১টি ইন্সটিটিউট ও ৬টি স্কুলে আরও নতুন ১৪টি ডিসিপ্লিন খোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে এডুকেশনাল ডিসিপ্লিন, ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল হাজবেন্ডি, মাইক্রো বায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, পাবলিক হেলথ, ট্রুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ড্রামা এন্ড মিউজিক ডিসিপ্লিন এবং ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি এবং ইন্সটিটিউট অব কোস্টাল জোন অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন। খুবিতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডক্টরাল ও পোস্ট-ডক্টরাল পর্যায়ে সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজারেরও অধিক। এছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, পরিবেশ ও সুখ্যাতির জন্য নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি সেশনে ৪৫ জনেরও অধিক অতিথি শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হন। এসব কিছু বাস্তবায়ন হলে মোট ডিসিপ্লিনের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩২টি এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছাড়াবে ১১ হাজারে।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। ছবিঃ মীর হাসিব

এসব কিছু ছাড়াও খুবি’র স্থাপত্য নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে ৩টি বিশাল একাডেমিক ভবন, ৩টি ছাত্র হল, ২টি ছাত্রী হল, শার্লি ইসলাম গ্রন্থাগার ভবন, রেজিস্টার ভবন, প্রশাসনিক ভবন, গেস্ট হাউজ, ক্যাফেটেরিয়া, জিমনেশিয়াম, মেডিকেল সেন্টার, পোষ্ট অফিস ভবন, টিচার্স কোয়ার্টার ও ডরমিটরি, নার্সারি, মৎস্য খামার, কেন্দীয় শহিদ মিনার, কটকা স্মৃতিসৌধ, হাদি চত্বর, কেন্দীয় গবেষণাগার, অদম্য বাংলা এবং একটি বিশালাকার কেন্দীয় গন্থাগার। এছাড়াও নির্মাণাধীন রয়েছে ১০ তালা একাডেমিক ভবন-‘জয় বাংলা ভবন’, টিএসসি-‘লালন সাঁই মিলনায়তন’, আইইআর ভবন- ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আইইআর ভবন’, ১০ তলা আবাসিক ভবন- ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ভবন’।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

প্রথম একাডেমিক বিল্ডিং। ছবিঃ মীর হাসিব

পূর্বেই বলা হয়েছে খুবি পুরো পুরি ছাত্ররাজনীতি মুক্ত এটি ছাড়াও খুবির আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে যা কিনা এখান কোন রকম সেশন জট নেই। ঠিক চার বছরের মাথায় একজন শিক্ষার্থী তার কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রি নিয়ে বেড়িয়ে যেতে পারে। কেননা খুবি’তে বছরের শুরুতেই ক্লাস রুটিন, সিলেবাস, পরীক্ষার সময়সূচী নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যার কোন রকম হের ফের হয় না। খুবি’র একাডেমিক ক্যালেন্ডারকে খুবি’র সংবিধানও বলা চলে। খুবি’তে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতে অরিয়েন্টেশন ক্লাস ও ওয়ার্কশপ করবার সুযোগ পায় যেখানে তাদের দিন ব্যাপী নানা কর্মসূচী মাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শেখান হয় কিভাবে এই চারটি বছরকে তারা কাজে লাগিয়ে আগামীতে একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে। তাছাড়া খুবি’তে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা থিসিস করার সুযোগ পায়। এর বাইরে ল্যাব ও ক্লাস রুমে হাতে কলমে শেখার সুযোগ-তো আছেই।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

তৃতীয় একাডেমিক বিল্ডিং এবং লাইব্রেরী বিল্ডিং। ছবিঃ মীর হাসিব

এছাড়াও খুবি যেসকল দিক দিয়ে অন্যদের থেকে এগিয়ে আছে- বাংলাদেশে খুবি’ই প্রথম আরবান ও রুরাল প্লানিং ডিসিপ্লিন চালু করে যা পরবর্তীতে বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়। এখানেই প্রথম ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলোজি ডিসিপ্লিন, এনভারমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিন, ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন ও বিবিএ ডিগ্রি এবং স্নাতক পর্যায়ে হিউম্যান রিসোর্স ও ম্যানেজমেন্ট ডিসিপ্লিন চালু করা হয়। বুয়েটের পর খুবি’ই প্রথম কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডিসিপ্লিন এবং আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিন চালু করে। এছাড়া উপমহাদেশের প্রথম বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন এখানেই চালু করা হয়। বুয়েটের পর খুবি’তেই প্রথম কোর্স ক্রেডিট পদ্ধতি চালু হয় এবং প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সিজিপিএ সিস্টেম চালু করা হয়। একমাত্র খুবি’তেই আন্তঃডিসিপ্লিন খেলায় ভিডিওর মাধ্যমে থার্ড আম্পায়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। এছাড়া খুবি’র শিক্ষার মান ও ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ কোন প্রশ্ন তুলতে পারেনি।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

কেন্দ্রীয় মাঠে আন্তঃ ডিসিপ্লিনের খেলার একটি অংশ। ছবিঃ উজ্জ্বল সাহা

এত সব কিছুর মাঝে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্দর অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে হার মানায়। খুলনার জিরো পয়েন্ট কিংবা গললামরই ব্রিজ থেকে সোজা এগিয়ে গেলেই চোখে পরবে খুবি’র মাঝারি ধরনের সুন্দর একটি গেট। গেটটি দিয়ে সোজা এগিয়ে গেলে দূর থেকে সবার আগে চোখে পরবে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘অদম্য বাংলা’। খুবিয়ান’রা যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী এটি তারই প্রতীক।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

অদম্য বাংলা। ছবিঃ মীর হাসিব

তার আগে বাম দিকে রয়েছে কেন্দীয় মসজিদ, প্রশাসনিক ভবন, নব নির্মিত ব্যাংক। এর ঠিক ডানেই রয়েছে ফরেস্ট্রি ডিসিপ্লিনের নার্সারি যার ভেতরে খুঁজে পাওয়া যাবে বিচিত্র প্রজাতির সব গাছপালা আর উদ্ভিদের সমারোহ। বামের ছায়া ঘেরা রাস্তাটি ধরে এগিয়ে গেলে বাম দিকে রয়েছে পুরাতন ব্যাংক এবং পোষ্ট অফিস আর একটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ‘প্রফেসর ড. মুহম্মদ ফায়েক উজ্জামান’ এর বাসভবন। এর ঠিক সামনেই রয়েছে সবুজ ঘাসের চাদরে মোড়া খেলার মাঠ আর খুবি’র গেস্ট হাউজ। এই মাঠেই প্রতি বছর আন্ত ডিসিপ্লিনের খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বসন্তকালে এই সকল ভবন গুলোসহ পুরো ক্যাম্পাস শত শত ফুলের সৌন্দর্যে ছেয়ে যায়। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে। খুবি’র ভিসি ‘প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান’ নিজে একজন ফুল প্রেমী মানুষ হওয়ায় প্রতি বছর শীতের শুরুতেই পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে নানা প্রজাতির ফুলের গাছ রোপণ করে থাকেন।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া। ছবিঃ মীর হাসিব

খুবি’র প্রধান রাস্তাটি ধরে সামনে এগিয়ে গেলে ডান দিকে চোখে পরবে খুবিয়ান’দের আড্ডা দেবার প্রথম স্থান ‘ক্যাফেটেরিয়া’। সদা সর্বদা কোলাহলে মুখরিত ক্যাফেটেরিয়াতে দেখা মিলবে চা-কফির নেশায় বুদ হয়ে থাকা তরুণদের হৈ চৈ, আড্ডা আর গানের আসর সাথে দেখা মিলবে জিভে জ্বল আনা মুখরোচক সব খাবার। এর ঠিক উল্টো পাশেই রয়েছে ‘মুক্তমঞ্চ’ এবং ‘শহীদ মিনার’। ক্যাফেটেরিয়া আর মুক্ত মঞ্চের ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলে গেছে অপরূপ সুন্দর ‘গ্রীন লেক’ যার সবুজ পানি যে কারো মনকে ভালো করে দিবে।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

শহীদ মিনার। ছবিঃ মীর হাসিব

রাস্তা ধরে আর একটু সামনে এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে ‘হাদী চত্বর’-এর। বাস চাপায় প্রাণ হারানো এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ‘শেখ মুহম্মদ হাদীউল ইসলাম’-এর অকস্মাৎ মৃত্যুকে স্মরণ করে তৈরি করা স্মৃতিসৌধের নাম রাখা হয় হাদী চত্বর। ছাত্ররাজনীতি মুক্ত এই ক্যাম্পাসের সুদীর্ঘ ইতিহাসে রাজনীতির কারণে আজ পর্যন্ত কোন শিক্ষার্থীর এক ফোটা রক্তের দাগ এই ক্যাম্পাসের মাটিতে পরেনি। খুবিতে এমন কোন ঘটনা চিন্তাও করা যায় না। খুবি’তে কোন শিক্ষার্থী কোন রকম রাজনৈতিক দলের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত থকাতে পারে না। এ কারণে ক্যাম্পাসের কোথাও কোন প্রকার রাজনৈতিক দলের পোস্টার বা প্রচারের কোন কিছুই দেখা যায় না।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

মুক্তমঞ্চ। ছবিঃ মীর হাসিব

হাদী চত্বর থেকে বাম দিকে এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে জীব বিজ্ঞান স্কুল ‘আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু’ বা ২য় একাডেমিক বিল্ডিং। বিল্ডিংটির ঠিক সামনেই রয়েছে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের গ্রিন হাউস যার ভেতরে দেখা মিলবে বিচিত্র প্রজাতির নানা ধরনের সব উদ্ভিদ। আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে ফিসারিজ ও মারিন ডিসিপ্লিনের মৎস্য খামার যেখানে বিভিন্ন মাছের চাষ ও গবেষণা হয়। একটু সামনেই ডান দিকে রয়েছে নব নির্মিত মন্দির। এই রাস্তাটি ধরে সোজা এগিয়ে গেলে চোখে পরবে ‘অপরাজিতা হল’ (১ম ছাত্রী হল)। এখান থেকে কিছুটা ডানে গেলে দেখা মিলবে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল’ (২য় ছাত্রী হল)। রাস্তাটি ধরে সোজা চলে গেলে দেখা মিলবে সুবিশাল অনিকেত প্রান্তর, আবাসিক এলাকা, সাড়ি সাড়ি নারকেল গাছ, ফসলের জমি, কুড়ে ঘর, পুকুর আর সবুজের সমারোহ। এখান থেকে ফেরা যাক আবার হাদী চত্বরে…।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল। ছবি: মীর হাসিব

হাদী চত্বর থেকে সোজা চলে গেলে সবার আগে দেখা মিলবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অদম্য বাংলা’র। তার ঠিক ডানেই রয়েছে খুবিয়ান’দের আড্ডা দেবার ২য় বড় স্থান ‘ত্বপন চত্বর’। চির চেনা হাসিমাখা ত্বপন’দার চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে এই স্থানটির নাম রাখা হয়েছে ‘ত্বপন চত্বর’। এই দোকেনের চা যে খায়নি সে চায়ের আসল স্বাদই জানে না। এখানকার এক একটি চায়ের কাপে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো খুবিয়ান’দের গল্প, তাদের মনের কথা, সুখ-দুঃখ, উচ্ছ্বাস-উল্লাস, সিজিপি এর বেদনা, প্রেজেন্টেশনের ভীতি, সিটি-অ্যাসাইনমেন্ট আর থিসিসের এর প্যারা, চাকরী না পাবার ভয়, বিসিএস-এ টেকার চিন্তা, বর্তমান রাজনীতি, আগামীর নেতা হবার স্বপ্ন, পছন্দের মানুষটিকে না বলা কথা, প্রেয়সীর সাথে কাটিয়ে দেয়া সময় কিংবা বন্ধুর ভাঙা প্রেম জোরা দেবার পরিকল্পনা কমিশন। এখানকার এক একটি কাপ যেন এক একটি কালের সাক্ষী। চায়ের সাথে বিশেষ ধরনের পুরি-সিঙ্গারা আর চাওমিন তো আছেই। ত্বপনদার দোকানের ঠিক পাশেই রয়েছে আরেকজন হাসিমাখা মুখ সাইদুল ভাই’য়ের দোকান আর তার পাশেই রয়েছে হুমায়ূন ভাইয়ের দোকান। দু-জনের বানানো চা আর পিয়াজুর সাথে আর কোন কিছুর তুলনাই চলে না। আরও আছে ভাবির চায়ের দোকান। ভার্সিটি খোলা বা বন্ধ উভয় সময়ে খুবি’র বর্তমান ও প্রাক্তন’রা এই দোকান গুলোতে একসাথে বসে আড্ডা দেয়। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এক সাথে বসে চায়ের কাপে আড্ডা দেবার দৃশ্য চোখে পরবে ঠিক শুধু এখানটাতেই।  শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার এমন নিবির বন্ধন শুধুমাত্র খুবি’র ক্যাম্পাসেই চোখে পরবে। খুবিয়ান’দের সব থেকে বড় প্রাপ্তি বোধহয় এটিই যে তারা কারিকুলাম কিংবা কো-কারিকুলাম উভয় কাজে সবসময় তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে পায়। এসব দোকান গুলোতে একাডেমিক বিল্ডিং গুলো থেকেও ব্যস্ত সময় কাটে। ক্লাস  শেষে এই দোকানগুলোতেই খুবিয়ান’রা তাদের প্রতিদিনের ব্রাঞ্চটা সেরে ফেলে। দোকানগুলোর সামনে সাপের মতো চলে যাওয়া রাস্তাটি ধরে সোজা চলে গেলে দেখা মিলবে ২য় একাডেমিক বিল্ডিংয়ের ২য় গেট এবং তার একটু সামনে নব নির্মিত সেন্ট্রাল সায়েন্স ল্যাব ‘আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

গ্রীন লেক। ছবিঃ মীর হাসিব

এই দোকানগুলোর ঠিক পেছেনেই রয়েছে সুবিশাল ‘অনিকেত প্রান্তর’। সবুজ ঘাসের চাদরে মোরা এই প্রান্তরে সন্ধ্যার পর দেখা মিলে ক্যাম্পাসের ইষ্টি-কুটুমদের। এখানেই খোলা আকাশের নিচে হিমেল হাওয়ায় প্রেয়সী তার প্রেমিকের ঘাড়ে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখে ঘরবাঁধার, কল্পনা করে ঝট-ঝামেলা মুক্ত এক সুন্দর বিকেলের, উপভোগ করে জ্যোৎস্না রাতে চাদের অপরূপ সন্দর, চলে তাদের বছর বছর জুরে বসন্ত। রাত গভীর হয় কিন্তু স্বপ্ন ফুঁড়োয় না। হলগুলো বন্ধ হবার সাথে সাথে তাদের আনাগোনাও কমতে থাকে। কত কথা অস্ফুস্ট, কত স্বপ্ন অদেখা থেকে যায়। চারিদিকে তখন এক অদ্ভুত নির্জনতা কাজ করে। বিকেল পাঁচটার শেষ বাসটি যখন ক্যাম্পাস ত্যাগ করে তখন থেকেই ব্যস্ত ক্যাম্পাসটি কেমন যেন মুষড়ে পরে। অনিকেত প্রান্তর, বাবলা তলা, ক্যাফেটেরিয়া, পুকুর ঘাট, খেলার মাঠ, অদম্য বাংলা, লাইব্রেরী, একাডেমিক বিল্ডিং, হলের পাশের দোকানগুলো সবখানে কেমন জানি এক শূন্যতার দেখা মেলে। সোডিয়াম আর ল্যাম্পপোস্টের আলোতে তখন খুবি’কে অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। দিন শেষে পাখিরা যেমন তার নিরে ফিরে যায় ঠিক তেমনি হলে থাকা মানুষ গুলো যার যার রুমে চলে যায়। এখান থেকে ফেরা যাক আবার অদম্য বাংলায়…।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

অনিকেত প্রান্তর। ছবিঃ মীর হাসিব

অদম্য বাংলা থেকে ডানে এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে আরেকটি মৎস্য খামার যার ঠিক পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্য শৈলীর অপরূপ নিদর্শন ‘কাজী নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী’। রাস্তাটি ধরে একটু এগিয়ে গেলে ডান দিকে রয়েছে ১ম একাডেমিক বিল্ডিংয়ের ২য় গেট। আর একটু এগিয়ে গেলে শার্লি ইসলাম গ্রন্থাগার এবং আইন ও বিচার স্কুল। গ্রন্থাগারটির ঠিক পাশেই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর নিচে আছে ‘ফাইন আর্টস ইন্সটিটিউট’। এর ঠিক বামেই সমাজ বিজ্ঞান স্কুল ‘কবি জীবনানন্দ দাশ একাডেমিক ভবন’ বা ৩য় একাডেমিক বিল্ডিং। এর পেছনে রয়েছে আবাসিক এলাকা।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

তৃতীয় একাডেমিক বিল্ডিং। ছবিঃ মীর হাসিব

আবার ফিরে আশা যাক ‘হাদী চত্বরে’। এখান থেকে ডান দিকের রাস্তাটি ধরে সোজা এগিয়ে গেলে দূর থেকে সবার আগে চোখে পরবে ‘কটকা স্মৃতিসৌধ’। রাস্তাটির বাম দিকে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি স্কুল ‘ড. সতেন্দ্র নাথ বসু একাডেমিক ভবন বা ১ম একাডেমিক বিল্ডিং। এর ঠিক সামনেই চোখে পরে সুন্দর বট গাছের পাশে মাঠের মধ্যে বসবার জন্য বানানো বেঞ্চ ও ছাতা। এর ঠিক অপর পাশেই রয়েছে ক্যাফেটেরিয়া। যার ঠিক পেছনে রয়েছে গ্যারেজ যেখানে দেখা মিলবে গারো নীল রঙের খুবি’র নাম ও লোগো সহ সাড়ি সাড়ি বাস, দেখা মিলবে খুবি’র নিজস্ব এম্বুলেন্স এবং অন্যান্য সব গাড়ী গুলোর।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। ছবিঃ মীর হাসিব

রাস্তাটি ধরে আর একটু এগিয়ে গেলে বাম দিকে দেখা মিলবে মেডিকেল সেন্টার ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী চিকিৎসা কেন্দ্র’ এবং তার বামেই নব নির্মিত মসজিদ। রাস্তাটির শেষ মাথায় দেখা মিলবে কটাকা’র। ২০০৪ সালের ১৩ই মার্চ সুন্দরবনের কটকায় ঘুরতে গিয়ে খুবি’র আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিনের ৯ জন ও বুয়েটের ২ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ১১ জন সমুদ্রের জলে ডুবে মারা যায়। তাদের স্মরণে প্রতিবছর এই দিনটিতে পুরো খুবি পরিবার  শোক দিবস পালন করে। সেদিন সাড়া দিনব্যাপী নানা কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

কটকা স্মৃতিসৌধ । ছবিঃ তাহমিদ চৌধুরী

কটকা’র ঠিক পেছনেই দেখা মেলে খাবা’র পুকুর বা ‘খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ হল’-এর পুকুর। এর ঠিক পাশেই রয়েছে খুবির বিশাল খেলার মাঠ। এই মাঠের পাশে আর পুকুর পারে নিয়মিত খুবিয়ান’দের আড্ডা দিতে দেখা যায়। এছাড়া ১ম ও ২য় একাডেমিক বিল্ডিংয়ের সামনের মাঠেও খুবিয়ান’রা আড্ডা দিয়ে থাকে, এই কাজে খুবিয়ান’রা খুবিই পটু। কটকা’র সামনের রাস্তাটি ধরে বাম দিকে পেছনে এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে খাজা হল বা ‘খান জাহান আলী হল’। আর ডান দিকে পেছনে এগিয়ে গেলে হাতের চোখে পরবে নব নির্মিত অসাধারণ সুন্দর ‘সুলতানা কামাল জিমনিসেয়াম’।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

সুলতানা কামাল জিমনেশিয়াম। চবিঃ মীর হাসিব

এর ঠিক বামেই রয়েছে ‘খাবা হল’। খাবা হলের সামনের রাস্তাটি ধরে এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে সেই ক্যাফেটেরিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে চলা ‘গ্রীন লেক’-এর একাংশ। আর একটু এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে ‘বাবা হল’ বা ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হল’। ‘খাজা’, ‘খাবা’, ‘বাবা’- ছেলেদের এই তিনটি হল খুবির স্থাপত্য শৈলীর এক অসাধারণ নিদর্শন। খুবির এক একটি হল যেন এক একটি অভিজ্ঞতা নেবার কারখানা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আশা স্বপ্ন-বাজরা যখন এক হয় তখন তাদের সুখ-দুঃখ, চিন্তা-চেতনা, ভালোবাসা সব মিলে একাকার হয়ে যায়। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে বিভিন্ন বিষয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা যখন নিজদের মধ্যকার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়; একজন জার্নালিজম-এ পড়া ছাত্র যখন একজন আইন-এ পড়া ছাত্রকে আইনে সাংবাদিকতার ধারা শিখিয়ে দেয় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার অনন্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এসব হল গুলোতে যখন ‘অনিকেত প্রান্তর’ ফেরত বোহিমানরা আসে তখন ঠিক একই সাথে এক ঝাঁক ক্লান্তি নিয়ে সারাদিন এখানে সেখানে টিউশনি করে বেড়ান মানুষটিও ফিরে আসে। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাবার সাথে সাথে পরিবারকে সাহায্য করবার মতো এমন অদ্ভুত শক্তিধারী মানুষগুলোর সব থেকে বেশি দেখা মেলে এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে। এত ক্লান্তির পরও কিভাবে যেন তারা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেবার সময়টা তুলে রাখে। কেউ কেউ রাতভর আড্ডা দেয়, তাস খেলে, টিভি রুমে বসে একটার পর একটা লিগের খেলা দেখে, প্রেয়সী বা বাড়ির মানুষদের সাথে ফোনে আলাপ করে আবার কেউ কেউ ঘড়ির কাটায় রাত ১০ টা না বাজতেই চুপ করে লাইটটা নিভিয়ে শুয়ে পরে। তবে তাদের ঘুম ভাঙ্গে যার যার ক্লাস টাইম আর টিউশনির ওপর নির্ভর করে। আর বন্ধের দিন হলে তো কোন কথাই নেই একেবারে ঘুম থেকে উঠে সোজা দুপুরের আহার তারপর আবার আরেক দফা ঘুম; এইতো পাবলিকিয়ান’দের জীবন।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

খান জাহান আলী হল। ছবিঃ মীর হাসিব

ছেলেদের হল গুলোর ঠিক পেছনের পুড়োটা রাস্তার এক পাশ জুরে সারিবদ্ধ ভাবে রয়েছে খাবার হোটেল আর ষ্টেশনারীর দোকানগুলো। নাসিরের বটতলা থেকে অ্যালেক্সের চায়ের দোকান পর্যন্ত সব গুলো দোকান দিন-রাত সবসময় খোলা থাকে। এখানেই খুঁজে পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘সালাম জুস কর্নার’,‘সিদ্দিক জুস কর্নার’ যার হরেক রকমের জুস ও লাচ্ছি একবার খেলে বার বার ফিরে আস্তে মন চাইবে আছে বিভিন্ন ধরনের কফি নিয়ে ‘কফিভিলে’, অনেক সুস্বাদু খাবারের আইটেম নিয়ে ‘বাসমতী’,’বুনো হাস’ আরও কত কি…। রাস্তাটি ধরে সোজা এগিয়ে গেলে পেয়ে যাবেন গল্লামারী বাজার। কম বাজেটে নিজের জন্য খাবার সামগ্রী কেনার এর থেকে ভালো জায়গা খুলনা শহরে আর নেই। এছাড়া কিছুটা দূরত্বে রয়েছে বিখ্যাত মেজবান বাড়ির ঘরোয়া স্বাদের খাবার, কেওড়ার বিভিন্ন রকমের মাছের গ্রিল আছে জিরো পয়েন্টের জিভে জল আনা সব খাবার আরও আছে চিটাগাং দরবার এবং কামরুলের বিখ্যাত কালা ভুনা যা আপনাকে ভোজন রসিক করতে বাধ্য করবে।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

বাবা হল। ছবিঃ মীর হাসিব

প্রতি সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট আর ল্যাব টেস্টে পিষ্ট খুবিয়ান’রা যে কি পরিমাণ আনন্দ-উৎসব করতে করতে পারে তা নিজ চোখে না  দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। খুবি’তে বারো মাসে তের পার্বণের মতো সারা বছর কালচারাল প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। এখানে ডিসিপ্লিন ভেদে কালচারাল নাইট, পিঠা উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি (ঘুড়ি উৎসব), কালার ফেস্ট, বৈশাখী মেলা, দীপাবলি, দিবস উপলক্ষে পোগ্রাম, বিভিন্ন সংগঠনের পোগ্রাম, জুনিয়রদের রিসেপশন, র‍্যাগ ডে, রজত জয়ন্তীসহ নানা পোগ্রাম খুবিয়ান’দের ক্রমাগত একাডেমিক চাপ থেকে রিফ্রেশ করে তোলে।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

হলের পেছনের হোটেলগুলো। ছবিঃ আহমাদ আল রাজী

শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য খুবিতে রয়েছে প্রায় ২২টি সংগঠন। এদের মধ্যে রয়েছে- বাঁধন (রক্তদান কর্মসূচি ও স্বেচ্ছাসেবক), রোটারেক্ট ক্লাব (স্বেচ্ছাসেবক), নৈয়ায়িক (বিতর্ক), নয়েজ ফ্যাক্টরি (ব্যান্ড), পোডিয়াম (পাবলিক স্পিকিং), নৃ-নাট্য, ছায়াবৃত্য (আবৃতি), ৩৫ মি.মি. (মুভি ক্লাব), ব-পাঠ (পাঠক), খুলনা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি সোসাইটি, ভৈরবী (সঙ্গীত), স্পার্ক (নৃত্য), খুলনা ইউনিভার্সিটি ইকনোমিক্স সোসাইটি, অন্বেষ (বিজ্ঞান ও প্রুযুক্তি) এবং আরও অনেক। সংগঠন গুলো নিয়মিত তাদের সেশন পরিচালনা করার ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করবার সাথে সাথে বিভিন্ন জনের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পায়।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

সংগঠনের মিটিং এর সময়। ছবিঃ সাজ্জিদ আহামেদ

এছাড়া নানা ধরেনের সেচ্ছাসেবী মূলক কাজেও এসকল সংগঠন গুলো কাজ করে থাকে। এইতো কিছু দিন আগেই উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামে বন্যা কবলিত মানুষদের পাশে দাঁড়ায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে বর্তমান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। এছাড়া খুবির শিক্ষার্থীরা পুরো খুলনা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে বন্যা কবলিত মানুষদের জন্য সাহায্য তোলে। ডিসিপ্লিনের বাইরে সংগঠন গুলোতে সিনিয়র-জুনিয়র’দের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। যেহেতু খুবি রাজনীতি মুক্ত তাই এখানে সিনিয়র-জুনিয়র’দের মধ্যে একটা ‘চেইন অফ কমান্ড’ টাইপের সম্পর্ক দেখা যায় যা আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ্য করার মতো নয়। এছাড়া খুবিতে জুনিয়রা আসার সাথে সাথে পুরো ক্যাম্পাসে সালাম আদান-প্রদান এর ছড়াছড়ি শুরু হয়ে যায়। এতে করে খুব সহজেই জুনিয়ররা তাদের সিনিয়র এবং ব্যাচ মেট’দের সাথে পরিচিত হতে পারে। এমন সম্পর্ক দেশের আর কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ্য করার মতো নয়।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

ক্যাফে আনপ্লাগড, ২০১৭। ছবিঃ শাহিরুল কবির সামি

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পার্ফরম করছেন জেমস।

খুবির সিনিয়র-জুনিয়র’রা মিলে যত গুলো অনুষ্ঠান করে তার মধ্যে সবচেয় বড় অনুষ্ঠানটি হলো ‘র‍্যাগ ডে’। তিন ব্যাপী বিশাল এই অনুষ্ঠানটি খুলনার সবচেয় বড় অনুষ্ঠান গুলোর একটি। প্রথম দিন রঙ খেলা, দ্বিতীয় দিন ফরমাল অনুষ্ঠান , তৃতীয় দিন শহরের সবচেয় বড় কনসার্টয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় একটি ব্যাচের অধ্যায়। পুরো ক্যাম্পাস আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠলেও চারিদিকে এক আবেগ ঘন মূহুর্তের সৃষ্টি হয়।চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা দেখতে দেখতে কিভাবে জীবনের সোনালি ৪টি বছর পার করে ফেলে তা বুঝতেও পারে না। সবার চোখে-মুখে তখন প্রিয় ক্যাম্পাসকে ছেড়ে যাবার কষ্ট। সবার চোখে তখন অশ্রু কিন্তু তা সুখের। জানিনা আবার কবে দেখা হবে তাই শেষ বারের মতো বন্ধুকে বুকে জরিয়ে ধরে একে অন্যকে রঙ মাখিয়ে দেয়; এই দৃশ্য ভুলবার নয়। তাদের এই আনন্দে যোগ দেয় তাদের জুনিয়র’রাও। সিনিয়র’রা তাদের আদরের সাথে বরণ করে। এই তিনটি দিন পুরো ক্যাম্পাস সবচেয় বেশি ব্যস্ত সময় পার করে। দিন শেষে যখন ফাকা ক্যাম্পাসের রাস্তায় রঙ পরে থাকতে দেখা যায় তখন বুকের ভেতর কাওকে হারানোর এক অদ্ভুত ব্যথা টের পাওয়া যায়।

নিয়ন আলোয়- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ একটি পরিবার- Neon Aloy

বন্যার্তদের পাশে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ছবিঃ শাওন

খুবির ক্যাম্পাসটা আকারে ছোট হলে সোন্দর্যের দিক দিয়ে ভরপুর। এখানকার রাজনীতি মুক্ত  ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক আর সিনিয়র-জুনিয়র’দের মধ্যকার এক বিরল সম্পর্কের দেখা মেলে যা কিনা একে করে তুলেছে সবার থেকে অনন্য। এখানকার সবুজের চাদরে ঘেরা মাঠ, ছায়াঘেরা ক্যাম্পাস, দক্ষিণা বাতাস, কৃষ্ণচূড়া ফুলে ঢাকা রাস্তা, বসন্তকালে হরেক রঙের ফুল, সবুজ পানির লেক, আকা-বাঁকা পথ, সুন্দর স্থাপত্য যে কোন মানুষকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়’কে ভালবাসতে বাধ্য করবে। এখানকার প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর মুখে গর্বের সাথে একটি কথাই উচ্চারিত হয়- “আই এম প্রাউড টু বি আ খুবিয়ান”।

লেখকঃ মীর হাসিব
গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন,
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

[আপনার প্রিয় ক্যাম্পাসের কথা সবাইকে জানাতে চান? তাহলে, আপনার ক্যাম্পাসের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে। পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top