নাগরিক কথা

গরিবের ভয়ংকর সুন্দর দর্শন ও কিছু “ভাবনা” (স্পয়লারমুক্ত)

নিয়ন আলোয়

রিভিউটা আরো আগেই লিখতাম। যে গল্পটা থেকে এই সিনেমা এডাপ্ট করা হয়েছে সেটা পড়ে নিয়ে তারপর লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিধি বাম, কোথাও পেলাম না মতি নন্দীর “জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ”।

কাহিনি-সংক্ষেপ: বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা শহর আসে নয়নতারা (ভাবনা)। এক রিক্সাওয়ালার সাহায্যে একটা নিম্নমানের হোটেলে ভাড়া নেয়। সেখানে দেখা হয় মুকুর (পরমব্রত) সাথে, যে সেই হোটেলের কর্মচারী। “নাটকীয়” কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে তারা সেই হোটেল থেকে পালায় এবং একসাথে বসবাস শুরু করে। এরপর শুরু হয় মূল গল্প, যা যথেষ্ট  ইন্টেরেস্টিং ছিলো, কিন্তু সেই ইন্টারেস্টটি কি ধরে রাখতে পেরেছেন পরিচালক?

অগোছালো আলোচনায় না গিয়ে বরং সিনেমাটি তার কোন কোন ডিপার্টমেন্টে কতটুকু মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে সেটাই বলছি।

কাহিনি: মূল কাহিনির বিষয়বস্তু বেশ অভিনব, বলতেই হবে। অন্তত আর দশটা বাংলা সিনেমার মতো তো নয়ই। কিন্তু সিনেমাটির এক্সিকিউশান খুব বেশি বেমানান ছিলো। শেষাংশে অনেকটা জোর করেই সাইকোলজিক্যাল ড্রামা করার চেষ্টা করা হয়েছে। প্লটহোলগুলো আর নাই বা বললাম।

এবার আসি মূল সমস্যায়। সিনেমাটি দেখতে যাওয়ার আগেই রিভিউ মারফত এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হই, আর সেটা হলো গল্পের “রাবারাইজেশন”। “পূর্ণদৈর্ঘ্য” চলচ্চিত্র তৈরি করার মতো গল্প এটা ছিলোই না। এই গল্পে শর্টফিল্ম কি টিভি নাটক তৈরি করা ছিলো বেশি যুক্তিসংগত।

চিত্রনাট্য: খুবই দুর্বল। কোনোমতে একটা ছোটগল্পকে জোর করে সিনেমা বানানোর অপচেষ্টা। আসলে মূল গল্প শুরুই হয় বিরতির পর, এর আগ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় চরিত্রদের দর্শকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের চরিত্রায়নের জন্য সময় নেয়া হয় এবং সিনেমাটির শুরুর এই অর্ধেকই ছিলো অতিরিক্ত দীর্ঘায়িত। এত বড় রানটাইমে ক্যারেক্টার বিল্ডআপ যতটা হওয়া উচিৎ ছিলো তার ছিটেফোঁটাও হয় না। প্রধান চরিত্রদের বৈশিষ্ট্যগুলো সিনেমার শুরু থেকেই অনেকটা জোড় করেই যেন দর্শককে গেলানোর চেষ্টা করা হয়।
সংলাপ ছিলো মেকি মেকি, অবাস্তব। মনে দাগ কাটার মতো কোনো সংলাপ অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাই নি।

অভিনয়: অভিনেত্রী হিসেবে লিডে ছিলেন ভাবনা, যাকে আসলে এভারেজ ছাড়া অন্য কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করা যাবে বলে মনে হয় না। এই ক্যারেক্টার অন্য যেকোনো অভিনেত্রীই তার চেয়ে ভালোভাবে করতে পারতেন। অভিনেতা পরমব্রতর অভিনয় অনেকের কাছেই ভালো লেগে থাকতে পারে। তাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তার অভিনয় আমার কাছে খুবই একঘেয়ে মনে হয়েছে। চোখে পড়ার মতো কোনো চেষ্টাই ছিলো না, তার উচ্চারণেও ছিলো যথেষ্ট সামঞ্জস্যহীনতা। তার মতো পরীক্ষিত অভিনেতার কাছে অন্তত এটা আশা করিনি। এছাড়া ছোট ছোট চরিত্রে ছিলেন হাসান ইমাম, লুৎফর রহমান জর্জ, অ্যালেন শুভ্র প্রমুখ; যাদের অভিনয় এর জন্য যথেস্ট স্ক্রিন টাইম ছিলো না। বিশেষ করে জর্জ এবং খায়রুল আলম সবুজের মতো অভিনেতাদের দু-চারটা সংলাপ দিয়ে “ভ্যানিশ” হয়ে যেতে দেখে একটু হতাশই হয়েছিলাম।

চিত্রগ্রহণ : খায়ের খন্দকারের চিত্রগ্রহণ বেশ ভালোই ছিলো। এ জায়গায় আসলে খুঁত ধরার খুব একটা সুযোগ ছিলো না।
তবে সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে এরিয়াল শটের বহুল ব্যবহার একটু দৃষ্টিকটুই বটে। এই বাহুল্য যেন আবার ট্রেন্ডে পরিণত না হয়।

সম্পাদনা: রতন পালের সম্পাদনা প্রশংসনীয় রকমের ভালো ছিলো। রানটাইম স্ক্রিপ্ট অনু্যায়ী একদম ঠিকঠাক ছিলো, কালার কারেকশনেও ছিলো যত্নের ছাপ।

সংগীতায়োজন: আবহ সংগীত যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই ছিলো। যদিও সাউন্ড ট্র‍্যাকে চিরকুটের গানটা বাদে কোনো মনে রাখার মতো গান ছিলো না। সব মিলিয়ে বলা যায়, উৎরে গেছে।

সব কথার সারকথা:
সারকথাটা আবার ধার করা “এই সিনেমা লইয়া আমরা কি করিবো”।

রেটিংঃ ৫.৫/১০

(উপরের কারন গুলো বাদ দিয়েও যদি এত কম রেটিং এর পক্ষে যুক্তি দিতে হয়, আমি বলবো, একজন নিয়মিত চলচ্চিত্র দর্শক হিসেবেও আমি বহু কষ্টে পুরোটা সিনেমা দেখে হল ছেড়েছি। সেখানে হলবিমুখ আমজনতা কি করেছে তা কিছুটা আঁচ করতে পারছি। কারন, সবকিছুর উর্ধ্বে, ভয়ংকর সুন্দর একটি বিনোদন বিবর্জিত উদ্ভট সিনেমা। এরকম সিনেমা দেখে সাধারণ মানুষজনের বিরক্তির উদ্রেক এবং আরো প্রকট আকারে হলবিমুখতা আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই না।)

ব্যাক্তিগত মতামতকে বিশেষজ্ঞের মতামত ভাবলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
ধন্যবাদ।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top