লাইফস্টাইল

পুরুষবাদ বনাম নারীবাদ: বাদ পড়ছে ভালবাসা!

নিয়ন আলোয়

ঘটনা ১ঃ

সকাল ৮ টায় ধানমন্ডী থেকে গুলশান যাচ্ছি। ফিরোজ আহমদের গাড়ীতে।
ফিরোজ আহমেদ। বয়স বেশী হলে ৩৫। পার্ট টাইম উবার ড্রাইভার। সকাল পাঁচটায় গাড়ী নিয়ে বের হন।
ফিরোজ সাহেবের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। এটা তার নিজেরই গাড়ী। ফিরোজ সাহেব সকাল ৫ টা থেকে সকাল ১০ টা পর্যন্ত আবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত উবারে সার্ভিস দিচ্ছেন। এখান থেকে মাসে আসে ৫০,০০০/-। মাঝখানের সময়টায় গাড়ী এক অফিসের বিদেশী ভদ্রলোকের পার্সোনাল ব্যাবহারে ভাড়ায় খাটান মাসে ৭৫ হাজার টাকায়। মোট ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে আয় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।

পথিমধ্যে হঠাৎ তার স্ত্রীর ফোন। ফোনালাপে ওপার থেকে অল্প সাউন্ডে কিন্তু পরিস্কার যা বুঝা গেল-
:: তুমি খেয়েছো?
– তুমি তো জানো, আমি এত সকালে খাই না। ১০ টার আগে খাওয়া হয় না। শুধু শুধু প্রতিদিন একই প্রশ্ন কেন করো?
:: টিফিন ক্যারিয়ারের খাবার খেয়ে নিও
– নাসিমা (তার মেয়ে) কি ঘুম থেকে উঠেছে?
:: না, উঠে নাই। তুমি খেয়ে নিও।

ফিরোজ সাহেবের স্ত্রী প্রতিদিন রাত তিনটায় উঠে ভাত তরকারী রান্না করে সাথে দিয়ে দেয় সময় করে খেয়ে নেয়ার জন্য।
তিনি চাইলেই আগেরদিন রান্না করে ফ্রিজের খাবার ওভেনে গরম করে ফিরোজ সাহেবকে দিতে পারতেন। ফিরোজ সাহেব তার স্ত্রীকে এত কস্ট করে ঘুম ভেঙে রান্না করতে বারনও করেছেন। কিন্তু তার স্ত্রী শুনেন নি।
মেয়েরা মা’য়ের জাত কথাটা বাঙালীর জন্য প্রযোজ্য ছিল। সেই আদিকালে। কখনো স্ত্রী মায়ের ভূমিকায়, কখনো বোন মায়ের ভূমিকায়, কখনো মেয়ে মায়ের ভূমিকায়।
কিন্তু, এখন ফ্রিজ-ওভেনের রাজত্বে জাত-কুল সব মিলিয়ে যাচ্ছে।

উপরের ঘটনায় কেউ কেউ নারীবাদী ও পুরুষতান্ত্রিকতার কথা তুলেছেন। পুরুষতান্ত্রিক পুরুষরা তো এমনটা চায়… ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঘটনা ২ঃ

এখন আসি আরেকজন চালকের কথায়। গত মাসে মালয়শিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে ট্যুরে যে গাড়ীতে দু’দিন ঘুরেছি, গাড়ীর চালকের নাম মি. সাথিয়া।

সাথিয়ার আদি নিবাস ভারতের তামিল নাড়ু। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে তার দাদামহ পরিবার সহ মালয়শিয়া সেটেল হয় তখনকার বৃটিশ আমলে। যখন বৃটিশ সরকার মালয়শিয়ার রেলপথ/সড়কপথ উন্নয়নের কাজ শুরু করে। তার দাদা মূলত শ্রমিক হিসেবেই এখানে আসেন।

সাথিয়াকে দেখলেই মনে হয় সে তার পেশায় যথেস্ঠ পরিশ্রমী, সৎ ও ডেডিকেটেড। তার প্রমান, হোটেলে বসে রাত ১২ টার সময় তাকে মেসেজ দিয়েছিলাম, আগামীকাল সকাল কখন আসবে। সে সাথে সাথেই প্রতিউত্তর দিয়েছে।

সাধারনত আমাদের বাংলাদেশীদের ধারনা যে গাড়ী চালায় সে শুধুই ড্রাইভার। তার অন্য কোন পরিচয় নেই।

মালয়শিয়া থেকে ঢাকা আসার দিন হোটেল থেকে পিক করার সময় অনেক গল্পের এক পর্যায় জানতে পারলাম, মি. সাথিয়া শুধু ড্রাইভার না, সে একটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল ও ট্যুরিজমের এমডি এবং সিইও। আর এই গাড়ীটা সহ আরো তার নিজের ২০টা গাড়ী আছে।

এগুলো শুনে বাংলাদেশীদের ভিমরী খাওয়ার মত অবস্থা হয়। আমারও হয়েছিল। কারণ এদেশে এমন কোন বিত্তশালী বা কোন কোম্পানীর এমডি নিজে ট্যুরিস্টদের নিয়ে ড্রাইভিং করবে, এটা ভাবা যায় না। কারন এদেশে কেউ কিছু টাকা খরচ করে একটা কোম্পানী খুলে এমডি হতে পারলে টেবিলের উপর পা তুলে এসির বাতাস খাওয়া শুরু করে।

তাহলে কিসের স্বার্থে মি. সাথিয়া নিজেই ড্রাইভিং করে? কারন, গুড উইল ও ব্যাবসার প্রসার। কিরকম? এই যে নিত্য নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। ভালো ব্যাবহার করে। দায়িত্বে সচেতন। ২৪ আওয়ার্স সার্ভিস। এই করে করেই সে তার ব্যাবসার প্রসার ঘটিয়েছে।

গুড উইল এমন এক জিনিস যা একজন মানুষের মাধ্যমে ১০ জন, দশ জনের মাধ্যমে ১০০ জন। এভাবে হাজারো হাজারো। এই সমীকরনের মাধ্যমেই এখন তার ২০ টি গাড়ী। তাই এই সহজ সমীকরনটা মি. সাথিয়া কোনভাবেই মিসইউজ করতে চায় না।

গল্পের এক পর্যায়ে সাথিয়ার পরিবারের কথা জানতে চাইলাম। এক ছেলে ও এক মেয়ে। এক সময়ে হতাশকন্ঠে বললেন, এখন বিকেল পাঁচটা, অথচ কি খেয়েছে, কেমন আছে, বউ এখনো কোন খবর নেয় নি।

বেচারা যে খুব কস্টে আছে, বুঝা গেল। সে শুধু একটা ফোন কলের আশা করেছিল। প্রিয়জন একটু খোঁজ নিবে, এটুকু তো আশা করতেই পারে। এই আশা করাটাও কি নারীত্বকে ছোট করা হয় বা পুরুষত্বকে জাহির করা হয়? কিন্তু এগুলোকে সে পাত্তা দেয় না। এগুলোকে পাত্তা দিলে তো আর দিন চলবে না। এন্ড অব দ্যা মান্থ সংসার সচ্ছলভাবে চলানোর জন্য টাকা দরকার।

পরিশেষেঃ

একজন আরেকজনের প্রতি সহানুভূতি, শ্রদ্ধাবোধ দেখানোটাই সম্পর্ক। যারা একে অপরের প্রতি যতটা সহানুভূতিশীল, সহমর্মী তাদের সম্পর্কের ভিতটাও ঠিক ততটাই মজবুত।

একজন নারী তার সহযোগীর (স্বামী শব্দটায় আমার আপত্তি আছে। স্বামী অর্থ প্রভু। সহযোগী যদি প্রভু হয়, তাহলে আর সহমর্মীতা থাকে না) জন্য সহানুভূতি হয়ে ঘুম ভেঙে রান্না করে, ফোন করে খোঁজ খবর নেয়, তাহলে বোধ করি নারীত্বে টান পরে না বা স্মার্টনেসেও ঘাটতি ঘটে না। ঠিক তার সহযোগী পুরুষ মানুষটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পুরুষ মানুষটি যদি তার সহযোগিনীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, শ্রদ্ধাবোধ দেখায় তাহলে তারও পুরুষত্বের স্মার্টনেসে টান পড়ে না।

একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা ছাড়া দুজন নারী-পুরুষ একসাথে বাস করা সম্ভব না। যদি বাস করে, সেটা মূলত ভোগের জন্য, তাদের সম্পর্কটাও মূলত ভোগের।

নারীবাদী-পুরুষতন্ত্র এগুলো মূলত ভোগবাদী তত্ব। প্রয়োজন মানবতাবাদী হওয়া, যা একে অপরের প্রতি সহযোগীতা, সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধ বাড়াবে। সেটা ঘরে হোক আর বাইরের কর্মস্থলেই হোক।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top