ইতিহাস

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলঃ ১৫ আগস্টের বিস্মৃতপ্রায় বীর সৈনিক

neon aloy কর্ণেল জামিল নিয়ন আলোয়

যে যতো কথাই বলুক, ১৫ আগস্টের সেই কালো রাতে একজন বাঘের বাচ্চারই দেখা পেয়েছিলো জাতি। তিনি শহীদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ (তৎকালীন কর্ণেল)। আমার ভুল না হলে কর্ণেল জামিল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মিলিটারি সেক্রেটারি। তবে কথা ছিলো ১৫ আগস্ট ডিজিএফআই-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন তিনি।

১৫ আগস্ট ভোর রাতে কর্ণেল জামিলের বাসায় একটা ফোন আসে। প্রথমে ফোন রিসিভ করেন কর্ণেল জামিলের স্ত্রী, তিনিই কর্ণেল জামিলকে দেন রিসিভার। ফোন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। ফোন রেখে ড্রাইভার আইনুদ্দিনকে তৈরী হবার নির্দেশ দিয়ে নিজেও দ্রুত সাধারণ পোশাকে তৈরী হয়ে নেন কর্ণেল জামিল। মাঝে সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন দিয়ে ফোর্স পাঠাতে বললেন, সেই সাথে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়ও ফোন করেন। সব জায়গা থেকেই তাকে সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয়। যদিও ইতিহাস বলে সাহায্য তো অনেক দূরের কথা, বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার কোন চেষ্টাই করা হয়নি সেদিন কোন স্থান থেকে!

সেই রাতে কর্ণেল জামিল যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ফোন দেন তার মধ্যে পিজিআর এবং রক্ষীবাহিনীর হেড কোয়ার্টারও ছিল। সেই সময়ে ডিজিএফআই-এর প্রধান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রউফ। অবাক করা হলেও সত্যি তিনি নাকি ক্যান্টনমেন্ট থেকে খুনীদের সাঁজোয়া সেনাদলের মুভ করার খবরটি জানতেনই না। আরো হাস্যকর কথা, তিনি নাকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবরটি জেনেছেন পরদিন রেডিও শুনে!

শোনা যায়, কর্ণেল জামিল প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) সহ মুভ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সৈন্যদের সেখানে বহন করার মত জীপ ছিল না বলে তাদেরকে ৩২ নম্বরের দিকে মার্চ করার কমান্ড দিয়ে তিনি তার ব্যক্তিগত লাল রঙের নিশান প্রিন্স নিয়ে প্রিয়জনদের নিষেধ-অনুরোধ উপেক্ষা করে আগেই রওনা দেন বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে।

সোবহানবাগের কাছের রাস্তার ওপর ট্যাঙ্কসহ ব্যারিকেডের মুখে পড়েন জামিল। গাড়ী থেকে নেমে সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন সুবেদার মেজরকে নিজের পরিচয় দিয়ে তার সাথে বাহিনী নিয়ে এগুতে বলেন কর্ণেল জামিল। এরপর তিনি আবার গাড়িতে এসে বসেন এবং তার ড্রাইভার আইনুদ্দিনকে গাড়ী স্টার্ট করতে বলেন। জানা যায়, আইনুদ্দিন জামিলকে ভিতরে না যেতে অনুরোধ করলে জামিল বলেছিলেন, তোমার ভয় লাগলে নেমে যাও, আমি ড্রাইভ করছি।

এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে আবির্ভাব ঘটে ঘাতক দলের অন্যতম বজলুল হুদার। হুদা এসেই প্রশ্ন করে, কে ওখানে? ওপাশ থেকে উত্তর আসতেই কালবিলম্ব না করে সুবেদার মেজরকে গুলি চালানোর আদেশ দেয় হুদা। তবে হুদার এই আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জানায় সুবেদার মেজর। এরপর হুদা নিজেই স্টেনগান দিয়ে কর্ণেল জামিলকে লক্ষ্য করে গুলি করে। মুহূর্তেই প্রাণ হারান জামিল। তবে ড্রাইভার আইনুদ্দিন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন সেখান থেকে।

তবে তৎকালীন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের স্টেশন কমান্ডার লেফট্যান্ট কর্ণেল হামিদের বর্ণনার সঙ্গে উপরের বর্ণনার কিছুটা অমিল রয়েছে। তার বর্ণনামতে জামিলের কপালে কেবল একটি গুলিই লেগেছিল, স্টেনগানের ফায়ারে যেটা প্রায় অসম্ভব। এবং গুলিটা মেজর নূর চালিয়েছিল বলে উনি শুনেছিলেন। উনার কাছে ১৫ই আগস্টের পুরা বর্ণনা দিয়েছিল বজলুল হুদা। তার ভাষ্যমতে কর্ণেল জামিলের হত্যাকারী নূর, হুদা বা কোন অফিসার নয়; বরং সাধারণ সৈনিকেরাই কর্ণেল জামিলকে হত্যা করেছিল। ৩২ নম্বরের দিকে যেতে নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি এগুতে চাইছিলেন এবং সৈন্যদের গালিগালাজ করছিলেন।

আবার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত সাহেবের বিবরণের সাথে হামিদ সাহেবের বিবরণের খানিক গরমিল পাওয়া যায়।

ঘটনা যাই হোক, বাঘ তো বাঘই! কর্ণেল জামিলের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন সেইটাই বড় কথা।

কর্ণেল জামিলের মৃত্যুর পরও তার লাশ নিয়ে কম নাটক হয়নি। হাজারো দেনদরবারের পরে ‘কান্নাকাটি করা যাবে না’- এই শর্তে তার স্ত্রীকে এক নজরের জন্য লাশ দেখানো হয়েছিলো। এই বীরের কপালে কাফনের কাপড়ও জোটেনি। তার পরিবর্তে জুটেছিলো আমেরিকা থেকে শ্যালিকার পাঠানো বিছানার চাদর।

আফসোসটা কি জানেন? আমরা সেই জাতি যারা আমাদের বীরদের সম্মান দিতে জানি না। কী জীবদ্দশায়, কী মৃত্যুর পরে। এই কারণেই এখনো কর্ণেল জামিলকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদবীতে ভূষিত করা ছাড়া ছাড়া আর কোন যোগ্য সম্মানই জানাতে পারিনি আমরা।

লেখকঃ নাজমুল হুদা এবং রিপন ইমরান

Most Popular

To Top