নিসর্গ

কাশ্মীরের গল্পকথা (চতুর্থ পর্ব)– ডাল লেকের একদিন

নিয়ন আলোয়

[আগের পর্বঃ কাশ্মীরের গল্পকথা (তৃতীয় পর্ব)- দিল্লী থেকে শ্রীনগরের গল্প]

মেজবাহ দাঁড়িয়েই ছিল, দুই রাস্তার দুই পাশে পাইনের সারি ধরে চলে যাওয়া সোজা রাস্তার দিকে যতটা দেখা যায়। মেহরীনের জীপ পাইনের সারির মাঝে মিলিয়ে যেতেই বন্ধুদের সাথে উঠে পড়লো ওদের নির্ধারিত গাড়িতে। উদ্দেশ্য সরাসরি ডাল লেক। আজ সারাদিন ওরা ডাল লেকে থাকবে হাউজ বোটে। যদিও হাউজ বোট ঠিক করা নেই, গিয়েই ঠিক করবে। সবাই সিঙ্গেল তাই কেউই আর আগে থেকে কোন রকম রুম বা বোট ঠিক করে আসার পক্ষে ছিলো না।

গাড়িতে উঠে চলতে শুরু করতেই ঝিঁমুনি নয়, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল মেজবাহ। ঘুম ভাঙল ডাল লেকে পৌঁছে বন্ধুদের ডাকে। ওহ এই সেই ডাল লেক? যার কথা সেই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওদের চারজন বন্ধুকে স্থানীয় জনগণ বা হোটেল-হাউজ বোটের দালালরা ঘিরে ধরলো চারপাশ থেকে। সবাই ওদের যার যার নিজেদের পছন্দমত হাউজ বোটে নিয়ে যেতে চায়।

অবশেষে মানুষের নানা রকম ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে ওরা একটি সিকারায় চেপে বসলো। ডাল লেক দিয়ে যেতে যেতে ওদের তেমন বিশেষ কিছু মনে হয়নি ডাল লেককে প্রাথমিকভাবে। ওদের মনে হতে লাগলো এটা যেন বাংলাদেশের বরিশালের নৌকা বিধৌত কোন অঞ্চল। অনেকটা স্বরূপকাঠির পেয়ারা বাগানের আদলে!

নিয়ন আলোয়

শেষ সকালের ডাল লেক

একটি হাউজ বোটের কাছে পৌঁছে গেল খুব সহজেই। গিয়ে রুম দেখে মাত্র ১০০০ টাকাতেই রুম পেয়ে গেল ডাবল রুম! যেটা ওরা ২০০০ টাকা ভেবে রেখেছিল। আর অন লাইনেও তেমনই দেখেছিল। ভাগ্যিস আগে থেকে অন লাইনে বুকিং দিয়ে আসেনি, তাহলে বেশ একটা ধরা খেতে হত ১০০০ টাকার! দুটি রুমের হাউজ বোট ওরা পেয়ে গেল ২০০০ টাকায়, চার জনের জন্য। সাথে বেশ বড় ড্রইং রুম, সুন্দর সোফায় সাজানো, আলাদা ডাইনিং রুম ও টেবিল, ঝাড়বাতি ও নানা রকম কাশ্মীরি দেয়াল চিত্র সহকারে। বাহ দারুন, এক কথায় অসাধারণ!

ওরা দুজন করে এক একটি রুমে চলে গেল। ফ্রেস হয়ে ঘুম দিল একটা বেশ বড়সড়। আজ ওদের কোন তাড়া নেই। সারাদিন, সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধা আর রাত শুধুই ডাল লেকের জন্য বরাদ্দ। ঘুম থেকে উঠে ওরা এই প্রথম হাউজ বোটের সামনের দিকে এলো। ডাইনিং, ড্রইং ছেড়ে একেবারে সামনে আরও একটি বসার যায়গা, দুইপাশে বেশ বনেদী বেদী, আরও সামনে একেবারে ডাল লেকের উপরেই কাঠের পাটাতন দিয়ে বেশ বড় উঠোনের মত। সেখানেও আছে বসার জন্য প্লাস্টিক আর বেতের চেয়ার।

নিয়ন আলোয়

হাউজ বোটের কাঠের বারান্দা

বন্ধুরা মিলে দারুণ আরাম করে বসলো চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। এতক্ষণ কেউই খেয়াল করেনি যে সামনেই বিশাল বিশাল পাহাড় দাড়িয়ে আছে ডাল লেকের দেয়াল হয়ে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আর ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক শব্দ করে চলেছে যে যার মত করে। একটু বাদে ওরা খেয়াল করলো যে শুধু সামনেই নয় ডানে-বামে যতদূর দেখা যায় কাছে দূরে যেন শুধু পাহাড় দিয়েই ঘেরা। এরই মধ্যে দুপুরের খাবারের ডাক পড়লো ওদের। সবাই মিলে খেতে চলে গেল।

নিয়ন আলোয়

পাহাড়ের দেয়াল ঘেরা ডাল লেক

তবে খাবারের দামটা একটু বেশী মনে হল, জন প্রতি ২৫০ রুপী! কিন্তু বেশ রাজকীয় খাবারের আয়োজন। বাসমতী চালের ভাত, আলু ভাজা, ভেড়ার মাংস টমেটো আর বেশী করে টকটকে ঝাল দিয়ে রান্না করা, লেবু আর পেঁয়াজ। আহ মুখে দিতেই দুই রকম স্বাদে ওরা অবাক হয়ে গেল, একদিকে অসম্ভব ঝাল আর অন্যদিকে দারুণ স্বাদ! আর পেঁয়াজ যে কি মজার বোঝানো মুশকিল। দারুণ পেট ভরে খেয়ে আবারো সামনের কাঠের পাটাতনে গিয়ে বসলো সবাই। রুমের মধ্যে আর থাকার প্রশ্নই উঠেনা।

দ্বিতীয়বার ডাল লেকের রূপ দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেল। একি দেখছে ওরা! সকালে বা একটু আগে তো এই ডাল লেকের এই রূপ চোখে পরেনি। কাছে দূরের সবুজ পাহাড়ে সূর্যের আলো পরে হলুদ, গোলাপি আর লালচে একটা রঙের শেড পরেছে পুরো ডাল লেক জুড়েই! অদ্ভুত হয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে ওরা ডাল লেকের অপূর্ব রূপ। এরপর ওদের হাউজ বোটের নির্ধারিত সিকারায় চেপে বসলো ডাল লেক ঘুরে বেড়াতে।

নিয়ন আলোয়

ডাল লেকের অন্যপাশেও পাহাড়ের দেয়াল

শেষ দুপুর থেকে প্রায় সন্ধা পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালো সিকারায় করে। তবে খেলো নানা রকম ফলের সালাদ, কিনলো কিছু উপহার সামগ্রী, দেখলো শালের নানা রকম ভাসমান দোকান, সবজি সিকারা, নানা রকম বাজারের মত বড় বোট বা নৌকা। পুরো ডাল লেকই যেন আলাদা ভাসমান এক জলের নগরী! যে নগরে শুধু ভেসে বেড়াতে হয়, যেখানে কোন ইঞ্জিনের শব্দ নেই, ধোঁয়া বা ধুলোবালি নেই, প্যাপু আওয়াজ নেই। নীরব, চুপচাপ, কোলাহলমুক্ত আর অলস এক ভাসমান শহর।

সন্ধা নাগাদ ওরা ওদের হাউজ বোটে ফিরে এসেছে। ততক্ষণে পাহাড়ের কোলে ঢলে পরেছে দিনের সূর্য, তার নানা রকম আলোর রশ্নি ঠিকরে পরেছে পাহাড়ে, গাছে, সবুজে আর দূরে দাড়িয়ে থাকা বরফ চুড়ায় চুড়ায়। কোথাও লাল, কোথাও গোলাপী, কোথাও সোনালী, কোথাও বেগুনী রঙের নানা রকম খেলায় মেতে উঠেছে সূর্য-পাহাড় আর বরফ চূড়ারা। ডাল লেকের এমন অদ্ভুত সুন্দর রূপ দেখতে দেখতেই সূর্য ডুবে গেল ঝুপ করে পাহাড়ের আড়ালে। আর হুট করেই সন্ধা নেমে এলো পুরো ডাল লেক জুড়েই। ওরাও আবার একটু কিছু খেতে আর চা নিতে ভিতরে চলে গেল ওদের ডাইনিং-এ।

কিন্তু ওরা এবারও বসলো না, হাতে করে কেক আর চা নিয়ে আবারো ফিরে এলো সামনের কাঠের বারান্দায়। একদম ঘুমের সময়টুকু ছাড়া ডাল লেকের এই অপরূপ সন্ধাকে হারাতে চায়না। উপভোগ করতে চায় মন প্রান দিয়ে, যতটা পারা যায়। কাশ্মীর আর ডাল লেক তো আর বার বার আসা হবেনা, ওতো বিশ্রাম নিয়ে আর ঘুমিয়ে কি হবে? তার চেয়ে তাকিয়ে থাকা অনেক আরামের আর প্রাপ্তির হবে।

কিন্তু ফিরে এসে ওরা ডাল লেকের আর এক রূপ দেখতে পেল, যেটা ওরা কল্পনাই করেনি। পুরো ডাল লেক যেন সেজে উঠেছে কোন উৎসবের রঙে। এতটাই রঙিন আর ঝলমল করছে যতদূর চোখ যায়! লাল-নীল-হলুদ-সবুজ-গোলাপি-বেগুনী-সাদা যত রকমের আলো আছে সব এঁকে এঁকে জ্বলে উঠেছে পুরো ডাল লেকের সমস্ত হাউজ বোট গুলোতে। শত-শত নয়, হাজার-হাজার হাউজ বোটের সব রকম আলো জ্বলে উঠে, উৎসবে সাজিয়ে তুলেছে নিজ থেকেই!

কি যে এক অদ্ভুত সে রূপ ডাল লেকের, বলে বোঝানো মুশকিল। আর সেই সাথে ছিল বসন্তের ঝিরঝির বাতাস, ঝকঝকে আকাশে লক্ষ-কোটি তারার মিটিমিটি হাসি, মাঝে মাঝে দুই একটি তারা খসে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য কোনটা দূরের ডাল লেকে, কোনটা পাহাড়ের পাইন বনে! ঝাউ গাছের আড়ালে!

সে এক পাগল করা রাত ছিল সেদিন ডাল লেকে, ওরা না ঘুমিয়ে জেগে ছিল প্রায় সারারাত। একদম শেষ রাতে সবাই মিলে ঘুমোতে গিয়েছিল। পেয়ে দারুণ পূর্ণতার একটি মায়াভরা আর সেজে থাকা রাতের ডাল লেক।

আগামি কাল ওরা গুলমার্গে যাবে।

(চলবে)

[মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার ইট-কাঠে বন্দী শহর থেকে বের হয়ে তাজা হাওয়ার ঘ্রাণ নাকে না নিলে কি আপনার দমবন্ধ হয়ে আসে? নিয়মিত ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশে কিংবা বিদেশে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্র? আপনার ভ্রমণের গল্প শেয়ার করুন আমাদের সাথে, পাঠিয়ে দিন neonaloymag@gmail.com এই ঠিকানায়!]

Most Popular

To Top