ইতিহাস

মৃত্যুর পরেও আপনি শাসন করবেন রাজ্য!!

নিয়ন আলোয়

আমাদের প্রায় সবার ধর্মগ্রন্থেই লেখা আছে যে মানুষ আসার সময় খালি হাতে এসেছে আর যাওয়ার সময়ও খালি হাতেই যাবে। মৃত্যুর পরে আপনার আর সবার সাথে এক কাতারে মিশে নিজের কর্ম সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিই।

কিন্তু মিশরের ফারাওরা আবার এর ব্যাতিক্রম ছিলেন। নিজেদেরকে ফারাওরা সূর্যের সন্তান বলে মনে করতেন, যারা ধুলো- মাটির এই পৃথিবীতে মানুষ নামের কিছু নগণ্য জীবকে সঠিক পথ দেখাতে এসেছেন। তারা মনে করতেন যে জীবিত অবস্থায় তারা যেভাবে শাসন করছেন রাজ্য, মৃত্যুর পরও সেভাবেই শাসন করে যাবেন। তাই তাদের আর দশজনের মত মৃত্যু হলে চলবে কি করে? এই ভাবনা থেকে ফারাওরা তাদের উপদেষ্টাদেরকে বললেন অমর হওয়ার উপায় বের করতে। কিন্তু মৃত্যুকে ঠেকানোর তো কোন পথ নেই। তাই গবেষণা করা হলো মৃত্যুর পরও কিভাবে বেঁচে থাকা যায়। এই চিন্তা থেকেই উৎপত্তি “মমি” ধারণার।

মমি বানানোর এই প্রক্রিয়া এক দিনে রপ্ত হয়নি। অনেক দিনের প্রচেষ্টা এবং অনেক উদ্ভাবকের কষ্টের বিনিময়ে তৈরি হয় সর্বোৎকৃষ্ট মমি বানানোর পদ্ধতি এবং আজও এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ভেষজ উপাদানগুলো বিজ্ঞানীদের মনে বিস্ময় জাগায়।

নিয়ন আলোয়

ফারাওদের মাথার ব্যান্ড

মমি বানাতে খুব দক্ষ লোক লাগতো, তারা প্রথমে মৃতব্যক্তির নাকের মাঝে ছিদ্র করে মাথার ঘিলু ও মগজ বের করতো অত্যন্ত সাবধানে। এ ক্ষেত্রে লোহা জাতীয় জিনিসের সহায়তা নেয়া হতো। তারপর মৃতদেহের পেটের বাম পাশে কেটে ভেতরের নাড়িভুড়ি বের করে ফেলা হতো। সেটার পর শরীরের বিভিন্ন পচনশীল অঙ্গ যেমন: ফুসফুস, বৃক্ক, পাকস্থলি ইত্যাদি বের করা হতো।পরে আবার পেট সেলাই করে দেয়া হতো সুন্দরকরে । সেলাই করার সময় উচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হতো ,কারণ পেট সেলাই করতে গিয়ে যদি পেটের ভেতর বাতাস ঢুকে যায়, তবে মৃতদেহ খুব দ্রুতই পঁচে যেত।

এরপর তারা মৃতদেহকে লবণ মাখিয়ে শুকাতো।লবণ একদিকে যেমন শরীরের পানিকে টেনে নিত তেমনি এন্টিব্যাক্টেরিয়াল রূপেও কাজ করত। যখন সব ভালোভাবে শুকিয়ে যেতো, তখন পাইন গাছ ও অন্যান্য মসলা দিয়ে তৈরি মিশ্রনে মৃতদেহকে রেখে দেওয়া হতো। রেখে দেওয়ার চল্লিশ দিন পর খুব সূক্ষ্ম লিলেন জাতীয় কাপড় দ্বারা পুরো শরীর মুড়িয়ে নিতো। এই লিনেন কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে রেখে দিত সুগন্ধি দ্রব্যের পুঁটলি। এভাবে তারা মমিগুলোকে সংরক্ষণ করতো। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৭০ দিন লাগতো। তারপর শুকিয়ে যাওয়া মমিকে রেখে দিত জমকালো কারুকাজ করা মুল্যবান ধাতুর তৈরি  একটা কফিনে। সেই কফিনের উপর আবার নানা নিষেধাজ্ঞা লিখে দেওয়া হতো, বলে দেওয়া হতো এই মমি স্পর্শকারীর ভয়ংকর পরিণতির কথা।

নিয়ন আলোয়

ক্যানোপী জার (যাতে ফারাওর শরীর থেকে বের করে শুকিয়ে ফেলা অঙ্গগুলো রাখা হত)

এইসব তো গেল মমি বানানোর কথা। এবার আসি মমির সাথে পাঠানো জিনিসপত্রের কথায়। আগেই বলেছি যে, ফারাওরা মনে করতো তারা মৃত্যুর পরও রাজ্য শাসন করবে। তাই একজন রাজার জন্য দরকারী সব কিছুই মমির সাথে পিরামিডের গুপ্তকক্ষে রাখা হত। কয়েকটা জিনিসের নাম নিচে দেওয়া হলঃ

১) সম্রাটের মৃত্যু মুখোশ, ২) শেয়ালমুখো আনুবিসের মূর্তি, ৩) হেডরেস্ট (বালিশের মত), ৪) গরমে বাতাস করার জন্য পাখা, ৫) সিনেট গেম (যা দেখতে প্রায় দাবা খেলার মত), ৬) চিতার মাথা,  ৭) লাঠি (যেন মৃত্যুর পর তা দিয়ে পাখি মারা যায়), ৮) স্ক্যারাব বিটল, ৯) সুগন্ধীর জার,  ১০) ক্যানোপী জার (যাতে ফারাওর শরীর থেকে বের করে শুকিয়ে ফেলা অঙ্গগুলো রাখা হত), ১১) জীবনের দেবতার মূর্তি, ১২) বিড়ালের মমি, ১৩) অমাত্য, ভৃত্য, দাস-দাসী সবার মূর্তি, (এইসব মূর্তিকে বলা হত উশবতি), ১৪) সারাজীবনে সঞ্চিত কয়েক লক্ষ ভরি সোনা-রুপা-হীরা-জহরত, ১৫) দামি দামি সব যুদ্ধের ছবি, ১৬) সম্রাটের রথ বা চ্যারিওট।  এসব ছাড়াও আরোও অনেক কিছু থাকতো সেখানে।

নিয়ন আলোয়

ফেরাওদের হেডরেস্ট

এত জিনিসপত্র সবকিছু ওই গুপ্তকক্ষে রেখে কক্ষের মুখ কৌশল করে আটকে দেওয়া হতো যেন অনাহুত কেউ সেখানে ঢুকতে না পারে। প্রবেশপথে থাকত নানা গোলকধাঁধা আর মৃত্যুফাঁদ।

এভাবেই মমিগুলো হাজার বছর ধরে লুকিয়ে থাকতো পিরামিডের অভ্যন্তরে। কিন্তু মমি চোররা বসে থাকতো না। তারা নানা ফন্দি-ফিকির করতো ভেতরে ঢুকার, কারণ একবার ঢুকতে পারলে সারাজীবন পার করার মত সম্পদ পাওয়া যাবে। এভাবেই আস্তে আস্তে মমির কথা ছড়িয়ে পরতে থাকে।

নিয়ন আলোয়

ফারাও তুতেনখামেনের মৃত্যু মুখোশ

মমি মানুষের নজরে আসে কয়েক দশক আগে। ইউরোপিয়ান, আমেরিকান প্রত্নতত্ত্ববিদরা মমিকে মানুষের সামনে উন্মোচন করেন। মানুষ আস্তে আস্তে আগ্রহী হতে শুরু করে। কারো আগ্রহ ছিল নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রতি, আবার কারোর লোভ ছিল মমির সাথে থাকা সম্পদের প্রতি। তাই মানুষ দলে দলে মমি খোঁজে মিশর যাওয়া আরম্ভ করে। তখনি প্রকাশ পায় মমির অভিশাপের কথা। মিশরের আদি বাসিন্দাদের মতে, মমির কফিনের গায়ে এবং প্রবেশ ফটকে লেখা থাকে নানা অভিশাপের নাম। তারা বলে থাকে, যে এই মমিকে স্পর্শ করবে তার উপর নেমে আসবে সেই অভিশাপ। কিন্তু বাইরে থেকে আগত মানুষরা এইসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতো না।

কিন্তু মমির সন্ধান করার সময় ঘটতে থাকে কিছু অদ্ভুত জিনিস। অনেকেই অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত, কেউ পাগল হয়ে ঘুরে বেরাত। আবার কিছু মানুষ নানা অশরীরী জিনিস দেখত। এমনকি কাজ শেষ করে নিজের বাড়ি চলে গিয়েও শান্তি হতো না। মমি আবিষ্কার বা এসব কাজে জড়িতদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন, দেউলিয়া হয়ে গিয়েছেন কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ কারোর দুর্ঘটনা হয়েছে। এসব কাহিনীর মধ্যে কয়েকটি খুব আলোচিত হয়েছিল।

প্রথম অভিশাপের কাহিনী জানা যায় ১৯৩২ সালে। সেই বছর ফারাও তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কার হয়। আবিষ্কারক ছিলেন Howard Carter এবং তাকে স্পন্সর করেন Lord Carnarvon। তারা দুইজন একসাথে পিরামিডে ঢুকেন। এর কিছু সপ্তাহ পরে Lord Carnarvon সামান্য এক মশার কামড়ে নিউমোনিয়া হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর সময় আশপাশের এলাকা হঠাৎ করে ব্ল্যাক আউট হয়ে যায়।

নিয়ন আলোয়

ফারাও তুতেনখামেনের পিরামিডের ভেতরে Howard Carter এবং Lord Carnarvon

অভিশপ্তের কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে টাইটানিকের জাহাজ ডুবির কথা। অনেকেই বলে থাকেন যে, টাইটানিকে নাকি ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে পরিবহনের জন্য একটা মমি পাঠানো হয়েছিলো যা অভিশপ্ত ছিলো এবং সেটার জন্যই টাইটানিক ডুবেছে।

নিয়ন আলোয়

ফারাও তুতেনখামেনের স্বর্ণ আবৃত কফিন

এছাড়া আছে  “Royal Air Force Britannia Aircraft” এর কাহিনী। সম্রাট তুত বা তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৭২ সালে ঐ বিমানে করে লন্ডনের উদ্দ্যেশ্যে কিছু সামগ্রী পাঠানো হচ্ছিল। সেই বিমানের এক টেকনিক্যাল অফিসার ঠাট্টা করে প্রদর্শনী সামগ্রীর ক্রেইটে লাথি মারেন এবং পরবর্তীতে তার পা ভেঙ্গে যায়। বাকি তিন জন অফিসারের একজনের ডিভোর্স হয়ে যায় আর অন্য দুইজন অফিসারের হঠাৎ হার্ট এট্যাক হয়।

তারা প্রত্যেকেই এর জন্য ফারাও তুতেনখামেনের অভিশাপকে দায়ী করেন এবং ১৯৭৮ সালে নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড পত্রিকায় এটা ছাপা হয়।

এসব ঘটনার পিছনের কারণ সেভাবে ব্যাখ্যা হয়নি আর মানুষও একে মমির অভিশাপ হিসেবেই মেনে নিয়েছে।

তবে যাই হোক না কেন, সত্যিই জানতে ইচ্ছে করে ফারাওরা যে উদ্দ্যেশ্যে মমি বানিয়েছিলেন এত কষ্ট করে তা আদৌ তাদের কোনো কাজে এসেছিল কিনা। তারা কি মৃত্যুর পর এখনো নিজেদের রাজ্য শাসন করছেন নাকি তাদের সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top