ফ্লাডলাইট

রুদ্ধ শ্বাস জয়ে অস্ট্রেলিয়া বধ!

নিয়ন আলোয়- রুদ্ধ শ্বাস জয়ে অস্ট্রেলিয়া বধ!- Neon Aloy

জিততে হলে ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে করতে হবে ২৬৫ রান। সেটা করতে নেমে স্কোরবোর্ডে কেবল ২ উইকেট খুইয়ে রান উঠে গেছে ১০৯। হাতে বাকি পুরো ২ দিন আর ৮ উইকেট। ধরা যাক, মিরপুর টেস্টের তৃতীয় দিন পর্যন্ত ম্যাচের গতিবিধি সম্বন্ধে আপনি ওয়াকিবহাল নন। ব্যাটিংয়ে থাকা দলটার নাম অস্ট্রেলিয়া, বিপক্ষে বল করে যাচ্ছে বাংলাদেশের বোলাররা। এই অবস্থায়, আপনি ম্যাচের হিসেবটা যত সহজে মিলিয়ে নিতে চাইবেন, এই টেস্টের চিত্রনাট্যটা অত সহজ নয় বরং ম্যাচের রঙ বদলের কাজটা হয়েছে প্রায় প্রতি সেশনে। অবশ্য, ৩য় দিনের শেষ বিকেলে ওয়ার্নার-স্মিথের ব্যাট থেকে আসা হাফ চান্সগুলো যখন আমাদের ফিল্ডারদের হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, প্রতিপক্ষের দিকে ম্যাচ ঝুঁকে যাবার সম্ভাবনা তখন প্রায় বারো আনা।

এবার চিত্রনাট্য কিছুটা ব্যবচ্ছেদ করা যাক। শুরুটা হয় বাংলাদেশের ব্যাটিং দিয়ে। ঠিক ১০ রানের মাথায় যখন পরপর তিনটা উইকেট পড়লো, মুহূর্তে মনে হল রান করার চেয়ে কঠিন কাজ যেন দ্বিতীয়টি নেই। এরপর তামিম-সাকিব জুটি কেবল প্যাট ক্যামিন্সকেই সামলে খেললেন না, পিচের আচরণ রপ্ত করে নিলেন দ্রুত। তখন পর্যন্ত তাদের দৃঢ় মনোযোগ সম্বলিত ১৫৫ রানের পার্টনারশিপ ম্যাচের পরিস্থিতে কতটা অপরিহার্য বুঝা যায় নি। সাকিবের রান যেখানে ৬৩.১৫ স্ট্রাইকরেটে ৮৪, তামিম ৭১ রান করলেন আরও স্বভাববিরুদ্ধ উপায়ে, ৪৯.৩০ স্ট্রাইকরেটে। প্রথম ইনিংসে ২৬০ রানের পুঁজি নিয়ে ৪৩ রানের লিড আসবে কেউই ভাবেনি। তবে সেই ভাবনার পালে আরও হাওয়া লাগতো যদি অজি টেলএন্ডাররা শেষ দুই উইকেটে ৭৩ রান যোগ না করতেন। যাই হোক লিড নেয়াটা নিশ্চিত করলেন আমাদের স্পিন-ত্রয়ী সাকিব-মেহেদী-তাইজুল। আর ৫ উইকেট নিয়ে সাকিব ভিড়লেন মাত্র চতুর্থ বোলার হিসেবে সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্বে।

ভয়টা ছিল ২য় ইনিংস নিয়ে। নির্বিঘ্নে দ্বিতীয় দিনের শেষ সেশনের ২২ ওভার কেটে যাচ্ছিল, সৌম বাঁধ সাধলেন স্রেফ কান্ডজ্ঞানহীন এক শটে। স্পিনে বাংলাদেশী বোলারদের সব উইকেট পেতে দেখে আগের রাতে নির্ঘাত স্পিন নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করতে বসেছিলেন নাথান লায়ন। প্রমাণ প্রথম ইনিংসে যেখানে তিনি ৯০ কিলোমিটার গতিতে স্পিন করাচ্ছিলেন পরের ইনিংসেই গতি কমিয়ে আনলেন ৮০কিমিতে। ৮২ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ফলাফলও হাতেনাতে পেয়ে যান। তৃতীয় দিনের শুরু থেকেই মিরপুরের উইকেটে বোলাররা আচমকা টার্ন আর অসম বাউন্স পেতে শুরু করলেন। তেমনই এক আচমকা বাউন্সে দারুণ খেলতে থাকা তামিম ব্যক্তিগত ৭৮ রানের মাথায় ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। সেই ধাক্কা সামলে লিড এগিয়ে নিচ্ছিলেন মুশফিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুশফিক রান আউট হতেই, একই স্কোরে তিন উইকেট হারিয়ে পেছন পায়ে চলে যাওয়ার যোগাড় বাংলাদেশের। ওইসময়টায় মমিনুলের স্কোয়াডে না থাকাটা দলকে নিশ্চয়ই ভাবিয়েছে। যেহেতু ক্রিকেট ইজ অ্যা মাইন্ড গেম, স্পিন-বান্ধব উইকেট সত্ত্বেও লিডটা ২৫০ না পেরোলে মানসিকভাবে এগিয়ে থাকা যাচ্ছিল না। আর তাই মুশফিকের ৪১ রান যতটা গুরুত্বের, ক্ষেত্রবিশেষে মেহেদীর ২৬ রান হয়তো তার চেয়েও বেশি।

২৬৪ রানের লিড নিয়ে শুরুটা ঠিক যেমন চাওয়ার কথা তেমনই হয়েছে বাংলাদশের ক্ষেত্রে। ২৮ রান তুলতেই অজিদের দুই উইকেট নেই। তখনই পাল্টা আঘাত। স্লিপে ‘জীবন’ পেয়ে ওয়ার্নার যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন, পজিটিভ ব্যাটিংয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দিতে চাইলেন। এটাই অস্ট্রেলিয়া। যেকোন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াতে জানে। জানে পাল্টা আঘাত হেনে প্রতিপক্ষকে ম্যাচ থেকে বের করে দিতে। দলের শক্তিমত্তা যেমনই হোক, এই মানসিকতা তাদের হামেশা এগিয়ে রাখে। ওয়ার্নারের সাথে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে ভালোই সঙ্গ দিচ্ছিলেন অজি কাপ্তান স্টিভেন স্মিথ। ৮ উইকেট হাতে নিয়ে ৮১ রানের অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় চতুর্থ দিন শুরু করে এই জুটি। এই পার্টনারশিপের এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশীদের টেম্পেরামেন্ট পরীক্ষাও নিচ্ছিল। ওয়ার্নার করলেন উপমহাদেশে তার প্রথম সেঞ্চুরী, এশীয় কন্ডিশনে নির্দ্বিধায় এটি তার সেরা ইনিংস; জুটি গিয়ে দাঁড়াল ১৩০ রানে। বল হাতে এবার রানের গতি কমিয়ে আনলেন অজি ‘হন্তারক’ সাকিব, আর নিচু হওয়া সুইং ডেলিভারিতে ফেরালেন ওয়ার্নারকে। ফেরালেন স্মিথকে, উজ্জীবিত তাইজুল সঙ্গ দিলেন স্পিন-যুদ্ধে। আর তাতে ৩৭ রান করতেই ৫ উইকেট খুইয়ে বিপদে পড়ে অজিরা, কিন্তু ম্যাক্সওয়েল তো আছেন। সেই আপদও দূর করলেন সাকিব লাঞ্চের পর প্রথম বলেই। ফলশ্রুতিতে, দ্বিতীয়বারের মতো একই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরী ও দশ উইকেট নিয়ে পৌঁছে গেলেন ২য় অবস্থানে, উপরে রইলেন কেবল গ্রেট রিচার্ড হ্যাডলি।

এমতাবস্থায় অজিদের প্রয়োজন ৬৬ রান, আমাদের ২ উইকেট। জয় নিঃশ্বাস দূরত্বে, কিন্তু ব্যাট হাতে বেঁকে বসলেন বোলার কামিন্স। কামিন্স মেহেদীর এক ওভারেই হাঁকলেন দুই ছক্কা। ম্যাচের পরিস্থিতিকে নিয়ে গেলেন দোদুল্যমান অবস্থায়। ম্যাচ তখন এক আদর্শ টেস্টের বিজ্ঞাপন। রুদ্ধ শ্বাস সেইসব মুহূর্তের রোমাঞ্চকর পরিণতি ঘটে তাইজুলের ডেলিভারিতে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ে বাংলাদেশ টেস্ট জয়ের দুই অঙ্কে (১০ জয়) পৌঁছাল। একবার অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান ডেভিড হুক্স ২০০৩ সালে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া-সফরে বলেছিলেন, “অস্ট্রেলিয়া এই বাংলাদেশকে একদিনে টেস্টে হারিয়ে দিবে।” ১৪ বছর পর সেই বাংলাদেশ নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে সাড়ে তিনদিনে হারিয়ে দিল! প্রকৃতই, ক্রিকেট ইজ অ্যা ফানি গেম!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top