নাগরিক কথা

সমাজ নিজেই যেখানে অপরাধী

নিয়ন আলোয়

এক ছেলে চাকুরি পেলেই হলো। আর চিন্তা করতে হবে না। সে বাকি সবাইকে টেনে তুলবে। কিন্তু কিভাবে টেনে তুলবে , তার কোনো ব্যাখ্যা নেই কারো কাছে! কেউ ব্যাখ্যা জানতেও চায় না। জানার প্রয়োজনও আছে বলে মনে করে না কেউ। সবাই বলতে থাকে, আপনার ছেলে বিসিএস ক্যাডার, টিএনও, ডিসি, ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার। অরে বাবা! টাকা আর টাকা! মূর্খ পিতা-মাতা সমাজের মানুষের অপব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত হয়। সন্তান যখন মূর্খ পিতা মাতাকে বুঝাতে থাকে, আমার তো আয় সীমাবদ্ধ। নির্দিষ্ট বেতনের চাকুরি। এ বেতন দিয়ে তো আমি নিজেই চলতে পারি না। বাকি তিন ভাইকে ছয় সাত লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ পাঠাবো কিভাবে? এত টাকা কোথা থেকে আসবে? কিন্তু পিতা মাতা এসব ব্যাখ্যায় কর্ণপাত করতে নারাজ! তারা মনে করে ছেলের অবশ্যই লাখ লাখ টাকা! তাই তারা ছেলের ব্যাখ্যা বিশ্বাস করতে নারাজ। এ ক্ষেত্রে ছেলেকে যে কোন একটি পথ অবলম্বন করতে হয়। হয় সে সততা বজায় রেখে চাকুরি করবে নতুবা সে কর্মস্থলে দুর্নীতি করবে। সততা বজায় রাখতে গেলে সে তার পিতা মাতা, ভাই বোনের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হবে। ভাই বোনেরা মনে করবে, তার অনেক টাকা থাকা স্বত্ত্বেও সে আমাদেরকে না দিয়ে নিজে আরাম করে জীবন উপভোগ করতেছে আর আমাদের সামনে কিছু না থাকার ভান করতেছে। এভাবে ভাই বোনদের মধ্যে অবিশ্বাস, দূরত্ব, হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। পরিবার ও সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে অবিশ্বাসের কারনে পিতা মাতা ভাই বোনের প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য নবীন চাকুরীজীবী কর্মস্থলে দুর্নীতি করতে বাধ্য হন। আর একবার দুর্নীতি শুরু করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা আর থামে না।

তাই একটিমাত্র সন্তান বা একটিমাত্র ভাই বা বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে পিতা মাতা বা অন্য ভাই বোনেরা যেন অবহেলায় বা অহেতুক সময় নষ্ট না করে। কেননা এটা থেকেই পরবর্তীতে সব ধরনের ভুল বুঝাবুঝি, অবিশ্বাস, হিংসা বিদ্বেষ, পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতা, হানাহানি সৃষ্টি হয়। দেখা যায় এই অবিশ্বাসের কারনে বাকি ভাই বোনেরা তার ইতিবাচক পরিকল্পনা বা উপদেশ না মেনে বরং ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে। সদ্য চাকুরিপ্রাপ্ত ভাইটি নিজের বাকি ভাই বোনগুলোকে পরামর্শ/উপদেশ দেয় এবং ব্যবস্থা করে দেয় কিভাবে অল্প থেকে শুরু করে চেষ্টা পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। কিন্তু বাকি মূর্খ বা অর্ধশিক্ষিত ভাই বোনগুলি সেই উপদেশ এবং ব্যবস্থা মেনে নিতে নারাজ। তারা অল্প থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সাবলম্বী হতে নারাজ। তারা চায় নগদ লাখ লাখ টাকা। পরশ্রীকাতর লোকেরা ভাই বোনদেরকে উসকে দেয়। ফলে তছনছ হয় রক্তের বন্ধন! অবকাঠামোগত অপচয় হয়। কারন দেখা যায়, একটি মাত্র সন্তান বা ভাই বা বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বাকি ভাই বোনেরা যে সময় নষ্ট করে আর স্থবির হয়ে বসে থাকে, সে সময়টুকু তারা যদি নিজেরা চেষ্টা করতো, তাহলে তারা নিজেরাও ততদিনে কম – বেশি স্বাবলম্বী হতে পারতো।

আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, “সালাত আদায় শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো আর আমার অনুগ্রহের অনুসন্ধান করো” , (সুরা আল জুমা -১০)। এখানে অনুগ্রহের অনুসন্ধান বলতে জীবিকা অন্বেষণ বুঝানো হয়েছে। সেখানে বলা হয় নি, “একটিমাত্র ভাই বা বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বাকি ভাই বোনেরা সময় নষ্ট করো”। শুরু থেকেই প্রত্যেকটি পরিবারের প্রত্যেকটি সন্তান যেন নিজ চেস্টায় স্বাবলম্বী হতে চেস্টা করে। অধিকাংশ সরকারি ও প্রাইভেট চাকুরির বেতন এমন যে, সেটা দিয়ে সেই চাকুরীজীবী নিজেই ঠিকমত চলতে পারে না। সেই চাকুরি পেতে পেতে তার একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে যায়। এই বয়সে যদি সে তার বাকি পাঁচ ছয়টি ভাই বোনের স্বাবলম্বী করার দায়িত্ব নিতে হয় , তাহলে সে নিজে বিয়ে করবে কবে? নিজের সন্তানকে মানুষ করবে কবে? তাই অমুকের ছেলে বিসিএস ক্যাডার, টিএনও, ডিসি, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যাংকার হয়েছে। অতএব লাখ লাখ টাকা- এই উদ্ভট, অবাস্তব, সমাজ ধ্বংসকারী প্রচারনা বন্ধ করতে হবে। এ ধরনের প্রচারনা মানেই নবীন চাকুরীজীবীকে ঘুষ, লুটপাট দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়া।

পরিবার ও সমাজ যখন নবীন চাকুরীজীবীর ব্যাপারে ‘অনেক টাকা’র কথা প্রচার করে তখন সে এই ‘অনেক টাকা’র স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য দুর্নীতি শুরু করে। অতএব দোষ তার নয় , দোষ পরিবারের , সমাজের। পিতামাতাকে বরং এ ধরনের চিন্তা করতে হবে যে, আমরা প্রয়জনে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকবো , তবু আমার সন্তান যেন করমস্থলে দুর্নীতি না করে; আমরা সন্তানের হারাম আয় খাবো না। তাহলেই শুধু সন্তানের পক্ষে দুর্নীতিমুক্ত থাকা সম্ভব হবে।

সামাজিক এই অপপ্রচার সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ডাক্তারের জীবনে। চ্যালেঞ্জ করেই বলা যায় , ‘ডাক্তার মানেই কোটি কোটি টাকা’- এই কুধারনা আর কুপ্রচারের কারনে নবীন ডাক্তারেরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। কারন, যেহেতু সবাই মনে করে ডাক্তার মানেই কোটি কোটি টাকা, তাই পরিবারের কেউ ডাক্তার হওয়া মাত্র পরিবারে বাপ মা সহ সবাই তাদের চাহিদার তালিকা হাতে নিয়ে টাকার জন্য নবীন ডাক্তারের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। সমাজের লোকেরা কোন অনুষ্ঠান বা মসজিদ / মাদ্রাসা বা মাহফিলের জন্য নবীন ডাক্তারের কাছে মোটা অঙ্কের ‘দান’ প্রত্যাশা করে। যাবতীয় পারিবারিক আর সামাজিক চাপে বাধ্য হয়ে নবীন ডাক্তার কথিত ‘কোটি টাকা’র স্ট্যাটাস রক্ষার জন্য দুর্নীতি শুরু করে। বিপরীতে নবীন হওয়ার কারনে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে ধরে নিয়ে অনেকেই তার কাছে প্রাইভেট চিকিৎসা নিতে যায় না। তাছাড়া ইন্টারনী শেষ হওয়ার পর তাকে সরকারি চাকুরি পাওয়ার আগে পর্যন্ত পরবর্তী লেখাপড়া করার জন্য অন্তত ৫ বছর সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনা বেতনে প্রশিক্ষন করতে হয়। এমন অবস্থায় সে ঠিকমতো নিজের আর্থিক খরচই যোগাতে পারে না। লাখ/ কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে?

কয়জন ডাক্তার কোটি কোটি টাকা আয় করেন? হাতেগোনা যে ২, ১ জন কোটি টাকা আয় করেন , তারা সেটা করেন বয়স ৪০ বছর পার হওয়ার পর। তাই চ্যালেঞ্জের সাথেই বলা যায়, ‘ডাক্তার, বিসিএস ক্যাডার, ব্যাংকার ইত্যাদি মানেই কোটি কোটি টাকা’ – এই জঘন্য কুসংস্কার দূর না হলে কর্মস্থলে দুর্নীতি যেমন কমবে না তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতাও কমবে না।
কিছু ব্যাতিক্রম থাকবে, ব্যাতিক্রম কখনোই উদাহরণ নয়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top