নাগরিক কথা

দারুচিনি দ্বীপ,আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রাণ মাখানো কয়েকটি দিন (শেষ পর্ব)

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ দারুচিনি দ্বীপ,আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রাণ মাখানো কয়েকটি দিন (দ্বিতীয় পর্ব)]

দেখতে দেখতে চারটি দিন চলে গেছে, আজ আমাদের পঞ্চম দিন বালিতে। আজকের প্ল্যান হল, প্রথমে যাব বোটানিক্যাল গার্ডেন, তারপর উলুন ধানু টেম্পল এবং সেখান থেকে তানাহ লটে সুর্যাস্ত দেখে প্রত্যাবর্তন। যেতে হবে সেই ২২ কিলোমিটার দূরে, আর আগের দিনের ট্র্যাফিক জ্যামের যে চিত্র দেখেছি তাতে আর রিস্ক নেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই সকাল সকাল রেডি হয়েই রওনা দিলাম আমরা। যদিও রাস্তায় তেমন ট্র্যাফিক ছিল না, তবে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি এমনিতেই একটু ধীরে যায় বলে প্রায় দুই ঘন্টা পর আমরা পৌঁছলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে।

নিয়ন আলোয়

হোটেলের সামনে কুটা বীচ

বালির বোটানিক্যাল গার্ডেনটি পর্যটকদের জন্য একটি অসম্ভব সুন্দর, ‘মাস্ট ভিজিট’ টুরিস্ট স্পট। চারিদিকে লক্ষাধিক নানা বৈচিত্রের বৃক্ষরাজি আর তার মাঝে মাঝে নান্দনিক ভাস্কর্য শোভিত এই দৃষ্টিনন্দন স্থানটিতে একবার যে যাবে, সে এই স্নিগ্ধ, চিরহরিৎ, সতেজ পরিবেশের প্রেমে পরে যাবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই কোন। এক পাশে আকাশ ছোঁয়া দীর্ঘকায় বৃক্ষরাজি বেস্টিত বালি ট্রি টপ এ্যাডভেঞ্চার পার্ক। বৃক্ষ নির্ভর যাবতীয় এ্যাডভেঞ্চারের তীর্থস্থান এই স্থানটি। কোমরে দড়ি লাগানো বেশ কিছু একালের টারজানকে দেখলাম বিভিন্ন কসরতে ঝুলে ঝুলে এক গাছ থেকে আরেক গাছে বিচরন করতে। ইন্দোনেশিয়ায় তখন সাত দিনের লম্বা ঈদের ছুটি চলছিল আর তাই দলে দলে লোক ফুল ফ্যামিলি সহ পিকনিকে এসেছে। আপনি যদি মনে করেন সারাটি দিন ধরে এই স্থানটি ঘুরবেন তবুও আপনি একদিনে এর প্রতিটি স্থান ভিজিট করে শেষ করতে পারবেন না এতই বিশাল এই স্থানটি। সত্যিই একটি স্থানে এত বৈচিত্রের উদ্ভিদ এক সাথে দেখা পাওয়া দুস্কর।

নিয়ন আলোয়

বোটানিকাল গার্ডেনের ক্যাক্টাস কালেকশন

এর মাঝেই রয়েছে অর্কিড গার্ডেন, ক্যাক্টাস গার্ডেন, বেগোনিয়া কালেকশন, রোজ গার্ডেন আরো কত কি! চমৎকার সাজানো গোছানো, ফুল, পাতা, ঝরনা ঘেরা এক একটি গার্ডেন যেন এক একটি রুপকথার রাজ্য। সত্যিই এর মোহিনী সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দুপুর পর্যন্ত ওখানে কাটিয়ে, এক বুক তাজা হাওয়া ফুসফুসে সঞ্চয় করে বেড়িয়ে পরলাম আমরা। লাঞ্চ টাইম, তাই উলুন দানু যাওয়ার আগেই লাঞ্চটা সেরে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। কোথায় লাঞ্চ করব? সেটাও দেশে থাকতেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম। দে দানাও লেক ভিউ রেস্টুরেন্ট, উলুন দানুর একদম সামনেই। লেকের চমৎকার ভিউ আর তাজা স্ট্র বেরির জুস এ দুই এর কম্বিনেশন আমাদের লাঞ্চকে আরো উপাদেয় করে তুলল। ওদের নিজস্ব স্ট্রবেরির ফার্ম আছে তবে অফ সিজন বলে আমাদের শুধু প্ল্যান্টস দেখেই স্বান্তনা পেতে হল।

নিয়ন আলোয়

দে দানাও রেস্টুরেন্ট

এবার গন্তব্য উলুন দানু। নেটে ছবি দেখে মনে হয়েছিল লেকের পাশে ছোট্ট কোন টেম্পল হবে কিন্তু কাছে যেয়ে তো আমরা অবাক! বিশাল এড়িয়া জুড়ে করা চমৎকার একটি ট্যুরিস্ট স্পট এটি। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বেশ কয়েক হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত পাহাড় ঘেরা একটি মনোরম লেক আর তার মাঝে মধ্যমণি হয়ে আছে এই দৃষ্টিনন্দিত টেম্পলটি। মেঘ পাহাড়ের লুকোচুরি আর লেকের কাকচক্ষু পানি, মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া মৃদুমন্দ ঝিরিঝিরি হাওয়া। আহ! রিফ্রেশিং বুঝি একেই বলে। এর মাঝে হাল্কা একটু বৃস্টিও পড়ছিল। আমরা সাথেই ছাতা, রেইনকোট এসব রাখি বলে ঝামেলায় পরতে হল না। তবে আপনারা গেলে বিশেষ করে সাথে বেবি থাকলে ছাতা, রেইনকোটের সাথে হাল্কা শীতের পোশাক নিতে ভুলবেন না কিন্তু কারণ অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে এখানে শীত বেশ ভালই অনুভুত হয়। আমার তো প্রায় ঠান্ডা লেগে যাওয়ার দশা হল। কিছুক্ষণ এই ঘোর লাগানো প্রকৃতির মাঝে সময় কাটিয়ে উঠে পরলাম গাড়িতে। উদ্দেশ্য তানাহ লটে সুর্যাস্ত দেখা।

নিয়ন আলোয়

উলুন দানু ট্যাম্পল

মাঝাখানে একবার এক গ্রাম্য মার্কেটে নেমে কিছু লোকাল ফ্রুটস আর হ্যান্ডিক্রাফটস কিনলাম। দেশের গ্রামের বাজার দেখেছি এবার দেশের বাইরের গ্রাম্য বাজারেরও এক্সপেরিএন্স হল। আমাদের ড্রাইভারের আপ্রাণ চেস্টা আমাদের সুর্যাস্ত দেখিয়েই ছাড়বে সে। চলেও এলাম প্রায়, কিন্তু বিধি বাম! তানাহ লটের তিন কিলোমিটার কাছে এসে সে এক দীর্ঘ জ্যাম। সুর্যাস্তের এখনো প্রায় আধা ঘন্টা বাকি। সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে এটা কোন ব্যাপারই নয়, তিন কিলোমিটার পথের জন্য আধা ঘন্টা অনেক বেশি কিন্তু এ যে বালির জ্যাম! আধাঘন্টা ধরে শম্বুক গতিতে তিন কিলোমিটার রাস্তা পারি দিয়ে যেই তানাহ লটের গেটে এসে পৌছলাম তক্ষণ টুক করে সূর্য বাবাজি আমাদের সামনেই কোথায় হারিয়ে গেলেন। সাগরে সুর্যাস্ত আর দেখা হল না আমাদের। নেমেই পরিমরি করে এক ছুট, উদ্দেশ্য শেষ বিকেলের আলোয় যতটুকু পারি তানাহ লট কে দেখা। কাছে যেয়ে দেখি এ যে জনসমুদ্র, কোথাও যেন তিল ধারণের জায়গা নেই। সত্যিই ঈদের ছুটিতে বালিতে এসে একি যন্ত্রণায় পরা গেল! সাগরের মাঝে টেম্পল, অসম্ভব সুন্দর প্রকৃতি কিন্তু পর্যটকের ভারে যেন ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। ওর মাঝেই কোন রকমে কিছুক্ষন প্রকৃতি দেখে এবং কিছু ছবি তুলে রওনা দিলাম আমরা। আবার সেই তীব্র জ্যাম, ফিরতে লাগল প্রায় তিন ঘন্টা। ফেরার পথে লিপ্পো মলে নেমে এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে অবশেষে হোটেলে প্রত্যাবর্তন এবং ঘুম। পরদিন যে আমাদের বীচ ডে, ঘুমাতে হবে তো তাড়াতাড়ি।

নিয়ন আলোয়

শেষ বিকেলে তানহা লটে

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে প্রথমেই গেলাম আমাদের হোটেলের সামনেই কুটা বীচে। রাস্তার এপার আর ওপার, তিন মিনিট ওয়াকিং ডিসটেন্সে এই বীচ। সেখানে কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু, এ্যাডভেঞ্চার সাউথ বালি। প্ল্যান হল বালির যত বীচ আছে দেখা এবং শেষে উলুয়াটু টেম্পলে সুর্যাস্ত দেখা। দুইপাশে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এর মাঝ দিয়ে কিছু পথ পাড়ি দিয়ে এবং সাগরের উপর গড়া কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এক মনোরম ব্রীজ পেরিয়ে প্রথমে টার্টল আইল্যান্ড। যাবতীয় সী এ্যাক্টিভিটিজ এর জন্য বীচটি প্রসিদ্ধ। এখানে অল্প কিছু সময় কাটিয়ে দিয়ে গেলাম নুসা দুয়া বীচ এবং নুসা দুয়া ওয়াটার ব্লো।

নিয়ন আলোয়

নুসা দুয়া বীচ

বালির সবচেয়ে সুন্দর, নিরিবিলি এবং অভিজাত এলাকা হল নুসা দুয়া। বিলাস বহুল, ফাইভ স্টার হোটেল গুলোও এই এলাকাতেই অবস্থিত। শুভ্র বালুকা বিস্তির্ণ, শান্ত , গোছানো বীচ এই নুসা দুয়া। আর এর ওয়াটার ব্লো এর সৌন্দর্য্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তীব্র গতিতে ছুটে আসা ঢেউ এসে পাথুরে বীচে বাধাগ্রস্ত হয়ে ছলকে উঠছে বেশ কয়েক ফিট উপরে। সেই ছলকানো পানির স্ফটিক শুভ্র ফোয়ারা আর উচ্ছসিত কলতান আমাদের যেন এক অদ্ভুত জগতে ভ্রমণ করিয়ে আনল। সেখানে তখন চলছিল নুসাদুয়া লাইট উৎসব। চারিদিকে তাই রং বেরং এর উৎসব মুখর পরিবেশ। এর মাঝে কিছুটা সময় ফটোস্যুট করে ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। পথে নেমে কেএফসিতে লাঞ্চ করে এবার গেলাম আরেক বীচ পান্তাই পান্ডোয়া (পঞ্চ পান্ডব) বীচ। পাহাড়ি রাস্তা থেকে অনেকটা নেমে আসতে হয় এই বীচে পৌঁছতে হলে। নামের প্রতি সুবিচার করতে পঞ্চ পান্ডবের বিশাল পাঁচটি মুর্তি স্থাপিত রয়েছে এখানে। বিচ দেখা শেষ (সময় না থাকায় ড্রীম বীচে আর যাওয়া হলনা) এবারের গন্তব্য উলুয়াটু টেম্পল।

উলুয়াটুতে সুর্যাস্তের অপার দৃশ্য

গতকালের এক্সপেরিএন্স মনে আছে তাই এবার আর কোন রিস্ক নিলাম না । হাতে সময় রেখেই উলুয়াটুর পথ ধরলাম আমরা এবং সুর্যাস্তের এক ঘন্টা বাকি থাকতেই টেম্পলে পৌঁছে গেলাম। এখানে প্রবেশ করতে হলে সারাং পরতেই হবে তবে সে জন্য চিন্তা নেই, ওরাই সরবরাহ করে। ওদের দেয়া সারাং পরে আমরা প্রবেশ করলাম টেম্পলে। পাহাড়ের উপরে টেম্পল আর তার অনেক নীচে সাগর। চমৎকার একটি জায়গা! কিন্তু মন ভরে দেখব সে উপায় নেই, ট্যুরিস্ট গিজগিজ করছে। ভালমত হাঁটার উপায় পর্যন্ত নেই, ধাক্কা লেগে যাচ্ছে গায়ে। বিশেষ করে যেখান থেকে ভিউটা সব থেকে সুন্দর সেখানে যেয়ে নাভিশ্বাস উঠে গেল আমাদের। চলে এলাম তাই যেখান থেকে সুর্যাস্ত দেখব সেখানে। তবে এবার আমাদের অপেক্ষা স্বার্থক। বিশাল থালার মত সুর্য পশ্চিম আকাশে লালিমা ছড়িয়ে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেল সাগর মাঝে, এ যে এক অপার্থিব দৃশ্য! সুর্যাস্ত দেখে এক অদ্ভুত ভাল লাগায় আচ্ছন্ন থেকেই ফিরে এলাম হোটেলে। ফেরার পথে আবার লিপ্পো মলে যেয়ে কিছু টুকিটাকি শপিং, কন্যার কিডস জোন আর ডিনারের পর্বটাও সেরে নিলাম। হাতে আর মাত্র একটা ফুল ডে। এদিন শুধু শপিং এর জন্যই বরাদ্দ। বরাবর মতই ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। বালির দিন যে শেষ হবার পথে।

নিয়ন আলোয়

ভ্রমণের শেষ মনে করিয়ে দেওয়া কুটা বীচের এই সুর্যাস্ত

সকাল থেকেই বিষন্ন মন। আজ যে শেষ দিন। উদ্দেশ্য শুধুই শপিং আর এলোমেলো ঘুরে বেড়ানো। সারাদিন মিলে শপিং আর ঘুরাঘুরি করে সন্ধ্যায় এক রেস্তোঁরায় বসে কুটা বীচের আর একটি মনোমুগ্ধকর সুর্যাস্ত দেখে অনেক রাত করেই ফিরলাম হোটেলে। পরদিন হোটেল থেকে কমপ্লিমেন্টারি এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার নিয়ে বালি এয়ারপোর্ট , সেখান থেকে আবার কে এল এয়ারপোর্ট এবং চার ঘন্টা ট্রাঞ্জিট শেষে সেখান থেকে ঢাকা। এভাবেই সাত রাত আট দিনের এক দীর্ঘ, এ্যাডভেঞ্চারপুর্ণ ও মনোমুগ্ধকর একটি ভ্রমণের সমাপ্তি।

ভ্রমণ সংক্রান্ত কিছু টুকিটাকিঃ

খরচঃ
সাত রাত আট দিনের এই ভ্রমণে আমাদের টোটাল খরচ হয়েছে এয়ার ফেয়ার সহ এক লাখ আশি হাজার টাকা (শপিং ছাড়া)। এর মাঝে রয়েছে বিমান, হোটেল, ট্রান্সপোর্ট, ফুড, সাইট সিয়িং ইত্যাদি। এখানে প্রথমেই বলে রাখি ইন্দোনেশিয়ান এক লাখ রুপি মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ছয় শত টাকা। অর্থাৎ, বালিতে যেয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা খরচ করার অভিজ্ঞতা আপনার হয়ে যাবে।

টিকিটঃ
মালয়শিয়া এয়ারলাইন্সে আমাদের তিনজনের (দুইজন এ্যাডাল্ট একজন ছয় বছরের কিড) ঢাকা- মালয়শিয়া -বালি রিটার্ন টিকিট লেগেছে এক লাখ ছয় হাজার টাকা। উল্লেখ্য যে আড়াই মাস আগে টিকিট করার কারণে আমরা এই রেটে পেয়েছি।

ভিসাঃ
ইন্দোনেশিয়ায় ভিসা অন এ্যারাইভাল। আমরা যত দেশে গিয়েছি সব চেয়ে সহজ এবং ঝামেলা মুক্ত ভাবে ভিসা হয়েছে বালিতে। কোন পেপারস কিংবা ছবিও লাগেনা। শুধু রিটার্ন ডেটটা জেনে একটি সিল লাগিয়ে দেয় পাসপোর্টে। ব্যাস, হয়ে গেল ভিসা তাও আবার সম্পুর্ণ বিনা মুল্যে।

হোটেলঃ
কুটা বীচে আমাদের হোটেল ছিল পাম বীচ, ট্যারিফ বাংলাদেশী টাকায় ২৭০০ পার নাইট। এখানে আমরা ছয় রাত ছিলাম। নুসা লেম্বোগান আইল্যান্ডে আমাদের হোটেল ছিল হোটেল মাদে ইন, এটির ও ট্যারিফ বাংলাদেশী টাকায় ২৭০০ টাকা। হোটেলগুলো ও আমরা আড়াই মাস আগে বুকিং দিয়েছিলাম বলে ঈদের এমন পিক সিজনেও এত কম টাকায় পেয়েছিলাম। সাত রাতে আমাদের হোটেল বাবদ টোটাল খরচ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৯ হাজার টাকা।

ট্রান্সপোর্টঃ
আগেই বলেছি আমাদের লোকাল মুভমেন্ট এর জন্য আমাদের গাড়িটি ঠিক করে দিয়েছিল জাকার্তায় বাংলাদেশী দুতাবাসের কর্মকর্তা আমাদের ফ্রেন্ড অনির্বান আর তাই তার সৌজন্যে আমরা অনেক রিজনেবল প্রাইজেই ফুল ডে কার পেয়েছি। এই রেট এখানে আর বলছিনা তবে বালিতে নর্মালি ফুল ডে কার ভাড়া করলে আপনাদের লাগবে বাংলাদেশী টাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। আমাদের নুসা লুম্বাগানে ফাস্ট বোটে যাওয়া আসা বাবদ রকি ফাস্টে দিতে হয়েছে টোটাল ১০০ ডলার অর্থাৎ প্রায় আট হাজার টাকা। বড়দের তিন হাজার আর বেবির দুই হাজার টাকা। লুম্বাগানে হাফ ডে ভ্যান ভাড়া দিয়েছি সাড়ে তিন লাখ রুপি অর্থাৎ ২১০০ টাকা।

সাইট সিয়িংঃ
বালির যে সব জায়গায় আমরা গিয়েছি সে সব জায়গার এন্ট্রি ফি গুলো এখানে উল্লেখ করছি। কিন্তামানি ট্যুরে কিন্তামানি ভিলেজে আমাদের তিনজনের এন্ট্রি ফি লেগেছে কারের পার্কিং চার্জ সহ ৬৪০০০ হাজার রুপি অর্থাৎ প্রায় ৪০০ টাকার কাছাকাছি। ডিএমজি থ্রি ডি আর্ট গ্যালারিতে পার পার্সন এক লাখ দশ হাজার রুপি অর্থাৎ তিনজনের তিনলাখ ত্রিশ হাজার রুপি যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় দুই হাজার টাকা। বোটানিক্যাল গার্ডেনে আমাদের তিনজনের লেগেছে ৬৮০০০ রুপি অর্থাৎ ৪০০ টাকার একটু বেশি। উলুন দানু টেম্পলে আমাদের তিনজনের এক লাখ রুপি অর্থাৎ ৬০০ টাকা। তানাহ লটে তিনজনের এক লাখ ৫৫ হাজার অর্থাৎ ৯০০ টাকার মত। পান্তাই পান্ডোয়াতে তিনজনের ৩৫০০০ অর্থাৎ ২০০ টাকা। উলুয়াটুতে ৮০০০০ রুপি যা প্রায় বাংলাদেশী ৫০০ টাকা।

খাবারঃ
বালির সবচেয়ে পপুলার ফুড হল নাসি গোরাং অর্থাৎ ফ্রাইড রাইস উপরে ডিম পোচ দিয়ে টপিং। নাসি মানে রাইস আর গোরাং অর্থ ফ্রাইড। খেতে খারাপ নয় তবে প্রতি বেলায় খাবার মত অত সুখাদ্যও নয়। এছাড়া রয়েছে চিকেন সাতে। চিকেন সাস্লিক উপরে বাটার সস দেয়া ডিশটিই হল চিকেন সাতে। আমরা তাই মাঝে মাঝে ইন্দো ফুড ট্রাই করলেও ইন্ডিয়ান রেস্তোঁরা, কেএফসি আর ম্যাগডোনাল্ডস এর উপর বেশ ভরসা করেছি। বাংলাদেশ ছাড়া সব দেশেই এসব ইন্টারন্যাশনাল চেইন ফুড শপ গুলোতে খাবারের দাম অনেক কম পেয়েছি আমরা সেই সাথে পরিমান ও অনেক বেশি। খাবারে আমাদের সাত দিনে খুব বেশি খরচ হয়নি তাই। ১৫ হাজারের মধ্যেই সাত দিনের খাবার আমাদের হয়ে গেছে। আর ব্রেকফাস্ট তো হোটেলে কমপ্লিমেন্টারিই ছিল।

শপিংঃ
নতুন একটি দেশে যাবেন আর টুকিটাকি শপিং করবেন না তাই কি হয়? আমরা তাই যাওয়ার আগেই নেট সার্চ দিয়ে কোথায় কি কিনব ঠিক করে গিয়েছিলাম তাই ঝামেলা পোহাতে হয়নি মোটেই। এছাড়া আমাদের আরেক ফ্রেন্ড স্বাতি (অনির্বানের সহধর্মিনী) ও টুকিটাকি কিন্তু অত্যন্ত কাজের কিছু শপিং টিপস দিয়ে আমাদের হেল্প করেছে প্রচুর। উড কার্ভিং আর বাটিকের কাজে প্রসিদ্ধ বালি। এছাড়া কফি তো আছেই । তাই আমরা উডেন শো পিস আর কফি কিনেছি বেশি। সুভেনিয়রের জন্য তীর্থস্থান হল কৃষনা সুভেনিয়র শপ। এখানে গেলে হরেক রকম হ্যান্ডিক্রাফটস আর তার রিজনেবল প্রাইজ দেখে যে কারো মাথা খারাপ হতে বাধ্য। এছাড়া বিডস আর মেটালিক অর্নামেন্টস, সিল্ভার জুয়েলারি, শো পিস, হার্বাল কসমেটিক্স, জুতা, স্যান্ডেল ,ব্যাগ, পোষাক কি নেই এখানে আর সব কিছুর ই দাম একেবারে হাতের নাগালে। তাই বালি শপিং এ ফার্স্ট চয়েজেই থাকবে কৃশনার নাম। এছাড়াও আর একটি শপ আছে এরই মত নাম “আগুং বালি” তবে এখানে দাম কৃশনার চেয়ে কিছুটা বেশিই মনে হল আমার। তবে সুভেনিয়ার ছাড়া আপনি যদি ব্র্যান্ডেড আইটেম কিনতে চান তবে ডিস্কোভারি শপিং মল, বালি ব্রাস্কো, লিপ্পো মল এগুলোতে ঢুঁ মারতে পারেন। দাম যে বেশি হবে তা বলাই বাহুল্য তবে অধিকাংশ দোকানেই সেল চলে তাই সেখান থেকে বেছে আপনার পছন্দ মত জিনিস আপনি কিনতেই পারেন। এছাড়া আমরা বিভিন সুপার শপ থেকে কফি ছাড়াও বিভিন্ন ফ্রুট জুস, বাদাম, ফ্রুটস (ম্যাঙ্গোস্টিন, স্নেক ফ্রুট), নুডুলস এসব কিনেছি। এগুলো খেতে যেমন টেস্টি তেমনি দামও রিজনেবল।

মোবাইল সিমঃ
প্রথম দিনেই আমরা রাতে একটি লোকাল অপারেটরের (Indo sat) সিম কার্ড কিনে ছিলাম। খরচ হয়েছে এক লাখ রুপি (ছয় শত টাকা) আর সাথে তিন শত টাকার টক টাইম। তবে এই সিমে নেট ওয়ার্কের প্রব্লেম হচ্ছিল বেশ।

মানি এক্সচেঞ্জঃ
বালিতে প্রচুর মানি এক্সচেঞ্জ রয়েছে তবে এদের অধিকাংশই কিন্তু নির্ভরযোগ্য নয়। লাখ লাখ রুপি লেনদেন হয় বলে এদের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্যুরিস্টদের ঠকানোর প্রবনতা দেখা দেয়। ডলার রেট বেশি দেয়ার কথা বলে তারা ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করে থাকে। অনেক টাকার মধ্যে দুই একটি নোট গায়েব করে দেয়া এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমরা তাই যাওয়ার আগেই খোঁজ নিয়ে গিয়েছিলাম যে সবচেয়ে অথেন্টিক মানি এক্সচেঞ্জ হল সেন্ট্রাল কুটা। তাই আমরা প্রতিবার সেন্ট্রাল কুটাতেই গিয়েছি। তবে যেখানেই যান না কেন রুপি গুণে নিতে ভুলবেন না কিন্তু।

পরিশেষঃ বিশালতা, গভীরতা আর প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালের লীলাভুমি হল বালি। মেঘে ঢাকা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি, পাহাড় ঘেরা লেক, শতবছরের পুরনো টেম্পল, রঙ বেরং এর প্রবাল আর সফেদ বালির সমুদ্র সৈকত, উঁচু পাহাড়ের গায়ে গড়া প্রাচীন স্থাপত্য, স্থানে স্থানে আইকনিক বালি গেট ,লাল, নীল বোগেনভোলিয়া আর সাদা কাঠগোলাপ আর সবুজে ছাওয়া বনানী এই হল বালির চীরন্তন রুপ। আর এর সাথে রয়েছে চমৎকার ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি আতিথেয়তা, সি ওয়াক, স্নোরকেলিং, সার্ফিং, প্যারাগ্লাইডিং জমজমাট বীচ এরিয়া, সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট কিছু রেস্তোঁরা আর ক্লাবে উদ্দ্যাম নাইট লাইফ, আধুনিক শপিং মল , কাপড়ের বাটিক রঙ্গে আর কাঠে খোদাই করে আঁকা এদেশের লক্ষ মানুষের ভাগ্যে নির্ধারনের কাহিনী এই নিয়েই বৈচিত্র আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বালি । এর প্রতিটি বৈচিত্র, বালিনিজ সংস্কৃতি আর প্রকৃতির অমোঘ সৌন্দর্য্যের নেশায় প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন কোণা থেকে ছুটে আসে লক্ষাধিক সৌন্দর্য্য পিপাসু এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ আর তাই তো অপরুপ সৌন্দর্য্যের লীলাভুমি এই স্থানটি আজ বিশ্বের প্রথম সারির ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনে পরিণত হয়েছে।

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top