নিসর্গ

কাশ্মীরের গল্পকথা (পঞ্চম পর্ব) – সবুজে সাজানো গুলমার্গ

neon aloy গুলমার্গ নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (চতুর্থ পর্ব)– ডাল লেকের একদিন]

কাশ্মীর ভ্রমণের প্রথম দিনের সকাল-দুপুর-সন্ধা আর রাত ছিল শুধুই ডাল লেকের মুগ্ধতা, হাউজ বোট ভিন্নতা আর সিকারায় ভেসে বেড়ানোর জন্য বরাদ্দ। সেই গল্প ছিল আগের পর্বে। আর দ্বিতীয় দিনটি ছিল গুলমার্গের জন্য বরাদ্দ। গুলমার্গের সবুজ গালিচা, রোপওয়ে বা গণ্ডোলায় চড়ে ১৪০০+ ফুট উঁচু পাহাড়ের বরফের চূড়া, আর বিভিন্ন হিন্দি সিনেমার শুটিং লোকেশন দেখার জন্য।

বেশ একটা ঝলমলে সকালেই আমরা আমাদের নির্ধারিত টেম্পো ট্রাভেলারে চেপে বসলাম আয়েশ করে। শ্রীনগর থেকে শহর ছাড়িয়ে সমতলের রাস্তা ধরে শাঁ শাঁ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়ি ৬০ কিলোমিটার দূরে গুলমার্গের পাহাড়ি পথ আর বরফে ঢাকা পাহাড় চুড়ার দিকে। পথে পরেছে নানা রকম ফুল-ফলের সাজানো দোকান, নানা রকম সবজি আর মাঝে মাঝে আমাদের দেশের মতই ধান ক্ষেত সমৃদ্ধ সমতলভূমি।

প্রায় ৪০ মিনিট চলার পরে আমাদের গাড়ি বামে বেশ নির্জন আর একটু অন্য রকম ঝকঝকে একটা রাস্তায় চলতে শুরু করলো। সেই সাথে একটু পর পর ছোট ছোট বাজারের মত লোকালয়ে চোখে পরতে লাগলো নানা রকম বেকারি আইটেমের মহাযজ্ঞ।

প্রথম প্রথম তেমন একটা পাত্তা না দিলেও, একটু পরে এক জায়গায় আমাদের গাড়ি কিছুটা ধীর গতি নিতেই বিশেষভাবে চোখ আটকে গেল ওদের নানা রকমের, ধরনের, রঙের, আকারের বেকারি আইটেম গুলোর দিকে। এমন করে সাজানো আর এতোটা লোভাতুর করে বানানো যে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হলাম। এবং ড্রাইভারকে বলে রাখলাম, ভালো একটা জায়গা দেখে যেন আমাদের গাড়ি থামানো হয়, যেন আমরা এসব কিনে নিতে পারি।

গাড়ি চলছিল তার নিজের গতিতে। একটু পরে ঝকঝকে রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে দূরে উঁচু পাহাড়েরা উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলো, অদ্ভুত ভাবে সাদা বরফের মুকুট মাথায় দিয়ে তারা আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। আর তার চেয়েও বেশী মনোমুগ্ধকর লাগতে লাগলো রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট নানা রঙে সেজে থাকা, আর নানা আকারের বর্ণিল দোতালা বাড়ি গুলো। দারুণ নান্দনিক কারুকাজ, কাঠের অসাধারণ সব ফ্রেম, বিশাল বিশাল কাঁচের জানালা, রঙিন সব ঢেউ খেলানো উঁচু-নিচু বাড়ির নানা রকম ছাদ আর সেসব বাড়ির বারান্দা, বেলকোনি বা সবুজ গালিচায় ইচ্চেমত রঙের ফুলের ছড়াছড়ি।

এসব দেখতে, দেখতেই আমরা এক সময় গুলমার্গের বড় রাস্তা শেষ করে, ছোট, পাহাড়ি, উঁচুনিচু আর ঢেউ খেলানো রাস্তার মুখে এসে বিশ্রামের জন্য বা বেকারির নানা রকম খাবার কিনতে থামলাম। আমাদের চার পরিবারের সবাই কমবেশী নানা স্বাদের বিস্কুট, কেক, প্যাঁটিস আর শুকনো খাবার কিনে নিলাম। সেই সাথে প্রথম পাহাড়ি উপত্যাকার কিছু ছবি তো অবশ্যই।

সবুজে ঘেরা পাহাড়ী উপত্যকা

আমাদের গাড়ি আবারো চলতে শুরু করলো। এবার সামনের ১৪ কিলোমিটার শুধুই পাহাড়ের গা, পা আর পিঠ কেটে বানানো মিহি ঢেউ-খেলানো রাস্তা দিয়ে আকাশের পানে উঠে যাওয়া। চারপাশে সবুজ বনভুমি, পাইনের ঘন অরণ্য, সবুজ ঘাসের গালিচা, বুনো ফুলে সেজে থাকা আঁকাবাঁকা রাস্তা, নানা নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির, অবাক করা কোকিলের পরিচিত সুমধুর সুর! এই সব বন, পাহাড়, ফুল আর পাখির অনিন্দ মোহে মোহাচ্ছন্ন হয়ে, মিহি পিচঢালা পাহাড়ি ঢেউ খেলানো পথে হেলতে-দুলতে আমরা পৌঁছে গেলাম একদম যেন শিল্পীর হাতে আঁকা সবুজে সাজানো কোন পাহাড়ি ভ্যালীতে।

নিয়ন আলোয়

গুলমার্গের সাজানো গোছানো পাহাড়ি ভ্যালী

চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাহাড়, মনকাড়া সবুজ ঘাসে মোড়ানো, ফাঁকে ফাঁকে দুই বা তিন পাহাড়ের ভ্যালী। পাহাড়ে পাহাড়ে কোথাও সবুজ ঘাস, কোথাও পাইনের অরণ্য, কোথাও নানা রকম সাদা, হলুদ আর বেগুনী-গোলাপি ফুলের ইচ্ছেমত বিচরণ। কোথাও পাইন কাঠের পাটাতনে বানানো বাড়ির বারান্দা, কোথাও নানা রকম পাথরে বানানো প্রাকৃতিক কারুকাজের মজবুত কটেজ, তবে সব বাড়ির বারান্দা বা সবুজ লনে আছে নানা রঙ-বেরঙের ফুলের সমাহার, যেন কেউ নিজ হাতে ছবি এঁকে রেখেছে! এতটাই গোছানো আর ছিমছাম।

বিভিন্ন রঙের ফুলে সুশোভিত গুলমার্গ

পুরো গুলমার্গের ভ্যালী জুড়ে শুধু সবুজ ঘাসের মায়াবী আকর্ষণ, পাইন বনের রোমাঞ্চকর আকর্ষণ, কাঠ আর পাথরের কারুকাজের বাড়ি গুলোর অন্য রকম মোহাচ্ছন্নতা, ফুলের বনে হারিয়ে যাবার ইচ্ছা, মেঘ আর কুয়াসায় লুকোচুরি খেলে, দারুণ আরামের মিষ্টি রোদে শুয়ে শুয়ে চা বা কফির স্বাদ নেবার লোভ সামলানো মুশকিলই নয় অসম্ভবও বটে।

তাই সেই অমোঘ আকর্ষণে নিজেদের সমর্পণ করা হল কিছু সময়ের জন্য, সবুজে সাজানো গুলমার্গের বর্ণিল পাহাড়ি উপত্যাকায়। চা-কফি, ছবি তোলা আর নানা রকম গল্প করে। নিমিষেই যেন কেটে গেল অনেকটা সময়। ওদিকে এরই মধ্যে আমাদের গণ্ডোলা রাইডের টিকেট কাটা হয়ে গেছে। তাড়া পরেছে এসব আয়েশ ছেড়ে সামনে আরও রোমাঞ্চকর ১৪,০০০ ফুট উপরে বরফের রাজ্যে যাবার, রোপওয়ে বা গণ্ডোলাতে চড়ে। তাই উঠতেই হল অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

নিয়ন আলোয়

এমন একটি জায়গায় শুয়ে চা বা কফির স্বাদ নেবার লোভ সামলানো মুশকিলই নয় অসম্ভবও বটে

সামনেই যে অনেকের জীবনের প্রথম বরফ দেখার, বরফ ছোঁয়ার, বরফ নিয়ে খেলার, বরফ ছুঁড়ে মারার আর বরফে গড়াগড়ি খেয়ে নিজেকে হারিয়ে ফিরে পাবার অনন্য আহ্বান আর অনবদ্য রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছে।

সেই গল্প আর একদিন।

আর এর পরেই, আমাদের বুকে বেঁধে যাওয়া সেই….

২১০০ রুপীর আলপিন…!!

[পরবর্তী পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (ষষ্ঠ পর্ব)– ২১০০ রুপির আলপিন বুকে!!]

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

To Top