বিশেষ

মোটিভেশন, পরকীয়ার স্বাধীনতা এবং রাস্তায় মূত্রবিসর্জন কাব্য

নিয়ন আলোয়

গত মাসের শেসে আট দিনের জন্য কানাডায় গিয়েছিলাম ভ্যানকুভারে। উদ্দেশ্য, সারা পৃথিবীতে যারা কম্পিউট্যাশনাল লিউঙ্গুইস্টিক্সে কাজ করে সুনাম কুঁড়াচ্ছেন সেইসব রথী মহারথীদের কাজকর্ম দেখা, তাহাদের সহিত পরিচিত হওয়া, আইডিয়া শেয়ার করা এবং নিজের কাজ বিক্রি করা।

১) কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন থেকে মন খারাপ হওয়া শুরু হলো। কারণ, হঠাৎ মনে হলো পিএইচডির কাজকর্মে তেমন ভালো করতে পারছি না। এখনো কোন হাইফাই পেপার বের করতে পারলাম না। দুনিয়ার সবাই ফাটিয়ে ফেলছে। যেই পরিমাণ মন খারাপ হয়েছে তার কারণে সেই যে গত রবিবারে এসেছি, পুরো উইক কাজ করেছি সিরিয়াসলি। আজকে উইকেন্ডের রাতে মনে হলো একটু জনসেবা করি। তাই ফেসবুকে দেশ উদ্ধার করছিলাম। এই যে মোটিভেশনটা পেলাম কনফারেন্সে গিয়ে কাজ করার সেটার কোন বিকল্প কোন ভ্লগ বা মোটিভেশনাল সেমিনার হতে পারবেনা।

২) হিউস্টনে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়া হয়না। নিজের গাড়ি ছাড়া চলাফেরা শক্ত। ভ্যানকুভারের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অতি চমৎকার। তো একদিন কনফারেন্সের পরে সামান্য ঘোরাঘুরি করে স্কাইট্রেনে উঠলাম হোটেলে ব্যাক করবো। রাত বাজে বারটার কাছাকাছি। পাঁচ স্টপ পরে হোটেল। যেই বগিতে উঠে বসছি সেখানে আমি বসার পরে দুইটা সিট খালি। পরের দুই নাম্বার স্টপে তিনটা মেয়ে উঠলো। উঠে তিনটা সিট খালি নাই দেখে তিনজনই দাঁড়িয়ে রইলো। খুব সম্ভবত কোন নাইটক্লাব থেকে পার্টি করে আসছে, দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে দেখে বুঝা যায়। আমাদের দেশী মুমিনীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের কাপড় চোপড় এ সমস্যা ছিলো। একটু পরে দুইজন দুইটা খালি সিটে বসে গেলো। একজন দাঁড়ানো। আমার তো দেশী অভ্যাস। বাসে মেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সিট ছেড়ে দিতাম। আমি উঠে দাঁড়ায়া বললাম বসতে। চোখে পুরা আগুন নিয়া তাকালো। আশেপাশের সবাই কেউই এতক্ষণ মেয়েগুলার দিকে ফিরেও তাকায় নাই। আমার এই কাণ্ডে এরা আমার দিকে এমনভাবে তাকালো বুঝলাম বিশাল অপরাধ করে ফেলেছি। দেশ থেকে যে মেলা দূরে এটা তো আর আমার মনে নাই। অভ্যাসবশত করে ফেলেছি। যাই হোক, তাদের দৃষ্টি এতই কঠিন ছিল যে বলতে বাধ্য হলাম, “আমি পরের স্টপে নামবো। তোমাকে টায়ার্ড মনে হচ্ছে। বসে যাও।” পরে আর কি। এক স্টপ আগে নামলাম। অনেক হেঁটে হোটেলে পৌঁছালাম।

৩) গত নভেম্বরে আরেকটা কনফারেন্সে গিয়েছিলাম। এই দুই কনফারেন্সে আমার এই দেশী চোখে একটা জিনিস ব্যাপকভাবে আটকিয়েছে। সেটা হলো ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোন ডিফারেন্স নাই। সবাই রিসার্চার। আমাদের দেশে আমরা মেয়েদেরকে কোন কিছুতে ইন্ডিপেন্ডেন্টলি এত একটিভ থাকতে বা এগিয়ে থাকতে দেখি নাই। কালচারাল শক বলতে যদি কিছু খেয়ে থাকি এই দুই বছরে, তাহলে এইটা হচ্ছে সবচাইতে মেজর। অনেক নারী প্রফেসর, পিএইচডি স্টুডেন্ট, চাকরিজীবীর সাথে পরিচয় হইসে। তাদের কাজের গণ্ডিকে কোনভাবে সেক্সুয়ালিটি দিয়ে মাপা যায় না। ইভেন এই কনফারেন্সে বেস্ট রিসোর্স পেপারের এ্যাওয়ার্ড পেয়েছে এলেনা স্যুর নামের একটা মেয়ে। ফার্স্ট ইয়ার পিএইচডি স্টুডেন্ট। তার সাথে জিনিয়া আপুর কল্যাণে পরিচয় হয়েছিল। তার কাজের বিবরণ শুনে অটোমেটিক মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে, তোমার ডেডিকেশন লেভেলের ১% যদি আমার ব্রেইনে থাকতো। মেয়েটার খুবই অবাক হওয়ার কথা। কারণ কথাটা যথেষ্ট উইয়ারড ছিল ওই মোমেন্টে। তার পেপারটা পড়েছি। নাইস জিনিস।

অত দুরে অবশ্য যাওয়া লাগেনা। আমার প্রফেসরও নারী। বাসায় দুইটা পিচ্চি সামলায়। ল্যাবে আটটা পিএইচডি স্টুডেন্ট, চার পাঁচটা মাস্টার্স এর স্টুডেন্ট, দুইটা পোস্টডক সামলায়, ফান্ডের এপ্লিক্যাশন লেখে, সারাদিন মিটিং করে। তার এনার্জির অর্ধেকও আমার নাই। এইরকম অমানুষের মত পরিশ্রম করতে দেখতাম ডঃ জাফর ইকবাল স্যারকে।

যাই হোক, দুই আর তিন নাম্বার পয়েন্টের উদ্দেশ্য হইলো নারী স্বাধীনতা। আমি আগে যতই খচ্চর টাইপের থাকিনা কেন গত পাঁচ ছয় বছরে আমি যথেষ্ট লিবারেল, ওপেন মাইন্ডেড হয়েছি, নিজেকে অনেক ইম্প্রুভ করেছি। আমেরিকায় দুই বছর ওপেনলি অনেকের সাথে মিশার পরেও হঠাৎ করে কনফারেন্সে গেলে কেন এখনও মেয়ে ছেলে একই পাল্লায় কাজ করছে সেইটা দেখে অবাক হই জানিনা। খুব সম্ভবত কালচার অনেক ডিপ রুটেড জিনিস বলে। কিন্তু আমি অপরাধবোধে ভুগি এভাবে চিন্তা আসার কারণে। এইসব দেশে এটা খুবই নরমাল। কারণ এখানে ছেলেরা মেয়েদেরকে আমাদের মত শুধুমাত্র ভোগ্যপণ্য ভাবেনা, রাত বারটায় কাপড় ছাড়া ঘুরলেও তাকাবেনা। নারীবাদীরাও খুব সম্ভবত নারী স্বাধীনতার ব্র্যান্ডিং পরকীয়ার স্বাধীনতা আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার অধিকারের মাধ্যমে করেনা। দুই পাশেরই চেষ্টা থাকে প্রত্যেকে যাতে নিজের ইচ্ছামত চলাফেরা করতে পারে, কাজ করতে পারে।

অনেক কিছু শেখার বাকী।

আরো পড়ুনঃ মোটিভেশনাল স্পিচের পিছনের না বলা কথাগুলো…

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top