ইতিহাস

হিরোশিমা’র বাতাসে তৃষ্ণার্তের হাহাকারঃ তেজষ্ক্রিয়তার ৭২ বছর

neon aloy হিরোশিমা তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন আলোয়

হিরোশিমা, ১৯৪৫। স্থানীয় সময় সকাল ৮ঃ১৬ মিনিটে গোটা আকাশে আগুন লেগে ওঠে যেন। চোখ অন্ধ করে দেওয়া আলোয় ভরে ওঠে চারপাশ। সূর্যের তীব্রতা ছাপিয়ে যাওয়া আলোর চমক কেটে ওঠার আগেই ১৬,০০০ টন TNT বিস্ফোরণের সমতুল্য ধাক্কা কাঁপিয়ে দেয় সবকিছু, যা অনুভব করা গিয়েছিল ১৮.৫ কি.মি দূর থেকেও। হিরোশিমার শল্যচিকিৎসা হাসপাতালের আকাশে ১,৯০০ ফুট উপরে বিস্ফোরিত হয় বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমা “লিটল বয়”।

তার সাড়ে পাঁচ ঘন্টা আগের কথা। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পল টিবেট তার ভালোবাসার B-29 যুদ্ধবিমানে নির্ধারিত প্যাকেজ তুলে রওনা হন। তার সাথে ২টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাংশবাহী গবেষণা বিমান যাত্রা করে। টিনিয়ান দ্বীপ থেকে হিরোশিমার দিকে যাত্রা করে বিমানবহর। সর্বসাকূল্যে ৭টি বিমান যাত্রা করলেও শুধুমাত্র পলের B-29ই একমাত্র বিস্ফোরক বহন করছিল। নির্ধারিত স্থানে পৌছে বোম্ব-বে এর দরজা খুলে প্যাকেজ ছেড়ে দেয়া হয়। ৪৪.৪ সেকেন্ড বাতাসের মধ্য দিয়ে মুক্ত ভাবে পড়ার পর বিস্ফোরিত হয় প্যাকেজটি। বিস্ফোরণের আগে ৪৪ সেকেন্ড সময়ে B-29 বিমানটি ১৮.৫ কি.মি দূরত্ব অতিক্রম করে। ২৬,০০০ ফুট উচ্চতা থেকে স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয় ১ কি.মি উঁচু মাশরুম ক্লাউড। বিমানের প্রকৌশলীরা বিস্ফোরণের ধাক্কা অনুভব করে হাহাকার করে ওঠেন “My god, what have we done?!”

neon aloy হিরোশিমা তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন আলোয়

হিরোশিমায় নরকের বার্তা নিয়ে উড়ে যাওয়া ‘ইনোলা গে’ বিমান ও তার ক্রু’রা।

“মাত্র” ১৪১ পাউন্ড ইউরেনিয়ামের তান্ডবে কয়েক সেকেন্ডে ভস্মীভূত হয় ১.৬ বর্গ কি.মি এলাকা। এই বিস্ফোরণের ঠিক নিচে মাটতে একটি থার্মোমিটার রাখা হলে তাপমাত্রার রিডিং আসতো ৬,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিরোশিমা’র ৯০,০০০ স্থাপনার মধ্যে মাত্র ২৮,০০০ কোনমতে টিকে ছিল। ১০ কি.মি ব্যাসার্ধের এলাকার সকল কাঁচের জানালা ভেঙ্গে পড়ে বিস্ফোরণের ধাক্কায়।

মূহুর্তের মধ্যে চল্লিশ হাজার (৪০,০০০) মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। দেয়ালে আর মাটিতে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়াদের অস্তিত্বের সাক্ষী হয়ে থাকে “নিউক্লিয়ার শ্যাডো”। বিস্ফোরণের পর হিরোশিমার সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। সকল বৈদ্যুতিক খুটি হেলে পড়ে। ৮.১৬ মিনিটে বন্ধ হয়ে থাকে প্রত্যেকটি ঘড়ি। ৮:৪০ মিনিটে আকাশ সম্পূর্ণ অন্ধকার করে কালো পানির বৃষ্টি নামে। ধূলা, মাটি আর তেজষ্ক্রিয় কণার মিশ্রণে আচ্ছাদিত হয় গোটা শহর ও আশেপাশের এলাকা।

নিয়ন আলোয় বাংলা অনলাইন ম্যাগাজিন Neon Aloy Magazine

ভাবছেন ‘নিউক্লিয়ার শ্যাডো’ কি? বিস্ফোরণের কাছাকাছি থাকা একজন হিরোশিমাবাসীর শেষ পদচিহ্ন। পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিলো যে তা আশেপাশের সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছিলো। এর মাঝে যে স্থানগুলো একটু ছায়া পেয়েছিলো (এক্ষেত্রে সে দুর্ভাগা ব্যক্তি রাস্তার পিচকে ছায়া দিয়েছেন), সে জায়গাগুলোতে এরকম প্রজেকশন থেকে গিয়েছিলো। একই রকম প্রজেকশন দেখা যায় পিছনে সেতুর রেলিং-গুলোর পাশে।

বিকট শব্দ আর ধাক্কার পর হিরোশিমার বাতাসে ভাসতে থাকে আগুনে দগ্ধ হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ। ফোর্থ ডিগ্রি বার্নে দগ্ধ অবস্থায় মানুষ ছটফট করতে থাকে হিরোশিমার রাস্তায়। ৮ বছর বয়সী অগুরা কিকো বাবার কূপ থেকে তেজষ্ক্রিয় পানি তুলে ছুটে যান আহতদের কাছে। দহন যন্ত্রণায় কাতর মানুষগুলোর মুখে পানি তুলে দিতেই তারা মৃত্যবরণ করেন। বিশুদ্ধ পানি যেন নেই আর কোথাও হিরোশিমায়। শহরে কর্মরত ২০০ ডাক্তারের মধ্যে মাত্র ২০ জন অক্ষত ছিলেন। ২০০০ নার্সদের মধ্যে সেবা করার মত সুস্থ ছিলেন মাত্র ১৫০ জন। অগুরার মত যারা বেঁচে গিয়েছিলেন সেদিন, প্রত্যেককে তৃষ্ণায় কাতর দগ্ধ মানুষদের আর্তনাদগুলোই তাড়া করে ফিরেছে বছরের পর বছর। তৎক্ষণাৎ মৃত্যবরণ করা ছাড়াও তেজষ্ক্রিয়া ও আনুষাঙ্গিক প্রভাবে সব মিলিয়ে ১,৪০,০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। হিরোশিমার পরবর্তী ৪টি প্রজন্ম তেজষ্ক্রিয়ার প্রভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করে।

৬ আগস্টের ঘটনায় মৃত ও আহতদের স্মরণে হিরোশিমায় প্রতিবছর “টোরো নাগাশী” নামক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। এতে মোটোইয়াশু নদীতে লণ্ঠন ভাসিয়ে দেয়া হয়। জাপানী ধর্মে নদীর উপর ভেসে যাওয়া এই লন্ঠন পরলোকে মানব আত্মার যাত্রার প্রতিরূপ। সকাল ৮.১৬ মিনিটে নীরবতা পালিত হয় সমগ্র হিরোশিমায় এবং তৃষ্ণা আর দহন যন্ত্রণার স্মারক স্বরূপ বিশুদ্ধ পানি দিয়ে হিরোশিমার স্মৃতিসৌধটি ভিজিয়ে রাখা হয়। হিরোশিমার আনুষ্ঠানিকতায় কেবল মৃতদেরই যে স্মরণ করা হয়, তা নয়। বরং সেখানে বিশ্ব শান্তির বিষয়টি প্রাধান্য পায় সবচেয়ে বেশি। হিরোশিমা ও নাগাসাকি’র মর্মান্তিক ঘটনার সম্মানে জাপানের মাটিতে সকল প্রকার পারমাণবিক গবেষণা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর এই দিনে জাপানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ চাপের মুখে পড়েন জনগণের পারামাণবিক পরাশক্তিদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আবদারে।

neon aloy হিরোশিমা তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ন আলোয়

বিশ্বশান্তি কামনায় হিরোশিমাবাসীর লন্ঠন প্রজ্জ্বলন

“লিটল বয়”-এর হাত ধরে মানবসভ্যতার এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় সেদিন। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় উপুর্যুপরি পারমাণবিক পরীক্ষণ ও গবেষণার। হিরোশিমার জের ধরে ১৯৫০-৬০ এর দশকে খোলা বাতাসে ও সমুদ্র পৃষ্ঠে বিস্ফোরিত হয় শতশত পারমাণবিক বোমা। বাতাসে মুক্ত হয় তেজষ্ক্রিয়তা। বিশ্বের প্রত্যেকটি মানুষের শরীরের হিরোশিমার ছাপ ফেলছে এই অদৃশ্য ঘাতক। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে C-14 তেজষ্ক্রিয়ার মাত্রা বেড়েছে কয়েক গুণ। এই মাত্রার বৃদ্ধিকে গবেষকগণ বোম্ব-পালস বলে আখ্যায়িত করেন। আশা করা হয় এই পালস ২০৫০ সালের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে যদি নতুন করে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের বা পরীক্ষণের প্রয়োজন না পড়ে। ৭২ বছর ধরে এই তেজষ্ক্রিয় পালস তৃষ্ণার্তদের হাহাকারের মত প্রতিধ্বনি হচ্ছে বায়ুমন্ডলে।

আরো পড়ুনঃ
ছবিতে হিরোশিমাঃ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের আগে ও পরে…

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top