ফ্লাডলাইট

জিততে শিখিয়েছিলেন ডেভ হোয়াটমোর

neon aloy ডেভ হোয়াটমোর নিয়ন আলোয়

১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সাথে সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর টানা পাঁচটা বছর ওয়ানডেতে জয় শূন্য কেটেছে বাংলাদেশের। টেস্ট ক্রিকেটে একের পর এক ইনিংস পরাজয় যেন নিয়তি বানিয়ে ফেলেছিলো বাংলাদেশ। টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পর কোথায় সামনে এগিয়ে যাবে, সেখানে যেন আরো পিছিয়ে পড়ছে প্রতিটা সিরিজেই! বাংলাদেশ দল তখন ক্রিকেট বিশ্বে এক হাসির বস্তু, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে থাকলেন কেন বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস দেয়া হয়েছিলো? যে দল মাঠে নামেই নাকি হারার জন্য! এডি বারলোর অপ্রত্যাশিত বিদায়ের পর ট্রেভর চ্যাপেল আর মহসীন কামালের অদক্ষতা, অপেশাদারীত্ব, অনভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছিলো ঘোরতর অন্ধকারের দিকে। এমনই অন্ধকার, যখন কানাডা-কেনিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপে খেলাটাই যেন প্রহসন মনে হতে থাকে।

এই কঠিন সময়টাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথ হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা ছিলো, ফুটবলের মতো অবস্থানে চলে যেত পারত। কিন্তু সেটা হয়নি মূলত দুটি কারণে। একটি, এই দেশের ক্রিকেটপাগল দর্শক যারা ম্যাচের পর ম্যাচ মাঠে গিয়ে হোক আর টিভির সামনে বসে হোক- দলের পরাজয়ের স্বাক্ষী হতো কেবল একটি জয়ের আশায়। কোন কিছুই এই দর্শকদের বাংলাদেশ দলের থেকে আলাদা করতে পারেনি। আর দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে- ডেভ জাদু, ডেভ মন্ত্র বা ডেভ মহিমা যে নামেই ডাকেন সেটি, অর্থাৎ ডেভ হোয়াটমোর।

ডেভ হোয়াটমোর ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, প্রথম মিশন ছিলো নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। পুরো দেশই তখন আতংকের ভেতর, বাতাসে উড়ছে একদিনে টেস্ট শেষ করে দেয়ার কাগজে কলমের লজ্জাজনক হিসাব, সেটাই না জানি এবার খেলার মাঠে বাস্তব করে দেয় অস্ট্রেলিয়া! তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়নি, প্রথম টেস্ট বাজেভাবে ইনিংস পরাজয়ে হারলেও দ্বিতীয় টেস্টে ভালোই লড়াই করেছিলো বাংলাদেশ, ওয়ানডে সিরিজেও ছিলো লড়াই করার ছাপ। অস্ট্রেলিয়ার পরেই ছিলো পাকিস্তান সফর, সেই সফর যেখানে বাংলাদেশ পেতে পারতো তাদের প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ। পায়নি কারণ একজন রশিদ লতিফের নির্লজ্জ চুরি, পিসিবি’র নিয়ম ভেঙে সূর্য ওঠার আগেই পিচে পানি ছিটিয়ে রোলার টানা আর একজন ইনজামামের অতিমানবীয় এক ইনিংসের কারণে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের চির আক্ষেপের এক গল্প এই মুলতানই আবার যেন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এক ছবি। টেস্ট ক্রিকেটে এইরকম হাড্ডাহাড্ডি লড়াই মুলতানের আগে আর কখনোই করেনি বাংলাদেশ। এটাই ছিলো হোয়াটমোরের প্রাথমিক সাফল্য, হারতে থাকা দলটার ভেতর জয়ের ক্ষুধা তৈরী করা আর মানসিকতার পরিবর্তন।

neon aloy ডেভ হোয়াটমোর নিয়ন আলোয়

হোয়াটমোরের হাত ধরে মুলতানে বাংলাদেশ জিতে নিতে পারতো নিজেদের প্রথম টেস্ট, যে স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় ইনজামামের এক অসাধারণ ইনিংস এবং রশীদ লতিফের নির্লজ্জ চুরির কারণে।

অস্ট্রেলিয়ান হলেও হোয়াটমোরের জন্ম শ্রীলংকার কলম্বোতে। শৈশব কেটেছে সেখানেই। পরে কোচ হয়েও লম্বা সময় থেকেছেন শ্রীলংকায়, যার কারণে এশিয়ার ক্রিকেট কালচার, এশিয়ার মানুষের ক্রিকেট অনুভূতি আর প্লেয়ারদের আবেগের সাথে হোয়াটমোর পরিচিত ছিলেন। চ্যাপেল, কামালরা যেখানে বলেছেন ভাষাগত সমস্যার কথা, সেখানে ডেভ বাংলাদেশের প্লেয়ারদের সাথে গড়ে তুলেছিলেন পেশাদারিত্ব, বন্ধুত্ব আর কঠোরতার অদ্ভুত এক মায়াবী সম্পর্ক।

দায়িত্ব নিয়েই তিনি অলরাউন্ডার-ভিত্তিক দল গড়ার দিকে মনোযোগ দেন। শ্রীলংকার ক্ষেত্রেও তিনি এটাই করেছিলেন। হোয়াটমোরের বাঁহাতিদের বিশেষ পছন্দ ছিলো। সম্ভবত এই কারণেই শ্রীলংকার ওই দলেও যেমন প্রচুর বাঁহাতি ছিলো, তেমনি বাংলাদেশের কোচ থাকাকালীন সময়েও একাধিক বাঁহাতি ক্রিকেটার দলে আসেন। একজন সত্যিকারের অলরাউন্ডার খুঁজতে গিয়ে তিনি দলে সুযোগ দেন প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানাকে। বর্তমানে সাকিব আল হাসান যেই ভূমিকা পালন করেন সেই ভূমিকায় হোয়াটমোরের প্রথম পছন্দ ছিলেন রানা, সেটা সাকিবের আগমনের বছর তিনেক আগেই। কে জানে, রানা বেঁচে থাকলে হয়তো আমরা দুইজন বিশ্বমানের অলরাউন্ডার পেতাম! হয়তো রানা পারেননি অকালে হারিয়ে গিয়ে, তবে হোয়াটমোরের দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা থেমে থাকেনি, তিনি কি চেয়েছিলেন সেটা সাকিব প্রমান করেছেন ভবিষ্যতে।

২০০৪ সালে বাংলাদেশ দল জিম্বাবুয়ে সফরে যায়, অধিনায়ক হিথ স্ট্রিকের পূর্ণশক্তির জিম্বাবুয়ের সেই দলের বিপক্ষে হারারেতে পাঁচ বছর পর আর ৪৭ ম্যাচের পর জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। যেন মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টি। এই জয়টাই পুরা দলকে বদলে দেয়। ওই বছরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে প্রথমবারের মতো পাঁচ দিন খেলে নিজেদের যোগ্যতায় লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। হাবিবুল বাশার, খালেদ মাসুদ পাইলট আর মোহাম্মদ রফিক সেঞ্চুরী করেন সেই ম্যাচে। ওয়ানডে সিরিজের এক ম্যাচে জন্ম নেয় আরেক আক্ষেপের, মাত্র ১৪৪ রান করেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ উইকেট ফেলে দেয় বাংলাদেশ! কোনমতে ১ উইকেটের জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দায়িত্ব নেয়ার এক বছরের মাথায় বাংলাদেশের এই পরিবর্তন প্রশংসা পাবার মতোই ছিলো।

হোয়াটমোর যখন বাংলাদেশের দায়িত্বে, ঠিক একই সময় আরেক অস্ট্রেলীয় রিচার্ড ম্যাকিন্সের অধীনে বাংলাদেশের প্রথম হাই পারফর্মেন্স ইউনিট গড়ে উঠছিলো। সেই এইচপি ইউনিটের দিকে নজর ছিলো হোয়াটমোরের এবং তৎকালীন নির্বাচকদের। ২০০৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ সফরে আসে জিম্বাবুয়ে। যদিও জিম্বাবুয়ের প্রথম সারির একাধিক ক্রিকেটার তখন বিদ্রোহ করে জাতীয় দলের বাইরে, তবুও টাটেন্ডা টাইবু-টেইলর-চিগুম্বুরা-মাসাকাদজাদের সেই জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশের সমানই ছিলো শক্তিতে প্রায়। এই সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ পায় অধরা টেস্ট জয়। এই জয় ছিলো স্বস্তির, ক্রমাগত টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিরুদ্ধে ছোট্ট এক জবাব আর জাতির জন্য বিশাল আনন্দের উপলক্ষ্য। জিম্বাবুয়ে অবশ্য দ্বিতীয় টেস্টে ফিরে আসার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়, অধিনায়ক টাটেন্ডা টাইবুর লড়াকু সেঞ্চুরী (১৫৪*) ম্যাচটা প্রায় বের করেই ফেলেছিলো কিন্তু বড় ইকবাল মানে নাফিস ইকবালের দূর্দান্ত এক সেঞ্চুরীতে প্রায় চার সেশন ব্যাট করে ম্যাচ ড্র আর সিরিজ জিতে নেয় বাংলাদেশ। এই সিরিজ জয়ে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন হোয়াটমোরের সময়েই দলে আসা বাঁহাতি স্পিনার এনামুল হক জুনিয়র। ওয়ানডে সিরিজে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও মানজারুল ইসলাম রানার পরপর দুই ম্যাচে দূর্দান্ত বোলিং সিরিজে সমতা আনে। শেষ ম্যাচে, যেটা ছিলো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেরও শেষ ক্রিকেট ম্যাচ, সেটাতে মোহাম্মদ রফিক আর আফতাব আহমেদের টর্নেডো ব্যাটিং প্রথমবারের মতো সিরিজ জেতায় বাংলাদেশকে। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে দুই ম্যাচ হেরে পিছিয়ে থেকেও সিরিজ জয়ের এটি প্রথম ঘটনা।

অলরাউন্ডার-ভিত্তিক দল গড়ার ইচ্ছায় হোয়াটমোর প্রথমে কিছুদিন মুশফিকুর রহমান বাবুকে খেলালেও পরে ২০০৪ সালে তার জায়গায় সুযোগ দেন আফতাব আহমেদকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট নিয়ে আফতাব তার প্রতিদান দিতে ভুল করেননি। একই বছর ভারতকে হারানোর ম্যাচেও দলীয় সর্বোচ্চ ৬৭ (৯৮) রান করেন আফতাব। হোয়াটমোরের অন্যতম সেরা আবিষ্কার ছিলো এই আফতাব আহমেদ। ভয়-ডরহীন ক্রিকেটের শুরু এই আফতাবের হাত ধরেই।
২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে এই জয় ছিলো বিশ্বে সাড়া জাগানো এক জয়। এক বছর আগে যে দল কানাডা, কেনিয়ার কাছে হেরেছিলো সেই দলটাকেই হোয়াটমোর একটা সম্মানজনক অবস্থানে তুলে আনেন।

২০০৫ সালে এইচপি ইউনিট থেকে আস্তে আস্তে ক্রিকেটার আসতে শুরু করে জাতীয় দলে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, দল নির্বাচন মূলত নির্বাচকদের কাজ হলেও ওই সময় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হোয়াটমোরের ভূমিকাই প্রধান ছিলো। এমনকি প্লেয়ার অথচ অধিনায়কের চেয়েও হোয়াটমোরের প্রতি মিডিয়ার আগ্রহ বেশি ছিলো। এটা যেন হোয়াটমোরের দল! হাবিবুল বাশার বা খালেদ মাহমুদের না! ২০০৫ সালে এইচপি থেকে প্রথম দলে আসেন শাহরিয়ার নাফীস। নাফিস ইকবাল আর জাভেদ ওমর বেলিমের ঘুমপাড়ানি ওপেনিং জুটির কারণে প্রায়শই রফিককে পাঠানো হতো ওপেন করার জন্য, সেই জন্যই একটা স্থায়ী সমাধানের আশায় শাহরিয়ার নাফিসকে দলে আনা হয়। আজকে তামিম-সৌম্য জুটি যে আক্রমনাত্বক ক্রিকেট খেলে তার গোড়াপত্তন এই শাহরিয়ার নাফিসের মাধ্যমে, যার ক্রেডিট কিঞ্চিৎ হোয়াটমোরের!

২০০৫ সালের ১৮ জুন ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় “অঘটন” ঘটিয়ে দেয় হোয়াটমোরের বাংলাদেশ! রিকি পন্টিং-এর অপরাজেয় আকাশে উড়তে থাকা অস্ট্রেলিয়াকে পরাজয়ের স্বাদ দিয়ে মাটিতে টেনে নামায় মোহাম্মদ আশরাফুলের মহাকাব্যিক এক সেঞ্চুরীর উপর ভর করে। এক বছর পরে এই অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট ম্যাচে ফতুল্লার মাটিতে “প্রায় হারিয়ে” দিয়েছিলো বাংলাদেশ।

২০০৬ সালে ডেভ হোয়াটমোর বিসিবিকে তার একটা পরিকল্পনার কথা জানান। সেটা ছিলো দলের জয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে প্রথমে। এজন্য জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া, স্কটল্যান্ডের মত ছোট দল্পগুলার সাথে নিয়মিত খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। হোয়াটমোরের যুক্তি ছিলো এদের সাথে জিততে জিততেই একদিন জয়ের অভ্যাস হবে প্লেয়ারদের, তখন বড় দলের সাথেও জিতবে। ২০০৩ বিশ্বকাপে কেনিয়ার কাছে হারা বাংলাদেশ ২০০৬ সালের শুরুতে কেনিয়াকে ৪-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে।

হোয়াটমোর-হাবিবুল বাশারের জুটি নিয়মিত ম্যাচ জেতা শুরু করে তখন থেকেই। রেকর্ড বুকে এগিয়ে থাকা জিম্বাবুয়ে, কেনিয়াকে জয় সংখ্যায় পেছনে ফেলাও তখন থেকেই। এইচপি ইউনিট থেকে একে একে জাতীয় দলে আসতে থাকেন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল। জাতীয় দলে না আসলেও জাতীয় দলের রাডারের আওতায় আসেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ।

২০০৬ সালেই বগুড়ায় ম্যাচ জয়ের পর মাঠে ক্রিকেটারদের বাঁধভাঙা উল্লাস দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন হোয়াটমোর! ড্রেসিং রুমে বলেছিলেন “এটা একটা জয় মাত্র, এর বেশি কিছু না। এরকম অসংখ্য ম্যাচ জিততে হবে”। হোয়াটমোর ততদিনে বুঝে গেছেন বাংলাদেশের সামর্থ্য আর প্রতিভা সম্পর্কে, জেনে গেছেন একটা ম্যাচ জিতেই উল্লাসে ফেটে পড়ার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে।

২০০৭ বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখেই সামনে এগিয়েছিলেন ডেভ, তবে সেটা এমনভাবে যেটা কারো চোখে ধরা পড়েনি বড় হয়ে। যেমন রাতারাতি বিরাট কোন পরিবর্তন আনেননি। আস্তে আস্তে দলে এনেছেন পছন্দের ক্রিকেটারদের। ঠিক চ্যাপেলের বিপরীত। চ্যাপেল যেমন এসেই নান্নু, বুলবুল, মনিদের একসাথে বাদ দিয়ে দেন। দুইজনই অস্ট্রেলীয়, অথচ কাজের ধরণে কি অমিল!

হোয়াটমোরের সময় ২০০৪ সালে দলে আসেন আফতাব আহমেদ আর আবদুর রাজ্জাক। তারপরের বছর শাহরিয়ার নাফিস, সৈয়দ রাসেলরা। তারপর বিশ্বকাপের আগে আগে সাকিব, তামিমরা। আবার একই সাথে দলে রফিক, বেলিম, হাবিবুল বাশাররা ছিলেন সিনিয়র হিসেবে। আর এদের সবাইকে নিয়েই হোয়াটমোরের বাংলাদেশ অংশ নেয় বিশ্বকাপে।

একেবারে সমালোচনা ছিলোনা হোয়াটমোরের- সেটা কিন্তু না! বিশ্বকাপের একেবারে আগে খালেদ মাসুদ পাইলটের বদলে কিপার হিসেবে মুশফিকুর রহিমকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেয়া হয়। যদিও নির্বাচকরা খালেদ মাসুদকে নিশ্চিত করেছিলেন তিনিই যাবেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। এটা নিয়ে সেসময় যথেষ্ঠ তোলপাড় হয় কারণ পাইলট বাংলাদেশের হয়ে অনেক কিছু করেছেন আর কিপার হিসেবে তিনি ছিলেন বিশ্বমানের। বলা হয়, তার সময়ে এশিয়ার সেরা কিপার ছিলেন তিনি। তবে বিশ্বকাপে ভারতের সাথে ম্যাচেই ফিফটি আর বর্তমানের মুশফিকের অবস্থান দেখে এতোদিন পর পিছনে ফিরে তাকালে মনেহয় হয়তো মাঝে মাঝে কঠিন হতে হয় কোচদের।

সেই বিশ্বকাপে কি হয়েছিলো সেটা এখন সবাই জানেন। বাংলাদেশের কাছে হেরে প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়া ভারত তাদের পুরা দলের কাঠামোই বদলে ফেলে, একাধিক প্লেয়ারকে বাদ দেয়। খেলার ধরন পাল্টে ফেলে। চারবছর পর বিশ্বকাপ যেতে।এই যে ভারতের এতো পরিবর্তন, তার কিছুটা ক্রেডিট কেন যে ভারত বাংলাদেশকে দেয় না! যাইহোক, সুপার এইটে বাংলাদেশ হারিয়ে দেয় সাউথ আফ্রিকাকে। অর্থাৎ বাংলাদেশ তখন সেরা আট দলের একটি দল।

এই বিশ্বকাপই ছিলো হোয়াটমোরের শেষ মিশন। হোয়াটমোর যাযাবর টাইপের কোচ। এক জায়গায় বেশিদিন থাকেন না। বিশ্বকাপ জেতার পর শ্রীলংকা তাকে অনুরোধ করেও রাখতে পারেনি। তবে বিসিবি অনুরোধ করলে হোয়াটমোর বিশ্বকাপের পরপরই হওয়া ভারতের সাথে হোম সিরিজ পর্যন্ত থাকতে রাজি হন। সেসময় হোয়াটমোর প্রকাশ্যে স্বীকার করেন তিনি ভারতের কোচ হবার জন্য আগ্রহী, কথাও চলছে ভারতের সাথে। যদিও হোয়াটমোর এক সিরিজের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলেন তবুও বাংলাদেশের কোচ থাকাকালীন আরেক দলের কোচ হবার আগ্রহ প্রকাশ করাটা উচিৎ হয়নি। তবে এটাও সত্যি, দেশটা ভারত বলেই এতো সমালোচনা হয়েছিলো অন্য দেশ হলে এতোটা হতনা।

হোয়াটমোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন যখন, তখন এক অন্ধকার রাস্তায় অলিগলি খুঁজছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হাস্যরসের বিষয় বাংলাদেশের ব্যাটিং, মাঠে নামা মানেই পরাজয়ের আরেকটা করুণ গল্প, দলটা তখন যেন ধু-ধু মরুভূমিতে “সম্মানজনক পরাজয়” এর আশায় ঘুরতে থাকা এক ক্লান্ত-বিধ্বস্ত-দিশেহারা বেদুইনের দল। আর হোয়াটমোর যখন দায়িত্ব ছাড়েন তখন বাংলাদেশ সমীহ জাগানো এক দলের নাম। বাংলাদেশের ক্রিকেট চাইলে দুই পর্যায়ে ভাগ করা যায়, হোয়াটমোর পূর্ব অধ্যায় আর হোয়াটমোর পরবর্তী অধ্যায়। মাঝের হোয়াটমোর অধ্যায় বলতে পারেন যুগঃসন্ধি, ছোট দল থেকে বড় দল হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। হোয়াটমোরই শিখিয়েছেন কিভাবে বড় দলের সাথে জিততে হয়। শততম ওয়ানডেতে ভারতের বিপক্ষে জয় থেকে বিশ্বকাপে সাউথ আফ্রিকা, বড় দলগুলাকে হারানোর স্বাদ হোয়াটমোরের হাত ধরেই। আর হোয়াটমোর রেখে গেছেন সাকিব, তামিম, মুশফিককে- যারা এখন দলের স্তম্ভ।

neon aloy ডেভ হোয়াটমোর নিয়ন আলোয়

শিষ্য ‘পাগলা’র গুরু ডেভ।

মাশরাফি বিন মর্তুজা আর মানজারুল ইসলাম রানা হোয়াটমোরের দুই প্রিয় শিষ্য। মাশরাফিকে “পাগলা” নামে ডাকতেন তিনি। “মাশরাফি” বইয়ের শুরুতেই মাশরাফির সাথে প্রথম দেখা থেকে শুরু করে নানান বিষয় নিয়ে একটা আলাদা লেখাই আছে ডেভ হোয়াটমোরের। মাশরাফি’র বাইকে ঘুরে বেড়ানো অথবা নিজেই সেই বাইক নিয়ে দুই পাঁক ঘুরে আসার মত সম্পর্ক ছিলো মাশরাফির সাথে, এখনো আছে। তাইতো গতবছর বরিশাল বুলসের কোচ হয়ে যখন এসেছিলেন, তখন মাশরাফির বাসায় চলে গিয়েছেন একসাথে খাবার খেতে। ইনজুরির কারণে মাশরাফিকে খুব খেয়াল করে ব্যবহার করেছেন ডেভ। সেই মুলতান টেস্টের আগে অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ, ম্যানেজার সবাই চাইলেন মাশরাফিকে, হোয়াটমোরের সাফ জবাব টানা তিন টেস্টে তিনি ম্যাশকে খেলাবেন না। মুলতানের সবুজ উইকেটে খালেদ মাহমুদ আগুন ঝরানোর পর মাশরাফির না থাকাটা আরো বড় হয়ে চোখে পড়েছিলো সবার।

আর রানার ব্যাপারে মিডিয়া প্রায়ই লিখতো তার উপর “ডেভ মহিমা” আছে! দেখা যাচ্ছে টাইমিং হচ্ছেনা, শট খেলতে পারছেন না তবুও কিভাবে কিভাবে রান পেয়ে গেছেন, তখন মিডিয়া মজা করে লিখে দিতো এটা “ডেভ মহিমা”! রানার ভেতর প্রচন্ড সম্ভাবনা দেখেছিলেন ডেভ। রানার মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি, যখনই বাংলাদেশ এসেছেন অন্য দলের কোচ বা ধারাভাষ্যকর হয়ে ছুটে গেছেন রানার বাসায়। ডেভ হোয়াটমোর হাবিবুল বাশার, মাশরাফির সাথে বেশ কয়েকবার রানার বাসায় গিয়েছেন।

neon aloy ডেভ হোয়াটমোর নিয়ন আলোয়

বাংলাদেশ আসলেই প্রিয় শিষ্য প্রয়াত মানজারুল ইসলাম রানা’র বাসায় ছুটে গিয়েছেন বারবার!

হোয়াটমোর নিজে বেশ মিডিয়াবান্ধব ছিলেন, মিডিয়ায় সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো, এমনকি মিরপুর স্টেডিয়ামের ইনডোরের বাইরে দাঁড়ানো মানুষের সাথেও দারুণ হাসিমুখে কথা বলতেন তিনি। এদেশের মানুষের সাথেও একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের দায়িত্ব ছাড়ার পর পাকিস্তান আর জিম্বাবুয়ের কোচের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ছিলেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের কোচ। বর্তমানে তিনি বলেছেন ২৩ বছর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার পর এখন তিনি রুট লেভেলে কাজ করতে আগ্রহী। ভারতের রঞ্জি ট্রফির রাজ্যদল কেরালার দায়িত্ব নিয়েছেন ছয় মাসের জন্য। এছাড়া কোচিতে করা হয়েছে “হোয়াটমোর সেন্টার অব ক্রিকেট” সেখানে তিন বছর তরুন ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করবেন তিনি।

অন্য অনেক বিখ্যাত কোচের মতোই হোয়াটমোরের খেলোয়াড় ক্যারিয়ার অতটা সমৃদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র ৭ টেস্টে ২৯৩ রান করেছেন। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র দুটিই ফিফটি আছে সেটা আবার একই টেস্টের দুই ইনিংসে। ক্যারিয়ারের চতুর্থ টেস্টের দুই ইনিংসে ৫৪ আর ৭৭ রান করেন ডেভ। হোয়াটমোর ওয়ানডে খেলেছেন মাত্র ১ টি। সেই তুলনায় প্রথম শ্রেনীর রেকর্ড যথেষ্ঠ ভদ্রস্থ! ১০৮ ম্যাচে ৬১১৬ রান, গড় ৩৩.৯৭, সেঞ্চুরী আছে ১০ টি, সর্বোচ্চ ১৭০।

হোয়াটমোরকে নিয়ে আলাদা একটা বই লেখা সম্ভব। কিভাবে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের টেস্ট পরবর্তী যুগের ভিত্তি গড়েছিলেন সেটা একটা আর্টিকেলে তুলে ধরা সম্ভব না। তবে এটা বলাই যায় যে হোয়াটমোর ছিলেন ফাউন্ডেশন, যার উপর দাঁড়িয়ে কাজ করে গিয়েছেন সিডন্স, স্টুয়ার্ট ল আর বর্তমানে চান্দিকা হাথুরুসিংহে। হোয়াটমোর এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট জগতের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের ভেতর একজন। বাংলাদেশের মানুষ এখনো হোয়াটমোরকে আগের মতোই ভালোবাসে।
হোয়াটমোরই জিততে শিখিয়েছেন, হোয়াটমোরকে কিভাবে ভুলবে বাংলাদেশ ক্রিকেট?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top