নাগরিক কথা

কি দোষ ছিল ছোট মেয়েটির; অথবা ছেলেটির?!

কি দোষ ছিল ছোট মেয়েটির; অথবা ছেলেটির?!

আমি দিয়া। তখন সাত মাস চলছিলো আমার। আমি কান্না করা ছাড়া কিছুই শিখিনি। বাবা প্রজেক্টের কাজের জন্য আমাকে আর মাকে নিয়ে ঢাকায় সাবলেট থাকতেন। আমাদের সাথে আরেকটি পরিবার ভাড়া থাকতেন। ঐ বাসার আন্টি আমাকে অনেক আদর করতেন। আন্টির ছেলে আমাকে সু্যোগ পেলেই কোলে নিয়ে আদর করতেন। সেদিন দুপুরের কথা। মা রান্না করার জন্য আমাকে খাটে শুইয়ে যান। হঠাৎ ভাইয়াটি আমার রুমে ঢুকে পরে। আমার জামা কাপড়ের ভিতর দিয়ে সব জায়গা স্পর্শ করছিলো। ভাইয়াকে আজ কেনজানি এক রাক্ষসরূপী নরপিশাচ লাগছিলো। ক্ষণিকের মধ্যে আমার সতীপথ দিয়ে নরপিশাচের কনিষ্ঠ আঙুল ভেদ করে। সাথে সাথে আমার বিছানার রং টকটকে লাল সিঁদুরের মতো হয়ে যায়। আমি মৃত্যুযন্ত্রণার মতো চিৎকার করে কান্না করতে থাকি। নরপিশাচটি মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যায়। মা রান্না ঘর থেকে দৌড়ে আসে। আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় দেখতে পায়। মা কাঁদছে আর আন্টিকে বলছে- তোমার ছেলে এটা কি করলো আমার এই ছোট্ট মেয়ের সাথে। ভাইয়াটি ঘটনাটির পর ঘরে ফিরেনি।

সাত মাস হয়েছে আমি পৃথিবীতে এসেছি। কিন্তু এখনো চিৎকার করে কাঁদছি। আমার বাবা মা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি সরকারি মামলা হবার ভয়ে। সমাজে জানাজানি হলে তাদের মানসম্মানে আঘাত আসবে। শীতকাল হওয়া সত্ত্বেও গায়ে কাপড়চোপড় রাখতে পারি নি ব্যাথার যন্ত্রণায়। আমার এই আর্তনাদের স্বাক্ষী খুব কম মানুষই ছিলো। যে আপুটি কলমের কালিতে আমার প্রতিবাদের ভাষাকে শুদ্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, তিনি নিজেও স্বাক্ষী হয়েছিলেন ক্ষণিককালের আর্তনাদে। কিন্তু আমার মা-বাবা তারা কি শুনতে পারছিলোনা আমার চিৎকার? সমাজের আত্মসম্মান কি আমার থেকেও বেশী ছিলো? আমি চাইনা এমন সমাজ, যার আত্মসম্মানের মুকুট মেয়েদেরকে পরিয়ে রেখেছে কিন্তু এই মুকুটের রক্ষণাবেক্ষণ করতে সবাই নারাজ। আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে এ কথা জানি কেউ না জানতে পারে তাই বাবা আমাকে আর মাকে নিয়ে দুদিনের মধ্যে শহর ত্যাগ করে।

আমি না হয় মেয়ে। আমাকে দেখলে বিশেষমন্ডলে তেঁতুল মনে হয়। আমি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ,উচ্চতায় কতটুকু বড় হয়েছি এই বিশেষ মন্ডলের কাছে খুব ভালো করে জানা। কিন্তু একটি ৬ বছরের ছেলে। তাকেও কি তেঁতুল মনে হয়? নাকি কচি লাঊ পেয়েছি, চিংড়ি দিয়ে রান্না করে খেতেই হবে। সামি নাম ছেলেটি; বোর্ডিং স্কুলে থেকে পড়াশুনো করে। অবিবাহিত এক প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষকের যৌনচাহিদার শিকার হয়। হাসপাতালের সাদা বিছানার চাদর সামির রক্তে লাল হয়ে আছে। পায়ুপথের তীব্র যন্ত্রণায় শুধু চিৎকার করে কাঁদছে। শিক্ষকটিকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। তাই তার বিরুদ্ধে সামির বাবা মা কোন মামলা করেননি। আবারো আপুটি আরেকটি শিশুর আর্তনাদকে কলমের কালিতে শুদ্ধ করবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

আমি উপরোক্ত দুটি শিশুর আর্তনাদের ক্ষণিক কালের স্বাক্ষী ছিলাম। কিন্তু তাদের এই আর্তনাদের প্রতিবাদ কোনো নির্যাতন আইনের দলিলে লিপিবদ্ধ হয়নি। আফসোস দু’টি পরিবার শুধুমাত্র সমাজের মিথ্যে আত্মমর্যাদার ভয়ে স্থান পরিবর্তন করে গা ঢাকা দেয়। তাই আমি দুটি শিশুর আর্তনাদের ভাষাকে কলমের কালিতে শুদ্ধ করবার ব্যর্থ চেষ্টা করছি।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর হতে চলছে। শুধুমাত্র একটি পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। তখন ৭১ ছিলো আর এখন ১৭; কিন্তু কিছু প্রথাগত সামাজিক ব্যাধি ধর্ষণ, নির্যাতন, অন্যায় জোঁকের মতো লেগেছিলো এবং এখনো লেগে আছে। সমাজের মানুষের চিন্তাধারার তেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। একটি মেয়ে ধর্ষণ হলে তাকে ন্যায় বিচার দেয়ার বদলে কিভাবে তার দোষ খুঁজে বের করা যায় তার পিছনে হন্যে হয়ে উঠে মানুষ। বিশেষভাবে তাদের পর্দা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কিন্তু আমাদের দেশে তো অনেক ধর্মের মানুষ বাস করে। ধরলাম মুসলিম মেয়ে ধর্ষিত হয় কারণ তার তথাকথিত পর্দার অভাব। কিন্তু অন্য ধর্মের মেয়ের ক্ষেত্রে কি হবে? নাকি তখন বলবে মেয়েগুলো উশৃংখল, বেয়াদব, অবৈধ মেলামেশা করে।

আমাদের দেশে ধর্ষক বলতে পুরুষজাতিকে বোঝানো হয়। সব পুরুষ নীতি ভ্রষ্ট নয়। তাইতো বাবার সাথে নিশ্চিন্তে এক ছাদের নিচে থাকছে মেয়েরা। অসংখ্য ছেলেও প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হয়। একটি ছেলে ধর্ষণের শিকার হলে এর বিচার কার কাছে চাইবে? সমাজের তথাকথিত কিছু লজ্জার কারনে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারে না। এছাড়া আমাদের দেশে পুরুষ নির্যাতন দমন কমিশন নেই।

ধর্ষক একজন অপরাধী। এর কোনো লিঙ্গ নেই। এটি হলো একটি ব্যক্তির কিছু হরমোনের নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড। ধর্ষণ, অন্যায়,অবিচার ইত্যাদি কর্মকান্ডের মূলে রয়েছে আমাদের দেশের ভিত্তিহীন সমাজব্যবস্থা। জন্মের পর থেকে একটি শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নামে প্রতিযোগিতা শিখানো হয়। ফলে একটি শিশু হিংসা, অহংকার, তুলনা শিখে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হয়ে অপরাধ কর্মকান্ডে আসক্ত হয়। প্রেমের মতো একটি পবিত্র জিনিসেও প্রতিযোগিতা করে। ব্যর্থ হয়ে ধর্ষণ, নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ করে। আর সর্বশেষ জীবনে ব্যর্থ হয়ে বেছে নেয় আত্মহত্যা। এই হাঁটুগাথুনি সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আর যাইহোক ন্যায়বিচার করা সম্ভব নয়। ভিত্তিহীন সমাজ ব্যবস্থাকে বদলে দেয়ার দায়িত্ব সকলকে নিজ অবস্থান থেকে নিতে হবে। সরকারের একার পক্ষে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। সকলের উচিত মূল্যবোধ, ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা করা। একটি শিশুকে প্রতিযোগিতার রাজ্যে প্রবেশ করানোর আগে তার নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে তার চরিত্রের ভিত্তিস্থাপন করানো প্রত্যেকের দায়িত্ব। একটি মানুষের নীতি ঠিক থাকলে তিনি কখনোই অন্যায় কাজ করবে না। হাজার অপরাধের ভিড়েও তিনি নিজের নীতির উপর সূর্যের মতো অটল থাকবে। আর নীতি ভ্রষ্ট হলে শুধু সমাজে না নিজের বাবা মার সাথেও একই ছাদের নিচে নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়।

মানুষ হয়ে জন্মানো সহজ। কিন্তু পৃথিবীর বুকে মানুষ হয়ে উঠা অনেক সাধনার ফল।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top