ফ্লাডলাইট

অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দলঃ বিতর্ক এবং উত্তর

neon aloy মাহমুদুল্লাহ মমিনুল নিয়ন আলোয়

প্রতিপক্ষ যেহেতু অস্ট্রেলিয়া, তাই অস্ট্রেলিয়ার একটা উদাহরণ দিয়েই শুরু করি, উসমান খাজা, সাউথ আফ্রিকার সাথে ৩ টেস্টে ৫২.৩৩ গড়ে করেছিলেন ৩১৪ রান, পাকিস্তানের সাথে ৩ টেস্টে ৬৬.৭৫ গড়ে ২৬৭ রান। তারপরেও ভারত সিরিজের দলে জায়গা হয়নি খাজা’র, ম্যাট রেন’শ ওপেন করেছিলেন ওয়ার্নারের সাথে। যুক্তিটা ছিলো খাজা স্পিনে দূর্বল।

এখন অধিকাংশ মানুষ মন্তব্য করবেন “ভাই, অস্ট্রেলিয়া আর আমরা এক না”। উসমান খাজার মত অভিজ্ঞ প্লেয়ারকে উপেক্ষা করে রেন’শর মতো “পিচ্চি ছেলেকে” অস্ট্রেলিয়া উপমহাদেশে অভিষেক করিয়ে দিলো আর বাংলাদেশ, মানে আমরা মমিনুল হককে ড্রপ করে তার জায়গায় কায়েসকে খেলাচ্ছি এতেই চারপাশে একরকম “গেল গেল রব” উঠে যাচ্ছে কেন? সেই কায়েস যার গত দুই বছরে সম্ভবত টেস্ট গড় ৪৯ (বা কাছাকাছি হবে)!

প্রতিটা সিরিজের দল ঘোষনা করা হলেই একরকম নির্বাচক আর কোচের মুন্ডুপাত শুরু হয়ে যায় অনলাইনে। রিল্যাক্স! এইটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, একজন অফ ফর্মে থাকলে তার জায়গায় অবশ্যই আরেকজন সুযোগ পাবে, আর কায়েসের কথা বললে তিন নাম্বারে যোগ্য একজনই খেলবে।

অনেকে হয়তো খেয়ালই করেননি যে স্কোয়াড দেয়া হয়েছে প্রথম টেস্টের জন্য। পাশাপাশি মমিনুল হক আছেন দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচেও। মমিনুল তার লাকি গ্রাউন্ড চট্টগ্রামের দ্বিতীয় টেস্টের জন্য ম্যানেজমেন্টের বিবেচনায় আছেন, হেড কোচ নিজেই চট্টগ্রামের জন্য আলাদা পরিকল্পনা করে রেখেছেন।
অতএব, আমরা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব না খুঁজি এই দফায়। অনেক ষড়যন্ত্র খুঁজেছি আমরা। জাতি হিসেবেই আমরা অবশ্য সন্দেহপ্রবণ। এই ষড়যন্ত্র যার বেলাতে, সবচেয়ে বেশি আলোচিত- সেই নাসির ফিরেছেন দলে; তবে সেটা তখনই, যখন মাহমুদুল্লাহ সাদা পোশাকে ক্রমাগত বিবর্ণ হয়েছেন। একইভাবে মমিনুল হক ফিরবেন, তবে সেজন্য অবশ্যই সৌম্য সরকার অথবা ইমরুল কায়েসকে জায়গা হারাতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাম্ভাব্য সেরা এবং ফর্মে থাকা দলটাই চাই আমরা। কারণ এটাই সবচেয়ে ভালো সুযোগ তাদের হারাবার। এমনিতেই তাদের এশিয়ার রেকর্ড ভালো না, তার উপর অস্ট্রেলিয়ার এই দলের কারোরই বাংলাদেশে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নেই। সুতরাং, আমরা জিততে চাই, এটাই একমাত্র লক্ষ্য এই সিরিজে।

আর মমিনুল হক মাস্টার ব্যাটসম্যান, দেশের সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান। তিনি অচিরেই আবার ফিরে আসবেন, বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার। সামনে চারটা টেস্ট আছে, ফিরে আসার অবারিত সুযোগ থাকছে মমিনুলের জন্য।

মমিনুল কেন বাদ পড়েছেন? লাস্ট ছয় ইনিংসে একটি মাত্র ফিফটি- এটা যতখানি সমস্যা, তারচেয়ে বেশি সমস্যা লাস্ট ছয়বারের ভেতর পাঁচবারই তিনি সাদামাটা অফ স্পিনে আউট হয়েছেন। শ্রীলংকার সাথে দিলরুয়ান পেরেরার বলে দুই ইনিংসেই যেভাবে আউট হয়েছিলেন, সেখানে অস্ট্রেলিয়ার নাথান লায়নের বিপক্ষে বিষয়টা আরো কঠিন হতে পারতো। আবার নাও পারতো অবশ্যই! পরিসংখ্যান বলে, শেষ পাঁচ টেস্টে ব্যাট হাতে মমিনুল ২৩.২ গড়ে মাত্র ২৩২ রান করেছেন।

লাস্ট চার টেস্টে সৌম্য সরকার ৪৬.৭৫ গড়ে করেছেন ৩৭৪ রান। সৌম্য কেন দলে এই “অক্রিকেটীয়” প্রশ্নের উত্তর আশাকরি আর দেয়ার দরকার নেই। বলতেই পারেন, সৌম্যের টেস্ট খেলার টেম্পারমেন্ট নেই, ধৈর্য্য নেই ইত্যাদি ইত্যাদি! সেগুলা নিয়ে অন্য সিরিজে আলোচনা করা যাবে, এই সিরিজের ম্যাচগুলা তিন দিন সাড়ে তিন দিনের বেশি হয় কিনা সন্দেহ আছে, এতো ধৈর্য্য দেখানোর সময়ই পাবেন না প্লেয়াররা। বাংলাদেশের সৌম্য সরকার এবং অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নার এই দুইজনই শুরুতে আক্রমন করে ম্যাচের গতিপথ ঠিক করে দিতে পারেন। এলিস্টার কুক স্টাইলের ব্যাটিং এই সিরিজে করার সুযোগ পাবেনা সম্ভবত কোন ওপেনার। আক্রমন করেই খেলতে হবে।

সাব্বির ছয় টেস্টে ৩৩ গড়ে করেছেন ৩৩০ রান, কলম্বো টেস্টের দুই ইনিংসেই সাব্বিরের ৪০+ রান অন্য যে কোন ম্যাচে সেঞ্চুরীর তুলনায় কম বলা যাবে না। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সাব্বির খেলবেন, নাকি নাসির- সেটা দেখার বিষয় প্রথম টেস্টে।

পরিসংখ্যান বিচারে সৌম্য বা সাব্বিরের স্কোয়াডে থাকার তাই যুক্তি আছে। কেউ কেউ এমনকি কয়েকটা অনলাইন পত্রিকা প্রশ্ন তুলেছেন সাব্বিরের জায়গায় মমিনুল থাকতেই পারতেন, এটা একটা সম্পূর্ণ “অবান্তর” প্রশ্ন। মমিনুল কি লোয়ার মিডল অর্ডারে খেলবে? এমনিতেই স্পিন বলে সমস্যা, ছয়/সাত নাম্বারে নামতে নামতে বল হবে পুরানো থাকবে হয়তো দুই প্রান্তেই স্পিনার! তাছাড়া সাব্বির লাস্ট ম্যাচেও ভালো ব্যাট করেছিলেন, তাকে কি কারণে সুযোগ বঞ্চিত করা হবে?

অনেক প্রশ্ন উঠছে। মাহমুদুল্লাহ অনেকদিন সুযোগ পেয়েছেন, সৌম্য ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েছেন ম্যাচের পর ম্যাচ এই রকম। সিরিজটা সাউথ আফ্রিকা সফর হলে আমিও চাইতাম মমিনুল সুযোগ পাক। কিন্তু এটা ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ, শুরুতেই বলেছিলাম এটাই অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর সুবর্ণ সুযোগ। সুতরাং কেন আপনি একজন অফ ফর্মের প্লেয়ারকে ফর্মে ফেরার সুযোগ এখানেই দিবেন? এই বিলাসীতা সাউথ আফ্রিকার সাথে দেখানো যাবে, সাম্ভাব্য সেরা দল নিয়ে গেলেও সেখানে ফলাফল কি হবে সেটা আঁচ করা যায়!

লিটন কুমার দাস স্কোয়াডে থাকায় খুশি হয়েছি, একটা ধারাবাহিকতা থাকা উচিৎ। এক টেস্ট খেলবে-আবার ড্রপ করা হবে-তারপর আবার একদিন উড়িয়ে আনা হবে এরকম চাইনা। কয়েকটা সিরিজে সুযোগ দেয়া উচিৎ। যদিও উইনিং কম্বিনেশন না ভাঙলে নাসির অথবা লিটন কেউই একাদশে থাকবে না। লিটন কিন্তু দূর্দান্ত একজন ব্যাটসম্যান, আমি চাই টেস্ট দলে সে নিজের জায়গা পাকা করুক। লিটনকে কিপিং গ্লাভস জোড়া হস্তান্তর করে মুশফিক চার নাম্বারে থিতু হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের উপকার। গ্রেট সাঙ্গাকারা, ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম, রাহুল দ্রাবিড়রা এভাবেই ক্যারিয়ার লম্বা করেছিলেন।

আমার কাছে অনেকদিন পর একটা দূর্দান্ত স্কোয়াড মনে হয়েছে আজকে দল ঘোষনা করার পর। একমাত্র তাসকিন ছাড়া কাউকে নিয়েই আপত্তি নেই। তাসকিন কি অস্ট্রেলিয়ার পেসের জবাব পেস দিয়ে দেয়ার মত কিছু? তাই হবে হয়তো কারণ তাসকিনের পেস ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনেও হয়না, চোখেও দেখিনা! এখানে রুবেল হলেও পুরানো বলে রিভার্স সুইং পাবার চান্স ছিলো, অথবা কামরুল বা শুভাশীষ হলেও আপত্তি ছিলোনা।

শেষ কথা, কেউ আবার মমিনুল হেটার বানাবেন না অনুগ্রহ করে। প্লিজ!

[ভারতের চেতশ্বর পুজারা যদি বারবার সুযোগ পান সাময়িক ব্যাড প্যাচের পরেও, তাহলে আমাদের মমিনুল হক কেন পাবেন না? পাল্টা প্রশ্ন রেখেছেন Fahim Rahman। পড়ুন এখানেঃ একজন মমিনুল এবং বড় দলগুলোর সাথে আমাদের পার্থক্য]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top