ইতিহাস

জহির রায়হান : জীবন থেকে নেয়া এক কিংবদন্তীর নাম

neon aloy জহির রায়হান নিয়ন আলোয়

সময়টা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি, সময় আনুমানিক সকাল ৯টা। আগের দিন রাতে জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে সর্বস্তরের ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে ছুটে এলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ আমতলায়। সেখানে তৎকালীন ছাত্রনেতারা সভা আহ্বান করেছিলেন। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে। তখনই তৈরি হলো ঐতিহাসিক “দশজনী মিছিল”। তারপরের ইতিহাস কম-বেশি আমাদের সবারই জানা। তবে এই মিছিলেরই প্রথম দশজনের মধ্যে ছিলেন এক যুবক, যিনি সেদিনই প্রথমবারের পুলিশের দমন-পীড়ন ও গ্রেফতারের শিকার হন। তিনি কি জানতেন, এই অন্যায়, নিপীড়ন তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাড়া করে ফিরবে? এই যুবকের নাম জহিরুল্লাহ, যদিও ততদিনে তিনি জহির রায়হান নামেই সুপরিচিত। তার সম্বন্ধে জানতে ১৯৫২ থেকে আমাদের যেতে হবে ১৯৩৫ সালে।

আগস্টের ১৯ তারিখ তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু আবদার মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ, ডাকনাম ছিলো জাফর। মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং সৈয়দা সুফিয়া খাতুনের তৃতীয় সন্তান জহিরের ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। দেশভাগের পর বাবার সাথে চলে আসেন মজুপুর গ্রামে। সেখানকার আমিরপুর হাই স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায়ই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন ভাষা আন্দোলনে। এরপর ১৯৫৩ তে আইএসসি আর ১৯৫৮ তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। একদম শৈশবেই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বরেণ্য কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সারের হাত ধরে যুক্ত হন বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে। সেই ধারাবাহিকতায়ই ১৯৫৩ (মতান্তরে ১৯৫৪) সালে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। সেখানেই তিনি ধারন করেন পার্টির অন্যতম নেতা মণি সিংহের দেওয়া নাম “জহির রায়হান”।

লেখালেখির হাতেখড়িটা হয় স্কুল জীবনে। এর পর থেকেই বিরতিহীনভাবে লিখে যান জহির রায়হান। মূলত নাগরিক লেখক ছিলেন তিনি। নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপনই ছিলো তার লেখার বিষয়বস্তু। প্রথম গল্পসংগ্রহ, “সূর্যগ্রহণ”, প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। প্রথম উপন্যাসটা তিনি লিখেন ১৯৬০-এ, নাম “শেষ বিকেলের মেয়ে”। এছাড়াও “হাজার বছর ধরে”, “আরেক ফাল্গুন”, “বরফ গলা নদী” ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। এর মধ্যে “আরেক ফাল্গুন” ছিলো ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংবাদকর্মী। “খাপছাড়া” পত্রিকা দিয়ে শুরু করে সাংবাদিকতা করেছেন “যুগের আলো”, “যান্ত্রিক”, “সিনেমা” পত্রিকায়। ১৯৫৬ সালে “প্রবাহ” পত্রিকায় যোগদান করেন সম্পাদক হিসেবে।

ফটোগ্রাফি শিখতে জহির রায়হান ১৯৫২তে পাড়ি জমান কলকাতায় প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল স্কুলে। যদিও অর্থাভাবে দশ মাসের কোর্স তাকে ছয় মাসের মাথায় জলাঞ্জলি দিয়ে আসতে হয়। কিন্তু এই কোর্স করতে গিয়েই তিনি তার নতুন এক শিল্পীসত্ত্বা খুঁজে পান; আর তা হলো সিনেমা তৈরি করা।

১৯৫৭ সালে আখতার জং কারদার এর সিনেমা “জাগো হুয়া সাভেরা”-র সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন জহির রায়হান। তারপর আরো কয়েকটি সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করে হাত পাকিয়ে অবশেষে ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন নিজের প্রথম সিনেমা “কখনো আসেনি”। তার পরিচালিত “সঙ্গম” (১৯৬৪) ছিলো পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। তার পরিচালিত অন্যান্য সিনেমাগুলোও, যেমন “সোনার কাজল”, “কাঁচের দেয়াল”, “জীবন থেকে নেয়া”, “বেহুলা” ইত্যাদি এক একটি অনবদ্য নির্মাণ। এর মধ্যে “জীবন থেকে নেয়া”-র কথা না বললেই নয়। রাজনৈতিক বিদ্রুপাত্মক এই সিনেমাটিই ভাষা আন্দোলন নিয়ে তৈরি প্রথম এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য (দুঃখজনক হলেও সত্যি) সিনেমা। এছাড়াও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি এই সিনেমাতেই প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত প্রদর্শন করেন। সিনেমাটিতে নির্মাতা জহির রায়হান অত্যন্ত চতুরতার সাথে ফ্যামিলি ড্রামার মাধ্যমে আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্র তুলে এনে জনগণকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। চলচ্চিত্রটির অপর চিত্রনাট্যকার আমজাদ হোসেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন যে মুক্তির দিনই সিনেমাটি নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তানি সরকার। পরবর্তীতে তৎকালীন শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলি বিভিন্ন চাপের মুখে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলেও ব্যক্তিগতভাবে জহির রায়হানকে শাসিয়ে দেন এই বলে যে তিনি জহির রায়হানকে দেখে নিবেন। এখানেই আসলে জহির রায়হান অনন্য। তিনি সবসময়ই জনমানুষের কথা বলে গেছেন, শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি কখনো তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাই তো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও তিনি থেমে থাকেন নি; “Let There Be Light” এর কাজ অসমাপ্ত রেখেই তৈরি করেন “Stop Genocide” নামের প্রামাণ্যচিত্র। ইংরেজি ভাষায় তৈরি এ প্রামাণ্যচিত্রে যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র দেখে শিউরে ওঠে গোটা বিশ্ব। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে এরকম একটি কালজয়ী সিনেমাও সেন্সর বোর্ডে আটকে দেয়া হয়।

চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি আদমজী পুরষ্কার, বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা দিবস সহ অসংখ্য পুরষ্কার পান। কিন্তু এসব পুরষ্কার তাদের ঔজ্জ্বল্য হারায় তখনই, যখন এ ক্ষণজন্মা মানুষটির শেষ পরিণতির কথা স্মরণ করা হয়।

১৯৭১ এর ১৪ ডিসেম্বর ১১১০ জন বুদ্ধিজীবীর সাথে নিখোঁজ হওয়া সহোদর শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে পাগলপ্রায় হয়ে যান জহির রায়হান। ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারি ভাইয়ের সন্ধানে মিরপুরে যান জহির রায়হান। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ। ভাইয়ের খোঁজে গিয়ে নিজেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন জহির রায়হান, জন্ম দিয়ে গেলেন নানা রহস্য আর জিজ্ঞাসার। তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে তার এ অকালেই চলে যাওয়াতে সমগ্র বাঙালি জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো দিনই পূরণ করা সম্ভব নয়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top