ইতিহাস

কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

নিয়ন আলোয়- কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

“কনফেডারেশন” শব্দটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারও কাছে স্বর্গের মত আবার কারও কাছে নরকের চেয়েও খারাপ। এখন কথা হচ্ছে, কেন আমি কনফেডারেশন কথাটা বললাম? কি এমন বিষয় এখানে লুকায়িত আছে যার জন্য দেশটির মানুষ আজও দু’ভাগে বিভক্ত? সেটা জানার জন্য চলুন প্রায় ১৫০ বছর আগে চলে যাই।

যুক্তরাষ্ট্র এক সময় আমাদের মতই ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিল। অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছরের যুদ্ধের পর ১৭৮৩ সালে তারা স্বাধীনতা লাভ করে। এর প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৬১ সালে দেশটির উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মধ্যে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের অন্যতম কারণটি ছিল ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ। ১৮৫০ সালে তুলা চাষ করে দক্ষিণের রাজ্যগুলি অর্থনীতিতে বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠে। মানব পাচারকারীরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দাসদের নিয়ে আসত এবং ওইসব এলাকায় বিক্রি করত। দাসদের সাথে দক্ষিণের রাজ্যগুলো এমন কোন জঘন্যতম কাজ নেই যে করত না। জোরপূর্বক ও বেশি সময় কাজ করানো, ধর্ষণ-নির্যাতন, এমনকি হত্যাও করত অনায়াসে কেননা দাসদের ‘মানুষ’ বলে গণ্য করা হতো না, বরং মালিকের ঘোড়া কিংবা বাসার আসবাবপত্রের মতই যেভাবে খুশি ব্যবহার করা যেত তাদের।

নিয়ন আলোয়- কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

দাসদের উপর নির্মম অত্যাচারের নমুনা

আর যেহেতু দাসদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না, তাই তাদের যখন খুশি মেরে ফেলাটাও সমাজে দোষ হিসাবে ধরা হতো না বরং দাসের মালিককে সম্মানও করতো অনেকে। অন্যদিকে উত্তরের রাজ্যগুলো এই দাসপ্রথার বিরোধী ছিল। তারা চাচ্ছিল এই বর্বর প্রথা যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। কারণ এটা সংবিধান ও মানবাধিকার বিরোধী। তখন দক্ষিণের রাজ্যগুলো এই দাসপ্রথা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। ফলে দাসপ্রথা প্রশ্নে উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলির মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি ব্যাপটিস্ট, মেথডিস্ট, এবং প্রেসবিটারিয়ান খ্রিষ্টান গির্জাগুলিও দাসপ্রথা প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে যায়। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হয়েই দাসপ্রথার বিস্তার রোধ করার ব্যবস্থা নেন। যার ফলে ১৮৬১ সালে দক্ষিণের সাতটি রাজ্য- সাউথ ক্যারোলিনা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা, আলাবামা, জর্জিয়া, লুইজিয়ানা এবং টেক্সাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে কনফেডারেট স্টেটস অফ আমেরিকা নামে নতুন একটা রাষ্ট্র গঠন করে।

নিয়ন আলোয়- কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

আমেরিকান গৃহযুদ্ধ চলাকালীন একটি ছবি

কিছু দিন পরেই ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল কনফেডারেট বাহিনী কর্তৃক সাউথ ক্যারোলিনার চার্লসটনে অবস্থিত সামটার দুর্গ আক্রমণের মাধ্যমে আমেরিকাতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরে আরো চারটি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে কনফেডারেট স্টেটস অফ আমেরিকায় যোগ দিয়ে। এই চারটি রাজ্য হলো ভার্জিনিয়া, আরকানসাস, টেনেসি এবং নর্থ ক্যারোলিনা। অবশেষে দীর্ঘ চার বছর পর ১৯৬৫ সালের ৯ এপ্রিল গৃহযুদ্ধটি শেষ হয়। তবে হ্যাঁ, গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস কর্তৃক ১৮৬১ সালে কনফিসক্যাশন এক্টস পাস হয় এবং ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কর্তৃক ইমানসিপেশন প্রক্লেমেশন ঘোষণা করার ফলে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর ১৮৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দাসপ্রথা চিরতরে বিদায় করা হয়।

এখন আসি বর্তমান প্রেক্ষাপটে।

১২ আগস্ট ২০১৭। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার শার্লোটসভিল শহর। বলে রাখা ভাল, গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শহরের ৮৬ শতাংশ ভোটার হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে ভোট দেয়। অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক এখানে খুবই নগন্য। ঐদিন শত শত শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী এবং নিও-নাজি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করে। কারণ দাস প্রথার পক্ষে লড়েছিলেন এমন এক কনফেডারেটপন্থী জেনারেল রবার্ট লি’র মূর্তি অপসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে যেটা ১৮৯০ সালে স্থাপন করা হয়। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান থেকে এই সকল ভাস্কর্য ও কনফেডারেশনের পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা মিছিলে বলতে থাকে, “শ্বেতাঙ্গদের জীবনের মূল্য আছে”- মূলত স্লোগানটি পুলিশ ব্রুটালিটির বিরুদ্ধে আফ্রিকান-আমেরিকান নিগ্রোদের “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” স্লোগানেরই একটি অর্থহীন সস্তা কাউন্টার-স্লোগান।

নিয়ন আলোয়- কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

কনফেডারেটপন্থী জেনারেল রবার্ট লি’র মূর্তি

অন্যদিকে বর্ণবাদবিরোধীরাও তাদের বিপক্ষে মিছিল করছিল। এক সময় মধ্যে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং এ সময় অন্তত তিনজন নিহত হয়। আহত হন আরো অন্তত ৩৫ জন। এক ব্যক্তি বর্ণবাদবিরোধী সমাবেশের ওপর চলন্ত গাড়ি তুলে দেয়। শার্লোটসভিল শহরের মেয়র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়বাদীদের এই মিছিলকে ‘বর্ণবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেন। সর্বশেষ জরুরী অবস্থা জারির পর এখন শহর বেশ শান্ত। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, কেন কারও কাছে কনফেডারেট আমেরিকা স্বর্গ আর কারও কাছে নরকের মত।

নিয়ন আলোয়- কনফেডারেশন ইস্যুতে বিভক্ত মার্কিনীরা, এবং বাংলাদেশীদের শিক্ষা!

১২ আগস্ট ২০১৭ এর শার্লোটসভিল শহরে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়বাদীদের মিছিল

সর্বশেষ নিজের দেশকে নিয়ে কিছু না বললেই নয়। আমাদের স্বাধীনতার বয়স মাত্র ৪৫ বছর। আমাদের থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হয়। আর গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে প্রায় ১০০ বছর আগে। এখন কথা হল তারা কিন্তু এত বছরেও তাদের ইতিহাসকে ভুলে যায় নাই, দেশ ও সংবিধানবিরোধী কনফেডারেশনপন্থী নেতাদের মুল এখনো সমুলে উৎপাটন করছে। অথচ স্বাধীন হবার ৫০ বছর না যেতেই আমরা আমাদের ইতিহাস ভুলে বসে আছি! আমাদের দেশে আজও স্বাধীনতাবিরোধীরা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় সদর্পে, স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলা আজও রাজনীতি করার সুযোগ পায়। কিছু বললেই বলে- “ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকলে হয় না, সামনের দিকে আগাও।” একটা কথাই বলব, পিছনের ইতিহাস ভুলে গেলে বা ফেলে রেখে কেউ সামনের দিকে এগোতে পারে না। কারণ, ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিতে হয়। আজ সেই শিক্ষা গ্রহন করেই ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, কোরিয়ার মত দেশগুলো উন্নত হয়েছে। অনেক দেখলাম, শুনলাম, জানলাম আর সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হলাম যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে স্বাধীনতা বিরোধীরা আজও তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে যেখানে উন্নত বিশ্বে এটা কল্পনাতীত!

সবাইকে ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্রঃ আরটিওয়াশিংটন পোস্ট, উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন সূত্র।

লেখকঃ মোঃ রেজাউল ইসলাম।

Most Popular

To Top