নিসর্গ

এইসব দিনরাত্রি…. টাঙ্গুয়ার হাওর… টাইমলাইন ৩/৭/১৫

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

এলজিইডির চাকরির জন্য গত ৩ বছর ধরে সুনামগঞ্জেই আছি। আপাতত অন ডেপুটেশনে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদে। এই চাকরিটা ব্যাপক মজার! সারা জেলা ঘুরে বেড়াতে হয়। প্রথম যখন এখানে আসি জায়গা দেখেই মাথা ঘুরে গেছিলো। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি! উদ্ভট টাইপ জায়গা। আমি বাই বর্ন চিটাইংগা; সুতরাং আমার কাছে পাহাড় আর সমুদ্র খুবই কমন ব্যাপার কিন্তু  হাওর এলাকা সত্যিই অদ্ভুত ধরণের। বর্ষাকালে পানি শীতে পুরাই ধানক্ষেত, পুরাই অদ্ভুত এবং উদ্ভট!

হাওরে আমি অনেকবারই গেছি কিন্তু থাকা হয়নি রাতে কখনো। সুনামগঞ্জকে বলা হয় জৌৎস্নার শহর। সেটা কেন এটা গত ২ বছরে মোটামুটি বুঝেছি। এখানে তেমন বড় কোন স্থাপনা নেই তাই ভরা পূর্ণিমায় পুরা শহর কেমন যেন আলোকিত থাকে। আমার রেস্ট হাউজের ঠিক সামনে থেকেই চাঁদটা উঠতে থাকে। দেখতে এতো যে অসাধারণ, তবে বেশি মজা হলো হাওরে পূর্ণিমা। হাওরের পানি মোটামুটি স্টিল ওয়াটার,  বাতাসে হালকা হালকা কাঁপতে থাকে, এর মধ্যে চাঁদের আলোটা কেমন যেন অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করে। তাই পূর্ণিমা রাতে হাওরে থাকার ইচ্ছে আমার অনেকদিন থেকেই, আর তার জন্য পারফেক্ট হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। এটা UNESCO ডিক্লেয়ার্ড ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ। আর এই জায়গায় থাকার জন্য পোলাপান তো অলটাইম রেডি। এবারের প্ল্যানটা একদম হঠাৎ, সম্ভবত ৩০ তারিখের দিকে রক্তিম ফোন করে বলে, “মামা আমরা আসছি ঢাকা থেকে, টাঙ্গুয়ারে থাকবো।” আমি তো শুরু থেকেই না। এই ঝড়বাদলে নিজের চেহারাই ভালোমতো দেখা যায় না আবার পূর্ণিমা! তার উপর টাঙ্গুয়ারে বোটে থাকা! প্লাস আমার তখন চিটাগাং থাকার কথা। রক্তিম বলে, “মামা তুমি না থাকলে হবে না।” আর কি করা? মাথা খারাপ পোলাপানের তালে পড়লে ঝামেলা ওইটা জানা কথা। আর আমারো যে মনে মনে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না, সেটা কেমনে বলি? (কিছু কথা থাকনা গুফন!)

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

টাঙ্গুয়ার হাওড়

যাই হোক ট্যুর প্ল্যান মোটামুটি ফাইনাল হলো ঢাকা থেকে ৪ জন (রক্তিম, রিমন, সজল আর তৌহিদ), চিটাগং থেকে ৪ জন ( চান্দু, জাহিদ ভাই, আলম ভাই আর জনৈক ভদ্রমহিলা) আর সিলেট থেকে ১ জন আর আমি। কিন্তু আইটেম বয় অনুপ কুমারকে ছাড়া এই ট্যুর করতে আমি রাজি না। সে হইলো একটা জ্বলজ্যান্ত মাল। ওকে আমি বাই ডিফল্ট ট্যুরে রাখার ট্রাই করি। আসলে যেকোন ট্যুরে পেইন দেবার মত পোলাপান না থাকলে মজা নাই। অনুপ কুমার কে পেইন দেবার মজা হইলো ও কখনো পেইন খায় না। কারণ আর্থ্রাইটিসের কারণে ও এতো বেশি  পেইনকিলার খাইছে ওর মস্তিস্কের ব্যথা পরিমাপক অঙ্গটি এখন প্রায় বিকল! তাই ওকে আসাই লাগবে। মজা হয়েছে সে আসার টাইমে তুষার দা কেও নিয়ে এসেছে যিনি অলরেডি ইন্ডিয়ার সব কয়টা স্টেট ঘুরে ফেলেছেন (সিকিম সহ তাও ২ বার!) মোটামুটি ৩৫ বার গেছেন, কঠিন পাব্লিক! সিলেট থেকে যে ভাইয়া আসছেন (পুসান ভাই) তিনিও ব্যাপক পাব্লিক। TOB এর অ্যাডমিন ছিলেন একসময়। টাঙ্গুয়ারে গেছেন অনেকবার তাই পুরো জায়গাটা তার খুব চেনা। উনি অনেকগুলো জটিল কাজ যেমন বোট ঠিক করা, কেনাকাটা করা মানে ঝামেলার জিনিসগুলো সব খুব সহজ করে দিয়েছিলেন। বোটওয়ালা উনার খুব পরিচিত লোক। এই ধরণের রিমোট প্লেসে এরকম জানা শোনা লোক না থাকলে কি পরিমাণ প্যারা খাইতে হয় এইটা আমি খুব ভালো জানি। পুরো ট্যুরটা খুব সাকসেসফুল হইছে এই ছেলের কারণে সো তাকে স্পেশাল থ্যাংকস। আর আমি যাবো শুনে  আমার রেস্ট হাউজের এক দাদাও বললো যাবেন উনি (সুমন দা)। এভাবে ঢাকা থেকে ৬ জন, চিটাং থেকে ৪, সিলেট থেকে পুসান ভাই আর আমি সহ এখানে ২ জন। টোটাল ১৩ জনের গ্রুপ (নাম্বারটা সত্যিই একটু আনলাকি)।

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

টাঙ্গুয়ার ট্যুরের সেই ১৩ জনের টিম

ঢাকার পাব্লিকগুলো সকাল ৬ টা বাজেই পৌছে গেল,  চিটাইংগাগুলো ৯ টার দিকে সবাই মোটামুটি ১০ টার ভেতর আমার রেস্ট হাউজে উপস্থিত। এখানে হালকা খাওয়াদাওয়া করেই রওনা, প্রথমে যেতে হবে তাহিরপুর সুরমা নদী পার হয়ে।  তাহিরপুরে যাবার নরমাল বাহন হলো মটরসাইকেল। এটাও একটা ইউনিক জিনিস তবে বেশি লোক হলে লেগুনা বা সিএনজি করেও যাওয়া যায়।  পুসান অভিজ্ঞ লোক, সে আগে থেকেই একটা লেগুনাকে বলে রেখেছিল। আমরা নদী পার হয়ে কিছুক্ষণ ওয়েট করতে করতেই লেগুনা হাজির। এরপর রওনা। মটরসাইকেলে লাগে ১ ঘন্টা, লেগুনা তে পৌনে ২ ঘন্টার মত। লেগুনা ড্রাইভার বেশ মজা পাইছিল আমাদের মত উড়াধুরা পাব্লিক দেখে। মোটামুটি হাওয়ার বেগে দেড় ঘন্টায় পৌছে গেলাম। এখানে একটু বলে রাখা ভালো মটরসাইকেলে তাহিরপুর যাওয়াটা খুব মজার, একপাশে মেঘালয়ের পাহাড়, রাস্তা বেশ ভালোই। লেগুনাতে এই ফিলিংসটা পাওয়া যায় না।

তাহিরপুরে পৌছালাম ২ টার দিকে। তাহিরপুর উপজেলাটা পুরাই হাওরের ভেতর। একপাশে বিশাল শণির হাওর আরেকপাশে মাটিয়াল হাওর তার পাশে টাঙ্গুয়ার। মাঝে একটুকরো ভূমি। ওটাই উপজেলা।

এখানে পৌছার পর প্রধান কাজ হলো আমরা যেহেতু বোটেই থাকবো সুতরাং খাওয়া দাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, মুরগি, মাছ, এসব কেনাকাটা করা। মাঝিই সব রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করবে। দলে একজন মেয়ে থাকলে কত যে সুবিধা কারণ বোটের ৫ জন সহ ১৮ জন মানুষ তিনবেলা খাবার জন্য কি পরিমাণ চাল লাগে এটার কোন আইডিয়াই আমাদের নাই। কেউ বলে ৫ কেজি কেউ বলে ১০ কেজি! আজমা আপু থাকার কারণে তিনিই বলে দিলেন কোনটা কেমন লাগবে। সুতরাং আমাদের অ্যাকাউন্টেন্ট সজল পুসান ভাইকে নিয়ে তাহিরপুর বাজারে গেলেন এই ফাঁকে আমরা বাজারের এক দোকানে মনের সুখে ছোলা, চা এসব খেতে লাগলাম। গরুর দুধের চা অসাধারণ ছিলো। এর ফাঁকে রক্তিম আম, আনারস কোথক জানি কিনে আনলো। ৩০ মিনিটের ভেতর সজল আর পুসান ভাই হাজির। সবার আর তর সইছে না কখন বোটে উঠবে, টাঙ্গুয়ারে যাবে। লন্চঘাট বাজারের পাশেই, বোটওয়ালা পুসনের অনেকদিনের পরিচিত, সে আগেই বোট নিয়ে ওয়েট করছে ঘাটে। আমরা মিনিট পাঁচেকের ভেতর লন্চঘাটে হাজির। বোটটা দেখেই মন ভরে গেলো। মোটামুটি বড় সাইজের কাঠের বোট। দেরি না করে মালপত্র সমেত উঠে গেলাম। দেখা গেল যে পরিমাণ খাওয়াদাওয়া নেয়া হইছে তাতে মনে হয় টাঙ্গুয়ারে হাওরে শুধু খাইতেই গেছি।

বোট ছাড়লো। আমরা ব্যাগট্যাগ সব ভেতরে রেখে ছাদে সবাই উঠে পড়লাম। তাহিরপুর থেকে ছাড়ার পর প্রথমে মাটিয়াল হাওর পড়ে তার পাশেই টাঙ্গুয়ার। বোট চলছিল হাওরের মধ্য দিয়ে। সবাই চিৎকার চেঁচামেচি, টাঙ্গুয়ারে অবশেষে যাচ্ছি আমরা। লাফালাফি চলছে রীতিমতো, কেউ ছবি তুলছে,  কেউ ঝিমুচ্ছে, কেউ বা অন্যজনকে কোন কারণ ছাড়াই ডিস্টার্ব করছে। মোটামুটি ঘন্টাখানেক চলার পরেই হিজলের বন দেখা গেল মানে টাঙ্গুয়ারে ঢুকে গেছি আমরা। মাঝিও তাই বললো। মোটামুটি সবাই এক্সাইটেড আমরা। এরপর আরো ভেতরে চলে গেলাম আমরা। তখন মোটামুটি বিকেল। টাঙ্গুয়ার হাওরের মাঝেই মাঝি বিল্লাল ভাইয়ের বাড়ি। আমরা প্রথম খাওয়াদাওয়া করবো সন্ধ্যায় ইফতারির পরে। তাই প্রথমেই উনার বাড়িতে জিনিসপত্র গুলো দিয়ে দেয়া দরকার। নৌকা যখন গ্রামে ভিড়লো ওখানকার বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে মোটামুটি ভিনগ্রহের প্রাণীর মত তাকাই ছিল। তাদের কাছে আমরা সবাই বিদেশী। আমরা বোটেই ছিলাম, আজমা আপু দেখি বোট থেকে নেমে বাচ্চাগুলোর সাথে ব্যাপক আড্ডা জমিয়ে ফেলেছেন। পিচ্চিগুলোও খুব মজা পাচ্ছিল উনাকে পেয়ে। আপু পেশায় ডাক্তার। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম উনি আবার না ডাক্তারি শুরু করে দেন! যাই হোক বিল্লাল খুব তাড়াতাড়িই জিনিসপত্র গুলো বাসায় দিয়ে বোটে চলে এলো।

আবার যাত্রা শুরু। কিছুটা গিয়েই একটা ওয়াচ টাওয়ার চোখে পড়লো। এটা বন বিভাগের তৈরি। বেশ উঁচু। এটার পাশেই হিজলের বন। আমরা ওটার দিকেই যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই পৌছে গেলাম ওই জায়গায়। বিল্লাল ওই টাওয়ারের কলামের সাথে বোট বেঁধে দিল। পানিটা এতো পরিস্কার যাকে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ওয়াটার বলা হয়; এটার কারণ আছে। এটা শুধুই বৃস্টির পানি। পানির নিচে গাছপালা, ছোট মাছ সব স্পস্ট দেখা যায়। দেখেই সবার মুখে এক কথা পানিতে তো নামতেই হবে রে! আমাদের সাথে লাইফ জ্যাকেট ছিল। না থাকলেও কোন প্রব্লেম নাই। গলা সমান পানি, ডুবার বিন্দুমাত্র চান্স নাই কোন। আর মাঝি ভাইরা তো পাশে বসে আছেনই। সুতরাং, কোন দেরি নাই যে যার মত ড্রেস চেন্জ করেই পানিতে ঝাঁপ। আমাদের মোটামুটি গলা সমান পানি, আলম ভাইয়ের কোমর সমান হবে। উনি মোটামুটি রাজপথে হেঁটে বেড়ানোর মত এদিক ওদিক চলে যাচ্ছেন। পাশেই হিজল গাছ, পুসান ভাই হ্যামক টানিয়ে দিলেন। আহ! হ্যামক একটা দারুণ জিনিস, পানির উপরে শুয়ে থাকা যায় আরাম করে। সবার তখন অস্থির অবস্থা। কেউ এদিকে লাফ দেয় কেউ ওদিকে। এর মধ্যে দেখি আমাদের অনুপ কুমার মোটামুটি রেসকিউ সাতারুর পোশাক পড়ে ফেলেছে। মুখে স্নোরকেলিং এর মাস্ক আর বাতাস টানার জন্য নল। তাকে এখন মোটামুটি ভাবে ভিনগ্রহের প্রাণীর মত দেখাচ্ছে! হঠাৎ শুনি বাজ পড়ার শব্দ! আসলে অনুপ বোটের উপর থেকে লাফ দিইয়েছে। সবার কাছে মনে হইছে ছোটখাট কোন হাতি আকাশ থেকে পানিতে পড়েছে। ঐ জায়গাটা মোটামুটি গর্ত টাইপ হয়ে গেছে আমি শিউর! এরপরে শুরু হলো অনুপের সার্কাস শো। সে এরকম বেমক্কা ফাল দেবার কারণে কত মাছ যে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে কে তার খবর রাখে! প্লাস তার উল্টাপাল্টা স্নোরকেলিং এবং সাতার কাটার কারণে পুরা জায়গাটাই ঘোলা হয়ে গেলো! পুসান ভাই চেস্টা করছেন সেলফিস্টিক দিয়ে আন্ডারওয়াটার সেলফি তোলার কিন্তু ঘোলা পানির জন্য হলো না। আমরা যে যার মত লাইফ জ্যাকেট, বয়া এগুলো দিয়ে ভেসে আছি। পানিতে ডুব মারছি, আবার উঠছি, ভাসছি। পানি মোটামুটি ঠান্ডা, সারাদিনের গরমের ক্লান্তি কেমন যেন এক মুহুর্তেই উধাও, খুব রিফ্রেশিং লাগছিলো। ওইদিকে হ্যামকে আমরা পালা করে উঠছিলাম, এটা বেশি আরামের জায়গা হওয়াতে সবার টার্গেট ওটাতে চড়া। পরবর্তীতে আলম ভাই আর আজমা আপু অনেকক্ষণ ওখানে বসে কত গুজুর গুজুর ফুজুর ফুজুর করলেন, মাথায় আবার লতাপাতা দিয়ে বসে ছিলেন দুজন, কেমন যেন আফ্রিকান আদিবাসীদের মতো। খুব সুন্দর লাগছিল দুজনকে আর আমরা চেয়ে চেয়ে রইলাম!

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ওয়াটারে দাপাদাপি

সুমন দা এর ফাকে পানিতে স্নান করে উঠে পড়েছেন,  ক্যামেরা নিয়ে টাওয়ার থেকে আমাদের বাঁদরামি ক্যামেরাবন্দী করার চেস্টা করছেন। তুষার দা হিজল গাছ থেকে লাফ দেবার চেস্টা করছেন উল্টো হয়ে, আমি আর চান্দু উল্টো হয়ে ভেসে থাকা যায় কিনা তার প্র্যাকটিস করছি। রিমন এর মধ্যেই তার ডিএসএলআর পানিতে নিয়ে এসেছে, তৌহিদ এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে, রক্তিম আর সজল সাতার কেটে কেটে পুরো টাঙ্গুয়া পার হওয়া যায় কিনা সেটার একটা হিসেব করছে, কিন্তু অনুপ যে কি করার চেস্টা করছিল সেটাই বোঝা যাচ্ছিল না, সে সাঁতার কাটতে পারে সর্বোচ্চ ১০ ফিট পর্যন্ত কিন্তু তার পোশাক আশাক দেখে মনে হবে সম্প্রতি অলিম্পিকে মাইকেল ফেলপসকে অল্পের জন্য হারাতে পারেনি! তার কান্ডকারখানা আমরা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলাম। এর মাঝে অনুপ আবার লাফ দিলো এবং তার গগলস হারাই গেলো পানিতে, যেটা দিয়ে পানির নিচে দেখবে ওটাই নাই! পরে অবশ্য এক মাঝি ভাই কস্ট করে খুঁজে দিয়েছিলেন এটা, কিন্তু আমাদের সবার জলকেলি যেন থামছেই না। আমরা মোটামুটি ২ ঘন্টা ছিলাম পানিতে, আজান দেবার কিছুক্ষণ আগে উঠে পড়লাম সবাই কারণ পুসান রোজা। তাই আমাদের যেতে হবে কিন্তু সবাই ফ্রেশ হয়ে বোটে উঠতেই মোটামুটি আজান দেবার সময় হয়ে এলো। আমার চানাচুর, জিলাপি, মিনারেল ওয়াটার এ ধরণের জিনিস নিয়ে নিয়েছিলাম, সমস্যা হলো না। পানিতে অনেকক্ষণ দাপাদাপি করার কারণে সবার পেটে ক্ষিধা। এগুলোই চাবাইতে চাবাইতে আমরা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বোটে যেতে যেতেই ইফতার সারা হলো। কিন্তু পেটে ছুঁচো ডন মারছে। মোটামুটি ১০ মিনিটেই গ্রামে পৌছে গেলাম। ততক্ষণে আকাশ মুখ গোমরা করে ফেলেছে কেন জানি, পুরো আকাশ ভেঙ্গে বৃস্টি আসবে এই টাইপ, নৌকা বাতাসে দুলছে, প্রচন্ড বাতাস, খুব শান্তি শান্তি ফিলিংস তার মধ্যে আমাদের খিচুরী চলে এসছে উইদ ডাল এন্ড ডিম ভাজা। আহ! পৃথিবীর সব সুখ তখন আমাদের। বোটের উপর ছাদে ঝিরি ঝিরি বৃস্টির মাঝে শুরু হয়ে গেলো গোগ্রাসে গেলা, কিছু ভাবার টাইম নাই তখন। বাকিদের কথা জানি না অনুপ খেতে পারছিল না দেখে তার অর্ধেক ডিম মেরে দিয়েছিলাম। পেট খারাপ মানুষ, তাকে সাহায্য করা নৈতিক দায়িত্ব। খাওয়াদাওয়ার পর পুরাই আয়েশ করা, এরপর কাজ হলো ফানুস উড়াতে হবে। সুতরাং প্রস্তুতি সারা, পুসান ক্যামেরা নিয়ে রেডি। আলম ভাই বাঁশিতে কঠিন সুর তুলে ফেলেছেন এই উপলক্ষে। কিন্তু ব্যাড লাক কেমন যেন। প্রচন্ড বাতাসে ফানুস বেশি উড়লো না। প্রকৃতি একটু বিরুপই ছিল আমাদের উপর, (এতো সুখ মনে হয় খাওয়া যায় না!) সো আর কি করা? এর মাঝে বৃস্টি একবার আসছে আবার কমে যাচ্ছে, আমরা আর নামলাম না, সবাই আয়েশ করে ছাদে শুয়ে আড্ডা দিচ্ছি, আলমভাই বাঁশি বাজাচ্ছে, প্রচন্ড বৃস্টি কিন্তু খুব ভালো লাগছে সবার। আমরা শুয়ে শুয়ে চাঁদ ওঠার প্রতীক্ষায় তখন। সময় বয়ে যাচ্ছে, মিনিট ঘন্টা বয়ে যাচ্ছে , কিন্তু চাঁদ উঠার নাম নেই। পুরো আকাশ কালো হয়ে  বজ্রপাত শুরু হল। হাওরে বজ্রপাত খুব ডেঞ্জারাস। কখন মাথার উপ্রে পড়ে বলা মুশকিল! কিন্তু কে আর এগুলর কেয়ার করে? সবাই বোটের ছাদেই রইলাম। সাথে মুশুলধারে বৃস্টি …এর মধ্যেই আড্ডা শুরু হল… অনুপ দেখি এর মধ্যেই তার বেশ ভুশা পরিবর্তন করে মাথায় হেডলাম্প জ্বালিয়ে ঘুরাঘুরি শুরু করেছে , কেমন যেন সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রই টাইপ ব্যাপার! সে এদিক সেদিক ঘুরে তেমন কিছু না পেয়ে আমাদের সাথে আড্ডায় যোগ দিল, সে কি আড্ডার ধরণ! ইহজাগতিক, পরজাগতিক, আমরা কোথা থেকে এলাম, কেনই বা এলাম , বিস্তর আলোচনা। অনুপ আলম ভাইকে বিচিত্র সব প্রশ্ন করছে আলম ভাই উত্তর দিয়ে কূলাতে পারে না। এর মাঝে তুষার দা বলছেন উনার গল্প, ইন্ডিয়ার সবগুলি স্টেট একা একা ঘুরে ফেলা মানুষের গল্প বিশাল। আমাদের প্রতিটা ট্যুরের মাঝে আরেকটা ট্যুরের প্ল্যান হতে থাকে। আমরা চিন্তা করছি এরপর নেক্সট জায়গা কি হতে পারে! চিল্যাক্স করার জন্য এমন জায়গা দেশে আর আছে কি! এসব আজগুবি কিন্তু সিরিয়াস লেভেল আলোচনা করতে করতে রাত প্রায় ১০ টা। মাঝি বারবার বলছে খেয়ে নেবার জন্য। এটা অত্যন্ত অত্যন্ত প্রত্যন্ত একটা এলাকা। ৯ টার ভেতর সবাই ঘুমায় পড়ে। আমরা খেয়ে নিলে পড়ে উনারা ফ্রি হতে পারবে। খেতে বসার পর দেখা যায় বোটের উপর রীতিমতো আলোক স্বল্পতা। অনুপ মোটামুটি ব্যাগভর্তি করে জিনিসপত্র নিয়ে এসছে। তাকে আমরা বলি চলমান ডিসপেনসারি। তার কাছে জ্বর, হাঁপানি, মাথাব্যথা, এমনকি ম্যালেরিয়ার, টাইফয়েড, জন্ডিস সবধরণের ওষুধ পাওয়া যায়! কিন্তু এখন তার একটা জিনিস সত্যিই কাজে লাগছে। সেটা হলো হেডল্যাম্প। সে হেডল্যাম্প দিয়ে সবাইকে আলো দিচ্ছে এ কারণে সে নিজে খেতে পারছে না। এমন মহান মানুষ কালেভদ্রে জন্মায়!

খাওয়া দাওয়া শেষ। আলো নাই কি আর করা। দু’একটা টর্চ আর অনুপের হেডল্যাম্পের আলোতে যা খাওয়া গেছে। মেন্যুতে মুরগির মাংস আর ডাল। আসলে পানিতে দাপাদাপি করে শরীর এতো ব্যথা যে খাওয়ার ইচ্ছেও নাই। খাওয়ার পর শরীর চলছেই না আর। গুড়িগুড়ি বৃস্টি ছিলো। ১০ টার পর যেনো পুরো আকাশ ভেঙ্গে বৃস্টি নেমেছে। এক একটা বৃস্টির ফোটা মোটামুটি শেলের মতো বিঁধছে। সাথে প্রচন্ড বাতাস। আমরা এসছি পূর্ণিমা উপভোগ করার জন্য কিন্তু কিসের কি… চাঁদের টিকিটিও দেখলাম না। প্রকৃতি এটা কিরকম ষড়যন্ত্র করলো মাথায় ঢুকছে না!

রাত প্রায় ১২ টা বাজে। ননস্টপ বৃস্টি চলছেই। আমাদের আর বোটের উপরে থাকার সুযোগ নেই। সব সদস্যই বোটের ভেতর। মাঝি বিল্লাল বোটটাকে একটা শক্ত খুটির সাথে বেঁধে দিয়েছে। না হলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে কই চলে যাবো তার দিশা পাওয়া মুশকিল। ভেসে হয়তো যায়নি কিন্তু দুলছে প্রচন্ড। বোটের ভেতর সব সদস্য মোটামুটি আঁটোসাটো টাইপ অবস্থা। একমাত্র এনি আপু ছাড়া আমাদের বেশিরভাগ সদস্যই গাট্টাগোট্টা টাইপ। উনি মোটামুটি শূণ্যের উপরে ছিলেন আমার যতটা ধারণা। কারণ সব সদস্য আর ব্যাগ, আরো জিনিসপত্র ভেতরে ঢুকে যাবার ফলে ভেতরে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের ভাষায় যাকে বলে dx পরিমাণ জায়গাও খালি নেই। যে পরিমাণ খাওয়া হইছে আর বাইরে কি সুন্দর বাতাস, তাতে একটা নরম গদিঅলা বিছানা পেলে… (আহা, আফসোস করে কি হবে আর!)। সবাই কাঠের পাটাতনের উপরে শুয়ে আছি (এ কাঠের পাটাতনের উপর ডিরেক্ট শোওয়া মোটেই আরামদয়ক নয়) আমি শুয়েছি মাঝামাঝি। বাম পাশে সুমনদা। আমার অপোজিটে অনুপ। সে একের পর এক উদ্ভট প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। তবে একটা প্রশ্ন খুব লজিক্যাল, এখানে সবদিকে পানি আর পানি। আমরা আসলে কি সৌন্দর্য দেখতে এসেছি? এটার উত্তর আমাদের কারো জানা নাই সম্ভবত। উদ্ভট সব কথাবার্তা বলতে বলতে রাত প্রায় ৩ টা। সবার চোখে ঘুম। আমারো যথারীতি। হঠাৎ দেখি চোখে তীব্র আলো। অনুপ ওর টর্চটা জ্বালিয়ে সোজা আমার চোখের উপর দেখছে আমি ঘুমাচ্ছি কিনা! কতবড় ফাজিল হলে এরকম করা যায়। নেহায়েৎ মন মেজাজ ভালো ছিলো। না হয় ঘুষি মেরে ওকে হাওরে ফেলে দিলে দুনিয়ার সবিশেষ কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হোতো না।

ভোর ৬ টা। বাইরে তুমুল বৃস্টি তখনো। কেউ কেউ জেগেেছে। বাকিরা সব গভীর ঘুমে। ৭ টার দিকে সবাই উঠে পড়েছি আমরা। বোটের জানালা দিয়ে বৃস্টি দেখছি। ‘একটি বর্ষণমুখর সন্ধ্য’ আমরা রচনা লিখতাম। তার থেকে একটা বর্ষণমুখর সকাল অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং! আর বৃস্টি তো যেনো তেনো না ইংরেজিতে যাকে বলে একদম টরেনসিয়াল রেইন। সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে এরকম বৃস্টি দেখার মাঝে ও কিছু সুখ আছে মনে হয়!

সকাল ৮ টা। বিল্লাল আমাদের সকালের নাস্তা রেডি করে ফেলেছে। খিচুরি আর ডিমভাজি। ওগুলো সবসহ আমরা বোট ছেড়ে দিলাম আবার। এবার গন্তব্য বর্ডারের দিকে। আমারা যাবো বাগলী নামের এক জায়গাতে। পুসান আগে গেছে। সে বেশ ভালোই জানে জায়গাটা। বর্ডারের দিকে যাচ্ছি। বৃস্টি কিছুটা ধরে এসেছে। এখন অনেকটা গুড়িগুড়ি ধরণের। কিছুটা দূরে পাহাড়ের গায়ে তুলোর মত মেঘ জমে আছে। আমরা ওদিকেই যাচ্ছি। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। ওই আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে কিনা জানি না কিন্তু আশপাশের পুরো জায়গাটার মধ্যে একটা অন্যরকম কালার চলে এসছে। গতকাল রাতের প্রচন্ড বৃস্টির তোড়ে পাহাড়ি ঢল নেমেছে স্পস্ট বোঝা যায়। আমরা যাচ্ছি আপস্ট্রিমের দিকে। আমাদের ইন্জিন বোট পুরো এনার্জি দিয়েও চলছে খুব ধীরে ধীরে। এভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর একটা খাল ধরে আমরা একদম বর্ডারে পৌছে গেছি।

বাগলী হলো মূলত কয়লা আমদানি করার জায়গা। ওখানে বিজিবি একটা ক্যাম্পও আছে। আমরা ওই ক্যাম্পের অপোজিট পাড়ে বোট ভেড়ালাম। ওরা বারবার ওই পাড় থেকে মানা করছিলো ওদের ক্যাম্পটাকে ক্রস না করতে। আমরা এখন যে জায়গাতে নেমেছি এটা মূলত নোম্যানস ল্যান্ড। ওখান থেকে ২০০ গজের কম দূরত্বে খাসিয়াপাড়া যেটা ইন্ডিয়াতে পড়েছে। আসার সময় আমরা অনেক দূর থেকে একটা প্রচন্ড জলস্রোতের শব্দ পাচ্ছিলুম। এখানে আসার মূল কারণ ওটাই। বৃস্টি না থাকলে সাধারণ অবস্থায় এটাকে ঝিরি বলা যায় কিন্তু প্রচন্ড বৃস্টিতে এটা ছোটাখাটো জলপ্রপাতের মত অবস্থা ধারণ করেছে। এ জায়গাটা অনেকটা পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত ফানেলের মতোন। অনেকগুলো ঝিরি এজায়গার আপস্ট্রিমের কোন এক জায়গায় মিশেছে আর সব পানি এই একটা দিকে বের হচ্ছে। তাই পানির এই প্রচন্ড স্পিড। ওই জায়গার কাছাকাছি যাবার কোন সুযোগ নেই কারণ ওই অংশটা পড়েেছে ভারতে। আমরা খালি দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখলুম। তবে আমরা যে অংশে আছি সেটাও বেশ মজার জায়গা। অনেকগুলো গাছ অনেকটা বনের মতন। আপাতত এখানে ছবি তোলা ছাড়া তেমন আসলে কাজ নেই (আসলে পুরো ট্যুরেই তেমন কোন কাজ নেই)। আলম ভাই আর অ্যানি আপু কতরকম পোজে যে ছবি তুলছেন তার কোন হিসাব কিতাব নাই। দলের বাকি রা যে যার মতোন ছবিটবি তুলছে। পুরো ট্যুরের গ্রুপ ছবিটা সম্ভবত এ জায়গায় তোলা। আমরা প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম ওখানে। দেন বোটে উঠে রওনা। গন্তব্য আবার সেই ওয়াচ টাওয়ার।

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

বিভিন্ন পোজে ছবি তোলা তো চলবেই!

এবার আমরা অনেক তাড়াতাড়ি পৌছে গেলাম ওখানে। বেলা প্রায় ১২ টা মতন হবে।সময় যেহেতু আছে সুতরাং পানিতে আবার নামতেই হবে। আসলে এতো সুন্দর পরিস্কার জল। পানিতে নামার লোভ সামলানোই দায়। আমরা আবার ঝটপট ড্রেস চেন্জ করে নেমে পড়লাম। আজকে পানির হাইট একটু বেশি কারণ রাতের বৃস্টি। গতকাল আমরা একই জায়গাতে কত সুন্দর সাপোর্ট পাচ্ছিলাম। পানি ছিলো গলা অব্দি সর্বোচ্চ আজকে মাথা ক্রস করে যাচ্ছে। হাওর এলাকার এটাই বৈশিস্ট্য অবশ্য। এগুলো মূলত মেঘালয়ে যে পরিমাণ বৃস্টি হয় তার একটা বিশাল ওয়াটার রিজার্ভার। এখান থেকে সুরমা নদী তারপর মেঘনা হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে চলে যায় পানিটা। পানিতে দাপাদাপি অবশ্য তার জন্য কিছু কম হইছে বলে মনে হোলো না। দুপুর ২ টার দিকে আমরা সবাই উঠে পড়লাম পানি থেকে। খাওয়াদাওয়া করে রওনা দিতে হবে আমাদের। কারণ এখান থেকে তাহিরপুর হয়ে সুনামগঞ্জ যেতেই প্রায় আড়াইঘন্টা লাগবে। সন্ধ্যা ৭ টার বাসে চিটাংর পাবলিকরা চলে যাবে। আর ঢাকার যারা তাদের বাস রাত ১০ টায়।

৩ টা বেজে গেছে। রওনা দিতে হবে। খাওয়া শেষ করেই রওনা দিলুম আমরা। বোট চলছে। এখন বৃস্টি নেই। আমি ভেতরে শুয়ে আছি। সবাই যে যার মতোন আছে। শরীরে একগাদা ক্লান্তি সবার। কিন্তু কেমন যেনো সুখের একটা ছাপ সবার চোখে। আমি শুয়ে ভাবছিলাম এ জায়গাটার আসল বিশেষত্বটা কি! কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম… নিঃস্তব্ধতা। বিশাল হাওর একপাশে পাহাড়। কিন্তু পুরো জায়গাটা কেমন যেনো শান্ত, নিঃস্তব্ধ ধরণের। এটা অনেক রিমোট একটা জায়গা। গাদাগাদা ট্যুরিস্টের কোন ভেজাল নেই। অনেক দূরে দূরে ছোট ছোট দ্বীপের মত এক একটা গ্রাম। অন্যান্য হাওরগুলোর এ সব বৈশিস্ট্য আছে কিন্তু এখানের স্পেশাল জিনিসটা হলো একপাশটা বিশাল পাহাড়। বৃস্টির পরে মেঘ জমে থাকে… সবমিলিয়ে এতো অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ বাংলাদেশে আর আছে কিনা সন্দেহ। ঠিক একারণেই মনে হয় এটা ফটোগ্রাফারদের বেশ প্রিয় জায়গা। দেশে অনেক জায়গায় ঘুরতে গেছি সেটা কোন দ্বীপে হোক বা পাহাড়ে … কিন্তু জায়গাটার প্রেমে পড়েছি একবার এসেই। এরকম জায়গার প্রেমে না পড়াটাই বরং অস্বাভাবিক! তবে এ ট্রিপের সবচাইতে আসল ব্যাপার হলো এটা অতিমাত্রায় রিল্যাক্স একটা ট্রিপ। গাড়িতে আসবেন, বোটে থাকবেন, পানিতে নামলে নামলেন নাহলে নাই, আর ইচ্ছেমতন হাওরের মাছ খেলেন! মানে অনেকদূর হাঁটতে হবে বা পাহাড় বাইতে হবে এজাতীয় কোন প্যারাদায়ক ব্যাপারস্যাপার বিন্দুমাত্রও নেই!

ট্যুরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। হাওরে দিন রাত মিলিয়ে পুরো একদিনের উপর আমরা, কিন্তু মনে হচ্ছে এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো! অনুপের ভাষায় কোন সৌন্দর্যই তো দেখতে পারলুম না। ঘন্টাখানেক পর তাহিরপুর পৌছে গেছি। লেগুনাকে আগেই বলা ছিলো সবাই বিল্লাল আর বোটের বাকি দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বিল্লাল পুরো দুদিন আমাদের জন্য অনেক কস্ট করেছে গাইড কাম মাঝি হিসেবে। সেজন্য ওকে স্পেশাল থ্যাংকস দিতে ভুললাম না। ওরাও বেশ মজা পেয়েছে মনে হলো আমাদের কাজকর্ম আর কথাবার্তা শুনে। ঘন্টাখানেক পর সুনামগঞ্জ পৌছে গেলাম আমরা। বিকেল সাড়ে পাঁচটা তখন। রেস্টহাউজে চলে এলুম সবাই। সবার মনে কেমন ফুর্তি ফুর্তি ভাব। হাওরে একরাত থাকার পর সবার বয়স মনে হচ্ছে বেশ কিছুটা কমে গেছে! ক্রিস্টাল ক্লিয়ার জলে দাপাদাপি করলে নবযৌবন পাওয়া যায় কিনা সেটা অনুপের জন্য একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে! আপাতত সেটা তোলা থাক। ( নবযৌবনের আরেকটা তরিকা অবশ্য ওকে দিয়েছিলুম… বেচারার অনেকদিন ধরেই পেটের সমস্যা। টাঙ্গুয়ারে প্রচুর পরিমাণ ফাইটো আর জুয়োপ্ল্যাংকটন আছে। অনুপকে বলেছিলাম পানির নিচের কিছুঘাস লতাপাতা চিবিয়ে খেতে তার পেটের সমস্যাটা যদি কিছুটা কমে! উল্টোপাল্টা আইডিয়া দিতে আমার সারাজীবনই বেশ ভালো লাগে! ) সন্ধ্যা ৭ টায় চিটাং এর বাস। পৌছবে সেই সকাল ৬ টায়। হালকা চা বিস্কিট খেয়ে নিলাম সবাই। পুরো ট্যুরে সবাই বেশ মজা করেছে তবে স্পেশালি অ্যানি আপুর কথা বলবো। সব ছেলেদের মাঝে উনি একাই ছিলেন মেয়ে। দলের দু’একজন সদস্য উনাকে আগ থেকে চিনলেও আমরা বেশিরভাগই চিনতাম না। কিন্তু এতোগুলো ছেলের মাঝে উনি মনে হয়না একবারের জন্যও বিরক্তি বোধ করেছেন। এটাই সত্যিকার ট্যুর স্পিরিট। আমাদের প্রতিটা ট্যুরেই নতুন কোন সদস্য থাকে। এবারের ট্রিপে দলের অর্ধেকের সাথে আগে কোন পরিচয়ই ছিলো না যেমন পুসান, সজল, রিমন। কিন্তু ট্যুর শেষে সবার মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়। মনে হয় যেনো আমরা অনেকদিনের পরিচিত। এ ট্যুরে প্রতিটা সদস্যই ছিলো স্পনটেনিয়াস টাইপ। একটা মুহুর্ত বোরিং কাটবে তার কোন চান্সই নাই। সবাই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত। কেউ ফানুস উড়াচ্ছে, কেউবা ছবি তুলছে। কেউ বা হয়তো জীবনের গভীর কোন মর্মার্থ বিশ্লেষণে ব্যস্ত ! তুষারদা মানুষটা একটা সত্যিকার যেনো বোহেমিয়ান। ভারতের সব স্টেট ঘুরেছেন একা একা। তুষারদা পুরো গ্রুপের জন্যই বলতে গেলে নতুন। উনিও মনে হয় বেশ মজা পেয়েছেন। আলম ভাই যে কি মজাতে আছেন ( কিছু কথা থাকনা গুপন!) , সুমনদা হাওরের মাঝেই বড় হয়েছেন কিন্তু উনার ভাষ্যমতে এরকম রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা নাই। চান্দুর কথা নতুন করে বলার কিছু নাই, এ ছেলেটার মধ্যে যেনো কোন দুঃখই নাই। সজল ছেলেটা বেশ কুল টাইপ, রিমন আর তৌহিদও বেশ বিন্দাস টাইপ পাবলিক। এ বিজাতীয় টাইপ ট্যুরে বিন্দাস লোকজনই সবসময় দরকার। আর দু’একরাত থাকলে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরোদস্তুর দার্শনিক বনে যেতো এটা নিশ্চিত বলতে পারি!

একটা অসাধারণ রাত হিসেবে সারাজীবনই এটা ট্যুরটা মনে থাকবে আমার। চাঁটগার পাবলিকগুলারে বাসে তুলে দিয়ে আমি, রক্তিম আর সজল সুনামগঞ্জ শহরটা একটু ঘুরতে বের হলাম। রক্তিমের মতে, ‘মামা, বেশি মজা হইছে !’ এ কথাটা আসলে নতুন করে বলার নাই। রাত ১০ টার বাসে ঢাকার পাবলিকেরা রওনা দিয়ে দিলো আর, ‘আমি একা রইলাম ঘাটে ‘। অর্থাৎ রেস্ট হাউজে ব্যাক করলুম!

ট্যুরের গল্প শেষ। এবার ক্রেডিট দেবার পালা। আমার প্রতিটা লেখাতেই এটা থাকে। টাঙ্গুয়ার ট্রিপের পুরো ক্রেডিটটা দিবো রক্তিম আর পুসনকে। হাওরে রাতে থাকবো এটাইপ উদ্ভট আইডিয়া একমাত্র রক্তিমের মাথাতেই আসতে পারে। এ চিন্তাটাই ট্যুরের শুরু। প্রতিটা ট্যুরই কাউকে না কাউকে শুরু করতে হয় এবং আমার ধারণা একাজটাই সবচাইতে জটিল! এর পরের কাজটা হলো লোকজন জোগাড় করা। আমাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এ জিনিসটার অভাব কোন কালেই তেমন নাই। আর বাকিটা হলো কিভাবে যাবো, কোথায় থাকবো বা কিভাবে পুরো ম্যানেজমেন্ট। এটার ক্রেডিট পুসনের। ও এর আগে বেশ কয়েকবার এসছে। এধরণের রিমোট জায়গাতে ঘুরতে আসার জন্য এ টাইপ পাবলিক খুবই দরকারি। আরেকটা কথা সে একই সাথে বেশ ভালো ফটোগ্রাফার। ট্যুরের বেশিরভাগ ছবিই ওর তোলা।

এখন লিখবো সম্পূর্ণ নতুন ট্যুরিস্টদের জন্য। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ খুব সহজে আসা যায়। রাতের বাসে সুনামগঞ্জ সকালে নেমে লেগুনা কিংবা সিএনজিতে সরাসরি তাহিরপুর। তারপর বোটে উঠে সরাসরি টাঙ্গুয়ার হাওর। দু’দিন যথেস্ট এ ট্রিপের জন্য। হাতে যদি একটা দিন বাড়তি রাখতে পারেন বর্ডার এরিয়াতে আরো বেশ কিছু সুন্দর জায়গা আছে। সেগুলো কভার করতে পারেন। আমাদের সময় ছিলো না তাই পারিনি। বারিক্কার টিলা একটা জায়গা আছে জাদুকাটা নদীর উপরে। জায়গাটা অসাধারণ সুন্দর অনেকটা যাকে বলে ছবির মতোন! তার জন্য আপনাকে টেকেরঘাট আসতে হবে দেন মটরসাইকেলে যেতে হবে। টেকেরঘাটেই একটা বেশ সুন্দর সবুজ পাহাড় রয়েছে আর আছে নীলাদ্রি লেক। লাকমাছড়া একটা জায়গা আছে সিলেটের বিছনাকান্দির আরেকটা ভার্সন। সবগুলোই বর্ডারের এক একদিকে পড়েছে। বোটের মাঝির সাথে কথা বলে আপনার সময় অনুযায়ী যেকোন দিকে যেতে পারেন। এবার সিকিউরিটি নিয়ে বলি। হাওরে রাতে থাকা নিয়ে কখনো তেমন কোন সমস্যা হয়েছে শোনা যায়না। তারপরেও একদম খোলা হাওরের মাঝে থাকাটা আমি সাপোর্ট করবো না কখনোই। যেদিকেই থাকেন লোকবসতির আশেপাশে থাকার চেস্টা করাটাই ভালো। সিকিউরিটির ব্যাপারটা আরেকটু সিরিয়াস হয়ে যায় দলে যদি কোন মেয়ে সদস্য থাকে। তবে এক্ষেত্রেও কোন সমস্যা নেই। এখন অনেক ট্যুরিস্ট গ্রুপ যাচ্ছে। যাবার আগে তাহিরপুর থানাতে একটু ইনফর্ম করে যাওয়া ভালো। এতোক্ষণ বাইরের মানুষের থেকে বিপদের কথা বলছিলাম। বিপদের কারণ আপনি নিজেই হতে পারেন! এটা ভাটির দেশ। পানি আর পানি। মাথা খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক। সাঁতার জানেন বা না জানেন লাইফ জ্যাকেট রাখার চেস্টা করবেন সবসময়। হাওরে অনেক জায়গা আছে হাঁটুপানি আবার কোন জায়গা তলই পাবেন না। ভালো সঁাতার না জানলে বেশি পানিতে না নামাটাই মনে হয় বুদ্ধিমানের! কদিন আগেই নীলাদ্রি লেকে একটা ছেলে মারা গেছে লাইফ জ্যাকেট থাকা সত্তেও। সুতরাং সাবধান থাকাটাই ভালো। আসল কথা ১০ বা ১২ জন মিলে ট্যুর করতে গেলেন, কেউ পানিতে ডুবে গেলো, দায়টা আসলে সবারই! এবার বলবো সময় নিয়ে। টাঙ্গুয়ারে আপনি যেকোন সসয়ে আসতে পারেন। এ জায়গা শীতে একরকম বর্ষায় পুরো অন্যরকম। তবে হাওর ঘোরার পারফেক্ট সময়টা হোলো বর্ষা। অর্থাৎ জুন থেকে নভেম্বর। এরপর পানি শুকিয়ে যায়, তখন ক্যাম্প করে থাকতে পারেন, আমরা ছিলাম একবার এভাবে। এসময়ে , অতিথি পাখি আসে প্রচুর। যারা ছবি তুলতে ভালোবাসেন বা একদম নিজের মত করে প্রকৃতির মাঝে থাকতে চান… তাদের টাঙ্গুয়ার সবসময়ই যেনো স্বাগত জানায়। ( সবকিছু লিখে ফেলছি আসলে… আর বাকি নাই!)

নিয়ন আলোয়- এইসব দিনরাত্রি.... টাঙ্গুয়ার হাওর- Neyon Aloy

মেঘালয়ের কোল ঘেঁষা এই টাঙ্গুয়ার হাওড়ে আপনি যেতে চাইবেন বহুবার

এ ট্যুরের গল্পটা লেখার চেস্টা করেছি খুব সহজভাবে। বেশি জটিল লেখার কোন সুযোগ অবশ্য নাই কারণ ট্যুরটাই সিম্পল! সবাই হয়তো এখানে যেতে পারবে না। লেখাটা পড়ে যাতে কারো মনে হয় সে নিজে ওই জায়গাতে ছিলো! আমি গল্পটা লিখছি দু’বছর আগেকার। এরপর থেকে আমাদের প্রতিবছরের কমন ট্যুর হয়ে গেছে এটা। গত কদিন আগেও ঘুরে এসছি, নতুন কোন জায়গায় প্রথমবারের মত যাওয়া সত্যিই খুব অসাধারণ। প্রতিবছরই যাই, মজা করি কিন্তু প্রথমবারের মতোন কোনটাই যেন না। প্রথম প্রেম মানুষ নাকি কখনো ভুলতে পারে না, প্রকৃতির জন্যও বোধকরি কথাটা অনেকাংশে সত্যি!

আমাদের দেশটা আসলে অসাধারণ সুন্দর। এর একেকটা দিক একেকরকম। জিওগ্রাফিকাল ভ্যারাইটির সাথে সাথে লিঙ্গুইস্টিক একটা অসাধারণ ভেরিয়েশন আপনি সবসময় পাবেন। গল্প লিখেছি মনে হয় এ জায়গার ১% সৌন্দর্য ও আনতে পারিনি! নিজের চোখে না দেখা অব্দি কোনকিছুই পূর্ণ না। দেশ ঘুরলে দেশপ্রেম কিছুটা হলেও বাড়ে মনে হয়, এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। আসল কথা দেশটা তো আমাদের সবারই। ধন্যবাদ সবাইকে।

Most Popular

To Top