গল্প-সল্প

আকাশেরা ঢেকে যায় কালো মেঘেদের আড়ালে

নিয়ন আলোয়

প্রায় ১৮ বছর ধরে ধানমন্ডী ৩২ এর পাশের গলিতেই আকাশ সাহেবের বাস। অফিস যেতে আসতে, ছেলে মেয়েদের স্কুল থেকে আনা নেওয়া সহ প্রায় প্রতিদিন ৬-৮ বার তাকে বঙ্গবন্ধু যাদুঘর পার হতে হয়।

বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের মানুষজন এখানে আসে। আগস্ট মাসে সবচে বেশী। ভিড় লেগেই থাকে। ফুল দেয়, শ্রদ্ধা জানায়। দেখতে ভালোই লাগে।

সেদিন অফিস যাবার পথে আকাশ খুব ভালো করে খেয়াল করে কাছের এক গলিতে একটা গ্রুপ ব্যানারসহ নিজেদের বেশ গুছিয়ে গাছিয়ে সামনের দিকে এগুচ্ছে। সেখানে ১০ বছরের ছেলেসহ ৭০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন। কেউ কেউ ব্যানারের সামনে এসে সেলফী তুলছে। কেউ আবার সামনের সারিতে থাকার জন্য অন্যকে ধাক্কা দিচ্ছে। একজন আরেকজন কে বলছে, ভালো করে ছবি তুলতে। “এই আমি যেন ছবিতে থাকি…”

আকাশ এদের পিছু নেয়। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালের সামনে এসে তারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালো যতটা তার চেয়ে বেশি ব্যাস্ত ছিল সেলফী ও ছবি তুলতে। একজন আরেকজনকে বলছে তার ছবি ঠিকমতো হাইলাইট না হলে খবর আছে। মোটকথা ছবি ঠিকমতো না আসলে এখানে আসাটাই বৃথা।

হুঁ, আজকাল বঙ্গবন্ধুর ম্যূরালের সাথে ছবি না থাকলে প্রমাণ থাকেনা সে কতটা লীগার। ছবিগুলো রাজনৈতিক ব্যাবসার ভালো পূঁজি ও।

ছবি তোলাটা মোটেও দোষের না যদি স্বার্থসিদ্ধির জন্য উদ্দেশ্যমূলক কিছু না হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সাথে আকাশের ছেলে মেয়েরও প্রচুর ছবি-ভিডিও আছে। মহান ব্যাক্তিদের সাথে সবাই ছবি তুলে, শ্রদ্ধায়, ভালোবেসে, সংগ্রহে রাখার জন্য।

আকাশের খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। তখন কতটা আর হবে, বেশি হলে পাঁচ বছর। একটা ডিঙি নৌকায় মামা বাড়ী যাচ্ছিল। আকাশের বাবা সাথে থাকা রেডিওতে খবর পান বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার কথা। আকাশ তার বাবা-মায়ের আলাপচারিতায় সেদিনই প্রথম বঙ্গবন্ধুর নাম শুনে। আজও তার মনে আছে, বঙ্গবন্ধু নামটা সেদিনই গেঁথে গেছে। মনে আছে সেই ডিঙি নৌকাটারও কথা। বঙ্গবন্ধুর জন্য বাবা-মায়ের মন খারাপের কথা।

আকাশ হিসেব করে ১৮ X ৩৬৫= ৬৫৭০ দিনে আর না হলেও ১০,০০০ বার এ জায়গাটা পার করেছে। যতবারই পার করেছে ঠিক ততবারই তার কাছে নতুন মনে হয়েছে। যতবার বঙ্গবন্ধুর ম্যূরালের সামনে দিয়ে গিয়েছে ততবার মাথা নীচু করে পার করেছে এক অনন্য শ্রদ্ধাবোধে। সেই ছোটবেলায় মনের মধ্যে জন্ম নেয়া শ্রদ্ধাবোধে।

আকাশ প্রতিবছরই ১৫ই আগস্ট ছেলেমেয়েকে নিয়ে যায়। নতুন করে বঙ্গবন্ধুকে জানতে, বুঝতে।

নাহ্। এই আঠারো বছরে বঙ্গবন্ধুর ম্যূরালের সাথে নিজের একটা ছবিও তোলা হয়নি আকাশের। ফুলও দেয়া হয়নি কখনো।

একবার তার ছোট্ট মেয়েটা বায়না ধরেছিল ফুল দেয়ার জন্য। সেদিন মেয়ের অলক্ষ্যে ওখানের একটা তোড়া থেকে দুটা ফুল এনে মেয়ের হাতে দিয়েছিল। মেয়ে দু’টা ফুলে খুশি হলো না। আকাশ সাহেবের অনেক কস্ট হয়েছিল মেয়েকে বুঝাতে যে, তুমি মন দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফুল দিতে চেয়েছো, এটাই যথেস্ট। মনটাই আসল।

এখন বঙ্গবন্ধুকে ফুল দেয়ার মানুষের অভাব নেই। যারা এক সময় তার চৌদ্দগুস্টি উদ্ধার করে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিত তারা এখন ভোল পাল্টে বঙ্গবন্ধুর ভক্তকুল। এরাই এখন ৩২ নম্বরে এসে ছবি তোলায় ব্যাস্ত। এদের সংখ্যাটাই বেশী। যতটা না শ্রদ্ধায়, তারচে বেশী ছবি তোলার জন্য।

এদেশে এমন লক্ষ লক্ষ আকাশ রয়েছে যারা নীরবে শ্রদ্ধা জানায়। তাদের কোন প্রমাণের দরকার হয় না। প্রমাণের প্রয়োজনও হয় না।

নীল আকাশেরা ঢেকে থাকে পাল্টিবাজ কালো মেঘেদের আড়ালে।

Most Popular

To Top