টেক

অমর বোস: নিঃশব্দে যার আওয়াজ পৌঁছে যায় কোটি মানুষের কানে!

neon aloy অমর বোস নিয়ন আলোয়

পশ্চিমা বিশ্বের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে একজন সাধারণ মানুষ তার জীবনের সাড়ে তিন দিন অতিবাহিত করেন হেডফোন নামক যন্ত্রের তারের গিট্টু খোলার কাজে। বিগত ১০ বছরে আমাদের দেশে সংবেদনশীল হেডফোনের চল বেড়েছে কয়েক গুণ। স্মার্টফোন বিপ্লবের সাথে হেডফোন যেন ছায়ার মত জড়িয়ে ছিল সবসময়। কার্যকারিতা আর নকশার ভিত্তিতে হেডফোনের বাজারে রয়েছে সীমাহীন বৈচিত্র্য। দামও আছে সবার হাতের নাগালে, সাধারণ ৪০০ টাকার রেপ্লিকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকার প্রফেশনাল স্টুডিও হেডসেট। বলাই বাহুল্য, দামের সাথে হেডফোনের শব্দের গুনাগুণ সমানুপাতিক।

যারা গানপোকা, তাদের জন্য বাসা থেকে বের হবার পূর্বশর্ত থাকে হেডফোন। একা একা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হেডফোনে পিংক ফ্লয়েড বাজতে থাকলে বহু দূর্গম পথ পাড়ি দেয়াও সহজ হয়ে ওঠে। নিত্যদিনের অপরিহার্য এই পণ্যটির উদ্ভাবনী গবেষণা ও সে সাথে শব্দ পূনরোৎপাদন নিয়ে বিভিন্ন আবিষ্কারে অসামান্য অবদান রেখেছেন বাঙালী বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক অমর গোপাল বোস– এ তথ্যটি আমাদের অনেকেরই অজানা।

BOSE Inc. নামক সাউন্ড সিস্টেম প্রস্তুতকারক কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন অমর বোস। কোম্পানীর মূল লক্ষ্য ছিল শব্দ তরঙ্গ মানুষের কানে শুনতে কি রকম লাগবে তার বিষদ গবেষণা। বোস প্রস্তুতকৃত স্পীকারের দাম আকাশচুম্বি হলেও এর শব্দ সংবেদনশীলতা এখনও অনন্য হয়ে আছে বিশ্ববাজারে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি ভক্তি থেকে অমর বোস পিএইচডি থিসিস জমা দেওয়ার পর একটি সাউন্ড সিস্টেম কিনেন। কাগজপত্রে লেখা তাত্বিক মান অনুসারে সবচেয়ে ভালো সিস্টেমটিই নিজের ঘরের জন্য বেছে নেন অমর। কিন্তু মানব শ্রবণক্ষমতার কাছে হার মানে সেকালের তথাকথিত সেরা সাউন্ড সিস্টেম। সাউন্ড সিস্টেমের হতাশাজনক শব্দের জের ধরে অমর মানুষের শ্রবণের উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার ভিত্তিতে শব্দ পুনরোৎপাদন প্রক্রিয়ার নানা ভ্রান্তি ঘুঁচে যায়।

১৯৬৪ সালে এই গবেষণার গতি নির্ধারণ ও সঞ্চালনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় BOSE Inc.। বোসের ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীর সুবাদে প্রথম ব্যবসায়িক সাফল্য আসে মার্কিন সামরিক বিমানের “Power-management system” প্রস্তুতি চুক্তির হাত ধরে। সেখান থেকে বাণিজ্যিক বিমানের জন্য Power-management system” তৈরি করে আসছে কোম্পানীটি। লাভের সিংহভাগ আবার খরচ করা হয় গবেষণার খাতেই। ১৯৬৮ সালে বাজারে আসে BOSE 901 ডিরেক্ট/রিফ্লেক্টিভ সাউন্ড সিস্টেম। মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে চিন্তার ফলাফল হিসেবে আবিষ্কৃত হয় এই সিস্টেম। তারপর একে একে আসে WAVE Radio এবং আমাদের পথের সঙ্গী নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন। এরপর থেকে কখনই পেছনে ফিরে তাকায়নি BOSE Inc.। পোর্শে, মার্সিডিজ বেঞ্জের মত নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়িগুলোতে ব্যবহৃত হয় বোস কার সাউন্ড সিস্টেম। কোম্পানীর “লাইভ সাউন্ড টেক” গ্রুপের গবেষণার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী সাউন্ড রেস্পন্স সিমুলেটর তৈরি করা হয়েছে। জগদ্বিখ্যাত নানা স্থাপনা, যেমন- মক্কার মসজিদ আল-হারাম, ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেল, রয়েল অ্যালবার্ট হল ও কয়েকটি অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেমের প্রস্তুতকারক এই মাল্টিবিলিয়ন ডলার কোম্পানীটি।

কোম্পানীটির বড় ধরনের স্বকীয়তাগুলোর একটি হল, দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রকল্পের বাস্তবায়ন। টানা ২০ বছর বা তার থেকেও বেশি সময় গবেষণার পর বাজারে আসে নতুন পণ্য। স্বাভাবিকভাবেই পণ্যগুলোর দাম বেশ চড়া থাকে। যাদের কাছে দামের চেয়ে পণ্যের মান মূখ্য, তাদের ক্রেতা ভেবেই এগিয়ে যাচ্ছে কোম্পানীটি। দীর্ঘমেয়াদী এই প্রকল্পগুলো সম্ভব হয়েছে অমর বোসের চাতুর্যপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে। BOSE Inc. এর শেয়ার বাজারে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে অমর বোস কারণ হিসেবে বলেছিলেন,

“সি.ই.ও হিসেবে বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করা দরকার হলে আমাকে কম করে হলেও ১০০ বার চাকুরীচ্যুত করা হত”।

ব্যবসায়িক স্বাধীনতা রক্ষার লক্ষ্যে এমন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কথা বলার সময় বোস বলেন “অর্থ উপার্জনের জন্য কোম্পানীটি প্রতিষ্ঠা করিনি আমি। আমার উদ্দেশ্য ছিল অন্বেষণধর্মী, গঠনমূলক গবেষণার একটি পরিবেশ তৈরী করা।” গবেষণার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা থেকে তিনি নিজ বিশ্ববিদ্যালয় MIT-এর নামে BOSE Inc এর কিছু শেয়ার রেখে দিয়েছেন। শেয়ারগুলো মতনিরপেক্ষ বলে কোম্পানীর কোন সিদ্ধান্তে MIT হস্তক্ষেপ করে না এবং শেয়ারগুলো অবিক্রয়যোগ্য। শেয়ার থেকে প্রাপ্ত মুনাফা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার পুঁজি নির্ধারণ করে MIT।

বোসের বাবা নণী গোপাল বোস ছিলেন উপমাহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পলাতক বিদ্রোহী। ১৯২০ সালে আমেরিকা যাওয়ার পর ফিলাডেলফিয়ায় বিবাহিত হন শার্লেট নামক মার্কিন স্কুল শিক্ষিকার সাথে। অমর জন্ম গ্রহন করেন ১৯২৯ সালে ফিলাডেলফিয়াতেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অমরের বয়স ছিল ১৩ বছর। ততদিনে রেডিও সারানোর কাজটা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন তিনি। যুদ্ধের সময় বাবার চট আমদানীর ব্যবসায় ভাটা পড়লে তিনি রেডিও ঠিক করে সংসারের হাল ধরেন। সেকালের ১০ হাজার ডলার ধারের বোঝা নিয়ে অমরকে MIT তে ভর্তি করা হয় ১৯৫০ সালে। শিক্ষাঙ্গনের সুবাদে বোস ইউক উইং লী ও নরবার্ট উইনারের মত বিখ্যাত গণিতবিদদের গুরু হিসেবে পান। তড়িৎ প্রকৌশলের উপর অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি শেষ করার পর শব্দ কৌতুহলের জন্ম হয় অমরের। তারপরের গল্পটুকুই BOSE Inc।

১৯৮০ সালে বোস গাড়ির শক অ্যাবসরবার নিয়ে কৌতুহলের ভিত্তিতে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে “BOSE Suspension System” এর একটি প্রাথমিক সংস্করণ প্রথমবারের মত গাড়িতে স্থাপন করা হয়। এটি এখন পর্যন্ত মানুষের আবিষ্কৃত সেরা সাস্পেনশন সিস্টেম। এছাড়াও বোসের নিজস্ব ওয়াইপার সিস্টেমের প্যাটেন্টও আছে।

BOSE Inc এর সিইও হবার পাশাপাশি টানা ৪৫ বছর MIT-তে শিক্ষকতা করেছেন অমর বোস। শিক্ষকতার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। তার শিক্ষণধারার সম্মানে ১৯৮৯ সালে MIT-তে চালু করা হয় “The Bose award for Excellence in Teaching”। ২০০৮ সালে তাকে “Inventors Hall of Fame”-এ স্থান দেয়া হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বোসের জীবনের মূল্যায়ন তার কোম্পানী বা তার আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মূল্যায়ন আসলে তিনি যে সম্ভাবনাময় জীবনদর্শনের প্রচার করতেন তার মধ্যেই প্রতিপাদ্য। আমাদের সবারই যে উর্ধ্বমুখী ঝুঁকিপূর্ণ চিন্তা ভাবনার ক্ষমতা আছে এবং সৃজনশীলতার দিক থেকে কেউ কারো থেকে কম নয়- এর বাস্তব উদাহরণ অমর গোপাল বোস।

২০১৩ সালের ১২ জুলাই ওয়েল্যান্ডের নিজ বাসগৃহে মৃত্যু বরণ করেন কিংবদন্তী এই উদ্ভাবক।

Most Popular

To Top