ফ্লাডলাইট

সাকিবের সাথে স্মরণীয় আড্ডাঃ চীনের দিনলিপি (চতুর্থ পর্ব)

সাকিব আল হাসানের সাথে চীনের দিনলিপি

[আগের পর্বঃ সাকিব আল হাসানের সাথে চীনের দিনলিপিঃ বেইজিং-এ প্রথম দিন]

মাঠে বসে বিপিএল দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। দেখেছিলাম গত বছরের রংপুর বনাম ঢাকা এবং কুমিল্লা বনাম রাজশাহীর খেলা দুটো।
রংপুর বনাম ঢাকার ম্যাচটা প্রথমে হয়েছিল। খেলা শেষ। মাঠে দুই দলের প্লেয়াররা একে অপরের সাথে গল্প করতে ব্যস্ত। শুধু একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, তার আইকোনিক এক পা আরেক পা এর সাথে ক্রস করে দাঁড়ানোর স্টাইলে।

পরের খেলা ছিল কুমিল্লা আর রাজশাহীর। মাশরাফি সহ কুমিল্লার সবাই মাঠে যখন ঢুকলেন, রংপুর আর ঢাকার প্লেয়াররা তখনো মাঠেই। মাশরাফি মাঠে আসামাত্রই ঐ নিঃসঙ্গ ভদ্রলোক দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে গল্প শুরু করলেন। মানুষটা সাকিব আল হাসান।

এই ছোট ঘটনাটা বললাম এই কারনেই যে, মানুষ ভাবে সাকিব অহঙ্কারী, ভাব নিয়ে থাকে- এগুলো আসলে একেবারেই ঠিক না। সাকিব আল হাসান যেকোনো ২৯-৩০ বছরের যুবকের মতই বন্ধুবৎসল, আর কারও সাথে একেবারে বন্ধুত্ব না হলে তিনি একটু রিজার্ভড থাকেন; আমাদের সবার মতই।

এখন বলি আমাদের চায়না ভ্রমনের সেই আড্ডার কথা যা আগের পর্বেগুলোতেও লিখেছিলাম।
চায়ের টেবিলে বসেছি আমরা সবাই। সাকিব ভাইও বসলেন। ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করলেন আমরা চা বা কফি কিছু নেবো কিনা। সাকিব ভাই নিলেন দুধ ছাড়া চা। আমরা কেউ কিছু নিলাম না দেখে উনি বললেন, “হায় হায় আমি তাহলে একাই খাবো নাকি!” সাকিব ভাই চা খাচ্ছেন, আর সাথে সাথে আমাদের অনুরোধ মতো ছবির আব্দারও মেটাচ্ছেন।

নিয়ন আলোয়

সাকিব আল হাসানের সাথে লেখক।

এই সময় একটা মজার ঘটনা ঘটলো। সাকিব ভাই হঠাৎ খেয়াল করলেন যে একজন আইফোন দিয়ে ছবি তুলছে। উনি বলে উঠলেন, “কি ভাই আপনি হুয়াওয়ের এর সাথে আসছেন আর ছবি তুলতেসেন অন্য ফোন দিয়ে! আপনার মোবাইল আমাকে দেন আমি সিজ করলাম এটা! ” আমরা সবাই হাসতে লাগলাম।

আমাদের মনে তখন অনেক প্রশ্ন। নাফিজ ভাই বললেন, “সাকিব এরা তোমার সবচেয়ে বড় ফ্যান। তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চায় ওরা”।

সাকিব ভাইঃ “অবশ্যই ভাই কি জানতে চান বলেন, কিন্তু সাংবাদিক টাইপের কোন প্রশ্ন কইরেন না!”
প্রথম প্রশ্ন টা আমিই করলাম, “ভাইয়া, ৩৩ রানে ৪ উইকেট পড়ল যখন, মাঠে নামতে নামতে আপনার কি মনে হচ্ছিল?”
সাকিব ভাইঃ “প্রথম প্রশ্নটাই তো সাংবাদিকদের মতো করে ফেললেন!”
সবার হাসি থামার পর উনি আস্তে আস্তে বললেন, “আসলে ভাই মাঠে নামলে আর কিছু মাথায় থাকে না বুঝছেন।”

এরপর রাকিব ভাই এর প্রশ্ন করার পালা।
– ভাইয়া, কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, আপনার পছন্দের সিনেমা ২০০৪ সালে রিলিজ পাওয়া ‘মিন গার্লস’। কিন্তু এরপর আর এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ‘গ্ল্যাডিয়েটর’। আসলে আপনার পছন্দের সিনেমা কোনটা?
সাকিবঃ ‘মিন গার্লস’ কোন সিনেমা! আমি তো মনেই করতে পারতেছি না। বলছি নাকি! এটাও মনে করতে পারতেছি না। কাহিনী কি এই সিনেমার?
-ভাইয়া, স্কুলের কয়েকটি মেয়ের গল্প।
সাকিবঃ না রে ভাই, মনে করতে পারতেছি না। যেহেতু মনেই আসছে না, তাহলে এই মিল গার্লস, ফিন গার্লস বাদ। প্রিয় সিনেমা গ্ল্যাডিয়েটর। আচ্ছা, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরীর পর ব্যাট উঠাইনি ক্যান? আসলে ব্যাট উঠানোর কথা মনেই ছিল না। আজকাল কিছুই মনে থাকে না।
-ভাইয়া, আপনার জীবন নির্ভর সিনেমা বানানোর অনুমতি দিবেন?
সাকিবঃ বায়োপিক, দেখা যাক।

এরপর প্রশ্ন করল ফারদিন।
-“ভাইয়া, আপনি কি কোন কুসংস্কার মেনে চলেন?
সাকিবঃ আগে মানতাম অনেক। যেমন ধরেন আগে মাঠে নামার সময় হাতাওয়ালা জার্সি পড়তাম ইচ্ছা করেই, এখন আর এসব মানি টানি না।

রাইয়ান এর প্রশ্নঃ
– ভাইয়া এমন কোনও ক্রিকেটার আছে আপনি যার ফ্যান?
সাকিবঃ না ওভাবে আসলে কাউকে ফলো করতাম না বা ফ্যান ছিলাম না। সাইদ আনোয়ার এর ব্যাটিং ভালো লাগতো এই আরকি।

এমন সময় নাফিজ ভাই হতাথ বলে উঠলেন, “এই সাকিব তোমার দেখি চুল পাকসে ২-৩ টা!”
সাকিব ভাইঃ আর বইলেন না ভাই, এখন পর্যন্ত চুল পাকসে চারটা। তিনটা পাকসে ক্যাপ্টেন্সি যেবার ফারস্টকরলাম সেবার।
আর লাস্ট এর টা পাকসে ২০১৭ আইপিএলে। মাথা টাথা গরম ছিল বুঝেনই তো।

নিয়ন আলোয়

এভাবে আড্ডা এগিয়ে যেতে থাকলো। সাকিব ভাই এর একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, উনি সব সময় বাম হাতে কোন কিছু ঘোরাচ্ছেন। যেমন আমাদের টেবিলে পানির বোতল ছিল, পানির বোতল যে ড্রামসটীক বানিয়ে টেবিলের কোনায় টোকা দিচ্ছেন আবার কখনো উপরে নিচে ঘোরাচ্ছেন।

কথা বলতে বলতে এক সময় ফুটবল নিয়ে কথা উঠলো। সাকিব ভাই এর পছন্দের প্লেয়ার মেসি। তারপরের দিন আবার কনফেডারেশন্স কাপ এর ফাইনাল ছিল। চিলি বনাম জার্মানী।
আমরা জিজ্ঞসা করলাম, “ভাইয়া তামিম ভাই তো গিয়ে কার্ডিফে রোনালদোর খেলা দেখে আসলো। আপনার কি কখনো মাঠে গিয়ে মেসির খেলা দেখার বা ওর সাথে দেখা করার ইচ্ছা আছে?”
সাকিব ভাই বললেন, “ইচ্ছা তো আছে দেখি কি হয়। আমি খেলা দেখলে নু’ ক্যাম্প আর বার্নাব্যু দুটাতেই দেখবো। রাইভাল পরিবেশের মজাই আলাদা।”

কথায় কথায় চলে এলো বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইয়ারে আর্জেন্টিনার দুরবস্থার কথা। সাকিব ভাই আশাবাদি যে, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ এর মূলপর্বে যাবেই।
নাফিজ ভাই তখন বললেন, “কিন্তু বার্সার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি , একদম আলাদা। এটার কারন কি?”
সাকিব ভাই বললেন,  “এর কারন হচ্ছে বার্সার হয়ে খেলার সময় ওর যেই এগ্রেশন থাকে, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় ওইটা অনেক সম ই থাকেনা।”
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, “এটার কারন কি হতে পারে ভাইয়া?”
সাকিব ভাই বলেন, “দেখেন ভাই আমি যখন কেকেআরের হয়ে খেলি, আমি কি এগ্রেশন দেখাই? না; কারণ আমার ঐ টিমমেটদের সাথে দেখাই হয় বছরে একবার। এখন বাংলাদেশের হয়ে খেলার সময় কেউ যদি বাজে ফিল্ডিং করে, তখন আমি এগ্রেসিভ হয়ে যাই। কারন আমরা একটা ফ্যামিলি। এখানে এগ্রেশন দেখাতে পারি আমরা অনেক বছর ধরে একটা টিম। বাংলাদেশ এর হয়ে খেলার সময় যেই এগ্রেশন আর প্যাশন দিয়ে আমরা খেলি, এটা কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি বা অন্য টিম এ গেলে পসিবল না।”

প্রিয় পাঠক, কেউ যদি এরপর থেকে আপনাকে বলে, “সাকেব টাকার জন্য কেলে” তাহলে তাকে উপরের প্যারাটা শুনিয়ে দিয়েন।

(চলবে)

Most Popular

To Top