নিসর্গ

দারুচিনি দ্বীপ,আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রাণ মাখানো কয়েকটি দিন (দ্বিতীয় পর্ব)

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ বালি ভ্রমণ- দারুচিনি দ্বীপ, আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রান মাখানো কয়েকটি দিন (প্রথম পর্ব)]

বালি থেকে দক্ষিন-পূর্বে সুনীল সাগরের বুকে জড়াজড়ি করে ভেসে রয়েছে তিনটি দ্বীপ- নুসা লেম্বোগান, নুসা পেনিদা আর নুসা চেনিংগান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সম্পদ, আর জীববৈচিত্র্যে অতুলনীয় এই দ্বীপত্রয়ের মাঝে পপুলারিটির দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে নুসা লেম্বোগান নামক সাফেদ বালি আর প্রবালে ঘেরা এই দ্বীপটি। বালি থেকে ফাস্ট বোটে এই দ্বীপটিতে যেতে আধা ঘন্টা সময় লাগে, তাই অধিকাংশ ট্যুরিস্টরাই বালি থেকে একটি প্যাকেজ ডে ট্রিপ নিয়ে সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসে। আগেই বলেছি আমাদের প্ল্যান হল ছোট্ট এই দ্বীপে রাত কাটানো, তাই যাওয়ার আগেই অনলাইনে হোটেল বুকিং দিয়ে গিয়েছিলাম। বালির হোটেলেই ল্যাগেজ রেখে এসেছিলাম কারণ ফিরে এসেও আমাদের এই হোটেলেই বুকিং দেয়া ছিলো। শুধু একদিনের মত কাপড়চোপড় একটি ব্যাগপ্যাকে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম আমরা আমাদের নেক্সট এ্যাডভেঞ্চার লেম্বোগানের পথে। এই প্যাকেজটিও আমরা দেশে থাকতেই অনলাইনে বুকিং দিয়েছিলাম রকি ফাস্ট নামক একটি এজেন্সির মাধ্যমে। তারা সকালে আমাদের হোটেলে এসে আমাদের তুলে নিয়ে সানুর বিচে নামিয়ে দিল। সেখান থেকে ওদের ফাস্ট বোটে করে শুরু হল আমাদের সাগর ভ্রমন।

নিয়ন আলোয়

নুসা লেম্বোগান নামক সাফেদ বালি আর প্রবালে ঘেরা দ্বীপ

এখানে বলে রাখা ভাল, ফাস্ট বোটে সমুদ্র ভ্রমণ কিন্তু খুব একটা সুখকর নয়। উত্তাল সাগরের ঢেউ’এর সাথে পাল্লা দিয়ে চলে বোটের দুলুনি আর তাতে অনেকেই (আমার আর আমার কন্যার মত এপিক পাবলিক) অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। ত্রিশ মিনিটের এই জার্নিটি মাতা-কন্যা কে যথেষ্ট নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল। অবশেষে বোট আমাদের নিয়ে ফেলল লেম্বোগানের তীরে। জেটি থেকে আবার আর একটি লোকাল ট্রান্সপোর্টে করে ওরা আমাদের পৌছে দিল আমাদের হোটেলে। আমাদের হোটেলটি একেবারেই সাগরের তীর ঘেসে। রুমের সামনেই কাঠের পাটাতনের উপর রঙ্গীন বাঁশে ঘেরা, রঙ-বেরং এর ল্যাম্প আর গাছগাছালি ছাওয়া নান্দনিকতায় পরিপুর্ন চমৎকার একটি খাবার জায়গা।

নিয়ন আলোয়

রুমের সামনেই কাঠের পাটাতনের উপর রঙ্গীন বাঁশে ঘেরা, রঙ-বেরং এর ল্যাম্প আর গাছ গাছালি ছাওয়া নান্দনিকতায় পরিপুর্ন চমৎকার একটি খাবার জায়গা

বালি ভ্রমণ- দারুচিনি দ্বীপ, আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রান মাখানো কয়েকটি দিন (দ্বিতীয় পর্ব)

আমাদের হোটেলের সামনে জুংগুত বাতু বীচ

এখানে বসে সাগরের রুপ দর্শন করতে করতে আনমনে তাজা ফলের রসে চুমুক দেয়ার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কখনো কখনো উত্তাল সাগরের নোনা ঢেউ এর ছটা এসে লাগছে চোখে মুখে, এতটাই কাছে সমুদ্র! এর আগে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে সাগর দেখেছি অনেকটা শান্ত-ধ্যানমগ্ন, কিন্তু এখানে সাগর শান্ত নয় মোটেই। আর তাই হোটেলের সামনেই সাগরের তীর ঘেঁষে বাঁধ দিয়ে সাগরকে আটকানোর চেষ্টা। কিন্তু জোয়ার আসলে সেই বাঁধকে থোড়াই কেয়ার করে ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল আমাদের শরীর।

নিয়ন আলোয়

ইয়েলো ব্রিজ

যাই হোক, রুমে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পরলাম দ্বীপ পরিভ্রমনে। যারা শুধুমাত্র ডে ট্রিপ নেন তারা এর সাথে আরো অনেক এ্যাক্টিভিটি এ্যাড করেন যেমন সি-ওয়াক, ম্যানগ্রোভ ট্যুর, স্নোরকেলিং, সি-উইডস ফার্ম ভিজিট ইত্যাদি। কিন্তু আমরা বরাবরই নিজেরা এক্সপ্লোর করতে পছন্দ করি বলে রকিফাস্টের কাছ থেকে শুধু যাওয়া আসার ই-টিকিট কেটেছি। তাছাড়া এসব অধিকাংশ এ্যাডভেঞ্চারই বেবি নিয়ে করতে পারবনা তাই নিজেরাই নিজেদের মত শুধু দেখব দ্বীপটিকে মন ভরে। পেছনে খোলা এক ধরনের মিনি ভ্যান এই দ্বীপের পপুলার পরিবহন। এরকমই একটা ভাড়া করে ফেললাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রথমে গেলাম ইয়েলো ব্রীজ। দীর্ঘাকায় এই হলদে ব্রীজটি নুসা লেম্বোগান আর নুসা ছেনিঙ্গান আইল্যান্ডের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। ওখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে প্রথমে গেলাম ড্রীম বীচে। কিছুটা সাদা বালি আর কিছুটা প্রবালে ছাওয়া চমৎকার এই বীচে মুগ্ধতামাখানো কিছু সময় কাটিয়ে গেলাম ডেভিলস টিয়ার। প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল এই ডেভিলস টিয়ার।

নিয়ন আলোয়

ডেভিল’স টিয়ার

অন্য কথায় একে পাথরের কান্নাও বলা যেতে পারে। বাধাভাঙ্গা অদম্য ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তিন দিক ঘেরা পাথুরে দেয়ালে আর পাথর বিদীর্ণ করার নিস্ফল আস্ফালন যেন গুমরে কান্না হয়ে বেয়ে পরছে পাথরের গা বেয়ে। পাথর ঘেরা গহবরটি যেন ডেভিলের মত সব কিছু গ্রাস করার জন্য হাঁ করে রয়েছে আর পাথর বেয়ে নেমে আসা পানির স্রোত যেন তার কান্না। তাই তো এর নাম ডেভিলস টিয়ারস। এখানেও কিছু সময় কাটিয়ে ক্যামেরার মেমোরিতে কিছু মুহুর্ত সংরক্ষণ করে এবার চলে এলাম মাশরুম বীচে সুর্যাস্ত দেখব বলে। কিন্তু বিধি বাম। মেঘে ঢাকা লজ্জাবতী সুর্য পণ করেছে কিছুতেই সে তার প্রস্থান দৃশ্য আমাদের দেখাবেনা বলে। তাতে কি? শ্বেত শুভ্র বালিতে গা এলিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওখানেই পার করলাম আমরা। আমার কন্যা দু’হাত ভরে কুড়িয়ে নিল রং-বেরং এর প্রবাল। ওর মা ও কম যায় কিসে? মাতা-কন্যার প্রবাল কুড়ানো সাঙ্গ হলে অবশেষে ফিরে এলাম হোটেলে। সাগর দেখে তো এবার অবাক আমরা। দুপুরের উত্তাল সাগর এখন শান্ত অনেকটাই। পানি এবার অনেক দূরে চলে গেছে, বুঝলাম ভাটার সময় চলছে। কিছুটা সময় ভাটার সাগরের রুপ অবলোকন করে সন্ধ্যার পর পদব্রজে বেরোলাম দ্বীপটি দেখব বলে। সেই সাথে উদ্দেশ্য ডিনারের জন্য একটি ভাল রেঁস্তোরা খুজে বের করা। এখানেও রাতে রেঁস্তোরাগুলো বিভিন্ন ধরনের খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছে তবে ফিফি আইল্যান্ডের মত ফেস্টিভ মুড নেই এখানে। দুই একটি রেঁস্তোরায় লাইভ মিউজিক চলছে তবে নেই কোন উদ্দামতা শুধুই ঘোর লাগানো সুরের মুর্ছনা। খাদ্য সম্পর্কে চরম খুঁতখুঁতে আমার কোন খাবারই পছন্দ হয়না। অবশেষে প্রায় দশ-পনেরটা হোটেল রিজেক্ট করে অবশেষে একটিতে বসে প্রায় দেড় ঘন্টা পরে সার্ভ করা খাবার খেয়ে (স্বাদ মোটেই ভাল ছিলনা) ফিরে এলাম হোটেলে। এসে শুনি আবার সাগরের উত্তাল গর্জন। জোয়ারের সময় এসে পড়েছে তবে!

নিয়ন আলোয়

শুভ্র বালি এবং প্রবাল মেশানো স্বপ্নের সৈকত

গভীর রাতে সেই উত্তাল সাগরের নেশা ধরানো মাতাল ধ্বনি শুনতে শুনতেই এক সময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম আমরা।

পরদিন সকালে দরজা খুলতেই আবার সেই সাগরের চিরচেনা রুপ। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বেরোলাম আশেপাশেই ঘুরতে। তিনজন মিলে সাগর জলে পা ভিজিয়ে হুটোপুটি করে এবং সকালের স্নিগ্ধ আলোয় কিছু ফটোশুট করে হোটেলে ফিরলাম। লাঞ্চ করে এবার অপেক্ষা ফেরার। রকি ফাস্ট আবার আমাদের হোটেল থেকে নিয়ে গিয়ে তুললো সেই ফাস্ট বোটে। গতকালের এক্সপেরিয়েন্সের কথা মনে ছিল তাই কন্যাকে আগে থেকেই ঔষধ খাইয়ে রেডি রেখেছি। যথারীতি উথাল পাথাল ঢেউ এর সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের নিয়ে ফিরতি পথের যাত্রা শুরু করল আমাদের বোট। আমরাও এবার এই ছোট্ট মায়ায় ভরা দ্বীপটিকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রস্ততি নিলাম। মাতা-কন্যা ঔষধের ইফেক্টে এবার আর কাউকেই বিরক্ত না করে ঘুমের কোলে নিজেদের সমর্পন করলাম। প্রায় ত্রিশ মিনিটের নির্ঝঞ্ঝাট যাত্রা শেষে আবার তরী এনে ফেলল আমাদের সানুর বীচে এবং সেখান থেকে গাড়িতে করে হোটেল। এভাবেই সমাপ্ত হল আমাদের এ্যাডভেঞ্চার নুসা লেম্বোগান আইল্যান্ড।

দুইদিন ধরে দ্বীপ দেখলাম এবার একটু অন্য স্বাদ নেবার পালা। আমরা বরাবরই চেষ্টা করি আমাদের ট্যুরটিকে বৈচিত্র্যমন্ডিত করতে। সেই সাথে ছবি তুলতেও পছন্দ করি আমরা অনেক। আর তাই দ্বীপ থেকে দুপুরে ফিরে বিকেলটা রেখেছি থ্রি-ডি আর্ট মিউজিয়ামের জন্য। কন্যাও এঞ্জয় করে এটা খুব। তাই দুপুরে হোটেলে লাঞ্চ সেরে বিকেলে আবার আমরা মাস্কেটিয়ারস-ত্রয় চললাম সেই ডিএমজি আর্ট মিউজিয়ামে।

বালি ভ্রমণ- দারুচিনি দ্বীপ, আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রান মাখানো কয়েকটি দিন (দ্বিতীয় পর্ব)

চমৎকার থ্রি-ডি আর্ট, নির্দিষ্ট কোণ থেকে দেখলে বুঝার উপায় নেই কোনটা বাস্তব আর কোনটা ইল্যুশন!

নিয়ন আলোয়

থ্রিডি আর্ট মিউজিয়াম

মজার মজার সব ছবি তুলে সন্ধ্যায় ম্যাগডোনাল্ডসে খেয়ে ছয় কিলোমিটার রাস্তা দেড়ঘন্টায় পাড়ি দিয়ে অবশেষে ফিরলাম হোটেলে। অবাক হচ্ছেন যাত্রার ডিউরেশন শুনে? বালির এই রুপটির সাথে এবার ভালভাবে পরিচিত হয়ে আমরাও অবাক কম হইনি! ঈদের সাতদিনের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে এই বালিতে। দেশ-বিদেশ থেকে সবাই এই ছুটিতে বালি সুন্দরীর সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল। এদের মাঝে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আছেন। শুনলাম উনিও এখন ফুল ফ্যামিলি সহ অবস্থান করছেন বালিতে। আর তাই ছোট্ট এই দ্বীপটি পর্যটকদের ভার আর সহ্য করতে না পেরে জন্ম দিয়েছে তীব্র যানজটের। গাড়ি দুই মিনিট এগোয় তো দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে এমনি প্যাথেটিক অবস্থা। বুঝলাম বাকি দিনগুলোতে যথেষ্ট ভোগাবে বালি সুন্দরী আমাদের। অবশেষে হোটেলে ফিরে “ঢাকা এর চেয়ে অনেক ভাল, বালিতে মানুষ থাকে? এত জ্যাম জীবনেও দেখিনি” ইত্যাদি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিদ্বেষপুর্ণ আলোচনা (!!) এবং শাপ-শাপান্ত করতে করতে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম আমরা। আগামীকাল যে যেতে হবে বেশ দূরে বোটানিক্যাল গার্ডেন, উলুন দানু টেম্পল আর ফেরার পথে তানাহ লট। রাস্তায় যে ট্র্যাফিক দেখলাম আজ, আল্লাহ জানে পরদিন কপালে কি আছে আমাদের!!

[পরবর্তী পর্বঃ দারুচিনি দ্বীপ,আগুন পাহাড় আর নীল সাগরের ঘ্রাণ মাখানো কয়েকটি দিন (শেষ পর্ব)]

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন NEONALOYMAG@GMAIL.COM এই ঠিকানায়!]

Most Popular

To Top