নিসর্গ

কাশ্মীরের গল্পকথা (ষষ্ঠ পর্ব)– ২১০০ রুপির আলপিন বুকে!!

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (পঞ্চম পর্ব) – সবুজে সাজানো গুলমার্গ]

২১০০ রুপির আলপিন আমার বুকে বেঁধেছিল গুলমার্গে গিয়ে!!

বলেন কি ভাই? আপনি কি মানুষকে গাধা পেয়েছেন? নাকি অবোধ, অবুঝ বা পাগল? যে বললেন ২১০০ রুপির আলপিন আপনার বুকে বেঁধেছে! আর সেই আলপিনের ব্যাথা সয়ে, জীবিত ফিরে এসে আমাদেরকে গল্পও শোনাচ্ছন?

ফাইজলামি রাখেন মিয়া!

ভ্রমণ গল্প, তার সাথে ২১০০ রুপির আলপিনের কি সম্পর্ক?
আর তাছাড়া ২১০০ রুপির আলপিন হয় নাকি কখনো!

খুব অদ্ভুত একটা শিরোনাম তাই না?

চলুন একটু সময় নষ্ট করে গল্পটা পড়ি বা শুনি, তাহলেই বুঝতে পারবেন ২১০০ আলপিন কাকে বলে, কত প্রকার আর কি কি? এবং কিভাবে? তখন আপনিও হয়তো স্বীকার করবেন বা নিজেই কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবেন ২১০০ রুপির আলপিন কি? আর তাতে করে ভবিষ্যতে আপনার লাভ বৈ ক্ষতি হবেনা সেটা হলফ করে বলতে পারি।

তো চলুন গল্পটা শুনি এবার।

কাশ্মীর যাবার পরিকল্পনার শুরু থেকে অনলাইন আলোচনা, ইনবক্স পরামর্শ, ফোনে উপদেশ, আর একদম শেষে হাউজ বোটের মালিক পই পই করে বলে দিয়েছে, গুলমার্গে গিয়ে যেন ঘোড়ার মালিক বা দালালের খপ্পরে না পরি। এটা একটা বাজে খরচ, এখানে যা করার নিজেরাই করতে পারবো। কারো কোন রকম সাহায্য লাগবে না, কোন কারণেই ঘোড়া নিতে হবে না। খুব সাবধান, নিজেদের কাজ নিজেরাই করে নেবেন।

সেভাবেই খুব শক্ত মনোবল আর সাহসিকতার সাথে গুলমার্গের ঠিক আগে শেষ চড়াই আর শেষ পাহাড়ের ভ্যালীতে ওঠার সময় গাড়ি ধীর হতেই এক গাইড অনেকটা জোর করেই আমাদের গাড়িতে উঠে পড়লো এবং উঠে পরেই গাড়ির জানালা গুলো লাগিয়ে সবাইকে একটা মানসিক ধাক্কা দিল না যেন কি না কি হয়?

এবার খুব সাবধানে, বিশেষ ভঙ্গিমায় আর ভয় আতঙ্ক ধরানো ছল-চাতুরীতে সবাইকে ঘোড়া নেবার উপকারিতা না নেবার অপকারিতা, আর ওখানকার গাইড ও দালালদের নানা রকম ভয় দেখিয়ে মানসিকভাবে প্রায় সবাইকে ঘোড়া দিতে রাজি করিয়ে ফেলল! সেটাও সারাদিনের জন্য আর ইচ্ছামত ঘোড়ায় ঘোরার লোভ দেখিয়ে! আমি মনে মনে প্রলাপ গুনছি যে হায়রে ধরাটা খেয়েই না যাই, সবাই যেন কঠোর থাকতে পারে ঘোড়া নেবে না সেই পণ করে। তখনও গাইডকে কোন কিছু বলা হয়নি।

এরই মাঝে আমাদের চার পরিবারের এক জনের মিসেস বলে উঠলেন, “জীবনে একবারই কাশ্মীর এসেছি, আর জীবনে আসা হয় কি না হয়, এতো খরচ করবে একটু ঘোড়ায় না চড়লে কি হয় বল?”

ব্যাস আর যাবে কোথায়? এই কথা বলে তিনি অন্য ভাবীদের দিকে তাকাতেই, তারাও একই রকম সম্মতি আর ইচ্ছার কথা চোখ আর অভিব্যাক্তিতে বোঝাতে লাগলেন। এখন আমরা আর কি করতে পারি, এই একটি ঘোড়ায় চড়া মাত্র ৭০০ টাকার জন্য কথা শুনতে হবে নাকি? আর কারনে বা অকারণে নানা রকম অতৃপ্তির খোটার মধ্যে তখন তো এটা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম খোটা হিসেবে সবার আগে চলে আসবে।

তাই অনেকটা নিমরাজী হয়েই সবাইকে রাজী হতে বাধ্য হতে হল, মানসিক আর আর্থিক অসঙ্গতি নয়, অপচয়ের বাঁধা সত্ত্বেও। বৌদের কাশ্মীর এসে প্রথম আর একমাত্র চাওয়া বলে কথা, এ আর কে ফেলতে পারে বলুন!

সেই থেকে আমার বুকে আলপিনের খোঁচা লাগতে শুরু করলো ধীরে ধীরে যেটা ২১০০ রুপির বিশাল এক আলপিনে পরিণত হতে লাগলো! আর একটু ছোট আলপিনের খোঁচাতেই যে পরিমান পেইন হয়, সেখানে ২১০০ রুপির আলপিনে কতটা পেইন আর অসহ্য ছটফটানি যন্ত্রণা হতে পারে ভাবতে পারেন?

আচ্ছা ভালো কথা একটা ঘোড়ার ভাড়া মাত্র ৭০০ রূপী হলে আমার কিভাবে ২১০০ রুপির ঘোড়া বা আলপিনের খোঁচা লাগলো?

ভাইরে আমি অংকে খুব কাঁচা হলেও এই টাকার অংকে, বিশেষ করে ভ্রমনে বেরিয়ে টাকার হিসেবে খুব না একটু বেশীই ভালো বুঝলেন। নইলে কি ২০০০ টাকায় মিরিক, ৪০০০ টাকায় রিশপ-লাভা আর ৫০০০ টাকায় সান্দাকুফু ঘুরে আসতে পারি?

কারন একটা ঘোড়ার ভাড়া ৭০০ টাকা হলেও আমাকে যে তিন তিনটা ঘোড়া নিতে হবে! ভাবতে পারেন? তিনটা ঘোড়া নেয়া মানে এক টানে ২১০০ রুপির আলপিনের খোঁচা লাগা! শুধু বুকে নয় কলিজায়! এখানে শুধু চিনচিনে ব্যাথা হয়না, অনবরত রক্ত ক্ষরণ হয়।

সেটাও যখন দেখা গেল আমি ঘোড়া নেব না বলাতে কাউকেই দেবে না বলে দিল! এমনকি বাপ-বেটার এক ঘোড়া নিলেও কাউকে ঘোড়া দেবেনা বলে মানসিক ভাবে ব্লাক মেইল করতে শুরু করলো! অগত্যা অন্য সবার কথা ভেবে আমাদের তিন জনকেই তিনটা ঘোড়া নিতেই হল। মানে ২১০০ টাকার আলপিনের খোঁচা লাগতে শুরু করলো অনবরত।

সেই ২১০০ রুপির আলপিনে খোঁজা ধীরে ধীরে আরও গভিরে বিঁধতে লাগলো যখন, ২০ মিনিটের গণ্ডোলা রাইডের কাছে নিয়ে গিয়ে, পরে আবার নেমে আসার পরে মাত্র ৩০ মিনিট, কোন অরণ্য, পাইন বন বা পাহাড়ি রোমাঞ্চকর রাস্তায় রাইড না দিয়ে, মিহি পিচ ঢালা রাস্তায় ঘোড়ায় চড়িয়ে বা হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এসে নামিয়ে দিয়ে পুরো সবাইকে এক একটা বলদ বানিয়ে ছেড়ে দিল। এবং পরে পেহেলগামে গিয়ে ৫০০ রুপীতে অনবদ্য, অনন্য রোমাঞ্চের ৩ ঘণ্টা পাইন বনের ঘোড়র রাইড সেই আলপিন আরও বড় করে তুলেছিল।

আমার মাথায় তখন আগুন জ্বলছে, গায়ের রক্ত ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচায় ঠিকরে বের হচ্ছে, হাত-পা নিশপিশ করছে কিছু একটা করে শোধ তোলার জন্য। এতো সহজে আমি ছেড়ে দেবার পাত্র নই মামু। আমাকে ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা দিবে আর আমি শুধু খেয়ে হজম করবো সেটা ভাবলে বড় ভুল করেছ।
আমি ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা খেলে তোমাকেও সুঁইয়ের গুঁতো আমি দিবই দিব!

শালারা জীবনে কাউকে, কাউকেই ছেড়ে কথা কইলামনা। হিসেব ছাড়া যে কাউকেই এক কানাকড়ি ছাড় দেয়না তাকে ২১০০ রুপীর আলপিনের খোঁচা দিয়ে মিটিমিটি হাসবে আর ভেড়ার কাবাব দিয়ে পেট পুরে খেয়ে দাঁতে সুখের টুথপিক লাগাবে সে কি করে ভাবলে?

তাই আমিও একখানা বেশ শিক্ষা দিয়েছিলাম আর ওদের কাছ থেকেই আদায় করেছিলাম জীবনের অন্যতম আর এখন পর্যন্ত করা সেরা অ্যাডভেঞ্চারটি, যেটার রোমাঞ্চ ছাড়িয়ে গেছে আমার জীবনের সকল রোমাঞ্চকেও।

সেই সেরা অ্যাডভেঞ্চার আর জীবনের অন্যতম রোমাঞ্চের গল্পটা বলবো অন্যদিনে…

২১ রুপীর আলপিনের খোঁচা খেয়ে!

[পরবর্তী পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (সপ্তম পর্ব)– জীবনের সেরা রোমাঞ্চের গল্প]

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

To Top