বিশেষ

তারেক মাসুদ- নিভৃতচারী এক ছবিকারিগর

মণিপুরীপাড়ার পাশের গলিটিতে প্রায়ই এক বিদেশিনী হেঁটে যান। পরনে শাড়ি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। কারো সাথে দেখা হলেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন, “ভালো আছেন?”

বিদেশিনীর নাম ক্যাথরিন মাসুদ। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সহধর্মিণী। ক্যাথরিন মাসুদ যেমন সদা হাস্যময়ী, তারেক মাসুদ ছিলেন তার উল্টোটা। স্বল্পভাষী, অন্তর্মুখী একজন মানুষ। যিনি জীবনকে দেখেছেন ভিন্ন আংগিকে, একটু অন্য চোখে।

তারেক মাসুদের জন্ম ফরিদপুরের ভাংগা উপজেলায়। মা নুরুন নাহার মাসুদ এবং বাবা মশিউর রহমান মাসুদ। ভাংগা ঈদগা মাদ্রাসায় শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষায় পাস করেন এসএসসি। তারপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইতিহাস বিভাগে। মাদ্রাসায় ছবি আঁকা নিষিদ্ধ বলেই হয়তো চারুকলা নিয়ে তৈরী হয় তাঁর আগ্রহের জায়গা। তার বেশ কজন বন্ধু ছিলেন চারুকলায়। তাদের সাথে প্রায়সময়ই পড়ে থাকতেন আর্ট কলেজে। পরে তো অনেক ছাত্র মনে করত উনি আর্ট কলেজেরই স্টুডেন্ট বুঝি!

neon aloy তারেক মাসুদ নিয়ন আলোয়

স্ত্রী ক্যাথেরিনের সাথে তারেক মাসুদ

চারুকলায় যাওয়া আসার সূত্রে তার আগ্রহ জন্মায় এস এম সুলতানের উপর। তাঁর সান্নিধ্যে থাকার জন্য তিনি তাঁর সাথে ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামে। তাঁকে নিয়ে তিনি তৈরী করেন প্রামাণ্যচিত্র “আদম সুরত”। সময়টা তখন ১৯৮২। অবশ্য কলেজে পড়াকালীন সময়েই তিনি যুক্ত হন ফিল্ম সোসাইটির সাথে। এই সময়টাকে বলা যায় তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। তার ভাষ্যমতে এর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্জ্ঞান! ছিলেন শিল্প সংস্কৃতি থেকে বেশ দূরে। এই সময়ে তিনি দেখেন বেশ ভালো ভালো কিছু চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র। সর্বভূক পাঠকের মত পড়ে ফেলতেন যেকোন বই। শিল্প জিনিসটা নতুন করে ধরা দেয় তাঁর চোখে। আদম সুরতের কাজ শেষ হয় ১৯৮৭ সালে। অবশ্য এর মাঝেই তিনি নারী নির্যাতন নিয়ে আরেকটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরী করেন, নাম “সোনার বেড়ি”

আদম সুরতের কাজের শেষ পর্যায়ে তাঁর পরিচয় হয় ক্যাথরিনের সাথে। বোহেমিয়ান স্বভাবের তারেক মাসুদ এবার একটু থিতু হন। তাঁর কাজে তাঁর সাথে হাল ধরেন ক্যাথরিন। বেশকিছু প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা কাজ করেন একসাথে। ক্যাথরিনের সাথে আমেরিকা গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় লিয়ার লেভিনের সাথে। তার কাছে তিনি পান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দুর্লভ কিছু ফুটেজ।

neon aloy তারেক মাসুদ নিয়ন আলোয়

ক্যামেরার সহযোদ্ধা মিশুক মুনীর, একইসাথে স্বর্গের পথে পা বাড়িয়েছেন দুই বন্ধু

তারেক মাসুদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেন। তবে তিনি তার ছবিতে সশস্ত্র যুদ্ধ কম, বরং মুক্তিযুদ্ধের অন্য দিকগুলোই বেশি উঠে এসেছে। স্বকীয়তার পরিচয় দেন এখানেও। “মুক্তির গান” ছবিটির কাহিনী মুক্তিযুদ্ধে যারা গান গেয়ে যুদ্ধে অংশ নেন তাদের নিয়ে। আর মুক্তির কথা ছবিতে বলেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে।

২০০২ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম ফিচার চলচ্চিত্র “মাটির ময়না”। এই সিনেমাটিকে বলা যায় বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটি মাইলফলক। মূলত এই ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি। এটি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র যেটি সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমী পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। বাংলা চলচ্চিত্রকে নতুন এক মাত্রা এনে দেওয়া এই ছবিকারিগর ২০১২ সালে পান একুশে পদক।

neon aloy তারেক মাসুদ নিয়ন আলোয়

শুটিং এর অবসরে

তাঁর বানানো আরো কিছু চলচ্চিত্র হল রানওয়ে, A kind of childhood, In the name of safety, Voices of children, নারীর কথা। তাঁর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র “অন্তর্যাত্রা”। এই ছবিটি তিনি বানান মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। এক ধরণের আত্মপরিচয়, অনেকটা নিজের শেকড়ের খোঁজ করতে।

অন্তর্যাত্রার পর তিনি শুরু করেন মাটির ময়নার সিক্যুয়েল তৈরীর কাজ- নাম “কাগজের ফুল”। এই ছবির লোকেশন দেখে ফেরার পথেই মানিকগঞ্জে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট বাংলা চলচ্চিত্রের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র হারিয়ে যান আমাদের মাঝে থেকে।

তারেক মাসুদ ছবি বানাতে এসেছেন অনেক সীমাবদ্ধতা, অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে। যে মানুষটার ছবি বানানোর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো দূরের কথা, ছবি বানানোর জন্য পারিপার্শ্বিক অবস্থাই অনূকূল ছিলনা, সেই মানুষটাই সম্পূর্ণ নিজ আগ্রহে হাত দেন ছবি বানানোতে। আমাদের এই চারপাশের জগতটাকে আমাদের দেখাতে চেয়েছেন একটু অন্যচোখে।

তার খুব বেশি চলচ্চিত্র হয়তো পাইনি আমরা। কিন্তু যে কয়টি ছবি বানিয়েছেন তাতেই বাংলা চলচ্চিত্রে এনে দিয়েছেন ভিন্ন এক মাত্রা। অনেক পরিচালক এখন ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করছেন। নতুন ধারা এসেছে বাংলা ছবিতে। এই নবীন চলচ্চিত্রকারদের পথিকৃৎ হয়ে থাকবেন তারেক মাসুদ। বাংলা চলচ্চিত্রের এই ছবি কারিগরকে জানাই অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top