ইতিহাস

জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত! [স্পয়লার অ্যালার্ট]

নিয়ন আলোয়- জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল একটি সঠিক কাজ!

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যোদ্ধারা সামান্য অস্ত্র আর বুকের অসীম মনোবল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাদের সাথে পুরো বাঙালির একাংশ বাদে আর সব মানুষ বিভিন্নভাবে যুদ্ধ করেছেন। কেউবা টাকা দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার আর আশ্রয় জুগিয়েছেন,অনেকে নিঃস্বার্থ ভাবে আহত যোদ্ধাদের সেবা করেছেন, প্রবাসীরা বিভিন্নভাবে জনমত গড়তে চেষ্টা করেছেন বিদেশে, এমন আরো অনেক কিছুই আছে।

আমরা স্বাধীনতার পক্ষে ন্যায্য দাবী করেছিলাম, তাই আমাদের কোথাও কারো কাছে মিথ্যাচার করতে হয়নি। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের এসব মিথ্যাচার করতে হয়েছিল তাদের অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য। তারা বিদেশে সংবাদ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ, মুক্তিযুদ্ধকে ‘জিহাদ’ নাম দিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা থেকে আরম্ভ করে তাদের মতের পক্ষে রেডিও-টিভিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন আর অনুষ্ঠান প্রচার করতে থাকে। পাকিস্তানীদের এসব নির্লজ্জ প্রচারণা হল প্রোপাগান্ডার বিভিন্ন রূপ। এসব ছাড়াও প্রোপাগান্ডা ফিল্ম হল আরেকটি সহজ হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সহজেই মানুষের কাছে নিজের ভুল বার্তাটুকু সহজেই পৌঁছে দেওয়া যায়।

উইকিপিডিয়াতে সার্চ দিয়ে প্রোপাগান্ডা মুভির সংজ্ঞা সম্পর্কে যা পেলাম তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় যে, “এটি এমন একধরণের ফিল্ম যা ভুল থিওরি প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের মনে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে”।

এরপর গুগলে সার্চ দিয়ে এমন অনেক ছবি পেলাম যেগুলোকে আগে আমি মাস্টারপিস হিসেবে মনে করলেও এগুলো একেকটা প্রোপাগান্ডা ফিল্মের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আর এদের মধ্যে যখন “লিটল বয়” মুভির নাম দেখলাম, তখন সত্যিই আমি অবাক হয়েছিলাম। কারণ এটি একাধারে যুদ্ধের ছবি এবং সাথে একটি শিশুতোষ ছবিও, ২০১৫ সালে এই ছবিটিকে অনেকে যুদ্ধের সেরা ছবির তালিকাতেও স্থান দিয়েছেন!

পরবর্তীতে যখন আবার মুভিটি দেখতে বসি তখন বিষয়টা আমার আস্তে আস্তে বোধগম্য হয়। এখানে খুব সূক্ষ্মভাবে দর্শকদের বোঝানো হয়েছে যে আমেরিকা জাপানে পারমানবিক বোমা ফেলে কোনো অন্যায় কাজ করেনি বরং জাপানই ছিল এর জন্য দায়ী!

নিয়ন আলোয়- জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল একটি সঠিক কাজ!

“লিটল বয়” মুভির পোস্টার

আলেজান্দ্রো গোমেজ মন্টেভারডে পরিচালিত এই ছবিটি একটি আমেরিকান ওয়ার-ড্রামা ফিল্ম।

ক্যালিফোর্নিয়ার ও’হারা এলাকার অধিবাসী পিপার নামের এক ছেলেকে নিয়ে এই গল্প আবর্তিত হয়। ভাই, মা এবং বাবাকে নিয়ে তার সংসার। পিপারের শারীরিক বৃদ্ধি অন্য দশটা ছেলের মত ছিলোনা, সে ছিল একটু খাটো টাইপের। এর ফলে সবাই তাকে “লিটল বয়” হিসেবে ডাকতে থাকে যার কারণে পিটার সবসময় নার্ভাস থাকত। একমাত্র পিপারের বাবা জেমস তাকে উৎসাহ দিত এবং সাথে সাথে রাখত, বাবা-ছেলে পরস্পরকে “পার্টনার” নামে ডাকতো।

এরপর আরম্ভ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। পিপারের বড়ভাই স্যামের ফ্ল্যাট-ফুট সমস্যার জন্য সে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়, এর পরিবর্তে তার বাবাকে চলে যেতে হয় সেনাবাহিনীতে। বাবা চলে যাওয়ার পরে পিপার সম্পূর্ণ একলা হয়ে যায় এবং সে চার্চে যায় তার প্রিয় ফাদার অলিভারের কাছে। ছোট ছেলেটার বাবার জন্য এমন ভালোবাসা দেখে ফাদার অলিভার তাকে বাইবেল থেকে একটি উক্তি শোনান, যেখানে বলা হয়েছিলো- ইচ্ছা শক্তি থাকলে একজন মানুষের পক্ষে পাহাড়ও নড়ানো সম্ভব। এরপর তিনি পিপারকে কিছু ভালো কাজের লিস্ট দেন এবং বলেন যে এসব কাজ করলে সৃষ্টিকর্তা তার বাবাকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিবে। সে একে একে সব কাজ করতে থাকে তার বাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। অনেকে তার এই সংকল্পের কথা শুনে হাসাহাসি করতে থাকে। সেসময় গ্রামে এক জাদুকর আসে এবং তার সাথে পিপারের ভালো সখ্য হয়। ঐ জাদুকরও পিপারকে ইচ্ছা শক্তির কত জোর তা বলে। একদিন বন্ধুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পিপার বলে সে এখন সামনের পাহাড়টাকে নাড়িয়ে দিতে পারবে। সে যখন এটা বলে, তার কিছুক্ষণ পরই সেখানে ভূমিকম্প হয় এবং এলাকাটি নড়ে উঠে। এই ঘটনায় এলাকার লোকজন সবাই পিপারকেই কৃতিত্ব দেয়।

ফাদার অলিভারের লিস্ট অনুযায়ী শেষ কাজটি ছিল সেখানকার এক জাপানি বাসিন্দাকে সাহায্য করা। পিপার প্রথমে হাশিমোতো নামের ঐ লোকটিকে পছন্দ করতো না, কারণ সে সময়ে জাপান-আমেরিকা যুদ্ধের জন্য সবাই আমেরিকাতে বসবাস করা সংখ্যালঘু জাপানীদেরকে বিষদৃষ্টিতে দেখত। তখন ফাদার অলিভার তাকে বলে যে যার মনে ঘৃণা থাকবে তার ইচ্ছা ঈশ্বর পূরণ করবেন না, তাই নিজের বাবাকে ফিরে পাওয়ার জন্য পিপার অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাশিমোতোর সাথে মিশতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের দু’জনের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করতে থাকে। একদিন পিপারের ভাই এবং জাপানের সাথে যুদ্ধে সন্তানহারা একজন লোক হাশিমোতোকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। হাশিমোতোর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, কিন্তু তারপরও সে আক্রমণকারীদের নামে মামলা করতে রাজী হয় না।

নিয়ন আলোয়- জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল একটি সঠিক কাজ!

“লিটল বয়” মুভির একটি দৃশ্য

এদিকে দিনে দিনে যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তেই থাকে, আর মানুষের মনে তা প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এমন সময় হঠাৎ একদিন সবাই জানতে পারে যে আমেরিকা জাপানের উপর “লিটল বয়” নামে পারমাণবিক বোমা ফেলেছে এবং এর কারণে জাপান আত্মসমর্পণ করেছে আর যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে। পিপারের গ্রামের লোকরা পিপারকে ধন্যবাদ দেয় এবং বলতে থাকে যে পিপারের ইচ্ছা শক্তির জন্যই ঈশ্বর “লিটল বয়” নামের বোমা পাঠিয়ে জাপানিদেরকে মেরে ফেলে এই যুদ্ধকে বন্ধ করেছেন।

পিপারও খুশিমনে তার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। একদিন সকালে কিছু যুদ্ধ ফেরত সৈন্য বলে যে পিপারের বাবা মারা গিয়েছে যুদ্ধে। এতে পুরো পরিবারে শোক নেমে আসে এবং পিপাররা তার বাবার কবর দেখতে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় যে পিটারের বাবা মরেনি, তিনি সাময়িক স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছেন এবং মৃত ব্যাক্তিটি অন্য আরেকজন সৈনিক। এরপর পিপাররা তার বাবার সাথে দেখা করতে যায় সবাই মিলে।

এই হলো লিটল বয় মুভির সংক্ষিপ্ত কাহিনী। ১০৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই মুভিটিতে কোথাও জাপানে নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। সবখানেই আমেরিকা এবং আমেরিকার যোদ্ধাদের মহান এবং জাপানকে ঘৃণ্য রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শুধু ছবির একটা দৃশ্যে পিপার নিজেকে স্বপ্নে জাপানের বিধ্বস্ত জনপদের মাঝ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে।

নিয়ন আলোয়- জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল একটি সঠিক কাজ!

পারমানবিক বোমা “লিটল বয়”, যা ১৯৪৫ সালে মার্কিন বাহিনী জাপানের হিরোশিমায় বিস্ফোরণ ঘটায়

এখন আপনিই বলুন, পারমাণবিক বোমার আঘাতে ছিন্ন-ভিন্ন জাপানের কথা কি এখানে আরো ভালোভাবে বলা যেত না? যারা যুদ্ধ চায়নি এমন জাপানিদের সংখ্যাও তো কম ছিলোনা, তাদের কথাই বা কেনো বলা হলনা? হাশিমোতোর স্ক্রিন প্রেজেন্সটাও কেনো একজন শান্তিকামী জাপানীর পরিবর্তে অবস্থাদৃষ্টে একজন অসহায় জাপানীর চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে?

আমি মানলাম যে জাপানীরাও কম নৃশংস ছিলো না, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এত বছর পরেও পারমানবিক বোমার কারণে জাপানীদের যে শারীরিক এবং মানসিক পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে, তার এতটুকু উল্লেখ নেই এই ছবিতে। বোমার আঘাতে যারা তাৎক্ষণিক মারা গিয়েছিলো তারা আক্ষরিক অর্থে একপ্রকার বেঁচেই গিয়েছিল। কারণ বেঁচে যাওয়া মানুষদের তিলে তিলে মরতে হয়েছে। গুগলে সার্চ দিয়ে একবার দেখুনতো হিরোশিমা-নাগাসাকির মানুষদের যুদ্ধ পরবর্তী করুণ অবস্থার ছবি, আপনার গা শিউরে উঠতে বাধ্য। এখনো তো হিরোশিমা এবং নাগাসাকির আশপাশের এলাকায় শিশুরা বিকলাঙ্গ হিসেবে জন্ম নেয়। বিজয়ী দেশে বসে ছবি বানাচ্ছেন বলে কি ন্যুন্যতম মানবিকতাটুকুও থাকবে না?

নিয়ন আলোয়- জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা ছিল একটি সঠিক কাজ!

পারমাণবিক বোমা “লিটল বয়” এর আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া হিরোশিমা শহর

পারমাণবিক বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া হিরোশিমা’র আরো ছবি দেখুন এখানে- “ছবিতে হিরোশিমাঃ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের আগে ও পরে”

“লিটল বয়” ছবিটি রটেন টমেটোতে ১০ এ ৪.৫ এবং মেটাক্রিটিকে মাত্র ৩০% ভোট পায়, আরো অনেকেই এর সম্পর্কে নেগেটিভ রিভিউ দেন এবং একে ভুল তথ্যসম্বলিত সিনেমা নামে অভিহিত করেন। কিন্তু তারপরও এমন অনেকেই আছেন যারা এই ছবিটিকে প্রশংসা করে ভাসিয়ে দিয়েছেন এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আপনি যদি ইন্টারনেটে এই ছবিটি যে প্রোপাগান্ডা ছবি এটি নিয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল খুঁজেন, তবে খুব কম আর্টিকেলই আপনি খুঁজে পাবেন। নেগেটিভ রিভিউ দেওয়া বিদেশি সব আর্টিকেলেই ছবিটিকে একটি মিসলিডিং ছবি হিসেবে দেখানো হলেও কেন এটা মিসলিডিং সেটা নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি কোথাও।

কারণ,“পরাজয়ের ইতিহাস পরাজিতরা লিখেনা,জয়ীরাই তাদের নিজেদেরকে মহিমান্বিত করে ইতিহাস লেখে”

Most Popular

To Top