নিসর্গ

কাশ্মীরের গল্পকথা (সপ্তম পর্ব)– জীবনের সেরা রোমাঞ্চের গল্প

নিয়ন আলোয়- Neon Aloy

[আগের পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (ষষ্ঠ পর্ব)– ২১০০ রুপির আলপিন বুকে!!]

এই অল্প বয়সের জীবনে এখন পর্যন্ত অনেক রকম রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়েছি বা পেয়েছি। কখনো বাস্তবতার মুখে পড়ে, কখনো বাধ্য হয়ে, কখনো শখে, কখনো অবাধ্য হয়ে বা কখনো রোমাঞ্চের নেশায়। জীবনের নানা রকম রোমাঞ্চের স্বাদ পাওয়া মধ্যে যে গুলো আমার কাছে অন্যতম, সেগুলো হলঃ ৪ নাম্বার সিগন্যালে স্পীড বোটে সমুদ্র পাড়ি দেয়া, বগালেক থেকে চাঁদের গাড়ির ছাদে করে রুমা বাজার আসা, চ্যালেঞ্জ নিজে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়া, মধ্যে রাতে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে লঞ্চ থেকে লাফ দিতে চাওয়া, মোটর বাইকে উল্টো পথে ৩২ কিলো আসা, না জেনে লাশের আঙুল ধরে ফেরি পারাপার হওয়া, আম্মার সাথে রাগ করে সারারাত ধানের কুটার ভিতরে লুকিয়ে থাকা, সান্দাকুফুর পাহাড়ে একা একা ট্রেক করতে গিয়ে পরে গিয়েও ফিরে আসা ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে এই সকল রোমাঞ্চকে ছাড়িয়ে গেছে আমার এবারের কাশ্মীর ভ্রমণের ২১০০ রুপীর আলপিন বুকে বিঁধে যাবার পরে যে রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়েছি বা পেয়েছি। ভাগ্যিস এমন একটা রোমাঞ্চের কথা মাথায় এসেছিল! ভাগ্যিস এমন একটা রোমাঞ্চের নেশা চেপেছিল, ভাগ্যিস ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচায় রক্তাত্ত হয়ে মাথায় রক্ত উঠে জেদের বসে এমন কিছু করে একটু হলেও শোধ তুলতে চেয়েছি এবং তৃপ্তি হয়ে নিজেকে অনন্য রোমাঞ্চে পূর্ণ করেছিলাম।

তো কি সেই অনন্য রোমাঞ্চের গল্পটা?

বলছি।

তার আগে একটু বলে নেই, উপরের যেসব রোমাঞ্চকর ঘটনা গুলোর কথা বলেছি, শুধু লাশের আঙুল ধরে ফেরি পার হওয়া ছাড়া সব গুলোরই কিছু না কিছু পূর্ব প্রস্তুতি ছিল। নদী, সমুদ্র, চাঁদের গাড়ি, মোটর বাইকে উল্টো চলা বা আম্মার সাথে রাগ করে কুটার ভিতরে থাকা। কিন্তু এই সর্বশেষ রোমাঞ্চের কোন রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছিলোনা, এমন হবে সেটা কল্পনাই করিনি, আর শেষ পর্যন্ত যে সফল হব, সেটা হয়তো শুরু আগে ভাবতেই ভয়ে সরে আসতাম এই রোমাঞ্চ থেকে!

এবার তবে মুল গল্পটা শুরু করা যাক।

আগের পর্বে ২১০০ রুপীর আলপিনের ক্ষতর গল্প তো নিশ্চয়ই পড়েছেন। যারা পড়েছেন তারা জানেন যে কি পরিমান ব্যাথা লেগেছে সেই ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচায়! তো ঘোড়া থেকে নামার আগে আগে মাথায় এলো শালারা, বলেছিলি পুরো গুলমার্গ ঘোরাবি, যতক্ষণ খুশি ততখন আর যেখানে খুশি সেখানে ঘুরতে পারবো বলে ঘোড়ায় চড়িয়ে ৩০ মিনিট পিচ ঢালা রাস্তায় হাঁটিয়েই নামিয়ে দিবি!

তাতে করে যে যেই টাকা দিক, আমি অন্তত আমার ঘোড়ার টাকা তদেরকে এতো সহজে দেব না। আগে আমাকে পুরো গুলমার্গ আবার ঘোরাবি, উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তায় চড়াবি, পাইনের বনে ঘোড়ায় করে নিয়ে জাবি, তারপর আমি আমার ঘোড়ার থাকা দেব। ঠিক এমনটাই ভেবে রাখলাম। এবং ঘোড়া থেকে সবাই নামার পরে আমি কেন নামছিনা দেখে জিজ্ঞাসা করাতে, আমার খায়েসের কথা জানালাম এবং সাথে এও যে নইলে আমি আমার ঘোড়ার টাকা দেব না! আমার ইচ্ছামত চড়ালে, চড়াও এবং তারপর টাকা নাও, আর এখনি নামিয়ে দিলে আমার ঘোড়ার টাকার আসা বাদ দাও!

মামু ঘোড়ার দালাল এইবার পড়লো মহা ফাঁপরে! এমনটা সাধারণত কেউ করেনা কখনো। সবাই এইটুকু ঘোড়ায় চড়েই ক্লান্ত হয়ে যায়, শরীর ব্যাথা হয়ে যায়, অনেকে ভয়ে নিজ থেকেই নেমে যায়, আবার অনেকে পরিবার নিয়ে যায় বলে আর তেমন কোন ঝামেলা করেনা। এই কোন চিজ মামা, যে প্রথমবার ঘোড়ায় চড়ে, পরিবার নিয়ে এসেও এতো প্যাঁচাল পাড়ছে, আর টাকাও দিচ্ছেনা! একটু গড়িমসি করে কি যেন আবোল-তাবোল বোঝাতে চাইলে, কিন্তু কে শোনে কার কথা, আগে তুই পুরো গুলমার্গের পাহাড়, অরণ্য, ঝর্ণা আমাকে ঘুরে দেখা, তারপর তোর টাকা!

এরপর ঘোড়ার দালাল কাকে যেন ডেকে আনলো। সাথে দুটো ঘোড়া। দুজনের কথার ধরন, চোখের ইশারা আর কঠোর ইন্সট্রাকশন শুনে মনে হল, ব্যাটারা আমাকে শিক্ষা দিতে চায় এমন কোন কিছু একটা বলেছে। এরপর আমাকে ওঠালো একটা বড় ঘোড়ায়, যেটা আগের চেয়েও তাগড়া আর টগবগে। অন্যজন আগে থেকেই আর একটা ঘোড়ায় চেপেই ছিল। আমার হাতে ঘোড়ার লাগাম দিয়ে প্রথমে একটু ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড়ানো থাকা ছোট পাহাড়টা পেরিয়েই, দিল ছুট! এই ছুট আর সেই ছুট! পুরো ঘোড়ার রাইড শুরু করে দিল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই!

দুই একবার পরে যেতে ধরতেই ভাবলাম এভাবে শক্ত করে লাগাম ধরে আর ওর উড়ন্ত পিঠে বসে থাকার চেষ্টা করলেই আমি শেষ, একদম ছিটকে গিয়ে পরবো কোন এক খাঁদে বা অন্তত পাহাড়ের গায়ে! তাতে শুধু ব্যাথা নয় হাত-পা এমনকি হাড়গোড় ভেঙে পর্যন্ত যেতে পারে। তাই নিজ থেকেই যে বুদ্ধিটা করলাম, সেটা হল…

ঘোড়ার উপরে বসে না থেকে, লাগামটা ধরে পা দুটো যে রিঙের উপরে রাখা আছে সে দুটোর উপরে দাঁড়িয়ে থাকা আর মাঝে মাঝে ঘোড়ার পিঠে বসে নিজের ব্যালান্স ঠিক রাখা। আহা, এরপর কিছুটা ভয়, কিছুটা আতঙ্ক আর অনেক অনেকটা ঝুকি নিয়ে যে রাইডটা দিলাম… গুলমার্গের পাহাড়ে, পাইনের অরণ্যে, বয়ে চলা ঝর্ণার ভিতরে আর কাদামাখা মাঠে সে এক অনন্য অনুভূতি, জীবনের অন্যতম নয় এখন পর্যন্ত সেরা প্রাপ্তি বা রোমাঞ্চ!

নিয়ন আলোয়- Neon Aloy

গুলমার্গের পাথুরে পাহাড়ে লেখকের হর্স রাইডিং এডভেঞ্চার

যখন চলছিলাম ওভাবে উড়ে উড়ে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে, খেয়াল করলাম, আমাকে যে নিয়ে এসেছিল সামনের আর একটা ঘোড়ায় বসে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল! ভাবটা এমন যে পড়ছিনা কেন? থামতে বলছিনা কেন ভয় পেয়ে! বা নিজেই লাফ দিয়ে নেমে কেন ওনাকে বারন করছিনা! প্রায় ১৫ মিনিট এমন দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর একটা রাইড শেষ করে ফেরার পরে, আমার ঘোড়ার দালাল আর অন্য ঘোড়ার চালক যে স্বীকৃতি টুকু দিয়েছিল সেটাই বিশাল একটা পাওয়া ছিল ওদের বাটপারির বিপক্ষে।

সেটা ছিল ওরা সমস্বরে বলেছিল…

“আপতো ভাইছাব রাইডার নিকলা!!”

এমনকি ১০০ রূপী পুরস্কার পর্যন্ত দিতে চাইছিল! সত্য হোক বা মিথ্যে, বলেছে তো!
তবে যাই বলুন, আসলে এটা ছিল একটা ভয়ানক রোমাঞ্চকর আর নিজেকে নিজের কাছে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবার মত একটা দুঃসাহস আর দুর্লভ অভিজ্ঞতা। মোট কথা এটা আমার জীবনের সেরা রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা আর এখন পর্যন্ত ভ্রমণে অর্জন করা সেরা অর্জন বা রোমাঞ্চ।

নিয়ন আলোয়- Neon Aloy

থ্রিলিং একটি হর্স রাইড শেষে বিজয়ীর বেশে লেখক

এটা যে কতটা রোমাঞ্চকর ছিল সেটা আরও বুঝতে পেরেছিলাম ঘোড়া থেকে নেমে নয়, গাড়িতে বসে যখন গাড়ি চলা শুরু করেছিল তখন থেকে পরবর্তী এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত! কারন গাড়িতে উঠে চলার শুরু থেকে মনে হচ্ছিল, আমার শরীরের সবগুলো হাড় যেন আলাদা আলাদা হয়ে খসে খসে পড়ছে।

মনে হচ্ছিল, একটা একটা করে হাড্ডি যেন নড়াচড়া করছে নিজেদের মত করে। এক জায়গার হাড্ডি যেন অন্য জায়গার হাড্ডির সাথে দেখা করতে যাচ্ছে, ঘোড়ায় চড়েই। হাত, পা, ঘাড়, মাথা সব যেন সব যেন শরীরের থেকে আলাদা-আলাদা এক একটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। আর ব্যাথা? উহ সেতো অসীম…!!

তবে উপভোগ করা দুর্দান্ত রোমাঞ্চের কাছে এসব তেমন কিছুই ছিল না তখন। মনে মনে দারুণ খুশি, আনন্দ আর অন্যতম অর্জনের প্রাপ্তিতে নিমগ্ন তখন……

কি নেবেন নাকি এমন একটা অনন্য রোমাঞ্চের স্বাদ, জীবনের অনন্য অর্জন হিসেবে করবেন নাকি যোগ?

তাহলে চলে যেতে হবে গুলমার্গে।

(চলবে)

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

To Top