গল্প-সল্প

পোস্টার

নিয়ন আলোয়

১.
বেঞ্চের এক কোণে চুপ করে বসে কী যেন ভাবছিল যুবক। সম্পাদকের রুমে যাওয়ার সময় আড়চোখে একবার দেখেছিল রাত্রি। বেশি কিছু ভাবে নি। কবিতা লেখায় বেশ সুনাম আছে ওর। এই সপ্তাহের সাহিত্য পাতায় ওর একটা কবিতা ছাপা হয়েছে। সাহিত্য পাতার সম্পাদক নিজে টেলিফোন করে প্রশংসা করেছেন। প্রধান সম্পাদক মিজান সাহেব ওর বাবার কী রকম যেন বন্ধু। সেই সূত্রে মাঝে মাঝে আসা যাওয়াও করা হয় এই পত্রিকা অফিসে।

চলে আসার সময় আরেক ঝলক সেই যুবককে দেখেছিল রাত্রি। বেঞ্চের এক কোণে চুপ করে বসে ছিল তখনও।

২.
-ওরা আজকে বিকালে ফোন করেছিল।

-কারা?

-ভুলে গেলে? সেদিন বিকেলে রাত্রিকে দেখতে এল যে।

-সেটা তুমি এখন বলছ? কী বলল ওরা?

-জানতে চাইল রাত্রির পাসপোর্ট করা আছে কিনা? না থাকলে তাড়াতাড়ি করে নিতে বলল।

-তার মানে রাত্রিকে ওদের পছন্দ হয়েছে? এ তো দারুণ খুশির খবর। তুমি এতক্ষণ পরে খবরটা দিচ্ছ?

-মনটা হঠাৎ করে একটু খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা এত দূরে চলে যাবে…

-তুমিও না…. বাচ্চাদের মত কর মাঝে মাঝে। মেয়ে বড় হয়েছে দূরে তো চলে যাবেই। পৃথিবীতে মেয়ের বাবা যেন তুমি একাই।

-না, তা না। কিন্তু…

গভীর রাতে জানালা দিয়ে ষাট বছরের পুরনো আকাশের দিকে তাকিয়েও ঈসমাইল সাহেবের হঠাৎ পৃথিবীটাকে বড় অচেনা মনে হয়।

৩.
-আপু আমাকে কিন্তু মাশরাফি বইটা কিনে দিতে হবে। দিবি বল।

-আচ্ছা দেব। কোন ষ্টলে পাওয়া যাবে জানিস?

-আপু ঐতিহ্য প্রকাশনী। আমাদের ক্লাসের অর্ক কিনেছে, ওর কাছে দেখেছি।

-আচ্ছা চল, ঐতিহ্য প্রকাশনী খুঁজি।

একটা বই হাতে নিয়ে যখন তের বছরের ছোট ভাইয়ের মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে ওঠে তখন রাত্রির মনে হয় এরকম সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে খুব কম। সে জিজ্ঞাসা করে, ভাইয়া এই বইটার দাম কত?

-ছয়শ বিশ টাকা।

হ্যান্ডব্যাগটা খুলেই রাত্রির কপালে হঠাৎ ভাঁজ ফুটে ওঠে। একটা শুধু পাঁচশ টাকার নোট পড়ে আছে ব্যাগে।

-অভি, আজকে না এত টাকা আনি নি। আমি কালকে তোকে বইটা কিনে দেব, প্রমিজ। আজকে চল বাসায় যাই।

অভির হাসিমুখটা মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায়। রাত্রির মনে হয়, একটা চমৎকার বিকেল আর একটা প্রাণবন্ত বইমেলা যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেল এক মুহূর্তের মধ্যে।

৪.
-আপু, তামিম ইকবাল সেঞ্চুরি করেছে। আয় না, দেখ।

-আহ, অভি, কী সারাদিন খেলা খেলা করিস। পড়াশোনা নেই তোর?

-আয় না আপু। এমন করিস কেন?

অভি চোখ বড় বড় করে তামিম ইকবাল নামের তার হিরোর চোখে বিজয়ের হাসি দেখে। আর রাত্রি দেখে তার তের বছরের ছোট ভাইটাকে। বিকেলের কথা হঠাৎ মনে পড়ে। কত দ্রুত সব ভুলে গেছে তার ভাইটা। আবার ওর মুখে ফিরে এসেছে সেই নিষ্পাপ হাসি। আহ কী মায়া তার ভাইটার চেহারায়। রাত্রির মনে হয়, তার এই তের বছরের ছোট ভাইটার হাসি তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মুল্যবান বস্তু।

“একটু খবর দে তো দেখি”, বলতে বলতে ঈসমাইল সাহেব ঘরে ঢোকেন।

-আব্বু বাংলাদেশের খেলা হচ্ছে। এখন না।

-পাঁচ মিনিট পরে খেলা দেখ না। ক্রিকেট খেলা কি কেউ সারাদিন দেখে নাকি? দেখি রিমোটটা দে।

চ্যানেল ঘোরাতেই একটা টিভি চ্যানেলে একটা খবর চোখে পরে সবার। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে বিমূর্ত নামের তের বছরের একজন কিশোরকে অপহরণ করেছিল সন্ত্রাসীরা। বাবা মা মুক্তিপণ দিতে না পারায় তার লাশ ফেলে গেছে। রাত্রি অবাক হয়ে এই কিশোরের মৃতদেহ দেখে। আশ্চর্য, এই ছেলেটার চেহারাতেও তো একটা অদ্ভুত মায়া। ঠিক তার ছোট ভাইটার মত। রাত্রির হঠাৎ মনে হয় মৃত কিশোরের চোখের স্বপ্নগুলো যেন এখনো জীবিত। কেন যেন তার মনে হয় এই কিশোরও সবসময় তার বড় আপুকে বলত, “আপু মাশরাফি বইটা কিনে দিবি না আমাকে?”

৫.
সেদিন শম্পার সাথে যেতে হয়েছিল একটা প্রেসে। ভার্সিটির র‍্যাগ ডে উপলক্ষে কতগুলো লিফলেট ছাপাতে দিয়েছিল ওরা, সেগুলো আনতে। সেখানে হঠাৎ আবার এক ঝলক সেই যুবককে দেখল রাত্রি। কতগুলো পোস্টার নিয়ে বের হচ্ছে প্রেস থেকে। প্রেস থেকে বের হয়ে একজনের সাথে ধাক্কা লাগল হঠাৎ। হাত থেকে কিছু পোস্টার পড়ে গেল মাটিতে। রাত্রি দেখল সেখানে লেখা, আবিদ হত্যার বিচার চাই। পাশে শান্ত চেহারার এক যুবকের ছবি। কেন যেন সেদিনের সেই তের বছরের কিশোরের কথা ওর মনে পড়ে গেল হঠাৎ।
আর সাথে নিজের ছোট ভাইয়ের মায়া কাড়া নিষ্পাপ মুখটাও।

৬.
-শওকত, আজকে রাতে ঘুমাস না। কাজ আছে।

-কোনদিন রাতে আর ঘুমাই? কিন্তু কাজটা কী?

-পোস্টারগুলো নিয়ে এসেছি আজকে। লাগাতে হবে।

-ও।

শওকত নামের যুবক চুপ করে কী যেন ভাবে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ কী মনে করে নিজের অজান্তেই একটা মলিন হাসি ফুটে ওঠে ঠোঁটে।

-তুই বড় বদলে গেছিস হাসান। আগে এইসব রাতে তুই কী করতি মনে আছে?

হাসান কোনো উত্তর দেয় না। শওকত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর কোনো উত্তর না পেয়ে  নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দেয় একসময়।

-এই অভ্যাস ছিল আবিদের। সারারাত জেগে দেয়ালে লিখতে পারত। শুধু নিজে লিখেই ক্ষান্ত হবে না। আমাদের কাউকে ঘুমাতে দেবে না। ২৫শে মার্চ আসলেই তুই চিন্তা করতি রাতে কীভাবে আবিদের হাত থেকে বাঁচা যায়।

পুরনো দিনের কথা মনে করে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে শওকতের ভিতর থেকে।

তারপর কিছুক্ষণ কাটে নীরবতায়। নিঃশব্দে সিগারেট টানে ওরা। নিজের বানানো ধোঁয়ার রিঙের দিকে নিজেই তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ হয়ে। একসময় নীরবতা অসহ্য হয়ে আসলে আস্তে আস্তে মুখ খোলে শওকত,

-এক বছর হয়ে গেল, নারে হাসান?

-হাসান তখনো মুগ্ধভাবে তাকিয়ে আছে ধোঁয়ার রিঙের দিকে। সেদিকে তাকিয়েই আস্তে আস্তে বলে,

-তিনশ একষট্টি দিন।

শওকত অন্যমনস্কভাবে বলে, মাঝে মাঝে আমার কী মনে হয় জানিস? সবকিছু ছেঁড়েছুঁড়ে আমার ছোট্ট মফস্বল শহরটায় ফিরে যাই। এই নোংরা শহরটাতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে মাঝে মাঝে।

হাসান এবার মুখ খোলে, হৃৎপিণ্ড ছিঁড়েখুঁড়ে বের হয়ে আসতে চাওয়া আবেগটাকে দমন করতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয় ওর।

-দম আমারো বন্ধ হয়ে আসে শওকত। কিন্তু আবিদের মৃত্যুর পর আমরা কী শপথ নিয়েছিলাম মনে আছে? সেই জন্যই তো পড়ে আছি এই শহরটাতে। তিন বছর এক বিছানায় ঘুমিয়েছি, এত সহজে কি সবকিছু ছেঁড়ে দিতে পারি?

শওকত হাসে।

-শালার মরল আবিদ আর ফাঁসিয়ে গেল আমাদেরকে। যাই হোক আজকে রাতের জন্য সিগারেট ম্যানেজ করিস বেশি করে।

হঠাৎ আর কোনো কথা খুঁজে পায় না ওরা। রাত গভীর হওয়ার অপেক্ষা করে দুজন।

৭.
রাত্রি তৃতীয়বার যুবককে দেখল শাহবাগের মোড়ে। সিমেন্টের বেঞ্চে বসে চুপচাপ তাকিয়ে আছে সামনের ব্যস্ত রাজপথের দিকে। রাত্রি কেন সেদিন এগিয়ে গিয়েছিল যুবকের কাছে তা হয়তো পৃথিবীর যাবতীয় অমীমাংসীত রহস্যের তালিকায়ই থাকবে চিরকাল।

-এক্সকিউজ মি।

রাজপথ থেকে চোখ সরিয়ে যুবক তাকালো রাত্রির দিকে।

-বলুন।

-একটা প্রশ্ন করি আপনাকে?

-করুন।

কিছু বোঝার আগেই রাত্রি যে অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল তাও হয়তো পৃথিবীর যাবতীয় রহস্যের তালিকায়ই থাকবে।

-আপনি সবার চেয়ে অন্যরকম কেন?

যুবক কোনো উত্তর দিল না।

-আমি এই নিয়ে তিনবার দেখলাম আপনাকে। প্রথমবার……।

রাত্রিকে অবাক করে যুবক বলল এইসময়,

-প্রথমবার পত্রিকা অফিসে, দ্বিতীয়বার বাংলাবাজারে একটা প্রেসে, আর তৃতীয়বার এই শাহবাগের মোড়ে।

৮.
গত পাঁচদিন হল আমি আপনাকে বিকালে এখানে বসে থাকতে দেখছি। এই শাহবাগের মোড়ে, এই একই বেঞ্চে, একইভাবে।

-একসময় আমি আর আবিদ বসে থাকতাম এখানে। আবিদ জোর করে নিয়ে আসত। মানুষ অবসর কাটাতে নির্জনে যায়, ও আসত মানুষের ভিড়ে। ও বলত রাজধানী শহরে থাকতে হলে রাজধানীর ব্যস্ততাকেও ভালবাসতে শিখতে হবে।

একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবক।

-আবিদ আপনার খুব ভালো বন্ধু ছিল?

যুবক চশমা খুলে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। রাত্রির বুকে একটা ধাক্কার মত লাগল। ভারী চশমার আড়ালে লুকিয়ে ছিল একজোড়া আশ্চর্য সুন্দর চোখ।

-আবিদের সাথে আমি তিন বছর এক বিছানায় ঘুমিয়েছি।

আর কোনো কথা খুঁজে পায় না রাত্রি।

হঠাৎ কী যেন হয় যুবকের। হয়তো নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ভিতরের আবেগটাকে আর দমিয়ে রাখতে পারে না। আগ্নেয়গিরির লাভার মত সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে তা বের হয়ে আসে ভিতর থেকে।

এক বছর হয়ে গেল ওরা আবিদকে মেরে ফেলার পর। পুলিশ এখনো একজনকেও গ্রেফতার করল না। সেদিন পত্রিকা অফিসে গেলাম ওর খুনের বিচার চেয়ে একটা লেখা ছাপাতে। সম্পাদক সাহেব দেখাই করলেন না। কিন্তু এত সহজে আমি ছেড়ে দেব না। যতদিন আবিদ শান্তিতে না ঘুমাবে ততদিন এই শহরের একটা মানুষকে আমি ঘুমাতে দেব না। একটা মানুষকেও না।

রাত্রি অবাক হয়ে দেখে যুবকের শান্ত চেহারা কীভাবে বদলে গেল প্রচণ্ড ক্রোধে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষের প্রতি ক্রোধ। ঠিক সেই মুহূর্তে, সেই শেষ বিকেলের ক্লান্ত আলোতে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ইচ্ছাটা হল রাত্রির। নারীমনের চিরন্তন রহস্যময় ইচ্ছা।

ওর হঠাৎ প্রচণ্ড ইচ্ছা করল কিছুক্ষণের জন্য এই অদ্ভুত যুবকের পাশে বসতে। হয়তো রাজধানীর ব্যস্ততাকে একটু ভালোবাসার জন্য।

কিংবা হয়তো অন্য কিছু।

৯.
-কালকে সকালে একটু পাসপোর্ট অফিসে যাস তো রাত্রি। তোর কামরুল চাচাকে বলা আছে। উনি সব ব্যবস্থা করে দেবেন। তুই শুধু একটু যাস।

-আমার পাসপোর্ট লাগবে না বাবা। আমি বিদেশে যাব না।

-কী?

-ঈসমাইল সাহেব তার ষাট বছরের জীবনে এমন অবাক কোনোদিন হন নি।

রাত্রি খুব তাড়াতাড়ি সামলে নিল নিজেকে।

-সরি বাবা। অন্যমনস্ক ছিলাম তো তাই উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলেছি। আমি কালকে সকালেই যাব।

ঈসমাইল সাহেবের বিস্ময় তবুও কাটে না।

-কোনো কথা বলার আগে অনেক ভেবেচিন্তে বলতে হয় মা।

নির্জন দুপুরে নিজের বিছানায় শুয়ে নিজের উপরই প্রচণ্ড রাগ লাগে রাত্রির। আর কোনো দিন যাবে না সে ওখানে।

কোনো দিন না।

১০.
দুই বছর পর।

আমেরিকার ফার্গো নামের একটা ছোট্ট শহরে বসে ইন্টারনেটে এলোমেলো নিউজ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বাংলাদেশ নামের একটা ছোট্ট দেশের ছোট্ট একটা খবরে চোখ আটকে যায় রাত্রি নামের এক তরুণীর। আবিদ হত্যায় গ্রেফতারকৃতদের প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাশ করে দিয়েছে আদালত।

পোর্চে গাড়ির শব্দ শোনা যায়। জুবায়ের চলে এসেছে হয়তো। কয়েক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে রাত্রি। আশ্চর্য সুন্দর এক জোড়া চোখের কথা মনে পড়ে হঠাৎ। যে চোখের সাথে তার দেখা হয়েছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে।

Most Popular

To Top