ইতিহাস

পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া অপারেশন জ্যাকপট

neon aloy অপারেশন জ্যাকপট নিয়ন আলোয়

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করলে ‘অপারেশন’ শব্দটি উচ্চারনের সাথে সাথে মনে পড়ে ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ কথা, যে অপারেশনে তৎকালীন পাকিস্তানী মিলিটারি জান্তা ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য গনহত্যার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করে। এর প্রেক্ষাপটেই নয় মাসব্যাপী এক গণযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিশ্চিত হয়। তবে আজকের আলোচনা পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংস বর্বরতা নিয়ে নয়, বরং মুক্তিবাহিনীর গৌরব গাঁথা এক অপারেশন নিয়ে। ‘অপারেশন জ্যাকপট’ বলতে মূলত মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোদের দ্বারা পরিচালিত আগস্ট থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত চালানো সকল গেরিলা অভিযানকে বুঝায়। এ কর্মকান্ড মূলত নদীপথে চালানো হলেও বেশ কিছু স্থাপনা ধ্বংসের পরিকল্পনাও এ অপারেশনের অধীনে নেওয়া হয়।

আলোচনার শুরুতে ফিরে যেতে হবে মার্চ মাসে। ফ্রান্সের তুলন বন্দরে পাকিস্তানী বাহিনীর সাবমেরিন নোঙ্গর করা, ট্রেনিং চলছে সাবমেরিনারদের। ২৬ মার্চ বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকা সংবাদে ভেসে আসে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার খবর। দেশপ্রেমিক ৮ জন বাঙালী অফিসার (মূলত ৯ জন, একজন দেশে ফিরতে ব্যার্থ হন) পালাতে সক্ষম হন মার্চের ৩১ তারিখ। তুলন থেকে জেনেভার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েও আবার প্যারিসে ফিরে আসতে বাধ্য হন তারা। পরবর্তীতে স্পেনে ভারতীয় দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে নানান নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে তারা দিল্লিতে পৌছাতে পারেন এপ্রিলের ১০ তারিখ। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের জিজ্ঞাসাবাদের পর পলাতক সাবমেরিনাররা প্রস্তাব দেন নৌ-কমান্ডো গঠনের। এদিকে রণতরী, নাবিক ও কর্মকর্তার অভাবে তখন মুক্তিবাহিনীর পক্ষে নৌযুদ্ধ প্রায় অসম্ভব। সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন ও সেনাপতি ওসমানীর প্রতক্ষ সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনীর হরিনা ও বিএসএফ ক্যাম্প হতে তরুণদের বাছাই করা হল।

২৫ এপ্রিল ভাগীরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তরে নৌ-কমান্ডোদের ট্রেনিং পর্ব শুরু হল। ট্রেনিং শুরুর আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া হল যে ট্রেনিং-এর মাধ্যমে একটি সুইসাইডাল কমান্ডো গঠন করা হচ্ছে এবং অপারেশনের জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন দিতে হতে পারে। বিষয়টি পরিষ্কারের জন্য সকলকে ছবি সহ একটি ফর্মে স্বাক্ষর করানো হয়, যাতে লেখা ছিল-

“আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।”

এ শর্ত সাপেক্ষেও তিন ব্যাচে ৫১৫ জন কমান্ডো ট্রেনিং গ্রহণ করে। মিশনের গোপনীয়তা রক্ষার্থে প্রয়োজন ব্যাতিত অন্য কোন ব্যক্তিকে এ প্রশিক্ষণের খবর জানানো হয় না। ট্রেনিং এর নাম রাখা হয় C2P।

সাধারণ গেরিলা ট্রেনিং-এর চেয়ে ব্যাতিক্রমী এ ট্রেনিং ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু সাঁতার শেখানো হলেও প্রশিক্ষণ শুরুর কয়েকদিন পর প্রত্যেক কমান্ডোকে বুকে গামছা দিয়ে ৪/৫ কেজি ওজনের মাটির ঢিবি বেঁধে পানির নিচে বিস্ফোরনের কৌশল শেখানো হত। ৫ কেজি ওজনের লিমপেট মাইন বুকে বেঁধে জাহাজের সাথে স্থাপন করে নিরাপদ দূরত্বে ফিরে যাওয়া ছিল মূল কাজ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলত ট্রেনিং, আবার ১ ঘন্টা বিশ্রামের পর পুনরায় ট্রেনিং। সাতারের পাশাপশি এ কমান্ডো দলকে রাইফেল চালানো, কম্ব্যাট, আনআর্মড কম্বেট শেখানো হত। দিনে প্রায় ১৬ ঘন্টার মত ট্রেনিং চলত এ ক্যাম্পে।

প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং শেষ হওয়ার সাথে সাথে কমান্ডোদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। চট্টগ্রাম, মংলা, নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুরে আক্রমনের উদ্দেশ্যে ২ আগস্ট সি২পি ক্যাম্প থেকে কমান্ডোদল যাত্রা শুরু করে। ১৫০ জন কমান্ডোর মধ্যে ৬০ জনকে চট্টগ্রামে, ৬০ জনকে মংলা এবং ২০ জন করে নারায়নগঞ্জ ও চাঁদপুরে পাঠানো হয়। পরিকল্পনা হল একই সময়ে সকল বন্দরে বিস্ফোরন ঘটিয়ে শত্রুদের হতচকিত করে দেওয়া। কমান্ডোদের প্রত্যেকের সাথে ছিল একটি করে লিমপেট মাইন, এক জোড়া ফিন, কিছু শুকনা খাবার এবং প্রতি তিনজনের জন্য একটি করে স্টেনগান। প্রতিটি দলকে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে আলাদা আলাদা পথে পাঠানো হয়। চট্টগ্রামে কাঁঠালের ঝুড়ির নিচে মাইন ও ফিন রেখে কমান্ডোদল চেকপোস্ট অতিক্রম করে।

প্রথম এ অভিযানের গোপনীয়তা ছিল সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ। পাকিস্তনিরা নৌপথগুলো মোটামুটিভাবে অরক্ষিত রেখেছিল। প্রথমবারে যদি ব্যাপক আঘাত হানা যায়, তবে তা পাকিস্তানীদের জন্য হবে গুরুতর। এত গোপনীয়তা সত্ত্বেও যেন মিলিটারি কোনভাবে তা জানতে না পারে সেজন্য এক অভিনব পদ্ধতিতে অভিযানের নির্দেশনা দেওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়। প্রতেক দলনেতার কছে একটি এক ব্যান্ডের রেডিও সাথে দেওয়া হয়, যেখানে রোজ সকাল ৭:৩০ মিনিটে আকাশবাণীর ‘খ’ কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনতে বলা হয়। শুধু দলনেতাদের জানানো হয় বেতারে পঙ্কজ মল্লিকের ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম গান’ এর মাধ্যমে প্রস্তুতির নির্দেশ এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এর ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শশুর বড়ি’ গানটির মাধ্যমে ঐ দিন রাতে আক্রমনের নির্দেশ দেওয়া হবে।

এর মধ্যে গুজব রটে ১৪ তারিখ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তিবাহিনী ব্যাপক আকারে অভিযান চালাবে এবং ঘটেও তাই। সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আকারে গেরিলা আক্রমন চালায়। সারা দিন সতর্কতামূলক অবস্থানে থাকা পাক বাহিনীও অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য কমান্ডোদের নির্দেশ দেওয়া হয় ১৫ তারিখ রাতে অভিযান চালাতে। ১৫ আগস্ট, চারটি নৌবন্দরে ২৬ টি জাহাজ অকেজো করে দেওয়া হয়। ব্যাপক পরিমান অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ধ্বংসের পাশাপাশি বেশ কিছু বিদেশি জাহাজ গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাফল্য এবং গুরুত্বের বিচারে প্রথম অভিযানটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। প্রথমত, পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগে একাধিক বিস্ফোরনে পাকিস্তানী বাহিনী দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কমাতে ব্যার্থ হয় যা পরবর্তীতে তাদের তদন্ত রিপোর্টে উঠে আসে। দ্বিতীয়ত, নৌ-কমান্ডোর দল ব্যাপক পরিমানে যুদ্ধ সরঞ্জাম ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়, যা পাকিস্তানী মিলিটারিকে দূর্বল করে দিয়েছিল। তৃতীয়ত, জেটিতে থাকাকালীন সময়ে একাধিক জাহাজ ধ্বংসের কারণে জেটিগুলো অকেজো হয়ে যায়। তাছাড়া একাধিক জাহাজ বিকল করতে সক্ষম হওয়ায় চ্যানেলসমূহ নৌ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সর্বাধিক গুরুত্ববহ বিষয়টি ছিল বিদেশী নৌযান ধ্বংস।

অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ক্ষেত্রে আলেড়ন সৃষ্টি করে। পূর্ব পাকিস্তানে পণ্য পরিবহনে ‘War-risk Insurance’ এর পরিমান পাঁচ শিলিং থেকে বেড়ে ১ পাউন্ডে পরিনত হয়। ২০ শতাংশ অতিরিক্ত ঝুঁকি ভাতা নবিকদের দিতে বাধ্য হয়। এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানে এক সপ্তাহের বেশি কোন বৈদেশিক জাহাজ অবস্থান করলে অতিরিক্ত ১০০০ ডলার দৈনিক ভিত্তিতে ঝুঁকি ভাতা দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়। সমগ্র পাকিস্তানের অর্থনীতির চাবিকাঠি বাংলার পাট ও চা রপ্তানি ব্যাহত হয়। বিশ্বব্যাংকের প্রধান রবার্ট ম্যাকনামারা’র উপর চাপ সৃষ্টি হয়, যিনি কিনা সবসময় দাবি করে আসছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।

প্রথম অভিযানের এ ব্যাপক সাফল্য কমান্ডোদের মনোবল বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। আগস্ট-নভেম্বর মাসে বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়, যার মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ধ্বংসের লক্ষ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংসের পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয় (পরবর্তীতে ব্যার্থ হয়)। এছাড়াও বহিঃনেঙ্গরে অভিযানের পাশাপাশি একাধিক অভিযানে সারা দেশে ১২৬ টি নৌযান (১,০০,০০০ টন) নষ্ট/ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। পুরো অপারেশনে ৮ জন কমান্ডো শহীদ, ৩৪ জন আহত হবার পাশাপশি ১৫ জন কমান্ডো শত্রুর হাতে ধরা পড়েন।

আপারেশন জ্যাকপট আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রমের ইতিহাসে গৌরবোজ্জল এক অধ্যায়। নৌ-কমান্ডোদের এত কম সময়ে এত বিশাল সাফল্যের নজির নৌযুদ্ধের ইতিহাসে বিরল বলা চলে। এ অপারেশন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিণতি অনেকাংশেই নিশ্চিত করেছিল।

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। এ দিনে স্বাধীনতার রূপকার এবং জতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হন এবং দেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। শোকের এ দিনে জাতি যেন আশার আলো হিসেবে অপারেশন জ্যাকপটকে নিতে পারে- এ প্রত্যয় ব্যাক্ত করছি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top