টেক

পারমাণবিক বোমাকেও হার মানাতে পারে যে অস্ত্র!

যুদ্ধের জন্য যুগে যুগে মানুষ আবিষ্কার করেছে নানারকম অস্ত্র। প্রাচীন কাহিনী, যুদ্ধ বিবরণী এমনকি মহাভারতেও উল্ল্যেখ আছে বিভিন্ন অস্ত্রের কথা। ঢাল-তলোয়ার, কামান, তীর-ধনুক এসবের জমানা এখন শেষ। নানা ডিজাইনের বন্দুক, রাইফেল, মিসাইল, ড্রোন সবাইকে পাশ কাটিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের জয়জয়কার সবখানে। যে দেশ যত পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, সেই দেশ তত ক্ষমতাবান। এইসব অস্ত্রের জোরেই নর্থ কোরিয়া গলা ফাটিয়ে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে আমেরিকার মত রাষ্ট্রকে এবং আমেরিকার মত ক্ষমতাধর দেশকে কোরিয়ার এসব কথার জবাব দেওয়ার আগে নিজের মিত্র রাষ্ট্র খুঁজতে হচ্ছে। এই যে এত সব অস্ত্রের কথা বললাম, এদের সব কিছুই কিন্তু দৃশ্যমান। কোনো এলাকায় যখন যুদ্ধ হয় তখন আশপাশের মানুষ বিভিন্নভাবে জানতে পারে। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে, কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই যখন কোনো অস্ত্র আঘাত হানে তখন আপনি কি করবেন?

এমনি এক অস্ত্র হচ্ছে “বায়োলজিক্যাল উইপন” বা “জৈব অস্ত্র”

পারমাণবিক বোমাকেও হার মানাতে পারে যে অস্ত্র!

“জৈব অস্ত্র” হচ্ছে এমন এক অস্ত্র যার মাধ্যমে মহামারী করতে সক্ষম কোনো জীবাণুকে বিশেষ উদ্দ্যেশ্যে একটা নির্দিষ্ট এলাকায় সবার অজ্ঞাতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ঐ এলাকার মানুষরা এই রোগ প্রতিরোধে অক্ষম।

“জৈব অস্ত্র” এই ধারণাটি কিন্তু নতুন কিছু নয়। আমাদের পৃথিবীর প্রাচীন যুদ্ধের ইতিহাসের উদাহরণে ভরপুর।

প্রাচীনকালে জৈব অস্ত্রঃ স্কীথিয়ান তীরন্দাজরা ৪০০বিসি তে প্রথম এটি ব্যাবহার করেন। তারা তাদের তীরগুলোর মাথা রোগে মৃত ব্যাক্তিদের মলমুত্র এবং শরীরে ডুবিয়ে ব্যাবহার করত। ৩০০বিসি তে রোমান, পারসিয়ান এবং গ্রিক কাহিনীতে শত্রুদের খাবার পানির কুয়ার মধ্যে রোগাক্রান্ত ব্যাক্তির লাশ ডুবিয়ে দেওয়া হত, সেই পানি খেয়ে শত্রু-সৈন্যরা অসুস্থ হয়ে যুদ্ধ করতে পারতো না।

১৭১০ সালে রাশিয়া-সুইডেনের যুদ্ধে রাশিয়ানরা প্লেগ রোগে মৃত সৈনিকদের দেহ ক্যাটারপুলারের মাধ্যমে সুইডিস্ট যুদ্ধ তাঁবুতে ছুঁড়ে মারত। ১৮’শ শতকে ফ্রান্স-ব্রিটেনের যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনানায়ক স্যার জেফ্রি স্মলপক্সে আক্রান্তদের কম্বলগুলো রেড ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের দিয়ে দিতে বলেন। যেন তাদের মাধ্যমে স্মলপক্স ফরাসি সৈনিকদের মাঝে ছড়িয়ে যায়।

আমেরিকার সিভিল-ওয়ারের সময়ও এই স্মলপক্সের জীবাণু ব্যাবহারের অভিযোগ উঠে দুই পক্ষের বিরুদ্ধে। আধুনিককালে জৈব অস্ত্রঃপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীরা এন্থ্রাক্স, কলেরা, স্মল্পপক্সের জীবাণু ব্যাবহার করে ছিল শত্রুদের বিরুদ্ধে। তারা রাশিয়ার সেন্ট পিটারসবারগে প্লেগের জীবাণু ছড়িয়ে দেয় এবং ফ্রান্সে মেসপটেমিয়ান ঘোড়ার মাধ্যমে গ্লেন্ডারস ছড়ায়।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানীরা মাঞ্চুরিয়াতে প্রায় ৩০০০ বন্দির উপর এন্থ্রাক্স, সিফিলিস এসব বায়োলজিকাল উইপনের গোপন পরীক্ষা চালায়। রোগীদের কেউ মারা যায় আবার কাউকে মেরে ফেলা হয়। পরে মৃত ব্যাক্তিদের অটোপ্সি করা হত তাদের শরীরে মৃত্যুর পরও কোনো প্রভাব থাকে কিনা দেখার জন্য। এছাড়া ভিয়েতনাম যুদ্ধে ভিয়েতনাম কং গেরিলারা মৃতের দূষিত রক্তে চোবানো তীক্ষ্ণ অস্ত্র ব্যাবহার করত, যেন শত্রুকে আর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দেওয়া যায়। ১৯৯১ সালের দিকে ইরাক ধ্বংসাত্মক বায়োলজিকাল উইপন আবিষ্কার করলেও তা পরবর্তীতে কি করা হয়েছে জানা যায়নি।

পারমাণবিক বোমাকেও হার মানাতে পারে যে অস্ত্র!

বায়োলজিক্যাল ওয়েপনের মাধ্যমে আক্রান্ত এক শিশু

বায়োলজিকাল উইপন ব্যাবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি দিয়ে কম খরচে, কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছাড়াই কাজ সমাধা করে নেওয়া যায়। ধরে নিন, আপনি এক বর্গ কিলোমিটার শত্রু জায়গা ধ্বংস করে দিতে চান।এক্ষেত্রে সাধারণ অস্ত্র ব্যাবহার করলে ২০০০ ডলার, ৮০০ ডলারে পারমানবিক বোমা দিয়ে,৬০০ ডলারে নার্ভ-গ্যাস এবং শুধু ১ ডলারে বায়োলজিক্যাল উইপন দিয়ে আপনি কাজ সারতে পারবেন। চিন্তা করুন, মাত্র এক ডলার! মানে বাংলা টাকায় ৭০-৮০ টাকা!! তাইতো একে বলে গরিবের “এটম বোমা”। এই জৈব অস্ত্র ব্যাবহারের আরো সুবিধা রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ লাগলেও এর উৎপাদন খরচ কিন্তু খুবই কম আর এর জন্য আপনার ছোট্ট একটি ল্যাব হলেই চলবে। এসব অণুজীব উৎপাদনের প্রক্রিয়া আপনি বিজ্ঞানের যেকোনো আন্ডারগ্রাজুয়েট বইয়ে সহজেই পেয়ে যাবেন এবং গবেষণার কাজে দরকার এমন অজুহাতে কাজ করতে পারবেন। অন্যান অস্ত্র একবার ব্যাবহার করলেই শেষ হয়ে যায় কিন্তু জৈব অস্ত্র অনেকদিনতো থাকবেই, তার উপর আবার নিজেরাই মাল্টিপ্লাই করে করে সংখ্যা বাড়াবে।

পারমানবিক বোমার প্ল্যান্ট বানানো, নিক্ষেপ এসব অত্যন্ত দৃশ্যমান বিষয় এবং সহজেই আপনার শত্রুরা জেনে যাবে। এদিকে জৈব অস্ত্র আপনি কাউকে দিয়ে শত্রু দেশের যেকোনো জায়গায় রেখে আসলেই হবে, সেটি আসতে আসতে ছড়িয়ে পরবে সবখানে কিন্তু আপনি যে এর সাথে যুক্ত সেই প্রমাণ থাকবেনা। পৃথিবীতে এখন প্রায় ১২০০ রকমের জৈব অস্ত্রে ব্যাবহারকারী অণুজীব আছে। জৈব অস্ত্র হতে হলে একটা অণুজীবের অবশ্যই উচ্চ ইনফেকশন করার ক্ষমতা, রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা, ঐ রোগের ভ্যাক্সিনের অপ্রতুলতা এবং সহজে পরিবহন করার ব্যাবস্থা থাকতে হবে।

ব্যাক্টেরিয়াল বায়ো-এজেন্ট রোগগুলোঃ এন্থ্রাক্স, ব্রুসেলোসিস, তুলারেমিয়া, লিস্টেরিওসিস, গ্লেন্ডার, প্লেগ, কলেরা, ডিপথেরিয়া, শিগেলোসিস।
ভাইরাল বায়ো-এজেন্ট রোগগুলোঃ পক্স, ইকুয়াইন এন্সেফালাইটিস, ইয়েলো ফিভার, রিফট ভ্যালি ফিভার, ইবোলা ভাইরাস, লাসা ভাইরাস, হান্টা ভাইরাস ইত্যাদি।
মাইকোটিক টক্সিন হল কক্সিডিয়া ইমিটিস।
এছাড়া আছে বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল টক্সিন; যেমনঃ এব্রিন,রিসিন,বটুলিনাম টক্সিন,টেট্রোডোটক্সিন।
মশা এবংওরিয়েন্টাল র‍্যাট ফ্লিকেও বায়ো এজেন্ট বলা হয়। মশা নানা রোগ যেমন জিকা, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ছড়িয়ে বেড়ায় আর র‍্যাট ফ্লি হল প্লেগ রোগের প্রধান কারণ।

বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা, জাপান, কানাডা, রাশিয়া, ব্রিটেন, সাউথ আফ্রিকা, রোডেশিয়া বায়ো-এজেন্টের উপর কাজ করছে বলে প্রকাশ্যে জানা যায়। এদের নানা প্রজেক্ট থাকলেও তারা সেগুলোকে ভ্যাক্সিন ও ওষুধ উৎপাদনের প্রজেক্ট বলে চালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এরা ছাড়াও চীন, ইরান, ইস্রায়েল, তুরস্ক, নর্থ কোরিয়া, ভারত সহ আরো অনেক দেশ গোপনে গবেষণা করছে বলে ধারণা করা হয়।

পারমাণবিক বোমাকেও হার মানাতে পারে যে অস্ত্র!

উত্তর কোরিয়ার বায়ো ওয়েপন ল্যাব পরিদর্শন করছেন তাদের রাষ্ট্র প্রধান

জৈব-অস্ত্র ব্যাবহারের সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। আমেরিকাতে বিভিন্ন সময় বায়ো-উইপনের প্রতি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটুকু আছে তা দেখার জন্য স্বল্পমাত্রায় এসব জৈব-অস্ত্র ব্যাবহার করা হত। কিন্তু সেগুলো নানা দুর্ঘটনার কারন হওয়ায় প্রেসিডেন্ট নিক্সন এসব বন্ধ করার বিল পাস করেন। তবে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী এখনো এসব এক্সপেরিমেন্ট করে থাকে বলে শোনা যায়। এছাড়া রাশিয়াতে বায়ো-উইপন নিয়ে অনেক মাতামাতি আছে। তারা যুদ্ধে এর ব্যাবহার ছাড়াও গুপ্তহত্যা কিংবা অপরাধীদের সত্য বয়ান দিতে বাধ্য করার জন্য এসব ব্যাবহার করে থাকে।

১৯৭৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে মিলিটারির বায়ো-ল্যাব থেকে এন্থ্রাক্স রোগের জীবাণু প্রবলভাবে ছড়িয়ে পরে সর্বত্র এবং এতে অনেক লোক মারা যায়। সরকার ঘটনার দায় অস্বীকার করলেও তদন্তে সত্যতা পাওয়া যায় এবং প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েতলসিন এর দায় স্বীকার করে নেন।

বায়ো-উইপন ডিটেকশনের জন্য নানা প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে,এদের মধ্যেঃ

  1. SMART (Sensitive Membrane Antigen Rapid Test)
  2.  JBPDS (Joint Biological Point Detection System)
  3. BIDS (Biological Integrated Detection System)
  4. IBAD (Interim Biological Agent Detector)

এসব কিট সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য। তাদের সাহায্যে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিনের মধ্যে জানা যায় বায়ো-থ্রেট এর পরিমাণ।

বায়ো-উইপন বন্ধে বিশ্ব উদ্যোগঃ Hague Convention (IV) -এ ১৯০৭ সালে প্রথম এদের ব্যাবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তার জের ধরে ১৯২৫ সালে জেনেভা প্রটোকলে রাসায়নিক এবং জৈব অস্ত্র ব্যাবহারের কথা উঠে, সেখানে বায়ো-উইপন ব্যাবহারের উপর একমাত্র নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
পরে ১৯৭২ সালের দশ এপ্রিল সামগ্রিকভাবে বায়ো-উইপন উৎপাদন, উন্নয়ন, সংরক্ষণ, ব্যাবহার এবং এদের ধ্বংস নিয়ে কনভেনশনে ব্রিটেন স্বাক্ষরতা প্রোগ্রাম চালু করে। ১৯৭৫ সালে একে বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ২২টি দেশের সরকার তাদের বায়ো-উইপন সংক্রান্ত জিনিস জমা দিয়ে দেয়। মোট ১৭৮ টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, তাদের মধ্যে গিনি হচ্ছে সর্বশেষ স্বাক্ষরকারী। ১২টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থেকেছে এবং ৬ টি দেশ স্বাক্ষর করলেও নিজেদের অস্ত্র পর্যালোচনার জন্য জমা দেয়নি। যদিও এসব দেশের বায়ো-উইপন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের জন্য কমিটি আছে কিন্তু তারা যথেষ্ট সক্ষম নয় এবং অনেক দেশই তাদের দেশের জৈব-অস্ত্র নিয়ে সঠিক প্রতিবেদন জমা দেয়না।

বায়ো-উইপন যখন কোনো দেশের উপর ব্যাবহার করা হবে তখন কিন্তু শুধু ঐ দেশের লোকরাই এতে আক্রান্ত হবে এমন কিন্তু না। বাতাস, পানি, পোকা-মাকড় সহ আরো অনেক উপায়ে এটি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পরবে আশপাশের আরো অনেক দেশেই। এমনকি প্রয়োগকারী দেশের কাছে যদি পর্যাপ্ত প্রতিষেধক না থাকে তবে সেই দেশের মানুষরাও আক্রান্ত হতে পারে সমানভাবে এবং এভাবে এক পর্যায়ে হয়তোবা পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা আমাদের শুভবুদ্ধিকে জাগ্রত করি এসবের বিরুদ্ধে।

Most Popular

To Top