ফ্লাডলাইট

প্রিয় মুশফিক আপনি কি শুনছেন?

নিয়ন আলোয়- প্রিয় মুশফিক আপনি কি শুনছেন?- Neon Aloy

ডিফেন্সিভ খেলে আর যাইহোক টেস্ট ম্যাচ জেতা যায় না। আপনি যত ভালো খেলোয়াড়ই হোন না কেন, আপনার টিমের প্লেয়ার যতই স্ট্রং হোক আপনি ডিফেন্সিভ খেলে টেস্ট ম্যাচ জিততে পারবেন না।

২০১০ সালে ইংল্যান্ড যখন বাংলাদেশ ট্যুর করে তখন প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের মত টিমের সাথে ফ্লাট উইকেট বানিয়ে ৪১৯ রান করে ফেলি শেষের দিকে নাঈম ইসলাম, শফিউল আর রুবেলের ব্যাটের কারিশমায়। আনন্দ তো আর ধরে না। ইংল্যান্ডের মত টিমের সাথে ৪১৯! যেনতেন কথা না।ম্যাচের পর ম্যাচ ইনিংস ব্যাবধানে হারতে থাকা আমরা টেস্ট ম্যাচ তো তখনও জিততে শিখিনি, এই রানটাই জেতার স্বাদ পাইয়ে দিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছিলো।

এই ম্যাচের শেষ দিনে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিলো ২০৯ রান। সাধারণত ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি পিচ যদি কিছুটা স্পোর্টিংও হয় তবে টেস্টে পঞ্চম দিনে বোলাররা সুবিধা পায়, সে হিসেবে ২০৯ রান কঠিন না হলেও সহজ টার্গেট না নিশ্চয়ই। কিন্তু আমরা এমনই ফ্লাট পিচ বানাতাম যেনো বোলাররা কিছুই না পায়। ওই যে তখনো জিততে শিখি নি। মান বাচানোর জন্য খেলতাম, টেস্ট ম্যাচ কোনোভাবে টেনেটুনে পাঁচদিনে নেয়ার জন্য খেলতাম বলে এই ধরনের পিচ হতো, যদি কোনোভাবে টেস্টম্যাচ পাঁচদিনে নেয়া যায়!

হঠাৎ করে ওইম্যাচের প্রসঙ্গ টানলাম কেন? আমার স্মৃতি যদি ভূল না করে তবে ওই টেস্টের পঞ্চম দিনে ইংল্যান্ডের মত ব্যাটিং লাইন-আপের সামনে, আইমিন কেভিন পিটার্সেন আর কুকদের আটকানোর জন্য ওয়ানডে স্টাইলে ফিল্ড সেট করেছিলাম। শেষদিনে প্রায় দুই সেশন বাকি ছিলো।খেলা না পারা, খেলা না বুঝা এই আমারও হাসি চলে আসতেছিলো ফিল্ড সেটিং দেখে। ওরা এত সহজে ব্যাটিং করছিলো দেখে হাসিও পাচ্ছিলো আবার মায়া লাগছিলো আমাদের টিমটার প্রতি।মাঠের ফিল্ডার ছড়ানো থাকায় টুকটুক করে সিঙ্গেল বের করছিলো,দৌড়ায়া রান না নিতে চাইলে একটু পরপর বাউন্ডারি মারছিলো যেখানে জেতার কিছুটা পসিবলিটি থাকার কথা ছিলো সেখানে তাদের কোনোরকম ঝমেলায় না ফেলেই আমরা ম্যাচটাতে নয় উইকেটে হারের গৌরব অর্জন করেছিলাম। ম্যাচশেষে ইংলিশ দলপতি আমাদের প্রশংসাও করেছিলেন, আমরা নাকি ভালো খেলেছি!

এখানে হারের গৌরব শব্দটা নিন্দার্থে ব্যাবহার করেছি বলাই বাহুল্য। অথচ দেখেন এই বছর শ্রীলংকা তাদের ভাঙাচুরা টিম নিয়ে আরো ছোটো টার্গেট ১৯১ রানেও আমাদের টুটি চেপে ধরেছিলো।সাকিবের একটু পরই যখন মোসাদ্দেক আউট হয়েছিলো বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবেনা তার বুকটা একটুর জন্যও কাঁপেনি।

তুলনা করলে দেখবেন আমাদের ২০১০ এর টিমটা বর্তমান শ্রীলংকা টিমের চেয়ে খুব দুর্বল ছিলো না। ওই টিমটাই এর কয়েকমাস আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওদের মাটিতেই টেস্ট আর ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছিলো এবং ইংল্যান্ড সিরিজের কয়েক মাস পরে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করেছিলো।

আমি আসলে কি বলতে চাচ্ছি? জেতার জন্য রক্ষণাত্মক না খেলে আক্রমণাত্মক খেললেই সফলতা আসবে।

এখন একদল আমার কথা পুরো না শুনেই তেড়েফুঁড়ে আসবেন।

আমি তো বলছিনা আমরা এখন আক্রমণাত্মক খেলছি না, আমরা অবশ্যই আক্রমণাত্মক খেলছি। এখন আমরা জেতার জন্য আটঘাট বেধেই মাঠে নামি। কিন্তু মাঠে নামার পর মাঝে মাঝে বাধনটা আলগা হয়ে যায়, পরে আবার বাধন মেরামত করতে করতে ম্যাচটা হাত থেকে ছিটকে যায়।

এখন আমাদের সবকিছুই ঠিক আছে আমরা আক্রমণাত্মক খেলতে জানি।মানলাম টিম প্ল্যানের অংশ হিসেবেই সৌম্য, সাকিব মারতে যেয়ে উইকেট দিয়ে এসেছে। এই জিনিসটা আইমিন ব্যাটসম্যান মারতে গিয়ে উইকেট দিয়ে আসাটায় কন্ট্রোল নেই আমাদের। কিন্তু একটা জিনিসে আমাদের কণ্ট্রোল থাকার কথা এবং আছে। নিজেদের ফিল্ডিং। হ্যা মানি হাত থেকে ক্যাচ অহরহই ফসকায় আমাদের, আমাদের ফিল্ডিং অনেকসময় একেবারে বেহাল হয়ে যায়। বেহাল হয়ে যাওয়া মানেই যে একেবারে হাল ফেরানো যাবে না এমন তো না, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেই হয়।

এতক্ষণ ভূমিকা দিলাম অথচ মূল কথাটা অনেক ছোট।

আমাদের সবচেয়ে সফল টেস্ট ক্যাপ্টেন মুশফিকের ফিল্ড প্লেসমেন্ট অনেকসময় দৃষ্টিকটু হয়ে যায়,মাঝে মাঝে প্রচন্ড চোখে লাগে তার মিসফিল্ডপ্লেসমেন্ট। আমি মানছি উনার ক্রিকেটীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে বেশি একজন ক্রিকেট অনুরাগী হিসেবে আমার কিছু বলার থাকতে পারে না? যদি পারে তবে পরের টুকুও পড়ুন কষ্ট করে।

ম্যাক্সওয়েল যখন ক্রিজে নামে তখন তাদের জিততে কত রান প্রয়োজন ছিলো? ৮৮ রান।
এখন ম্যাক্সওয়েলের মত ব্যাটসম্যান তার কাছে এই রান তোলা কোন ব্যাপারই হওয়ার কথা না এরউপর ভরসা করার মত একট টেলএন্ডার তো আছেই, এরউপর এ বছরই ইন্ডিয়াতে করা সেঞ্চুরিটা আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া দিচ্ছে। ম্যাক্সওয়েল যেভাবে ধুমধাম ব্যাট করছিলেন তিনি কিন্তু ঠিক পথেই এগুচ্ছিলেন।

একটা নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিজে আসলে ক্যাপ্টেনরা এমনিতেই কয়েকজন ক্লোজ ইন ফিল্ডার নিয়ে আসেন। এখন ব্যাটসম্যান পরে যান প্রেশারে বল হালকা নিক হলেই ক্যাচ। ব্যাটসম্যান হয় সাবধানে খেলেন নয়তো প্রেশার কমাতে তেড়েফুঁড়ে খেলেন। তখন বিপক্ষ দলের ঘাড়ত্যাড়া ক্যাপ্টেন কি করে সে শটের নমুনা দেখে ফিল্ড সেটিংটা একটু ইনোভেটাইজড করে।

ম্যাক্সওয়েল কি করলেন ধুমধাম কয়েকটা সুইপ শট খেললেন, ব্যাকফুটে গিয়ে পাওয়ারফুল চার মারলেন কয়েকটা। তার রান নেয়াই শুরু হল সাকিবকে সুইপে চার মেরে আর ব্যাকফুটে বল হাওয়ায় ভাসিয়ে ব্যাক টু ব্যাক চার হাকিয়ে। মুশফিকও ঘাড়সোজা ক্যাপ্টেনের মত ক্লোজ ইন ফিল্ডার সরিয়ে নিলেন।নিক হওয়ার ভয় কমে যাওয়ায় ম্যাক্সওয়েল আরামসে খেলে রান নিতে লাগলেন।মুশফিক অবশ্যই আমার চেয়ে মাঠে ভালো বুঝেন, দেখেন। তবে আমরা মাঠের বাইরে থেকে অনেকসময় অনেক কিছু দেখে ফেলি না যে এমন না। ম্যাক্সওয়েল যখন ব্যাকফুটে গিয়ে ডীপ ব্যাকওয়ার্ডে চার হাকাচ্ছিলেন তখন বলগুলো মোটামুটি শর্ট থার্ডম্যান অঞ্চল পর্যন্ত হাওয়ায় ভাসছিলো, শুধু ম্যাক্সি কেন যেকোনো ব্যাটসম্যান ব্যাকফুটে ওই শট খেললে অধিকাংশ সময়ই বল শর্ট থার্ডম্যান পর্যন্ত হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে যায়ই যায়। ওই জায়গাটাতে কোনো ফিল্ডার দেখতে পাই নি।
লাঞ্চের পর সাকিবের করা প্রথম যে বলটা ম্যাক্সি ব্যাকফুটে খেলতে গিয়ে আউট হলেন ওই বলটা ঠিকমতো বাউন্স করলে সেটা চারই হতো, বড়জোর টপ এজ হয়ে শর্ট থার্ডম্যানের দিকে যেতো যেখানে কোনো প্লেয়ার নেই। ভাগ্য ভালো থাকায় বলটা নিচু হওয়ায় ম্যাক্সিও আউট হয়েছিলেন আমরাও ম্যাচটা জিতি। ভাগ্য তো আর সবসময় সাথে থাকবে না, বল মাঝে মাঝে নিচু না হয়ে ব্যাটের মিডল পার্টেও লাগবে।

আচ্ছা মাঠে হয়তো প্রেশারে মুশির এতকিছু মনে থাকে না, তাই বলে কি উনি ফিল্ডিং এর বেলায় কিছু প্রেশারে পড়লে এতটা ব্যাকফুটে চলে যান! যে মাঠে খেলা হয়েছে সেখানে জানা কথা সেট ব্যাটসম্যান বলে কিছু নেই বল উল্টাপাল্টা বাউন্স করবে। প্রথম ইনিংসে ৭১ রানে ব্যাট করা তামিম ইকবালের মত সাবধানী ব্যাটসম্যানও যেখানে হঠাৎ লাফিয়ে উঠা বলে আউট হলেন সেখানে বোঝাই যাই এধরনের পিচে ব্যাটের কানায় লেগে বল ক্লোজ ইন ফিল্ডার পর্যন্ত ক্যারি করবে। স্মিথ আর ওয়ার্নারের ক্যাচ মিস হওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রেশার রিলিজ করে দেয়া হলো, এরাও আরামসে সিঙ্গেল নিয়ে নিয়ে খেলাটা প্রায় হাতের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলো। ভাগ্যিস “জিতাইলে তুমিই জিতাইতে পারো” টাইপ মোটিভেশনাল স্পীকার একজন ছিলেন তাই তো ম্যাচটাও জিতা গেছিলাম। নইলে এ ম্যাচে আমাদের সবচেয়ে বড় তিন থ্রেট ওয়ার্নার, স্মিথ আর ম্যাক্সিকে আউট করা তো আর চাট্টিখানি কথা না।

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি নিখাদ ব্যাটিং পিচেও কুম্বলে, ওয়ার্ন মুরালিরা বোলিং এ আসা মাত্রই ফিল্ডাররা গালি,সিলি পয়েন্ট, শর্টলেগ আর স্লিপে ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলতো। টোপ ফেলে অপেক্ষা করতো কখন মাছ বড়শিতে উঠে। আর আমাদের পিচটাই তো একেবারে মাছের টোপ গেলার আদর্শ স্থান, বড়শিতে মাছ এমনিতেই উঠতো। তবুও এ কেমন ফিল্ড সেটিং?

ইংল্যান্ড সিরিজটাতেও এমন হচ্ছিলো। সবই ঠিক ছিলো। মাছের প্রাচুর্য, শিকারির দক্ষতা, আদর্শ টোপ। ঠিক ছিলো না শুধু টোপ ফেলে শিকার ধরার পরিবেশটা। আমরা আরো একটা লজ্জাজনক হোয়াইটওয়াশের দ্বারপ্রান্তেই ছিলাম। টি ব্রেকে কিসের যাদু হয়েছিলো সেদিকে আর কথা না নেই।

মুশফিক ভাই শুনতে পাচ্ছেন? টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে আর যাইহোক প্রেশার রিলিজ দেয়া যাবে না। এট্যাক হবে ভাই, শুধু এট্যাক। মাছ ধরতে হবে, প্রচুর মাছ। জাটকা হোক আর পূর্ণ ইলিশ হোক ধরার বিকল্প নাই, শুনছেন?

আরো পড়ুনঃ জনতার আদালতে মুশফিকের নেগেটিভ ক্যাপ্টেন্সী, নাকি উল্টোটা?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top