গল্প-সল্প

সুখ-লজ্জা

সুখ-লজ্জা

সলিম উদ্দিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক। শুধুমাত্র তাকিয়ে থাকে বলা যায় না, নিষ্পলক দৃষ্টির পিছনের কোটরে আরো নানান সব ছবি তার শত অনিচ্ছা স্বর্তেও শব্দ আর গতি সমেত বেসামাল চালু থাকে। মাথার উপর গনগনে সূর্যের অটল অসহ্যকর উপস্থিতি চোখে খানিকটা অন্ধত্ব দানে ব্যস্ত, দৃষ্টির পেছনের কোটরে নির্লজ্জ ছবি সব একই সাথে পাল্লা দিয়ে আরো নগ্ন হওয়ার পাঁয়তারা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে মস্তিস্কের বেয়ারা ভিডিওগ্রাফির অনবরত প্রদর্শনী তার জীবন ও জীবিকার জন্য সুখকর হওয়ার কথা না, পুরোপুরি ওয়াকিবহল সে এই ব্যাপারে, তারপরও এই প্রদর্শনী ঠেকানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না। সকালে বেলা করে ঘুম থেকে উঠার মুহূর্তটা বিরক্তিকর আনন্দদায়ক। ছোট বোনটা দশটা বাজলেই লুঙি ধরে টানাটানি শুরু করে, আর সলিম উদ্দিন তখন কাঁথা টেনে সারা শরীরে পেঁচিয়ে লুঙির আশা ছেড়ে দিয়ে আরো গভীর ঘুমের প্রস্তুতি নেয়। বোনটা তার নাছোড়বান্দা, লুঙি ছেড়ে একটু বাদেই কাঁথার উপর হামলে পড়ে। প্রাত্যহিক সকালের এই দৃশ্য সলিম উদ্দিনের দৃষ্টিতে এখন আরো পরিষ্কার, একজোড়া চোখ স্বাতন্ত্র্য লাভ করে সারা বাড়ি চষে বেড়ায়। চোখ জোড়া এদিক সেদিক বেড়িয়ে ঠিক বুড়া বাপের টাক মাথার উপর নিবদ্ধ। বুড়া বাপ এক নাগাড়ে সলিম উদ্দিনের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে যায়, “নওয়াবের পো নওয়াব। আইজকা যদি মইরা যাই, হোগাটা দিয়া কুনুখানে বওনের হুঁশ থাকব না। মাইনসের লাত্থিতে ঐ হোগা দম ফালাইবার সুযোগ পাইব না”। বুড়া বাপের টাক রীতিমত একটা আতঙ্কের বস্তু ঠেকে সলিম উদ্দিনের চোখে। এই টাকের সাথে সাদৃশ্য রেখে তার মাথাতেও একই পদ্ধতির মহা রূপরেখা বাস্তবায়ন চালু থাকে। টাকের সাদৃশ্য তাকে যতটুকু বিচলিত করে, বাপের পদাঙ্ক অনুসরণে প্রায় একই রকম অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সাদৃশ্য ততটুকু বিচলিত করে না। টাকা ছাড়া থাকা যায়, কিন্তু টাকের সহচার্য বড্ড মুশকিল। ছোট বোনটা পত্রিকায় পেঁয়াজ রেসিপিতে উৎসাহী হয়ে একগাদা পেঁয়াজ বাটা সলিম উদ্দিনের মাথায় মেখে দেয় নিয়ম করে, টাকের পাশাপাশি কাঁচা পেয়াজের উৎকট গন্ধ বোনাস হিসেবে জুটে।

বাপের টাকের উপর থেকে ভাসমান এক জোড়া বিরাগ চোখ উড়াল দিয়ে চলে যায় রান্না ঘরে। ভদ্রমহিলা তার ঘষা মাজাতে মত্ত কপাল কুঁচকে, ঘ্যানঘ্যান করে অনবরত। তাকে যদি বন্দুকের নলার মুখে প্রশ্ন করা হয়, “কোটি টাকা আর ঘ্যানঘ্যান, দুটোর মধ্যে আপনি কোনটা বেছে নিবেন?” ভদ্রমহিলা নিশ্চিত ঘ্যানঘ্যান বেছে নিবে। কোটি টাকার বদৌলতে তার গায়ে স্বচ্ছলতার মেদ জমবে ঠিক, কিন্তু একগাদা অভিযোগ তার বেঁচে থাকার প্রধান জ্বালানী। বারমাসি মৃদু অভাবের ছাপ শরীরে পরিষ্কার, পয়সাকড়ি আর একটু বেশি হলে গায়ের কাপড়টা অল্প পুরানো হতে পারত, ইমিটেইশনের পরিবর্তে একটু স্বর্ণের ছোঁয়া হাত জোড়া পেতে পারত। অভাবটা তাই ঠিক শরীরে না, লেবাসে। কিন্তু লেবাসের দারিদ্র্য শরীর ছেড়ে কথা কয় না, মুখে তার অধিক দলনে কালচে মলিন হয়ে যাওয়া আটার দলা আবাস করে।

ফকফকা আকাশ থেকে কিছু পাখায় আরো জোর নিয়ে তেড়ে আসে সলিম উদ্দিনের দিকে। নিষ্পলক দৃষ্টির কোটরের পেছনে যে বিচ্ছিন্ন প্রদর্শনী জারি থাকে তা তাৎক্ষনিক স্থগিত হওয়া দরকার, অথচ সলিম উদ্দিন হাতের আঙ্গুলটা পর্যন্ত নড়াতে পারে না। চারপাশের কোলাহোল তার কান পর্যন্ত পৌছুবার আগেই দম হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আর জিনিসটার গতি উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে। আজ সকালটাও অন্যান্য দিনের মত শুরু হয়। বেলা করে ঘুম থেকে উঠে কোনরকমে কুলি করে চায়ে রুটি চুবিয়ে আধাটা সলিমউদ্দিন খায়, বাকি আধা খাওয়ার আগেই বাসার সামনে গুটিকয় লোক ডাকাডাকি শুরু করে। সে এগিয়ে যায়, “শিমুলতলীর কিছু পোলাপাইন আমাগো খালেকরে পিটাইছে, সবাই প্রিপারেশন লইতাছে, তোমারো আওন লাগব”। খুবই নিয়মিত ব্যাপার, এক পাড়ার সাথে অন্য পাড়ার ঝামেলা হলে, কিশোর, জওয়ান আর মাঝবয়সীদের অংশগ্রহণ ফরজ, এর অন্যথা হবার উপায় নাই। সলিম উদ্দিন গায়ে শার্ট দিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। পুরো এলাকা থমথমে, রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ। ধাওয়া, পাল্টা-ধাওয়া চলে নিয়মিত ছন্দে, একই চক্রে তারা একে অপরকে কোণঠাসা করে অল্প কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটতে বাধ্য করে। একটু সময় জিরিয়ে নিয়ে পিছু হটা দল অপরপক্ষকে আবার কোণঠাসা করে। এই ছন্দ অবশ্য বেশিক্ষণ চলতে পারে না। হঠাৎ গুলির শব্দে সলিম উদ্দিনের দুই পক্ষ উল্টো দিকে দৌড়াতে থাকে। গুলির শব্দের সাথে সাথে সলিম উদ্দিন তার পাশেই লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রহমত সরকারকে নগদে লুটিয়ে পড়তে দেখে। খুলির ভিতরের থকথকে বস্তুর অনেকটা রক্তে মাখা মাখা হয়ে এদিক সেদিক ছড়িয়ে থাকে, আর তখনই হয়ত গরুর মগজের চমৎকার কোন রেসিপিতে কেউ কবজি ডুবিয়ে দুপুরের সুস্বাদু খাবার সেড়ে একটু আয়েশ করে সিয়াস্তায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, অথচ অবিশ্রাম পৃথিবী রহমত সরকারের কাছ থেকে নিজেকে আচমকা নির্লজ্জভাবে গুটিয়ে নেয়।

সলিমউদ্দিন আকশে তাকিয়েই থাকে নিষ্পলক অবশ, তা নিষ্কম্পা সূর্যের কারসাজিও হতে পারে, ঠিক বুঝা যায় না। মৃত্যু তার কানের পাশ দিয়েই গেল যেন। রহমত সরকারের নগদ মৃতুটাও ঠিক মৃত্যু বলা যায় না, কোন মর্যাদা নাই তাতে। এধরনের মর্যাদাহীন মৃত্যুর সাক্ষী সলিম উদ্দিন আগেও হয়। প্রথমত, রহমত সরকার মৃত্যুর প্রস্তুতি রাখে নাই, মৃত্যুর মধ্যে আড়ম্বরতা না থাকলে সেটাকে ঠিক মৃত্যু বলতে সলিম উদ্দিন নারাজ। কিছুটা নেকি কামকাজ করলে অথবা মৃত্যুর পূর্বে এলাকার মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে তওবা পাঠ করে নিলে রহমত সরকারের মৃত্যু এতোটা অনাড়ম্বর হতো না, ন্যুনতম একটা প্রস্তুতি নিয়ে অপর পাড়ে যাত্রা করতে পারত। দ্বিতীয়ত, রহমত সরকারের লাশ নিয়া একটা টানা হ্যাচড়া দুই তিনদিন চলবে, অমুকের বিচার চাই, তমুকের ফাঁসি চাই। তারপর কয়েকটা বান্ডেল কয়েকজনের পকেটে নিঃশ্বাস ফেলবে, একটা সামাজিক সমাধান দুই পাড়ার মধ্যাকার উত্তেজনা রাতারাতি প্রশমন করে ফেলবে। সলিমউদ্দিনের দৃষ্টির পিছনের কোটর বাসার সীমানা অতিক্রম করে আগামী দুইদিনের দৃশ্য অগ্রীম প্রত্যক্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তার শরীরে সম্বিৎ ফিরে আসে না।

সলিম উদ্দিনের গলায় বড্ড তেষ্টা, পুরো এক কলস বরফ ঠান্ডা পানিতেও তা মিটবে না বোধ হয়। পাশ থেকে কেউ একজন নিষেধ করে পানি দিতে। এমন হারামি মানুষ হয় নাকি? জিভ শুকিয়ে শিরিষ কাগজ হয়ে আছে, আর সেই শিরিষ কাগজ শুষে একটু লালা বের করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টায় সে চুক চুক শব্দ করে। কেউ যেন এক দু ফোটা পানি তার মুখে দেয়, তার তেষ্টা তাতে আরো বেড়ে বহতা নদীতে ডুবে পানি খেয়ে ফুলেফেপে মরার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে। সাত সকালে বিড়ালের ডাকাডাকিতে সলিম উদ্দিনের বিরক্তির সীমা থাকে না, কানের ভিতরে ঢুকে একটা বিড়াল আয়েশ করে বসে, তার বাসায় তো কোন বিড়াল নাই। বিড়ালের অযাচিত অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে চোখ মেলে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে সলিম উদ্দিন, মাথার পাশ ঘেষে আরাম করে বসে নাদুস নুদুস এক বিড়াল, মাথার ভিতর স্পন্দিত ভোতা ব্যাথার একটা রেশ কেটেও কাটে না যেন। মলিন দুখী সস্তা পুতুল বুকে আকড়ে একটা মেয়ে এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়ায়। পাশের বিছানায় সুখী চেহারার রোগী প্লেট থেকে আপেলের টুকরো মুখে পুড়ে আরো কয়টা দিন হাসপাতালে কাটিয়ে দেয়ার ইচ্ছায় মজে। কাছেই আরেকটা বিছানায় যমদূতের সাথে চূড়ান্ত সাক্ষাতের অপেক্ষায় নির্বিকার শুয়ে থাকে কেউ, আত্মাটা তার মরেই গেছে হয়ত, শরীর তবু তাকে ছাড়তে চায় না। কেউ ব্যাথায় কুঁকড়ে যায়, কেউ বা আজকেই সুস্থ ফিরে যাবার আনন্দে মনে মনে ছক কাটে, কেউ কেউ ব্যান্ডেজে হাত বুলিয়ে নকশা তৈরী করে প্রতিশোধের। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় এসে দর্শনার্থীদের বেড়িয়ে যেতে বলে, ডাক্তার আসার আগেই পুরো ওয়ার্ডে রোগী আর তার বিছানার চারপাশে কিলবিল করা পোকা মাকড় ছাড়া আর একটা প্রাণীর উপস্থিতি কাম্য না। ব্যতিব্যস্ত ইন্টার্ন ডাক্তারেরা এক বিছানা থেকে আরেক বিছানায় ছুটে চলে, প্রত্যেক গ্রুপের ভিজিটের জন্য বিছানার নাম্বারগুলা ভাগ করে দেয়া। একদল হবু ডাক্তারের প্রশ্ন বানে কোন কোন রোগী হয়ত বিহ্বল, কেউ কেউ এই ভেবে সুখ পায় যে তার কেইসটা হয়ত জটিল, ফিরে গিয়ে রসালোভাবে সবার কাছে অসুখের গল্প বলা যাবে। ওয়ার্ডবয়ের ধমকে দর্শনার্থীরা বিদায় নিলেও সলিম উদ্দিনের মাথার পাশ ঘেষে বসে থাকা বিড়ালের তাতে কোন বিকার আসে না, আয়েশ করে মাথার পাশে বসে থাকাটাই যেন তার জন্য স্বাভাবিক। “মাথা ফাটল কিভাবে?” “ব্যাথা করে এখন?” “বমি, বমি ভাব হয়?” “ক্লান্তি লাগে?” “চোখে সব কিছু পরিষ্কার দেখতে পান তো?” “দেখি, এদিকে তাকান।” সব প্রশ্নের ঠিক ঠিক জবাব দিয়ে সলিম উদ্দিন ঘুমে ঢলে পড়ে।

সলিম উদ্দিনের শীত লাগে খুব, একটা কম্বল হলে টেনে গায়ে জড়িয়ে নিলে একটু আয়েশ করে ঘুমানো যেত। কম্বল খুঁজতে সে যখন চোখ মেলে দেখে যে হাসপাতালে তার আশেপাশের বিছানায় একটা মানুষও নাই, ভয়াবহ কোন মহামারী সকলকে সাফ করে ভুল করে বোধ হয় তাকেই রেখে যায়। তাছাড়া আকাশের মেঘেরা শোক যাপন করতে কুয়াশা হয়ে হাসপাতালে অনুপ্রবেশ করে তার চারপাশটা আচ্ছন্ন করে রাখে। সলিম উদ্দিন সফেদ বিছানা ছেড়ে উঠে, তার শীত শীত লাগে। নাহ, ওয়ার্ডে সে একা না, সকালের নাদুস নুদুস বিড়ালটা শান্ত পায়চারী করে চলছে। পায়চারী করতে করতে বিড়ালটা তার কাছ থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাকে যেন বলে অনুসরণ করতে। সে বিড়ালের পিছন পিছন হাটে। বিড়ালের পিছন যেতে যেতে সলিম উদ্দিন দেখে পুরো হাসপাতালেই কোন দোপেয়ের চিহ্ন নাই, নানান জায়গায় উচ্ছিষ্ট খাবারে পুঁজের মত হলদেটে সাদা পোকা কিলবিল করছে। কুয়াশা ভেদ করে বিড়ালটাকে অনুসরণ করে সে ফ্লোরের একদম শেষ মাথায় গিয়ে হাজির। শেষ মাথার রুমটার এক কোণায় কাউকে বসে থাকতে দেখে তার বুকে কিছুটা বল ফিরে আসে, আদৌ যদি কোন এপোক্যালিপ্স ঘটে থাকে সে তার একমাত্র সার্ভাইভার না, ব্যাপারটা স্বস্তিদায়ক। একটুখানি স্বস্তি হাতে সে লোকটার দিকে এগিয়ে যায়।

– ভাই, ও ভাই। হাসপাতালের আর মানুষগুলা গেলো কই?
কোন সাড়া শব্দ নাই। লোকটা হাটুতে মাথা গুজে থাকে।
– ভাই, শরীর কি বেশি খারাপ? ডাক্তার ডাকুম?
কোন সাড়া শব্দ না করে লোকটা সলিম উদ্দিনের দিকে তাকায়। সলিম উদ্দিনের তখন কলজে শুকিয়ে যায়। রক্তশূন্য মুখে কপালে একটা ফুটো সমেত রহমত সরকার ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সলিম উদ্দিন অবশ হয়ে যায়।
– সলিম, তোমারে দেইখা খুব ভালো লাগল। হালার কোন কাকপক্ষীর দেখা পাই না কতদিন। একলা একলা কতক্ষণ ভালো লাগে কও। ক্লান্ত হইয়া ভাবলাম একটু ঝিমানি দিয়া লই। মাগার দেখি যে ঝিমানি আসে না, মাথার ফুটা দিয়া সব বাইর হইয়া গেছে, এই দেখ, ভিতরে কিছু থাকলে তো ঝিমানি আইত।
রহমত সরকারের হাত ভর্তি রক্তাক্ত মগজ দেখে সলিম উদ্দিনের বমি আসে। নিজকে কোন রকমে সে সামলে নেয়।
– রহমত ভাই, আপনে না মইরা গেছেন!
– আমি মইরা গেছি তোমারে কেডায় কইল? আর যদি মইরা যাই তাইলে আমারে দেখতেছ কেমনে?
– এইটা স্বপ্ন হইতে পারে।
– হা হইতে পারে স্বপ্ন। এমনো হইতে পারে আমি তোমারে স্বপ্নে দেখতাছি। আর তোমার মরা শরীরটা মর্গে পইরা আছে। খেয়াল কইরা দেখ। তোমার কপালে একটা ফুটা।

সলিম উদ্দিন তার কপাল হাতড়ে তীব্র আতঙ্কে ছিটকে পড়ে। আর সাথে সাথে ধড়ফড় বুকে সলিম উদ্দিনের ঘুম ভাঙে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর মোটামুটি সবকিছুই ঠিকঠাক, ঝামেলা বলতে এই যে উদ্ভট এই স্বপ্ন সলিম উদ্দিনের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বপ্নের মাঝে ঘুম ভাঙার পর বাকি রাত ঘুমানো তার পক্ষে অসম্ভব।

বাজার থেকে এক হালি কবুতরের বাচ্চা কিনে এনে রান্না ঘরে রেখে সলিম উদ্দিনের টেকো বাপ বলে, “পোলারে কবুতরের গোশত ঝোল ঝোল কইরা রাইন্ধা খাইতে দেও। কবুতর খাইলে গতরে রক্ত আসে, উৎকৃষ্ট পথ্য। জান ফেরত লইয়া যে বাইচা আইছে, আলহামদুলিল্লাহ্‌। তিনিই সবকিছুর ফয়সালাকারী। দুই রাকাত শোকরানা নামাজ আদায় করতে ভুইলো না জানি।” হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর সলিম উদ্দিনের জন্য খাতির যত্নের অভাব হয় না। মায়ের হাতের রান্নার স্বাদও দ্বিগুণ, ছোট বোনটাও সকালে এসে ত্যাক্ত করে না। ফল-ফলাদি সাজানো একটা ট্রে তার বিছানার পাশেই থাকে সারাক্ষণ। বেদানা ভেঙে তার মা মুখের সামনে ধরে বলে, “প্রত্যেক কোয়াতে এক ফোঁটা রক্ত, খাইতে থাক।” রক্তে ভরপুর বেদানা সলিম উদ্দিনের কস্মিনকালেও পছন্দ ছিল না, তারপরও গিলতে হয়।

সপ্তাহ না ঘুরতেই আয়েশের চর্বিতে ভাটা নামে সলিম উদ্দিনের, বাপ তার দুপুরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “নওয়াবের পোলার তো মনে হয় খাটের লগে বাসর শেষ হইব না, তারে কেউ কও গতর ঝাড়া দিয়া উঠতে।” এই দুপুর বেলায় সলিম উদ্দিনের মাথাটাই বিগড়ে যায়। সে সাধারণত সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বাপের মুখোমুখি না হতে, দেখা হলেই উল্টা পাল্টা কিছু একটা বকবেই, বাপের মাথাটা গেছেই বোধ হয়। সারাদিন শুয়ে বসে থেকে তার শরীরটাও কেমন জানি ম্যাজম্যাজ করে, একটু হাওয়া বাতাস গায়ে না মাখালে আর হচ্ছে না। বিছানা ছেড়ে কোনরকমে হাতমুখ ধুয়ে সে ঘর থেকে বের হয়।

ক্ষুধার্ত পেটে আল রাহমানিয়া হোটেলে গোগ্রাসে ভুনা খিচুড়ি চালান দিয়ে চমৎকার এক গ্লাস লাবাং ঢকঢক গিলে সলিম উদ্দিন রাস্তায় নামে। দুপুর বেলা এ দিকটায় মানুষজনের চলাফেরা একটু বেশিই থাকে, আশপাশের বাজার থেকে ট্রাক ড্রাইভার, হেলপার, কুলি, মজুরেরা দুপুরের পেট পূজা দিতে আল রাহমানিয়ায় ভিড় জমায়। সস্তায় এতো ভালো খাবার শহরের আর কোথাও জুটবে না। সে হাটে, সরু রাস্তার একপাশে সারি সারি আড়ৎ আর অপর পাশে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া খাল। বেখায়ালি সলিম উদ্দিনের প্রায় শরীর ঘেঁষে যখন একটা সাইকেল ছুটে যায়, আর পিছন ফিরে সে যখনই সাইকেল আরোহীর মাতৃ সম্বন্ধীয় কোন গালি উচ্চারণ করতে যাবে অসহ্য সূর্যের দিকে চোখ পড়তেই সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। চোখে তার অসম্ভব যন্ত্রণা হয় তারপরও তাকিয়ে থাকে।

এমন ভরদুপুরে খটমটে মেজাজ নিয়ে লোকজন তখন হয়ত একটুখানি পাখার নিচে কাপড় ঢিলে করে বসার সুযোগ খোঁজে, কিন্তু আসমানের দিকে সলিম উদ্দিনের স্থির নিবদ্ধ দৃষ্টির প্রতি উৎসাহী হয়ে স্ব স্ব কর্মের প্রতি ধাবমান লোকেরা অনিচ্ছাকৃত বিরতি নিয়ে হলেও আকাশের দিকে তাকায় আদৌ কিছু দেখা যাবে বলে। তপ্ত সূর্য ছাড়া আর কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশ ও বিরক্ত বদনে তারা আবার স্ব স্ব কর্মের প্রতি ধাবিত হয়। তপ্ত আকাশে সলিম উদ্দিন নানান রঙের দ্যোতনার যুগপৎ অবস্থান দেখে বিস্মিত হয় এই ভেবে যে সে ছাড়া আর কেউই তা দেখতে পায় না, প্রতি মুহূর্তে সূর্যের দহন তার চোখে ভিন্নভাবে হাজির। সাথে সাথে তার দৃষ্টির পিছনের কোটরে লক্ষ বছরের ইতিহাস যুগপৎ প্রদর্শনী চালু থাকে, হাজার হাজার বছর আগে কোথাও নিয়েন্ডার্থেলদের উপর জ্ঞানী মানুষের গজব, আটলান্টিক মহাসাগরে জাহাজে শিকলে আবদ্ধ হাড় জিরজিরে কালো মানুষেরা, ব্রিটিশ ব্লুমফন্টেইন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে কংকালসার শিশু লিযি ভান জ্যাল, দূর্ভিক্ষে কোন নারীর শুকিয়ে যাওয়া স্তন, সাইবেরিয়ার তুষার, কালাহারি মরুভূমি, হেরা গুহায় হযরতের ধ্যান অথবা কোন এক রাতে বুদ্ধার নীরব প্রস্থান। এমন কিছু বাকি থাকে না যে সলিম উদ্দিনের দৃষ্টির পিছনের কোটরে উপস্থিত হয় না। যুগপৎ প্রদর্শনি সব থমকে যায় ঠিক ঐ মুহূর্তটায় যখন সলিম উদ্দিন তার পাশেই রহমত সরকারকে লুটিয়ে পড়তে দেখে। শত শত পা দিকবিদিক ছুটে শঙ্কিত আর রহমত সরকারের নিথর শরীর তার নিচে পিষ্ট হয়ে পৃথিবীর আভরণ হয়ে শোভা বৃদ্ধি করে। খুলি থেকে ছিটকে বের হয়ে আসা তার রক্তে মাখা মাখা নাজুক মগজের দলা এখানে সেখানে ছড়ানো ছিটানো ভাষাহীন বর্বরের মত কাঁপে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাজুক মগজের দলা সকল ক্ষুধার্ত রাস্তার উদরে বিলীন হয়ে তার পেশীকে আরেকটু উঁচু ও স্ফীত করে। ঠিক তখনই সলিম উদ্দিন দেখে যে এক লহমার জন্য তার চোখে অসম্ভব সুখ খেলা করে। আর পরক্ষণেই রহমত সরকারের নিষ্পলক স্থির রক্তাক্ত চাহনি নজরের সীমায় আসতেই লজ্জায় তার গাল টকটকে রক্তাভ বর্ণ ধারণ করে।

Most Popular

To Top