নাগরিক কথা

বন্যার ভয়াবহতা কি সরকার এখনও বুঝতে পারছে না?

সরকার যদি বন্যার ভয়াবহতা বুঝতে পারতো তবে পুরো একটা উপজেলার লাখের উপরে দুর্গত মানুষদের জন্য ৮০ হাজার টাকা; কিংবা এক উপজেলার ৩০ হাজার দুর্গত মানুষের জন্য ১০ হাজার কেজি (জন প্রতি ৩০০ গ্রাম) চাউল বিতরণ করতো না। পত্রিকার তথ্য মতেই, “এখন পর্যন্ত বন্যায় ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্য গত ৪৮ ঘণ্টায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি পানিতে ডুবে ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে”। মৃত মানুষের প্রকৃত সংখ্যাটি যে আরও বেশি সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

গত কয়েক দিন থেকে গণমাধ্যমে বিভিন্ন পানি প্রকৌশলী বাংলালিংক দামে মন্তব্য করে যাচ্ছে বন্যা ১৯৮৮ সালের মাপের হবে না ১৯৯৮ সালের মানের হবে; বা ঐ দুইটার কোন টার ধারের কাছেও যাবে না। সেই পানি সম্পদ প্রকৌশলীদের বলতে চাই বন্যার পানিকে যদি পাথরের তৈরি পাহাড়ের সাথে তুলনা করি; তবে গোটা একটা পাহাড় ধসে পড়ার দরকার নাই; পাহাড় হতে মাঝারি মানের (২০০-৩০০ মিটার ব্যাসার্ধের) একটা পাথর গড়িয়ে পড়লেও নিজের চলার পথে ঘড়-বাড়ি, গাছ-পালা সব কিছুই পিষে মেরে সামনের দিকে এগোতে থাকবে। পিছন দিকে থাকবে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন।

এরা নিজেরাই বলছে এবারের বন্যা ১৯৮৮ কিংবা ১৯৯৮ সালের মত হবে না। ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় ঢাকা শহরে ডুবে ছিল অনেক দিন। দেশের প্রায় ৬০% এলাকা বন্যার পানিতে ডুবে ছিল। তাদের প্রশ্ন করি ঢাকা শহরের আয়তন কতো? ইতিমধ্যে ২০ টি জেলা বন্যা আক্রান্ত। ঐ ২০ টি জেলার আয়তন কতো? কত মানুষ বাস করে? ঐ ২০ জেলার মানুষদের আর্থিক অবস্থা কেমন? বন্যা পরবর্তী তাদের নিজের পুনর্বাসনের সক্ষমতা কেমন? ঐ ২০ টি জেলার উৎপাদিত ধান ও শাক-সবজি ঢাকা শহরের কত শতাংশ খাদ্যের যোগান দেয়?

সরকারি প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলতেছে যমুনা নদীর পানি গত ৬০ বছরে বিপদ সীমার এত উপরে দিয়ে প্রবাহিত হয় নাই। অন্যান্য নদী গুলো ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

অনেকেই নিজেদের পানি বিশেষজ্ঞ ও পানি প্রকৌশলী দাবি করছে; কিন্তু তারাই এবার প্রশ্ন করছে নদীতে এত পানি আসছে কোথা থেকে? তারা হয়ত বিজ্ঞান গবেষণায় প্রচলিত একটা কথা ভুলে গেছে; তাই আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই; Think outside the box; Look outside the Bangladesh border। জানি আপনারা সেটা করবেন না; আপনাদের ক্যারিয়ার জীবনে নতুন করে পাওয়ার কিছু নাই। তাই আপনাদের নতুন করে কিছু জানার আগ্রহ নাই, শেখার ইচ্ছেও নাই। তাই আপনাদের প্রশ্নের উত্তরে নিচের কয়েটি মানচিত্র যোগ করে দিলাম। বাংলাদেশের নদীতে এত পানি কোথা থেকে আসছে সেটা নিজেই দেখে নিন। নিচের চিত্র গুলো প্রস্তুত করা হয়েছে বর্তমান সময়ে পৃথিবীর সবচয়ে নির্ভুল কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা JAXA এর Global Precipitation Measurement (GPM) নামক ভূ-উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অন্যান্য দেশের একাধিক কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ দ্বারা সংগৃহীত তথ্যের সাহায্যে।

নিয়ন আলোয় বন্যার ভয়াবহতা কি সরকার এখনও বুঝতে পারতেছে না? Neon Aloy

সারাদেশব্যাপী বন্যার সাম্প্রতিক চিত্র

৩ দিন পূর্বে বলেছি, আজকে আবারও মনে করিয়ে দেই সবাইকে, প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ও ৩০০-৫০০ কিলোমিটার প্রস্থের এলাকার উপর পতিত ১ মিটার উঁচু (৩ ফুট) পানি একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী গুলোর মধ্যমে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হবে। বাংলাদেশের নদী গুলোর ঐ ক্ষমতা নাই যে ঐ পরিমাণ পানি ১ সপ্তাহের মধ্যে প্রবাহিত করবে; বড় রকমের বন্যা ছাড়াই।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ৪ টি জেলা (পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, ও নীলফামারী), ভারতের পশ্চিম বঙ্গের দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও কোচবিহার জেলায় ৪ দিন ধরে একনাগাড়ে প্রায় ১০০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত অধিক বৃষ্টিপাত ঐ সকল এলাকায় পূর্বে কোনদিন হয় নি (বাবা-দাদাদের জীবদ্দশায়)। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষার এই ধরনের ঘটনাগুলোকে বলা হয়ে থাকে এক্সট্রিম ইভেটস। এই ধরণের ঘটনা গুলো গ্রামার মেনে চলে না। আর একটি সহজ উদাহরণ দেই বুঝার সুবিধার্থে। রাতের মেঘ মুক্ত আকাশের দিকে তাকালে সবসময়ই কিছু ধূমকেতু দেখা যায়। কিন্তু হ্যালির ধূমকেতু দেখা যায় প্রতি ৭৫ বছর পর-পর। এবারের বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ঘটনাটি ঐ হ্যালির ধূমকেতু দেখার মতোই ঘটনা। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এই এক্সট্রিম ইভেটস নিয়ে আগামী দিনে গবেষণা করবে নিশ্চিত করেই বলা যায়। এই বৃষ্টিপাতের কারণ জানার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বৈজ্ঞানিকদের গবেষণা ও তার ফলাফল প্রকাশ করা পর্যন্ত।

পানি বিশেষজ্ঞ ও পানি প্রকৌশলীদের অনুরোধ করছি, নদীর পানি কোথা থেকে আসছে সেই প্রশ্নের উত্তর জানা এখন গুরত্বপূর্ন না; এখন গুরত্বপূর্ন হলো যে মানুষরা ইতিমধ্যে বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও বন্যার পানি বন্দি তাদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা; আর যে মানুষরা আগামী ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে বন্যার পানিতে প্লাবিত হতে যাচ্ছে তাদের জান ও মালের রক্ষার করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিন।

নিচে ৩ টি ছবি যোগ করা হলো বিভিন্ন রেজুলেশনে। এই ছবিগুলোতে স্থানের নামও আছে। ছবির রং যে স্থানে যত গাড় সেই স্থানে তত বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই ছবি বন্যার শুরু প্রথম ৪ দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্দেশ করছে। এই ছবি গুলো দেখলেই বোঝা যাবে বন্যার পানি সামনের দিন গুলোতে কোন কোন জেলায় উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাষ মানচিত্রও সাক্ষ্য দিচ্ছে উত্তরাঞ্চলের ৪ টি জেলায় (পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, ও নীলফামারী) বন্যার প্রকোপ কমে আসা শুরু করেছে; ও ঐ ৪ টি জেলার ভাটির জেলাগুলোতে বন্যা শুরু হয়েছে; সময়ের সাথে যার প্রকোপ বাড়তে থাকবে।

নিয়ন আলোয় বন্যার ভয়াবহতা কি সরকার এখনও বুঝতে পারতেছে না? Neon Aloy

নিয়ন আলোয় বন্যার ভয়াবহতা কি সরকার এখনও বুঝতে পারতেছে না? Neon Aloy

নিয়ন আলোয় বন্যার ভয়াবহতা কি সরকার এখনও বুঝতে পারতেছে না? Neon Aloy

বর্তমানে বাংলাদেশের বন্যা দূর্গত এলাকা

ছবি কৃতজ্ঞতা: Pacific Disaster Center।

বৃষ্টিপাতের তথ্য: Tropical Rainfall Measuring Mission (TRMM), (NASA’s Level 3 Integrated Multi-Satellite Retrievals for GPM ( IMERG ) gridded product (7-day accumulated precipitation)।

লেখকঃ মোস্তফা কামাল পলাশ
আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়াটারলু, কানাডা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top