নাগরিক কথা

আরেকটি ধর্ষণ আর আমাদের মরে যাওয়া মানবিকতা

neon aloy আইয়ামে জাহেলিয়াত নিয়ন আলোয়

সন্ধ্যা হয়-হয় সময় এখন, সারাদিন কাজ শেষে বাড়ী ফিরছি। মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে আছে।

এই প্রান্তিক সন্ধ্যায় এমনিতেই মনটা এক ধরনের দ্রবীভুত অবস্থায় থাকে। না, আজ সেই কারণে মন খারাপ না। সামার শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই কারণেও না, গাছেদের পাতা ঝরা শুরু হয়ে গিয়েছে – এমনকি তার জন্যও না!

কাজ শেষে ফেসবুক খুলতেই আজকের ধর্ষণের খবরটা চোখে পড়লো।
ইস, কি অসহায় – মর্মান্তিক আর করুণ মৃত্যু!
আমার মনটা খারাপ হয়ে আছে, অসম্ভব খারাপ – শুধু সেই কারণে।

বিভিন্নভাবে নিজেকে বোঝাতে চাচ্ছি, এতে আমার কোন দোষ নেই, সেই মেয়েটিকে আমি চিনিনা – জানিনা, আর দেশে এমন ধর্ষণ-হত্যা প্রতিদিন অহরহ হচ্ছে আর হবেও। সবগুলো নিয়ে এমন মন খারাপ করলে তো বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে যাবে!

কিন্তু তারপরও মন খারাপ হয়েই থাকে, গলার কাছে কষ্টরা জমে থাকে, বুকটা পাথরের মতো ভারী হয়ে থাকে।

আমার ছোট বোনটা যে বাড়ি গেলে একা একা সেই পথটা দিয়েই যায়, সেটা ভেবে আমি ভীত হয়েই থাকি!

আমি ক্ষুব্ধ হতে থাকি, যখন মনে হয় এদেশে এক ভাস্কর্য কোথায় থাকবে না থাকবে সেটা ফয়সালার জন্য হাজার-হাজার মানুষ তরবারি নিয়ে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকে, অথচ একটি জলজ্যান্ত মানুষ এভাবে খুন হয়ে যাওয়ার পরেও অন্তত তার বিচার চেয়েও টু শব্দটি এরা করেনা।
আমার মুখের ভিতরে থুতু জমা হয় এদের জন্য।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে থাকি বিরোধী দলের অবস্থানে থাকা মানুষদের দেখে! কেউ বলেনা এমন হত্যা ধর্ষণের বিচার না হলে রাজপথ ছাড়বোনা, কিন্তু এদের দলীয় চোর-ছ্যাঁচড়া নেতাদের কিছু হলে ঘরে ঘরে আগুন জ্বালানোর হুমকি শুনতে পাই! এরা ব্যস্ত থাকে এমন ঘটনাকে শুধু আরেকটি রাজনৈতিক চাল হিসাবে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার ধান্ধায়।

শুধুমাত্র সংবাদপত্রের হিসাবে অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি ২৪ ঘন্টায় গড়ে ৩ জন নারী ধর্ষিত হয়। সারাদেশের কয়টা খবরই বা আর খবরের কাগজে আসে? আমি নিশ্চিত আসল সংখ্যা আরো ভয়াবহ।

আমি ক্ষুব্ধ-অসহায়-স্তব্ধ হয়ে থাকি যখন মনে হয় এই পরিসংখ্যান আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনপ্রণেতা আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার লোকজন আমার চেয়ে অনেক ভালো এবং বিশদভাবে জানেন। কিন্তু তারা ভবিষ্যতে এগুলো প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা তো নেনই না, এমনকি এর জন্য তারা অনুতপ্তও বোধ করেন না! এরা শুধু ব্যস্ত থাকেন কি কি উন্নয়ন করে ফেলেছেন তার হিসাব দিতে। এরা প্রদীপের আলোর দিকেই শুধু তাকিয়ে থাকেন, এর নীচের বিশাল অন্ধকারগুলো কি অবলীলায়ই না এড়িয়ে যান! এরা ভুলে যান শুধু জিপিএ’র সংখ্যা বাড়ালে, ফ্লাইওভার আর সেতু বানালেই জাতি উন্নত হয়ে যায় না! কোন দেশের বিচার ব্যবস্থায় যদি এতবড় ছিদ্র থাকে- সেই জাতি কেবলমাত্র কথাতেই বড় হবে, কাজে নয়। সত্যিকারের উন্নতি তো অনেক দূরের কথা!

যেই দেশের বিচার ব্যবস্থা এমন সব ভয়াবহ হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারেনা, সেখানে বলা চলে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় স্পন্সরশীপেই এইসব ধর্ষণ-হত্যা ঘটে। আগের ঘটনাগুলোর বিচার হলে, বাজী ধরে বলতে পারি এমন ঘটনার সংখ্যা অনেক কম হতো। আচ্ছা, কেউ কি বলতে পারেন সবশেষ কবে একটা ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড হয়েছিল বাংলাদেশে?

তাই এই বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত থাকা কেউই এই হত্যাকান্ডের দায় এড়াতে পারেন না।

আমার প্রতিবাদ করার অক্ষমতায় নিজেকে তাই দোষী মনে হয়, দোষী মনে হয় বারবার একই ধরনের ঘটনাগুলো দেখে শুনেও না দেখার, না শোনার ভান করে থাকার জন্য!

আমার ভাবতে লজ্জা করে, সে ভুখন্ডের মানুষদের নিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আমি গর্ববোধ করি – কেউ খারাপ কিছু বললে তর্কে লিপ্ত হই। অথচ কি ভয়ংকর মানুষ এরা, কি নির্লিপ্ততা এদের!

আমি বুকের মধ্যে চেপে বসা কষ্ট নিয়ে, আবার একটি ধর্ষণ-হত্যাকান্ডের খবর দেখার ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখি…
২৯/৮/২০১৭।

[আরো পড়ুনঃ ফিরে এসো আইয়ামে জাহেলিয়াত]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top