ইতিহাস

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং কিছু কথা

রোহিঙ্গা ইস্যু এবং কিছু কথা

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ইসলাম ধর্মে দিক্ষীত একটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীই হল রোহিঙ্গা। মূলত রোহিঙ্গারা হল আরাকানের একমাত্র ভূমিপুত্র।
ইতিহাস ও ভূগোল বলতেছে, রাখাইন প্রদেশে পূর্বভারত হতে প্রায় খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতিস্থাপন করে, ক্রমান্বয়ে বাঙ্গালি হিন্দু (পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত মুসলিম) পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগর উপকূল বরাবর বসতিস্থাপন করে। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস নিয়ে বললে আজ পুরো লেখাতেও শেষ করা যাবে না। আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য অন্য আরেক পয়েন্ট নিয়ে তাই আমি শুধু তাদের ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করবো না; তবে তাদের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু ধারণা দিয়ে যাবো আপনাদের।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রেহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর চরম বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। এক সময় বৃটিশরা এই ভূমির দখল নিলে তারা ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর একটি তালিকা তৈরি করে কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গা জাতির নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যেহেতু তারা প্রায় সব জাতিগোষ্ঠীকে তাদের হিসেবে নিয়েছিল রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে, সেহেতু এখানে অনেকে অন্যকোন কারণ খুঁজে পায়। তবে এটা ইচ্ছাকৃত ছিল নাকি ভুলে তাদের নাম বাদ পড়ে যায় এই ব্যাপারটা আজ ও সবার অজানা। এইরকম বহু ভুল করে গেছে তারা।

১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি বৃটিশরা মিয়ানমারকে স্বাধীন করে দেওয়ার পর তারা একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করে যেখানে রোহিঙ্গাদের ও প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে তারা কাজও করতো । কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয় আর তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের উপর নেমে আসে অত্যাচারের নতুন অধ্যায়।

আজ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোর খাতিরে আমরা প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর জানতে পারলেও আমরা বেশিরভাগ এর অতীত সম্পর্কে অবগত নই।

রোহিঙ্গারা কয়েক শতক থেকেই বিভিন্নভাবে নির্যাতনের স্বীকার হলেও মূলত বিংশ শতাব্দীতে এটি ভিন্ন মাত্রা পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গারা মূলত মিত্রশক্তিকে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে তাদের পক্ষে অবস্থান রাখে। পরবর্তীতে জাপান যখন বার্মার দখল নেয় তখন জাপান সরকার কয়েক হাজার রোহিঙ্গা হত্যা করে মতান্তরে লাখের কাছাকাছি । তারপর ১৯৬২ সালে আবার শুরু হয় তাদের উপর নির্যাতন, মধ্যে ৪৮ সাল থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত তারা খুব ভালো অবস্তান তৈরি করে বার্মায়। গত কয়েক দশক থেকে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের স্বীকার হয়ে সীমান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তন্মধ্যে মূলত প্রধান দুইভাগে তারা এদেশে ঢুকে। এক নাম্বারে, ১৯৭৮ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনী নাগামান (ড্রাগন রাজা) অভিযানে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। দুইয়ে, ১৯৯১-৯২ সালে নতুন আরেকটি দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা নতুনভাবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। রোহিঙ্গাদের এ নাজুক পরিস্থিতি দেখে
মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ার বলেছেন, “পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা”।

গত কয়েকদিন যাবৎ ফেসবুকের কল্যাণে এই রোহিঙ্গা ইস্যু আবার আমাদের সামনে চলে আসে। বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ সাইটগুলোর খবরে বোঝা যাচ্ছে তাদের অবস্থা কতটা মর্মান্তিক! রোহিঙ্গা সমস্যা আজকের সমস্যা না। কয়েক শতক ধরে চলতে থাকা এই সমস্যা এখন জটিল রূপ ধারণ করেছে যেটা যেকোন মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদিও এই নিয়ে জাতিসংঘ সহ বড় বড় এনজিও বা মাথাওয়ালা দেশগুলো চোখে পড়ার মত কোন পদক্ষেপ আমরা দেখতেছি না।  ১৯৪৭ সনে ভারত পাকিস্তান ভাগাভাগির সময় তখনকার বার্মার রোহিঙ্গা নেতারা বার্মিজ মুসলিম লীগ গঠন করে মুহম্মদ আলী জিন্নার সাথে দেখা করে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহ দেখায়। তারা চেয়েছিল রোহিঙ্গা মুসলিম প্রধান এলাকাগুলি পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হোক। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তা বাস্তবায়ন করেননি। বৃটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৮ সনে বার্মাও স্বাধীনতা পায়। এরপর থেকে বেশীরভাগ সময়ই সামরিক বাহিনীর কব্জাতেই ছিল দেশটি। অথচ বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের অনেকেই বার বার কক্সবাজার গিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন এবং সবক দিয়ে চলছেন বাংলাদেশকেই। তাদের এতটুকু সামর্থ্য নেই মিয়ানমারকে এ বিষয়ে কোনও কথা বলার। এই পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতগণ এভাবে বাংলাদেশকে এই ‘রোহিঙ্গা-সমস্যায়’ একটি ‘পক্ষ’ বানিয়ে নানা ধরনের নসিহত করতে শুরু করেছেন।

এ যেনো আরেক ফেসবুক বাঙ্গালি। ফেসবুকে যা আসে সেটা কিন্তু সবসময় সত্য না। হ্যাঁ, মেনে নিলাম সত্য। আমরা বিবেক দিয়ে না, আবেগ দিয়েই বিচার করলাম। সীমান্ত খুলে তাদের এই দেশে বাস করতে দিলাম কিন্তু কত লাখ মানুষকে আপনি এই দেশে জায়গা দিতে পারবেন? যেখানে আমরাই ঠিকমত বসবাস করতে পারতেছি না। তবে সেক্ষেত্রে মায়ানমার আমাদের থেকে অনেক বড়। সমস্যা কিন্তু জায়গাতে না, সমস্যা অধিকারে। আমরা যদি এখন তাদের আমাদের দেশে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেই তারা কিন্তু তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি তাদের আসল ভূমি হারাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও আর এতে নাক গলাবে না।

অনেকেই মনে করেন নোবেলবিজয়ী ‘অং সান সুচি’ চুপ থেকে নীরবে তাদের অত্যাচার করে যাচ্ছে। আসলে এই ধারণা ভুল। যদিও গণতান্ত্রিকভাবে মিয়ানমার সরকার দেশটা শাসন ব্যবস্থায় কিন্তু পরোক্ষভাবে মিয়ানমার কিন্তু তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত। এটা যারা বুঝে না দুর্ভাগ্য তাদের! অং সান সুচির ওইরকম কোন ক্ষমতা নেই যে তিনি এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেন।  তাই তিনি বরাবরের মত চুপ আছেন বরং মাঝেমাঝে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কথা বলে সেনাবাহিনীর আস্থা তৈরি করে চলছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী এই অগ্নিকন্যা।

এই ইস্যুর সবচেয়ে বড় বিষয়টা, রোহিঙ্গা সমস্যা কিভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে। আমাদের দেশ বা পাকিস্তান, সৌদি, মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের নিজেদের করে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক ভাবে জনমত সৃষ্টি করে মিয়ানমারকে চাপ দিতে হবে রোহিঙ্গাদের তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে।
আর এক্ষেত্রে সাহসি ভূমিকা পালন করতে পারে ওআইসি এবং জাতিসংঘ। মিয়ানমারের লগ্নিকারক দেশের সিরিয়াল করলে সেখানে চীন থাকবে সবার উপরে আর এই চীনকে দিয়ে যদি কিছু করাতে পারে তাদের বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশ বা কোন সংস্থা তাহলে হয়তো কোন একটা সমাধানে পৌছানো যাবে। এছাড়াও মোড়ল দেশ আমেরিকা যদি তাদের ডানহাত কোন স্বার্থ ছাড়া ঠিকমত কাজে লাগায় তাহলেও সমস্যাটা একটা পজিটিভ অবস্থায় আসতে পারে।

বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষের বর্তমান এক ভয়ের নাম এবং উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে ধরা হয় বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীকে। যদি বিশ্বনেতারা এই রোহিঙ্গা ইস্যুর সঠিক সমাধান করতে না পারে তাহলে আইসিস, আলকায়েদার মত আরেক জঙ্গিবাহিনী দেখা পেতে পারি আমরা।কারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান মাধ্যম অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান যদি তারা না পায় তাহলে অন্যকিছুর মূল্য তাদের কাছে আর থাকবে না। এছাড়া আমাদের বা পাশের দেশগুলোর বিভিন্ন সন্ত্রাসীগোষ্ঠী এদের কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত করবে । যদিও ইতিমধ্যে শোনা গেছে পাকিস্তানের লস্কর ই তাইয়েবাতে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটেছে।

বর্তমানে আমাদের সবার উচিত নিজ নিজ জায়গায় থেকে রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে সত্য খবর প্রচার করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা। মিথ্যে, ভুল এবং আবেগকেন্দ্রিক হয়ে কোন কথা বা কোন সাইটে কোন পোষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাই একমাত্র বুদ্ধিমানে কাজ হবে।

আমার এই লেখার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই এখনো লেখা হয় নি, সাম্প্রতিক কিছু বছরে রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে সোশ্যাল সাইটে মানুষ যেরকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে এটা স্বাভাবিক কিন্তু সেখানে যখন আপনি সমগ্র ধর্ম বা জাতি টেনে আনবেন সেই ব্যাপারটা তখন স্বাভাবিক থাকে না। আপনার কি মনে হয় সমগ্র বৌদ্ধ বা বার্মিক এই নির্যাতনের পক্ষে? আমেরিকা, ইউরোপ,লন্ডনে ইসলামের নামে সন্ত্রাসী জঙ্গি হামলার দায়ভার যেমন সমগ্র ইসলামের উপর বর্তায় না তেমনি আরাকানে রোহিঙ্গা নির্যাতন সমগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর উপর যায় না। আপনি দোষী হতে পারেন,আমি দোষী হতে পারি কিন্তু সেজন্য আমার বা আপনার পরিবার দোষী হতে পারে না। কোন ধর্মই খারাপকে সমর্থন করে না। কোন মানুষ যেমন সম্পূর্ণ সঠিক না তেমনি কোন ধর্ম বা জাতির সব মানুষ সম্পূর্ণ সঠিক না। এই সাধারণ জিনিস আমাদের বুঝতে হবে।

আমি বৌদ্ধদের পক্ষে স্তবক দিতে আসি নি, আমি এসেছি পড়ে থাকা নোংরা সত্যকে সবার সামনে ধুয়ে-মুছে বুঝিয়ে দিতে। আমাদের উচিত আগে প্রকৃত মানুষ হওয়া তারপর না হয় আমরা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান হয়ে নিজ ধর্ম প্রচার করি। শুদ্ধ ধর্মীয় মূল্যবোধে ঘেরা মানবতার জয় হোক।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top