লাইফস্টাইল

সুস্থ আছেন- এই কি বেশী না?

Neon Aloy- সুস্থ আছেন- এই কি বেশী না?- নিয়ন আলোয়

১.
পুরানা পল্টনে বইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের উপর একটি বই চোখে পড়েছিলো। বইটি কিনে চেম্বারের টেবিলে রেখেছিলাম। রোগী না থাকলে মাঝে মাঝে পড়া হতো।

একদিন বিকেলে চেম্বারে ঢুকে বইটি পড়ছিলাম। তখনই সর্বপ্রথম ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত “Ellora Caves” সম্পর্কে জানতে পারি। খ্রিষ্টীয় ৭০০ শতাব্দীতে কোনো উন্নত টেকনোলজীর সাহায্য ছাড়া কিভাবে একটি পাহাড় কেটে এই স্থাপত্যকর্ম তৈরি করা হলো তা বই পড়ে আমার মাথায় আসলো না। একটা ইন্টারেস্টং তথ্যও পেলাম; তা হল, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব নাকি একবার এক বাহিনী পাঠিয়ে স্থাপত্যটিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই ইস্যুতে উনি সফল হন নাই।

পড়তে পড়তে আমি যখন ৭০০ শতাব্দীতে, তখন এক ভদ্রমহিলা রুমে ঢুকলেন। উনি আমার পূর্বপরিচিত, বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি। ভদ্রমহিলার চেহারায় আনন্দের ছাপ স্পষ্ট। আমার কাছে আসার কারণ খোলাসা হলো, উনি বিয়ে করছেন, নিমন্ত্রণপত্রটি আমার হাতে দিলেন। সপরিবারে যাতে বিয়েতে যাই সেই রিকোয়েস্ট করে বিদায় নিলেন।

জীবনে এই প্রথম কোনো বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র হাতে নিয়ে মনটা গভীর বিষাদে ছেয়ে গেলো।

২.
যে মহিলাটি আনন্দ নিয়ে উনার বিয়েতে আমাকে নিমন্ত্রণ করে গেলেন, সেই একই মহিলা ৭-৮ মাস আগে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় এক ভদ্রলোককে নিয়ে আমার চেম্বারে এসেছিলেন। ভদ্রলোকটি তার স্বামী, পেশায় মধ্যম মানের ব্যবসায়ী। আমার কাছে নিয়ে আসার কারণ ধীরে ধীরে লোকটির পেট ফুলে যাচ্ছে।

ক্লিনিক্যালি দেখার পর এবং কয়েকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসলে আমার ধারণা হয়- মহিলাটির হাজব্যান্ড Advanced stage এর ক্যান্সারে ভুগছেন। এই রোগীকে আমার কাছে রাখা সমীচীন নয়, ঢাকা মেডিকেলে রেফার করলাম।

মাস দুই-তিন পর মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে আবার আমার চেম্বারে এলেন, ভূত দেখার মত চমকালাম! চোখের সামনে এক জীবন্ত কঙ্কালকে দেখতে পেলাম, চুল মোটামুটি সব উধাও। ঢাকা মেডিকেলের ডিসচার্জের হলুদ কাগজ আমার হাতে দেয়া হলো। যতদূর মনে পড়ে Colorectal ক্যান্সার ডায়াগনোসিস হয়েছিলো, কেমোথেরাপীও দেয়া হয়েছিলো, সার্জারী করার প্ল্যানও ছিলো। ভদ্রলোক ব্যাপারটিতে এগ্রি করেননি।

তারপরের ঘটনাগুলো শুধুমাত্র বেদনারই ইতিবৃত্ত। প্রতি পনেরো দিন পরপর মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে আমার কাছে আসতেন, সিম্পটম্ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতাম। লোকটির হাঁটতে কষ্ট হতো, স্ত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে তাকে চলতে হতো। আমি চিকিৎসা লিখতাম, মহিলাটি কোনো এক অজানা কারণে নীরবে চোখের পানি ফেলতো। বারবার ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবার তাগাদা দিতাম, ৪০ কিমি দূরত্ব ক্রস করে ঢাকা মেডিকেলে যেতে রোগী বা রোগীর স্ত্রী সায় দিত না। রোগীর কথা ছিলো, “শেষ সময়ে আর কষ্ট দিয়েন না ডাক্তার সাব, মরলে এইখানেই মরমু….”।

ঢাকায় যেয়ে কেমোথেরাপী না নেয়া বা সার্জারী না করানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিলো আর্থিক। রোগ নির্ণয় ও প্রাথমিক কিছু কেমোথেরাপী দিতেই লোকটির টাকা পয়সা অনেকটা শেষ হয়ে যায়, দীর্ঘদিন কর্তাব্যক্তিটি কর্মক্ষম না থাকায় ৫ সদস্যের পরিবারটি বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের সঞ্চিত অর্থকেও ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে। একটা মধ্যবিত্ত স্টেবল পরিবার শুধুমাত্র এক ক্যান্সারের রোগীর কারণে কিভাবে পথে নেমে যায়-সেটা এই রোগীর কারণে নিজের চোখে দেখলাম।

লোকটির স্ত্রী সাহায্যের জন্য নানা লোকের কাছে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তার সে অভিজ্ঞতা যে খুব একটা সুখকর ছিলোনা; আমি সে কথাও জানতাম। একবার মহিলাটি খবর পেলেন কোনো এক সামাজিক সংস্থা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের ভালো আমাউন্টের টাকা দেয়। অনেক পেপার যোগাঢ় করতে হয়, মহিলাটি কষ্ট করে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে পেপারগুলো যোগাঢ় করলেন। পেপারগুলো অ্যাটেস্টেড করার জন্য আমার কাছে নিয়ে এলেন। আমি একটার পর একটা পেপার সাইন করে গেলাম। আমি বুঝেছিলাম, মহিলার এই দুর্দিনে টাকাটার খুব প্রয়োজন ছিলো।

শেষের দিকে অবস্থা এমন হয়েছিলো যে আমার ভিজিটের টাকাও উনারা দিতে পারতেন না, আমিও কিছু আর বলতাম না। মৃত্যুপথযাত্রী এক লোকের কাছ থেকে ভিজিট নেয়ার ব্যাপারটায় আমার মনও সায় দেয়নি। গুরু নানক বলেছিলেন, “দুগুণা দত্তার, চৌগুণা জুজার…..”- এর অর্থ, “দু’গুণ দিলে নাকি চারগুণ ফেরত পাওয়া যায়”। আমি নিশ্চিত, আমার সীমিত ক্ষমতায় এক মুমূর্ষু রোগীর যতটুকু উপকার আমি করেছি, জীবন চলার পথে কোনো না কোনো এক সময় আমি তার চারগুণ ফেরত পাবো।

যাই হোক, লোকটি জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর সংবাদটি আমি পেয়েছিলাম তার মারা যাবার দিন দশেক পর। শেষ যেবার এসেছিলেন সেদিনের কথাটা মনে পড়লো। যাবার আগে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, “ডাক্তার সাব, আমি তো মইরা যাইয়া বাঁইচাই যামু। এত ব্যথা আর সহ্য হয় না। কিন্তু আমি মরলে আমার তিন মাইয়্যার কি হইবো??”

আমি কিছু বলতে পারি নাই। নির্মম পৃথিবীতে তার কন্যারা থাকবে, তাদের আগলে রাখার জন্য তিনি থাকবেন না, এটা যে কত বড় কষ্ট তা কন্যা সন্তানের পিতা ছাড়া যথাযথভাবে কারো বোঝার কথা না।

৩.
লোকটির মৃত্যুর পরপর মহিলাটি বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। কাজটি সঠিক হয়েছে নাকি হয়নি আমি সে বিতর্কে যাবো না। কিছু মতামত নিজের মাঝেই থাকুক। অন্য প্রসঙ্গে আসি।

চিকিৎসক হিসেবে অনেক সৌভাগ্যের মুখোমুখি যেমন হয়েছি, তেমনি অনেক বেদনা গাঁথাও দেখতে হয়েছে। একটি সাজানো সংসারে একদিন লোকটির ক্যান্সার ডায়াগনোসিস হলো, এটি ছিলো পরিবারটির জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। ধীরে ধীরে লোকটি আর্থিকভাবে পঙ্গু হলেন। ইন প্র্যাকটিক্যাল সেন্স, অর্থের আপাত ক্ষমতা অপরিসীম, যেদিন থেকে অর্থের অনুপস্থিতি সেদিন থেকে লাঞ্ছনা তার উপস্থিতির জানান দেয়। তাই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শারীরিক বেদনার সাথে সাথে লোকটিকে নানা মানুষের লাঞ্ছনাও সহ্য করতে হয়েছে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার চিন্তা জুড়ে ছিলো তিন কন্যার অনিশ্চিত ভবিষ্যত। মৃত্যুর পর জীবন চলার নিমিত্তে তার স্ত্রীকে আরেক পুরুষের হাত ধরতে হয়েছে।

“When you are in the light, everything follows you, but when you enter into the dark, even your own shadow doesn’t follow…. “– কথাটা যথার্থ।

জীবন মাঝে মাঝে কতটা রুদ্ররূপই না ধারণ করতে পারে! জীবনের পরীক্ষা কারো কারো জন্য কতই না কঠিন!! একজন মানুষ জীবনযুদ্ধে কতভাবেই না পরাজিত হয়!!

৪.
লেখাটা শেষ করি।

প্রায়ই ইনবক্সে মেসেজ আসে। ইনবক্সের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে Frustration বিষয়ক কথাবার্তা। আমাকে বলা হয় ইন্সপায়ারিং কিছু বলার জন্য।

আমি মোটিভেশনাল স্পীকার না, আমি চিকিৎসক, ইন্সপায়ারিং কিছু বলা আমার ঠিক সাজে না। এরপরও ভদ্রতা রক্ষার জন্য রিপ্লাই দিতে হয়। একটাই প্রশ্ন করি, ” আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ তো?”

অধিকাংশই শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন। তখন তাদেরকে জানাই, “শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন- এর চেয়ে বড় ইন্সপায়ারিং ব্যাপার আর কিছু কি হয়? সেটাকেই উপভোগ করুন না!”

অনেকেই আমার কথাকে হেঁয়ালি বলে মনে করেন, মুদ্রার এক পিঠের মানুষ তারা, অন্যপিঠ তো দেখা হয়নি। তাই বেশীরভাগই আমার কথা ধরতে পারেন না, ধরতে না পারারই কথা। ‘আঁখি মুঞ্জিয়া’ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিসটির রূপ দেখার ক্ষমতা সবসময় সবার থাকে না।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top