ইতিহাস

“বঙ্গবন্ধু ও ধর্মনিরপেক্ষতা” একটি নির্মোহ আলোচনা

নিয়ন আলোয় “বঙ্গবন্ধু ও ধর্মনিরপেক্ষতা” একটি নির্মোহ আলোচনা Neon Aloy

১.
১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ও সৌদী বাদশা ফয়সালের এক বৈঠক হয়। এম আর আখতার মুকুল এর লেখা “মুজিবের রক্ত লাল” বইতে সেই বৈঠকের পূর্ণ বিবরণ উদ্ধৃত করা হয়। সেই বিবরণ সরাসরি তুলে ধরলাম সবার জন্যঃ

বাদশা ফয়সালঃ ইউর এক্সেলেন্সী। আমি শুনেছি যে, বাংলাদেশে আমাদের কাছে কিছু সাহায্য আশা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি আসলে কি ধরনের সাহায্য চাচ্ছেন। আর হ্যা, যে কোন ধরনের সাহায্য দেওয়ার আগে আমাদের কিছু পূর্বশর্ত আছে।

মুজিবঃ ইউর এক্সেলেন্সী। আশা করি আমার দুর্বিনীত ব্যবহার ক্ষমা করবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার মনে হয় না- বাংলাদেশ ভিক্ষার জন্য আপনার কাছে হাত বাড়িয়েছে।

ফয়সালঃ তাহলে আপনি কিংডম অব সৌদি আরবের কাছে কি আশা করছেন?

মুজিবঃ বাংলাদেশের পরহেজগার মুসলমানরা পবিত্র কাবায় গিয়ে ইবাদত পালনের অধিকার দাবী করছে। ইউর এক্সেলেন্সী, যদি ইবাদত পালনের জন্য আপনার কোন শর্ত থেকে থাকে তাহলে আপনি তা বলতে পারেন। আপনি পবিত্র কাবা শরীফের তত্ববধায়ক। আপনি মহান ব্যাক্তি এবং বাঙালী মুসলানদের কাছে আপনার স্থান অনেক উচুতে। একথা নিশ্চয় স্বীকার করবেন, সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদেরই সেখানে ইবাদত করার অধিকার রয়েছে। সেখানে ইবাদত পালন করার কোন প্রকার শর্ত আরোপ করা কি ন্যায়সঙ্গত? ইউর এক্সেলেন্সী, আমরা সমঅধিকারের ভিত্তিতে আপনার সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ন সম্পর্ক চাই।

ফয়সালঃ কিন্তু এটা তো কোন রাজনৈতিক আলোচনা হলো না। ইউর এক্সেলেন্সী। দয়া করে আমাকে বলুন আপনি কিংডম অব সৌদি আরবের কাছে আসলেই কি আশা করছেন?

মুজিবঃ ইউর এক্সেলেন্সী। আপনি জানেন যে, ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আমি জানতে চাই, কেন সৌদী আরব স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি?

ফয়সালঃ আমি অসীম ক্ষমতাবান আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে প্রশ্নের জবাব দিই না। যেহেতু আপনি একজন মুসলিম, তাই আপনাকে বলছি- আপনি সৌদি আরবের স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে “Islamic Republic of Bangladesh” করতে হবে।

মুজিবঃ এই শর্ত বাংলাদেশে প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশের জনগনের প্রায় অধিকাংশই মুসলিম। আমাদের প্রায় এক কোটি অমুসলিমও রয়েছে। সবাই একসাথে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে বা যুদ্ধের ভোগান্তিতে পড়েছে। তাছাড়া সর্বশক্তিমান আল্লাহ শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই নন। তিনি বিশ্বভ্রমান্ডের স্রষ্টা। ইউর এক্সেলেন্সী, ক্ষমা করবেন, তাছাড়া আপনার দেশের নামও তো “Islamic Republic of Saudi Arabia” নয়। আরব বিশ্বের একজন গুনী ও খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ প্রয়াত বাদশা ইবনে সৌদের নামে নাম রাখা হয়েছে “Kingdom of Saudi Arabia”। আমরা কেউই এই নামে আপত্তি করিনি।

ফয়সালঃ ইউর এক্সেলেন্সী। এটার পাশাপাশি আমাদের আরো একটা শর্ত আছে। সেটা হলো পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়া।

মুজিবঃ এটা বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয়। দুই দেশের বহু অমীমাংসিত বিষয় আছে। এগুলোর মধ্যে আছে; কয়েক হাজার আটকেপড়া পাকিস্তানীদের ফেরত নেওয়া এবং বাংলাদেশ প্রাপ্য ন্যায্য সম্পত্তির হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়া। এই ব্যাপারগুলো সমাধা হতে কিছু সময় লাগতে পারে। তাই পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের বিনাশর্তে মুক্তির বিষয়টি নিয়ে এককভাবে কাজ করা যাবে না। তাছাড়া এটা নিয়ে সৌদি আরবের এতো উৎকন্ঠার কারন কি?

ফয়সালঃ দয়া করে এটা জেনে রাখুন যে, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান কার্যত এক এবং একই জিনিস। পাকিস্তান আমাদের নিকটতম বন্ধু। ইউর এক্সেলেন্সী, এখন আমাদের আর আলোচনার কিছুই নেই। আমাদের কন্ডিশন দুটি ভেবে দেখুন; এক, ইসলাম প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং অন্যটি হলো পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তিদান।

মুজিবঃ ইউর এক্সেলেন্সী, আপনি কি দয়া করে একটি বিষয় বুঝিয়ে বলবেন।

ফয়সালঃ ইউর এক্সেলেন্সী, দয়া করে বলুন- বিষয়টি কি?

মুজিবঃ বাংলাদেশকে সৌদী আরব স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে গত দুবছর ধরে বাংলাদেশের পরহেজগার মুসলমানরা হজ্বে যেতে পারছেনা। ইউর এক্সেলেন্সী আপনি এ বিষয়ে অবগত আছেন? এমন বাঁধা সৃষ্টি করা কি জায়েজ? সারা বিশ্বের মুসলমানদেরই অধিকার রয়েছে পবিত্র কাবায় ইবাদত করার। তাহলে কেন এমন প্রতিবন্ধকরা সৃষ্টি করা হলো? কেন হাজার হাজার মুসলমানকে হজ্ব করার জন্য ইন্ডিয়ার পাসপোর্ট করে হজ্বে যেতে হয়?

এ সময় অনাকাঙ্খিত ভাবে শেষ হয় আলোচনা। উঠে পড়েন বাদশা ফয়সাল। দু’নেতা বেরিয়ে যান। যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন তার এক কালের নেতা মাওলানা ভাসানীর উচ্চারিত একটা আয়াত, “লা-কুম দ্বীন-কুম ওয়াল-ইয়া দ্বীন” (তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার)।

তথ্য সূত্রঃ মুজিবের রক্ত লাল / এম আর আখতার মুকুল

২.
পাকিস্তান একটা ইসলামিক রিপাবলিক আর বাংলাদেশ পিপলস রিপাবলিক। লক্ষণীয় এই যে বাংলাদেশ একসময় পাকিস্তান ছিল অর্থাৎ ইসলামিক রিপাবলিক ছিল। যদি বাংলাদেশের ইসলামিক রিপাবলিক এর আইডিয়া প্রত্যাখ্যান করে পিপলস রিপাবলিক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপট আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে চলে আসবে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান।

এই প্রস্তাবনা পরিস্কার যে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে তাদের সংগঠিত সুপরকল্পিত গণহত্যায় মানুষ হত্যা করেছে নির্বিচারে। সেনাবাহিনীকে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে হিন্দুদের, কমিউনিস্টদের এবং আওয়ামীলীগ কর্মীদের। সেনাবাহিনীকে ধর্ষণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এই দেশের নারীদের যাতে সেইসব নারীদের গর্ভে প্রকৃত মুসলমান সন্তান জন্মলাভ করে। পাকিস্তানী জেনারেলদের লেখা বিভিন্ন পুস্তক থেকে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।

আজ এই কথাগুলো বলার পেছনে আমার সুনির্দিষ্ট একটা উদ্দেশ্য আছে। দেখুন একদম সাদা চোখে যদি আমরা দেখি তাহলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পেছনে যে কয়টা মৌলিক ফ্যাক্টর কাজ করেছে সেগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে সবার উপরে থাকবে গণহত্যা, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ইত্যাদি। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অর্থনীতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়াদির সাথে অনুচ্চারিত আরেকটি বিষয় ছিল ধর্মীয় ফ্যাক্টর, একথা ব্যাখ্যা করা বাহুলতা। পাকিস্তান নিজেদের ধর্ম রাষ্ট্র দাবী করতো এবং আমাদের ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার করতো।

পাকিস্তান ভেঙে বেরিয়ে এসে একটা নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে পাকিস্তানের সমস্ত আইডিয়াকে ভাঙ্গাটাও জরুরি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে সেটা ভাঙাও হয়েছিল বটে। আমাদের সংবিধানের চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে কয়টা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার মাঝে অন্যতম একটা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। এখন এই দেশের কোন দল যদি এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে অস্বীকার করে কোন একটা নির্দিষ্ট ধর্মের রিপাবলিক গঠনের চিন্তা করে সেটা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রদ্রোহীতা। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাষ্ট্রদ্রোহী।

৩.
একই ভাবে আমরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পাই আমাদের রাষ্ট্রধর্মের ধারনাটিও একই যুক্তিতে অগ্রহণযোগ্য। যদি রাষ্ট্রধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে পাশাপাশি রাখতে হয় তবে দেশে প্রচলিত সমস্ত ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা আবশ্যিক। আহমদ ছফা নব্বই-এর দশকে তার “বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ” প্রবন্ধে বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেছেন,

“বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু সকল সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে হঠাৎ করে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলে অনান্য সম্প্রদায়ের দাবী এবং অধিকারকে খর্ব করা হয় না কি? যদি এ সত্য মেনে নেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের গর্ভ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি জন্ম নিয়েছে, এই যুদ্ধে সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করেছে, তাহলে অনান্য ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের অধিকার ও দাবীকে খর্ব করার কারোর কি কোন নৈতিক অধিকার থাকা উচিত?

যদি রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা একান্তই প্রয়োজন হয়ে পড়ে-তাহলে অন্য ধর্মকে বাদ দেয়া হলো কেন?

প্রসঙ্গত ইন্দোনেশিয়ার কথা উল্লেখ করতে পারি। দুনিয়াতে মুসলিম দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়াকে সবাই চেনে। অথচ সেখানে সরকারী ভাবে পাঁচটি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইসলাম, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ প্রভৃতি প্রধান ধর্মসহ পাঁচটি ধর্মকে জাতীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় মাত্র কয়েক লক্ষ হিন্দু বসবাস করেন। ইন্দোনেশীয় সরকার এ মুষ্টিমেয় মানুষের ধর্মকেও জাতীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আমাদের দেশে হিন্দু জনগণের সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটির মতো। বৌদ্ধ জনগণের সংখ্যা প্রায় ত্রিশ লক্ষের মত হবে। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন যদি মুখ্য উদ্দেশ্য হত আমরা সবগুলো ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে স্বীকৃতি দিতে পারতাম। শুধু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে অনান্য ধর্মকে খাটো করা হয়েছে, তা বোঝানোর জন্য আইনশাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যার গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না।”

৪.
সৈয়দ মুজতবা আলী আর সন্তোষ কুমার ঘোষের সাথে আলাপকালে বঙ্গবন্ধু একবার বলেছিলেন,

“স্বাধীন বাংলাদেশ ও সেক্যুলার বাঙালী জাতির অস্তিত্বের রক্ষাকারী হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আমি এই ধর্মনিরপেক্ষতার চারা বাংলাদেশের মাটিতে পুঁতে রেখে গেলাম। যদি কেউ এই চারা উৎপাটন করে, তাহলে বাঙালী জাতির স্বাধীন অস্তিত্বই সে বিপন্ন করবে।” (তথ্যসুত্রঃ কোলকাতার দৈনিক যুগান্তর, ২৯ নভেম্বর ১৯৭২)

সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় বঙ্গবন্ধু খুন হবার পরদিন সকালে। সৌদি বাদশা খালেদ খন্দকার মোশতাকের কাছে পাঠানো এক বার্তায় বলেন,

“আমার প্রিয় ভাই, নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করায় আপনাকে আমার নিজের ও সৌদি জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।” (তথ্যসূত্রঃ হু কিলড মুজিব/এ. এল. খতিব)

Most Popular

To Top