ক্ষমতা

যান্ত্রিক ডাকে মানবিক জোয়ার!

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

সবাই কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। সবার অভিযোগ ইদানিংকালে এই একটাই। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব গিলছে আমাদের সময়।

কর্মক্ষেত্রে সোশ্যাল সাইট নিষিদ্ধ অনেক অফিসে। বন্ধুদের আড্ডায় তর্ক-বিতর্ক হারিয়েছে আঙ্গুলের ডিজিটাল নাড়াচাড়ায়। আধোবোল শেখা ক্ষুদে শিশুর নিত্যসঙ্গীও ইউটিউব। তাহলে কি সোশ্যাল সাইটের যান্ত্রিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক আবেগ? প্রশ্নটা ভাবিয়েছে অনেক। কারণ, সংক্রমিত যে সব বয়সের সবাই!

এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন। গেল মাসের শেষে তিনদিনের টানা বর্ষণ বদলে দেয় চিন্তাধারা। বন্যায় প্লাবিত অভয়নগরের ভবদহসহ অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়েছি দিন-রাত। পরিবারগুলোর সাথে খুব কাছে থেকে মিশে একটা রূপরেখা পেয়েছি নিজের করণীয় সম্পর্কে।
জানি ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই, আর সে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব সরকারের অন্য অনুষঙ্গের।
তাহলে করণীয় কি? অস্থায়ী দুটো বিষয়ের ওপর এলাকাবাসী গুরুত্ব দিল।

  • নদী-খালে নেট-পাটা ভেসাল জাল অপসারণ
  • খালের পানিকে স্থবির করে দেয়া কচুরিপানা অপসারণ।

এ দুটো কাজে স্থায়ী কোনো সমাধান সম্ভব নয়, তবে অস্থায়ী ভিত্তিতে বহুমুখী উপশম হবে বলেই বন্যাকবলিতদের ধারণা।

প্রথম কাজটিতে নেমে পড়লাম নিমেষেই। টানা ১০ দিনের অভিযানে নদী-খাল থেকে নেট-পাটা ভেসাল জাল অপসারণ করলাম স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি। এর মাঝেই বীরদর্পে খালে রয়ে গেল মাইলকে মাইল কচুরিপানা।

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

এবার তো আর একা নেমে হচ্ছে না। কচুরিপানা তোলার জন্য উপজেলা পরিষদের কোনো বরাদ্দও নেই। দ্বারস্থ হলাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের। সেখানেও কোনো ইতিবাচক ফল পেলাম না।

শুণ্য হাতেই নেমে পড়লাম লড়াইয়ে।

বন্যাকবলিতদের কাছে বললাম। স্বেচ্ছাশ্রমে তেমন সাড়া মিলল না। সেটাই তো স্বাভাবিক।কারণ, বন্যায় জনজীবন যেখানে নাজেহাল, সেখানে স্বেচ্ছাশ্রমের চিন্তা অমূলক। অন্য পথে হাঁটলাম।

বিভিন্ন সমাজকর্মের কারণে অভয়নগরের বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা আমার ফেইসবুকে যুক্ত আছেন। ভাবলাম, যান্ত্রিক মাধ্যমেই টোকা দিয়ে দেখি, সাড়া পেলেও তো পেতে পারি।

স্ট্যাটাস দিলাম। ২০০ জনের কথা লিখে। তাতেও ভয় হচ্ছিল। বর্তমান ফেসবুক-ইউটিউব-গেমস জেনারেশন নোংরা পানিতে নামবে আমার সাথে???

নিজেকে ভুল প্রমান করে এত আনন্দ হয়নি কখনও। ২০০ তো পার হল প্রথম দিনেই। রেজিস্ট্রেশন করলো ১২৩৫ জন!!! হ্যাঁ, ভুল শোনেননি। ১২৩৫ জন। কে নেই এ দলে? ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা,কর্মচারী, সাংবাদিক, ভবদহ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত নেতৃবৃৃন্দ, সাংস্কৃতিক কর্মী, এনজিও, ব্যবসায়ী,খেলোয়াড়, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, খেলোয়াড়, রাজনৈতিক সংগঠন… সবাই! শারিরীক প্রতিবন্ধী ঠিকাদার বলল, “স্যার, আমি কি পারব?” অভয় দিলাম, দলে নিলাম।

নির্ধারিত দিনে ১০ টি স্পটে দেখা গেল ভিন্ন রূপ। ১২৩৫ বদলে গেছে দু’হাজারে। জনজোয়ার। মানবিক জোয়ার।

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয় neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়q

সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা। এ কয় ঘন্টাতেই বদলে গেছে খালের চালচিত্র। কচুরিপানার বিরুদ্ধে সংগ্রাম সফল। তবে এ লড়াই গৌণ মনে হয়েছে অন্য বিজয়ে।

ফেসবুক-গেমস-ইউটিউব জেনারেশন খালে নেমেছে। উন্মত্ত হয়ে কাজ করেছে পুরো ৭-৮ ঘন্টা। আমি নিজেই জলের মাঝে ছিলাম ওদের মত করেই। পুরোটা সময়।

ভাটবিলা, রাজাপুর, ওয়াপদা,পাথরঘাটা, সুন্দলী বাজার, ফুলেরগাতি, ডুমুরতলা, বেদভিটা খাল হয়েছে কচুরিপানা মুক্ত। এ অংশে পানির প্রবাহও হয়েছে স্বাভাবিক।

চমকের বাকি ছিল আরও একটু। পরদিন এ কার্যক্রমে যোগ দিলেন মাননীয় সংসদ সদস্য নিজে। আমাদের মতই তিনিও নেমেছেন কোমর পানিতে।

ভবদহের স্থায়ী সমাধানের দিকে চোখ ফেরানো জরুরী। তবে তার আগের প্রাপ্তিটাও কম কিসে! তরুণ প্রাণের এ ডিজিটাল জাগরণ বড় অচেনা। সামাজিক কাজে এখনও জাগ্রত আছে ওরা সবাই। এটাই তো বড় বার্তা।

সংবাদমাধ্যমের সাথীরা ছুটে এসেছেন এ আজব সমাবেশ দেখতে। সারাদিন ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ তো করেছেনই, নেমেছিলেন আমাদের সাথেও।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালের কেতাবী সংজ্ঞা জানা নেই। তবে, পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। আমাদের এ উদ্যোগ নিয়ে বাংলানিউজের খবরটি শেয়ার হয়েছে ৯৬০০ বার। জাগোনিউজ ৪১০০ বার। সময়ের কন্ঠস্বরে ৪৭০০ বার। আর বাংলা ট্রিবিউনে? ৪১,৩০০ বার।
একাত্তর, ইনডিপেনডেন্ট, মাছরাঙ্গা, নিউজ ২৪, ডিবিসি, দেশ টিভির প্রচারিত সংবাদ ও একাত্তর লাইভ শুধু অনলাইনে দেখেছেন ৪৭ হাজার মানুষ।

আরেকটু প্রসঙ্গ বদলাই? ব্রিটিশ আমলেও রীতি ছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলাশয় পরিস্কারের। একটা সাদা-কালো ছবি দিয়েছি। লক্ষ্য করুন, ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে লাঠি। আর পানি পরিস্কার করছে সাধারণ মানুষ।

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ বাংলাদেশ ওল্ড ফটো আর্কাইভ

বর্তমান প্রশাসন ঔপনিবেশিকতার এসব কালো প্রভাব পরিহার করে মন দিয়েছে জনসেবায়। আমাদের এ উদ্যোগ ঔপনিবেশিকতা থেকে ৩৬০ ডিগ্রী পরিবর্তনের সেই ছাঁচেই গড়া।

এ ডিজিটাল জোয়ার আশা জাগায়। ভাল কাজে সবাই মিলে কোমর বেঁধে নামতে পারি এখনও। এ প্রজন্ম দেশকে ভালবাসে অনেক বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তোলা বোদ্ধারা একটু হলেও হোঁচট খাবেন এ উদ্যোগে।

neon aloy মনদীপ ঘরাই নিয়ন আলোয়

আপতদৃষ্টিতে ভাল কাজ মনে হলেও অন্য লেন্সে দেখেছেন কেউ কেউ। সে সংখ্যাটা হাতে গোনা। আলোচনা-সমালোচনা আছে বলেই তো এ মানবজীবন বিচিত্র।

“যন্ত্র গেলেনি তারুণ্য, আমরা গিলেছি জড়তা আর ভয়, হয়েছে ঐক্য আর মানবতার জয়”

লেখকঃ মনদীপ ঘরাই,
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।

Most Popular

To Top