টাকা-কড়ি

প্রবাসীদের রেমিট্যান্স, একটি চলচ্চিত্র এবং কিছু মানুষের ছোট মন-মানসিকতা…..

neon aloy প্রবাসী নিয়ন আলোয়

কথা না পেঁচিয়ে সোজা কথা বললে বলা যায়, দারিদ্র্য, দেশে সবার জন্য উন্নতমানের শিক্ষার অপ্রতুলতা, বা সবার অবস্থা ভালো না থাকা, শিক্ষা গ্রহণ করার পরেও ভালো চাকরি না পাওয়া এবং ভালো আয়-উপার্জনের আশা- মূলত এই কারণগুলোই আমাদের দেশের মানুষগুলোকে বিদেশ পাড়ি জমাতে বাধ্য করে। ২০১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী সরকারি তথ্যমতে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি লোক ১৬০ টিরও বেশি দেশে কর্মরত আছেন।

আর এই প্রবাসীরা প্রতিবছর গড়ে ১২-১৪ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছে। যার কারণে আমাদের জিডিপি’তে রেমিটেন্সের অবদান প্রায় ১১-১৩ শতাংশের মত। জিডিপি হল এককথায় দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অর্থনীতির আকার পরিমাপক।

বাংলাদেশের বর্তমানে বৈদেশিক রিজার্ভ ৩১,৩৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। দেশের অর্থনীতিতে রেমিটেন্স যে অবদান রাখছে সেটা অবিশ্বাস্য। কারণ আমাদের বিদেশী ঋণ, ব্যাংক ঋণ থেকে রেমিটেন্স অনেক স্থিতিশীল একটা অর্থভাণ্ডার। এখানে টাকা দেওয়া-নেওয়া বা সুদ নিয়ে কোন হৈচৈ নেই।

এইবার আসি এই লোকগুলা কিভাবে বিদেশ যায় এবং কিভাবে কিছু মানুষ দেশে ফেরত আসে সেই বিষয়ে। বাংলাদেশে কিছু থাক আর না থাক, বিভিন্ন সেক্টরে দালালের যে অভাব নেই এটা আমরা সবাই জানি। এই প্রবাসী সেক্টরেও তারা তৎপর। যারা বৈধভাবে বিদেশ যায়, তারা তো যায়-ই। কিন্তু অনেকে টাকা দিয়েও ভালোভাবে বিদেশ যেতে পারে না বা অনেককে জোর করে বিদেশ পাঠায় দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দালালচক্রগুলো।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৪(১) অনুচ্ছেদ জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায় নিষিদ্ধ করেছে। বাস্তবতায় এইরকম আইন কতটা পালন করা হয় সেটা তারাই ভালো জানে।

ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে প্রায় ২৫ হাজার লোক দেশত্যাগ করেছে। যেটা আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এই সংখ্যা কমলেও কিন্তু মানবপাচার বা হিউমেন ট্র‍্যাফিকিং কিন্তু চলছেই!

যারা এইভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যায়, তারা কেনো যায় তা আমি-আপনি সবাই জানি। সুতরাং সেই দীর্ঘ আলাপে গেলাম না। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের এক তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশজন প্রবাসী লাশ হয়ে দেশে ফিরছেন, যাদের সিংহভাগের বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে। এবং এইসব মৃত্যুর বেশিরভাগই অস্বাভাবিক বা তাদের কর্মস্থলে এবং নানান চিন্তার কারণে হয়ে থাকে।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে দেশে লাশ এসেছে প্রায় ৪ হাজার ৩ শত ৩ জনের।

গত দশ বছরে শুধুমাত্র সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার ৩ শত ৮১ জন।
গত কয়েকবছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।আর প্রতিমাসে লাশ আসছে প্রায় ১৯৭ টি।
এগুলো হচ্ছে বিমানবন্দর এবং দূতাবাসগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রবাসী বাংলাদেশীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান।

কিন্তু যাদের অবৈধভাবে বিদেশ পাঠানো হয়, যাদের পরিচয় ঠিকমত নাই বা থাকলেও সেটা সঠিক নয়- তাদের তো সেইদেশেই দাফন করা হয় বা বিভিন্নভাবে কবর দেওয়া হয়। হয়তোবা নদীতেও ফেলে দেওয়া হয়!

দুঃখের বিষয় এই ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই!

এইবার আসি একটি চলচ্চিত্রের কথায়, যেটা প্রবাসীদের এবং অবৈধ মানবপাচার নিয়ে তৈরি।

দেশের কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোন এক পিতার সন্তান সঠিক পিতৃপরিচয়হীন ভাবে অবৈধভাবে বিদেশ যায়। কোন এক সময় সে সেখানেই মারা যায় এবং লাশ সেখানে দাফন করা হয় নাকি দেশেই লাশ আসার পর কোথাও দাফন করা হয় সেটা কেউই জানলো না!

এরকম ছোট এক কাহিনী নিয়েই তৈরি হয় তৌকির আহমেদের চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’
হয়তোবা মারা যাওয়ার পর লাশ ঠিকই আসতো, যদি ছেলেটা সঠিক পরিচয়ে বৈধ উপায়ে বিদেশ যেতো।

জমিজমা বিক্রি করে হাজারো স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদেশ যাবার পর, অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠানোর পর যার মৃত্যুর পর ঠিকমত পরিচয় পাওয়া যায় না তার মত দুর্ভাগা আর কে হতে পারে!

তৌকির আহমেদের গল্পে, পরিচালনায় এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ফজলুর রহমান বাবু, মোশাররফ করিম, শহীদুজ্জামান সেলিম, নিপুণসহ আরো অনেকে।
গত বছর ১৭ ই মে ‘অজ্ঞাতনামা’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং জুরি স্পেশাল মেনশন পুরস্কার লাভ করে। যেটা কিনা তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রের পর মাত্র দ্বিতীয় কোন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অর্জন।

এছাড়া গাল্ফ অফ ন্যাশনস ইন্ডিপেন্ডেন্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, কম্বোডিয়ায় ৫৭তম এশিয়া প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৫৪ টি চলচ্চিত্রের মধ্যে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় এটি।

তবে নিজ দেশে ছবিটি তেমন আশানুরূপ ব্যবসা করতে পারেনি!

এই চলচ্চিত্রে মোশাররফ করিম ও শহীদুজ্জামান সেলিম অনবদ্য অভিনয় করেছেন। এবং ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয় ছিলো এক কথায় অনবদ্য!

সব চরিত্রের রূপায়ন করা হয়েছে সে বাস্তব চরিত্রকে কেন্দ্র করেই যেটার উপস্থাপন ছিল এক কথায় আউটস্ট্যান্ডিং!
সেট, মেকআপ, চিত্রগ্রহণ, অভিনয়, গল্প, পরিচালনা­­ সবকিছুর জন্য চলচ্চিত্রটি পুরো চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনে গেঁথে থাকবে আজীবন, আমি মনে করি।

এবার আসি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়ে। প্রবাসীরা শত বিপদ-আপদ নিয়ে, উপরোক্ত এইরকম অবস্থার শিকার হয়েও দেশের জন্য, পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান। আর আমাদের কিছু টিনেজ ইউটিউবার তাদের নিয়ে ভিডিও নির্মাণ করে যেগুলোর বিষয় থাকে অতি কুৎসিত এবং জঘন্য। আবার সেখানে কিছু আধুনিক মেয়ের প্রবাসী মানুষদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেও দ্বিধা করে না! যেটা এই দেশের জন্য, এই সমাজের জন্য, এবং আমাদের প্রবাসী ভাইদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক!

হয়তোবা তারা স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়ে। বাবা-মা প্রতিদিন টাকা দেয়, কিন্তু এই টাকা কোথা থেকে আসে তারা তা জানে না। তাদের বাবারাও হয়তোবা কোথাও এইরকম চাকরি-ই করে!

আমাদের দেশের বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে এটা একটা, সব কাজকে মূল্যায়ন না করা এবং কাজের শ্রেণিবিভাগ গড়ে তোলা। কিন্তু বিভিন্ন দেশে এইরকম ছোট মন-মানসিকতা নিয়ে কেউ চলে না। সব কাজই তাদের চোখে সমান। তাই সেইসব দেশ ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা পিছিয়ে পড়ছি প্রতিনিয়ত। যতদিন আমরা আমাদের মন থেকে এইসব সমস্যা সমাধানে এগিয়ে না আসবো, যতদিন আমরা এইসব মানসিক সংকীর্ণতা, বিকৃত ভাবনা পরিহার না করবো- ততদিন আমরা মানুষ হিসেবে, বাঙ্গালি জাতি হিসেবে সমাজে-রাষ্ট্রে এবং উন্নত বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আশা করতে পারি কি?

Most Popular

To Top