ফ্লাডলাইট

সৌম্য কি এরকম আচরণ পাওয়ার যোগ্য?

neon aloy সৌম্য নিয়ন আলোয়

আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমার প্রিয় খেলোয়াড় কে, আমি নির্দ্বিধায় বলে দিবো তামিম ইকবাল। এখনকার চমৎকার ফর্মের জন্য না, আমি তার গুণমুগ্ধ ভক্ত তার অভিষেকের পর থেকেই। তার খেলা দেখে যে আরাম পাওয়া যায়, তার আসলেই কোন তুলনা আমি দেখি না। তিনি যখন প্রায়ই লম্বা ইনিংস খেলতেন না, যখন তিনি নুডলস রান্নার টাইমার হিসেবে কাজ করতেন, যখন তাকে দেখলে মনে হতো এই আউট, কি সেই আউট হবে- তখনও আমি তামিমের গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলাম। বিরক্তি যে আসেনি এমন না, মাঝে মাঝে প্রচন্ড খারাপ লাগতো।

এখানে বলে রাখি বাংলাদেশীদের মধ্যে তামিমের পর মুশফিকের ব্যাটিং দেখে আরাম পেয়েছি খুব।

তবে এই লেখার উদ্দেশ্য আসলে সৌম্য। ২০১৫-তে যিনি তুফান-তান্ডব চালালেন, হঠাৎ করে লম্বা একটা সময় ধরে তার ছন্দপতন ঘটলো। তবে কপাল ভালো মধ্যবর্তী সময়টাতে বাংলাদেশের ওয়ানডে এবং টেস্ট ম্যাচ কম ছিলো, টি-টুয়েন্টি ছিলো বেশি। ২০১৬-তে ৪টা ওয়ানডে খেলে করেছেন ৮ গড়ে ৩২ রান। আগের বছর ৫১.৬৯ গড়ে রান করা ব্যাটসম্যানের জন্য একটু বেমানানই বটে। ২০১৬-তে ১৬টি টি-টুয়েন্টি খেলে সংগ্রহ প্রায় ১৬ গড়ে ২৫৫ রান। আনলাকি সিক্সটিন, ২০১৬-তে তিনি কোনো টেস্টই খেলেননি।

এখন সৌম্যের এই অফফর্মের যাত্রা শুরু হয়েছিলো কবে? ২০১৫-তে ইনজুরি এবং পরে বিপিএলের মানহীন উইকেটে খেলে নিজের উপর থেকে কনফিডেন্স হারিয়ে। এবং সেটা আস্তে আস্তে কাটে ২০১৬-এর শেষে আরেকটা মানহীন বিপিএলের উইকেটে খেলে। তবে আগের বারের তুলনায় সেবার মাঠটা একটু ভালো ছিলো।

এখন সৌম্যের ক্যারিয়ারের ড্যাশিং শুরু দেখে আমরা বাঙালীরা তাকে মাথায় তুলে নেচেছি, মনে আছে তো? এরপর যখন বেচারার অফফর্ম শুরু হলো, তখন প্রথম কিছুদিন ঠিক হবে-ফর্মে ফিরে আসবে বলতাম। একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে আমরা বাঙালীরা নিজেদের চিরন্তন রূপে ফিরে আসি। শুরু হয় গালাগালি। গালাগালি তো গালাগালি, আজকে একটা কমেন্ট দেখলাম সৌম্যকে হাতুড়েসিংহের শয্যাসঙ্গী ইঙ্গিত করে এক নরকের কীটের মন্তব্য, স্ক্রীনশট নিতে মনে ছিলোনা।

আচ্ছা সৌম্য কি আসলেই এসবের যোগ্য? শুধু সে কেন, পৃথিবীর কোনো প্লেয়ারই কি এসবের যোগ্য?

সে প্রশ্নের উত্তর পরে দিবেন, আগে আরেকটু কথা শুনে যান। যার কারণে সৌম্য এত গালি খেলো, তার সাথে সৌম্যের একটু তুলনা দেইঃ

মমিনুলের ২০১৫-তে ৫ টেস্টে গড় ৩৬.৮৬,
২০১৬’তে ২ টেস্টে গড় ২৩.৫০,
২০১৭’তে ৩ টেস্টে গড় ২৩।
গত তিনবছর ১০ টেস্ট খেলে ১৭ ইনিংসে ২৮.৮২ গড়ে সংগ্রহ ৪৯০ রান।

এখন সৌম্যের ব্যাপারটা দেখেন। বেচারা এই বছর মমিনুল বাদ পড়ার আগে ৪ টেস্ট খেলে (অজিদের সাথে খেলার আগে) গড় ৪৬.৭৫। ৮ ইনিংসে সংগ্রহ ৩৭৪ রান।

আমি নিজেও মানি এখনো সৌম্য টেস্ট টেম্পারমেন্ট শো করতে জানে না, টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে সে মমিনুলের মত পক্ব না। কিন্তু সে কারণেই কি সৌম্য গালি খাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়?

আচ্ছা উত্তর নাহয় আরেকটু পরে দিলেন। একটু ঘুরে আসি তামিম ইকবালের সাথে সৌম্যের তুলনায়। আরে আরে… এখনই মারতে আসবেন না, আগে একটু পড়াশুনা করে নিন!

চলুন তামিমের সাথে আমাদের ঘৃণার পাত্র সৌম্যের তুলনায় যাই।

তামিমের ক্যারিয়ারের শুরুর বছরে তার ব্যাটিং গড় ২০০৭ সালে ২১টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ২১.৬৭। এদিকে সৌম্যের অভিষেকের বছর ২০১৪-তে একটা ওয়ানডে খেলে তার গড় ছিলো ২০, পরের বছর ২০১৫-তে ১৫টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশী হিসেবে অবিশ্বাস্য ৫১.৬৯ গড়, স্ট্রাইকরেট ১০২.২৮!

তামিমের ফরম পড়তি ছিলো ২০১৪ সালে, গড় ছিলো ২৬। এর আগের বছর ৪০, এবং পরের বছর ৪৬, ৪৫ এবং ৬৯।

সৌম্যের ওয়ানডেতে পড়তি ফরম হলো ২০১৬ এবং ২০১৭-তে। এই সময়ে ১৪ ইনিংস ব্যাটিং করে ২০.৫৪ গড়ে সংগ্রহ ২৬৭ রান।
তামিমের টেস্ট অভিষেকের বছর ২০০৮ সালে ৯ টেস্ট খেলে টেস্টে গড় ছিলো ২৪.৬৩, সৌম্যের ২০১৫-তে ৩ ম্যাচ খেলে গড় ২১.৪০। ২০১৭-তে ৬ ম্যাচ খেলে ৩৯ গড়ে তামিমের সংগ্রহ ৪২৯, আর সৌম্যের সংগ্রহ ৫ ম্যাচ খেলে ৩৯.৭০ গড়ে ৩৯৭।

অস্ট্রেলিয়ার সাথে বর্তমান ম্যাচটা বাদ দিলে সৌম্যের ছিলো ৪৬.৭৫ গড়ে ৩৭৪ রান, আর তামিমের ৩২.৮০ গড়ে ৩২৮ রান।

এখন এতগুলো তুলনা দিয়ে দেখাতে পারলাম কিনা জানিনা, তবে তামিমের চেয়ে সৌম্য খুব একটা খারাপ না মনে হয়। এই দুইজন যদি ক্লিক করতে পারে, ওপেনিং জুটিতে কি হতে পারে ২০১৫-তেই দেখেছেন। সৌম্য তাই এত গালি খাওয়ার যোগ্য না, বেচারাকে একটু সময় দেয়া হোক।

neon aloy সৌম্য নিয়ন আলোয়

এ বছর বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ক্যাচ ধরেছেন সৌম্য সরকার, ৫ ম্যাচে আটটি। ছবি কৃতজ্ঞতাঃ গেটি ইমেজেস

গতকাল ক্যাচ মিসের পর তাকে আবার ধুয়ে ফেলা হচ্ছে। এটা আমরা মানতে চাই না যে আমরা ফিল্ডিং-এ একটা ইউনিট হিসেবে এখনো অনেক দুর্বল। এই দুর্বল ইউনিটের কয়েকজন সবল সেনানী হচ্ছেন আমার দেখা মতে তামিম, নাসির, সাব্বির, সৌম্য, রিয়াদ। মিরাজ আর মোসাদ্দেকের ফিল্ডিংও এক্সিলেন্ট।

আমাদের বাংলাদেশের মাটি নরম হওয়ায় বাচ্চাকাল থেকে আমরা স্লো বলে খেলে অভ্যস্ত। ছেলেবেলায় যা শেখা হয়, বড়বেলায় তা ভুলা অনেক কঠিন। স্লো-পিচের বলে ফিল্ডিং করে করে আমাদের ডিএনএ’তেই স্লো রিফ্লেক্স ঢুকে গেছে। টেস্টে স্লীপ পজিশন যে কতটা ভাইটাল এটা আমরা সবাই-ই মানি। টেস্ট ম্যাচে অধিকাংশ সময় এই জায়গাটায় উইকেট নিতে ফোর্স করেন বোলার। এমন একটা জায়গায় দক্ষ কেউ ছাড়া ভালো রেজাল্ট আশা করা যায় না। এখন আমরা বাঙালীদের তো গোড়াতেই সমস্যা। স্লীপে ক্যাচ ধরার অভ্যাস আগে থেকেই নেই!

এখন আমরা যারা আজকে সৌম্যের ক্যাচ মিস দেখে তাকে গালি দিচ্ছি, তারাই ইংল্যান্ডের সাথে তৃতীয় ওয়ানডে’তে ইমরুল কায়েসের স্লীপে ক্যাচ মিস দেখে তাকেও গালি দিয়েছিলাম, ম্যাচটাও ওখানে হেরে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছে?

আমাদের স্লীপ ফিল্ডাররা কঠিন ক্যাচ নেওয়া দূরে থাক, হাতের মুঠোয় আসা সহজ ক্যাচগুলো-ও ফেলে দেয়। তো এই যখন আমাদের স্লীপের অবস্থা, আপনাদের কি মনে হয় ওখানে কেউ ইচ্ছা করে দাঁড়ায়? এর উপর যখন বাঙালীদের মত একট ফ্যানবেজ আছে; তখন স্লীপ তো দূরে থাক, মাঠে নামতেও জান হাতে নিয়ে মাঠে নামা লাগে। অথচ সমর্থকদের রিএকশন দেখলে মনে হয় আমাদের স্লীপ ফিল্ডাররা হলো গলির ক্রিকেটের বড়ভাই, যে নিজের ইচ্ছাতে কম পরিশ্রম করার জন্য এ জায়গাটাতে এসে দাঁড়ায়। তাকে কে কি বলবে?

অথচ সত্য হলো আমাদের টিমে এমন প্লেয়ার নাই যে স্লীপে ক্যাচ নেয়ার গ্যারান্টি দিবে, অন্তত সহজ ক্যাচগুলো মিস না করার মত ভরসা দিবে। বিশ্বসেরা সাকিব এবং দেশসেরা তামিমও না। সৌম্য সেখানে তুলনামূলকভাবে যথেষ্ট ভাল ফিল্ডিং করে। আপনি কি জানেন এ বছর বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ক্যাচ কে ধরেছেন? সৌম্য সরকার, ৫ ম্যাচে আটটা। হয়তো অনেকগুলো মিসও করেছে। শুধু সৌম্য বলেই এই পজিশনে সে অল্প মিস করেছে। আর কেউ হলে কি হতো?

সোজা বাংলায়, সৌম্য’র জায়গায় অন্য কেউ হলে তারও অনেক ক্যাচ মিস হতো, ফলে মুখের ভাষায়ই তাকে ‘খেয়ে ছেড়ে দিতেন’ আপনারা।
এখন আপনারাই বলুন তো, সৌম্য সরকার কি আসলেই এ ধরনের আচরণের যোগ্য?

এতবড় লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি পরবর্তীতে আর কোন প্লেয়ারকে গালি দিবেন না। কোনো প্লেয়ারই কষ্ট করে আপনাদের মুখের বাণী অমৃত শুনতে মাঠে নামে না, জানটা তারা এমনি-এমনি দিয়ে দিতে চায় না মাঠে। তারা আমার-আপনার চেয়ে দেশটাকে কম ভালোবাসে না। হারলে তাদেরও খারাপ লাগে। বাজে খেললে আপনার যতটুকু খারাপ লাগে, তারচেয়ে অনেক গুণ বেশি খারাপ লাগা বিরাজ করে এদের মধ্যে। দয়া করা তাদের গালি দিবেন না। এরা এসবের যোগ্য না, এরা এসবের জন্য না।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top