ফ্লাডলাইট

হুইলচেয়ারে কোচিং, চোখের জলে বিদায়

neon aloy এডি বারলো নিয়ন আলোয়

ডার্বিশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে বসে গভীর মনোযোগে বাংলাদেশ বনাম ডার্বিশায়ারের খেলা দেখছেন ভদ্রলোক। সাদা চুল, গোলগাল গঠন আর ভারি চশমা চোখে ৬৫ বছরের মানুষটার দৃষ্টি মাঠের দিকে হলেও মন হয়তো চলে গেছে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট একটি ক্রিকেটপাগল দেশে। মানুষটার অন্তরের বিশাল এক অংশ জুড়েই যে বাংলাদেশ! ম্যাচের মধ্যবিরতির সময় উঠে দাঁড়ালেন, ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন বেলকনির সামনে, বেলকনির ঠিক বিপরীত পাশেই বাংলাদেশের ড্রেসিং রুম। হঠাৎ সেদিকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানালেন ভদ্রলোক, ছুড়ে দিলেন ফ্লাইং কিস। দলের নবীনতম সদস্য মুশফিকুর রহিম, শাহরিয়ার নাফিসরা হয়তো কেবল গল্পই শুনেছিলেন, কিন্তু খালেদ মাসুদ পাইলট, হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিক, সুজন, বেলিমরা এই মানুষকে খুব ভালো ভাবে চিনেন। একজন অভিভাবক, একজন মেন্টর, একজন কোচ, একজন বন্ধু হিসেবে। ২০০৫ সালের ইংল্যান্ড সফরের প্রথম অংশ ছিলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম কঠিন এক সময়। ব্রিটিশ মিডিয়ার সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয়েছে প্রতিটা দিন। কোন এক ব্রিটিশ পত্রিকা লিখেছে বাংলাদেশ যেন ভবিষ্যতে লর্ডসের একশ মাইলের ভেতর না আসে। তিন দিনেই টেস্ট ম্যাচ শেষ করে যেন মহাপাপ করেছে বাংলাদেশ। সেই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের হয়ে ব্যাট ধরলেন উপরের ভদ্রলোক; মিডিয়াতে এক সাক্ষাৎকারে বললেন,

আমি অসুস্থ এবং ক্লান্ত হয়ে গেছি সমালোচনা পড়তে পড়তে। আজকেও একটা ইংলিশ পত্রিকা এগুলা লিখেছে। বাংলাদেশ দলটা খারাপ করলে আমি সত্যিই কষ্ট পাই, কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে ১৯৭০ সালে আমরা (সাউথ আফ্রিকা) যখন অস্ট্রেলিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে বাজেভাবে ৫-০ ব্যবধানে হারাই তখন কি অস্ট্রেলিয়াকে লাথি মেরে টেস্ট ক্রিকেট থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো? তোমরা একদিকে গ্লোবালাইজেশনের কথা বল আর অন্যদিকে বাংলাদেশ কেন টেস্ট খেলে সেই প্রশ্ন কর! জাস্ট রাবিশ!

বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে অসাধারন এক মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল। দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরীর সামনে দাঁড়িয়ে বুলবুল নার্ভাস নাইনটিজে পড়ে গেছেন। টেনশন দূর করতে বারবার ড্রেসিং রুমের দিকে তাকাচ্ছেন। সেখানে হুইলচেয়ারে বসে আছেন একজন মানুষ। বুলবুল সব চাপকে জয় করে ছুঁয়ে ফেললেন সেঞ্চুরী। ড্রেসিং রুমের দিকে তাকিয়ে দেখলেন হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য একপ্রকার নিজের সাথেই যুদ্ধ করছেন মানুষটা, এতো বড় অর্জন আর দাঁড়িয়ে অভিনন্দন না জানালে চলে? অবশেষে স্ত্রীর সাহায্য নিয়ে দাঁড়ালেন, করতালিতে ভেজালেন বুলবুলকে।

এই ঘটনার কয়েক মাস পরের কথা, গুলশানের নাভানা টাওয়ারে বিসিবি’র তৎকালীন প্রধান কার্যালয়ে মানুষটা শিশুর মত হু-হু করে কাঁদছেন, কাঁদছেন বিসিবি’র কর্তারা, কাঁদছেন প্লেয়ার এবং সাপোর্টিং স্টাফের সদস্যরা। মানুষটার স্ত্রী ক্যালি হাত দিয়ে চোখ মুছলেন। স্ত্রী’র হাত ধরে বিসিবি অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি, এক কোণায় পড়ে আছে তার হুইলচেয়ারটি। চোখের জলে বিদায় জানালেন বাংলাদেশকে। অসুস্থতার কাছে হার মানলেন সারাজীবন হার না মানা মানুষটা।

এতক্ষণ যার কথা বললাম, তার নাম এডি বারলো। মাত্র ১৪ মাস ছিলেন বাংলাদেশে। এই সময়েই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষকে করে নিয়েছিলেন আপন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবেসেছেন বাংলাদেশকে।

গর্ডন গ্রিনিজের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ক্রিকেট হয়ে যেতে পারতো অভিভাবকহীন, হতে পারতো পথভ্রষ্ট। কিন্তু বিধাতা এতটা কঠোর হননি টেস্ট ক্রিকেটের স্বপ্নে বিভোর এই দেশটার প্রতি। সেই সময়ের বিসিবি সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী সাউথ আফ্রিকা বোর্ডের প্রধান আলি বুখারকে জানালেন একজন কোচ প্রয়োজন তার। আলি বুখার সাত পাঁচ না ভেবেই তার একসময়ের টিমমেট বারলো’র নাম বলে দিলেন। বারলো তখন কোচিং ছেড়ে ফার্মিং করছেন। বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা শুনে রাজি হয়ে গেলেন দায়িত্ব নিতে।

জুলাই ১৯৯৯, এডি বারলো বাংলাদেশে আসলেন। কোচের চেয়েও বড় দায়িত্ব নিলেন, আলি বুখারের পরামর্শেই বাংলাদেশের ইতিহাসের একমাত্র “ডিরেক্টর অব কোচিং” হলেন এডি বারলো। তাকে ক্রিকেট উন্নয়নের সামগ্রিক দায়িত্ব দেয়া হল। কিভাবে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাবে, কিভাবে ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হবে সব কিছুর পরিকল্পনা করবেন বারলো। বারলো’র পরামর্শ অনুযায়ী সেই বছরই বাংলাদেশে চালু হল ঘরোয়া চারদিনের ক্রিকেট, যার কাঠামো বারলো’র তৈরী। চারদিনের ম্যাচের পর ওই দুই দলের ভেতরই একদিনের ম্যাচ (কাউন্টি সিস্টেম অনেকটা)। জাতীয় লীগে অনেকদিন পর্যন্ত এই একদিনের ম্যাচ চালু ছিলো, এখন নেই অবশ্য।

একটা সময় বিসিবি’র পাশাপাশি বারলো নিজেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেন। বাংলাদেশ কেন টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার যোগ্য সেই প্রচারনা শুরু করে দেন। বারলো’র সাবেক অধিনায়ক আলি বুখার তখন ক্রিকেট বিশ্বে পরিচিত একজন বোর্ড প্রধান। এশিয়ার তিন দল আর আইসিসি পক্ষে ছিলো, বারলো ম্যানেজ করলেন বুখারকে। বুখারকে অনুরোধ জানালেন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড বোর্ডের সাথে কথা বলে রাজি করানোর জন্য। বিসিবিকে জানালেন আন্তর্জাতিক কোন দলকে সফরের জন্য আনা যায় কি না? বিসিবি’র ডাকে সাড়া দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একটা তিন দিনের প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ আর দুটি ওয়ানডে খেলতে ঢাকায় আসে ক্যারিবিয়ান দল। ইয়ান বিশপের ওয়েস্ট ইন্ডিজ একাদশ দলের সাথে তিন দিনের ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। কোন আন্তর্জাতিক দলের সাথে প্রথম ম্যাচেই ড্র। ওয়ানডে দুটিতে হারলেও দুই ম্যাচেই দুইশ পার করে বাংলাদেশ (২১৯/৫ এবং ২০৫)। সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার ছিলো সেটা অবশ্য হয়েছিলো, দুই ম্যাচেই ৪০ হাজার দর্শক হয়েছিলো মাঠে। বারলো’র অধীনে ২০০০ সালের এশিয়া কাপ টুর্নামেন্টে অংশ নেয় বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে হয় এই আসর। বাংলাদেশ ভারতের সাথে ২৪৯/৬ করে প্রশংসা পায়। যদিও বাংলাদেশ কোন ম্যাচ জেতেনি, তবে এটা বোঝা যাচ্ছিলো বাংলাদেশের ক্রিকেট সঠিক পথেই যাচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্বে বারলো একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তার সময়ের সেরা অলরাউন্ডার, সফল অধিনায়ক এবং কোচ।

বারলো আর সাবের হোসেনের প্রচন্ড পরিশ্রমের ফসল আসে ২০০০ সালের ২৬ জুন। সেদিন আইসিসি’র সভায় এডি বারলো বাংলাদেশের ক্রিকেট, অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান আর কেন বাংলাদেশে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল সেটার উপর এক ঐতিহাসিক প্রেজেন্টেশন দেন। বলা হয় বারলো’র সেই উপস্থাপনার পরে কেউই আর দ্বিমত করেনি বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের ব্যাপারে। এমনকি যাদের ব্যাপারে অনিশ্চিত ছিলো বিসিবি, সেই ইংল্যান্ডের ভোটও পায় বাংলাদেশ।

কিন্তু সুখ যেন বেশিদিন কপালে ছিলোনা বিসিবি’র। টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির কিছুদিন পরেই ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন বারলো। নিতে হয়েছিলো আই.সি.ইউ তে। সদ্য টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্ত বাংলাদেশের জন্য সেটা ছিলো প্রচন্ড এক ধাক্কা। বারলো’র হাতে তখন আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা। বারলো দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁকে বলা হতো দেশের ক্রিকেটের “ফাদার ফিগার”, কারো কাছে তিনি মেন্টর, কারো কাছে বন্ধু আবার কারো কাছে কড়া শিক্ষক। প্রচন্ড আবেগ দিয়ে কাজ করতেন তিনি। ছিলো ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্ক। বলা হয় বারলো’র সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিলো সেন্স অব হিউমার। স্ট্রোকের পরেও হার মানেননি বারলো, এই দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে শুরু করেন হুইলচেয়ার কোচিং। হুইলচেয়ারে করে মাঠ আসতেন, দিকনির্দেশনা দিতেন তার স্ত্রী’র মাধ্যমে, এইখানে একটা জিনিস বলে রাখা ভালো বারলো’র স্ত্রী ক্যালি সেই সময় অনেকটা সহযোগী কোচের ভূমিকা রেখেছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়, তিনি হচ্ছেন আমাদের সারোয়ার ইমরান স্যার। বারলো শুধু পরিকল্পনা আর নির্দেশনা দিতেন, মাঠের কোচ বাস্তবে সারোয়ার ইমরান। এই অসুস্থ অবস্থাতেই বারলো কেনিয়ায় দ্বিতীয় আইসিসি নকআউট (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) টুর্নামেন্টে অংশ নেন দলের সাথে। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের অফিশিয়াল দায়িত্ব ছিলো সারোয়ার ইমরানের উপর, বারলো’র তখন বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ টেস্ট খেলবে আর বারলো বিশ্রাম নিবে- সেটা কি হয়? তাই বারলো প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে মাঠে আসতেন, ড্রেসিং রুমে উপস্থিত থেকেই দেখেছেন প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের চারশ রান, বুলবুলের মহাকাব্যিক ১৪৫ রান।

কিন্তু হুইলচেয়ারে বাঁধা পড়ে যাওয়া বারলো দ্রুতই আরো অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকলে আর বেশিদিন কাজ করতে পারেননি। ২০০১ সালের শুরুতেই অপূর্ণতা নিয়ে চোখের জলে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। বাংলাদেশের চরম দুর্ভাগ্য, বারলোকে খুব বেশি দিন পাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাঁর ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্ক পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটের কল্যাণে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার এই ক্রিকেট কোচ তাঁর মেধার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছিলেন টেস্ট ক্রিকেটের মহা সমুদ্রে মাত্রই পা রাখা বাংলাদেশের ভিত্তিটা গড়ে দিতে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যে ভিত্তি, সেটাতো এই বারলো’রই গড়ে দেয়া! বারলো’র আগে বা পরে বিসিবি “ডিরেক্টর অব কোচিং” পদে আর কাউকে নিয়োগ দেয়নি। আর কোন কোচকে দেশের সামগ্রিক ক্রিকেট কাঠামো নিয়ে কাজ করতে হয়নি। অর্থাৎ বলাই যায় বারলো কোচের চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন আমাদের জন্য।

বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়ে বারলো ওয়েলসে স্থায়ী হন। এবং যতদিন বেঁচে ছিলেন যখনই পেরেছেন বাংলাদেশের খেলা মাঠে যেয়ে দেখেছেন। ২০০৪ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে, লর্ডসে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে, ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ওয়ানডেতে। প্রতিবারই বারলো উপস্থিত থেকে উৎসাহ দিয়েছেন পুরানো শিষ্যদের। বাংলাদেশের স্মৃতিচারন করে বারলো বলেছিলেন,

“আমি বাংলাদেশকে আমার এবং ক্যালির জন্য নিজের বাড়ি হিসেবেই দেখি। সেখানে কাটানো ১৩ বা ১৪ মাস ছিলো দারুণ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য। আমি অবশ্যই আবারো ফিরে যেত চাইব সেই সব দারুন মানুষের কাছে যারা আমাদের প্রচন্ড কেয়ার করত, যখনই সুযোগ পাব আমি বাংলাদেশে যাব আরেকবার।”

কিন্তু সেই সুযোগ আর এডি বারলো পাননি, ২০০৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে চির বিদায় নেন এই মহান মানুষটি। তবে এডি বারলো’র মৃত্যুর পরেও তার স্ত্রী ক্যালি বারলো এখনো বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট রেখেছেন। বাংলাদেশে এসেছেন বেশ কয়েকবার। ২০১০ সালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশের এক টেস্ট ম্যাচ ক্যালি আর জেমি সিডন্সের স্ত্রী একসাথে উপভোগ করেন। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের একটা পতাকা পরম যত্নে ভাঁজ করে নিজের ব্যাগে ঢোকানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেন একজন ফটো সাংবাদিক। এসেছিলেন ২০১৬ সালের এশিয়া কাপের ফাইনাল দেখতে। সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন,

“বাংলাদেশে আমার পরলোকগত স্বামীর সঙ্গে এসেছিলাম। ওখানে গিয়েই দেশটাকে, দেশের মানুষগুলোকে দারুণ ভালো লেগেছিল। দুর্ভাগ্য আমাদের বাংলাদেশে থাকতে দেয়নি। কিন্তু এর পর থেকে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ক্রিকেট আমাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল। এবারের এশিয়া কাপে ফাইনালে খেলল বাংলাদেশ। আমার স্বামী বেঁচে থাকলে কত যে খুশি হতেন! তিনি নিশ্চয়ই স্বর্গের কোনো একটা জায়গা থেকে খেলা দেখেন আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান প্রজন্মকে শুভকামনা জানান।”

পেশাদারিত্বের বাইরে এমনই এক আবেগের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন যা আজও অটুট বারলো পরিবারের সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেটের।

এডি বারলো’র ক্রিকেট ক্যারিয়ারঃ

“আনঅ্যাথলেটিক”, “স্থুল”, “আনস্মার্ট” এই কয়েকটা শব্দই ছোটবেলায় বারলো’র নামের সাথে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হত। তার সাথে যোগ হয়েছিলো চোখের সমস্যা। মোটা গ্লাসের চশমা পরতেন বারলো। বলা হয়, একটা সময় চোখের সমস্যা এতোটাই প্রকট ছিলো যে নিজের বাইসাইকেলের সামনের চাকা দেখতে পেতেন না তিনি! ফলাফল- আরো মোটা গ্লাসের চশমা। একদিন ক্রিকেট অনুশীলন করার সময় বারলো’র স্কুলের কোচ জিজ্ঞেস করেন, “বারলো তুমি কি অন্য কোন খেলা পার?” বারলো বললেন, “আমি প্রচুর রাগবি খেলি”। কোচ সাফ জানিয়ে দিলেন তাহলে তুমি রাগবি খেলা শুরু কর, ক্রিকেট তোমার জন্য না। বারলো সত্যি সত্যি ক্রিকেট ছেড়ে রাগবি ধরেন। ট্রান্সভাল প্রদেশের হয়ে রাগবিতে সুনাম অর্জন করলেও ফিরে আসেন ক্রিকেটে। সেই বারলো পরবর্তীতে বিশ্বক্রিকেটের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হন। আক্রমনাত্বক মনোভাবের ওপেনিং ব্যাটসম্যান এবং কার্যকরী পেসার।

neon aloy এডি বারলো নিয়ন আলোয়

শারীরিক গঠন আর ভারি চশমার কারনে তার ডাকনাম হয় বান্টার। চার্লস হ্যামিল্টনের বিখ্যাত কাল্পনিক কমিক চরিত্র উইলিয়াম বান্টারের সাথে মিল থাকায় এই নাম।

বর্ণবাদ ইস্যুতে সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হবার কারনে মাত্র ৩০ টেস্টেই থেমে যায় বারলো’র আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ক্যারিয়ারের ৩০ টেস্টে বারলো রান করেছেন ৪৫.৭৪ গড়ে ২৫১৬। ক্যারিয়ারে সেঞ্চুরী ৬ টি, ফিফটি ১৫ টি। পাশাপাশি উইকেট নিয়েছেন ৪০ টি।

সাউথ আফ্রিকার যে দলে বারলো খেলেছেন সেই দলে নিয়মিত বল করা লাগেনি তার। গ্রায়েম পোলক, পিটার পোলক, মাইক প্রক্টরদের সাউথ আফ্রিকা দলের সদস্য ছিলেন।

বারলো’র ক্যারিয়ারের সেরা সময় আসে ১৯৬৩-৬৪ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে। প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরী করেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অভিষেকেই কোন সাউথ আফ্রিকানের প্রথম শতক। পরের ম্যাচেই এডিলেডে করেন ডাবল সেঞ্চুরী (২০১)। গ্রায়েম পোলকের সাথে ৩৪১ রানের জুটি গড়েন মাত্র ২৮৩ মিনিটে। অস্ট্রেলিয়াকে ৪-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করা এই সিরিজে ৬০৩ রান করেন বারলো।

প্রতিপক্ষ হিসেবে বারলো’র প্রথম পছন্দ ছিলো অস্ট্রেলিয়া। ক্যারিয়ারের ৬ সেঞ্চুরীর ৫ টি এবং ৪০ উইকেটের ৩৩ টি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ক্যারিয়ার সেরা বোলিং (৮৫/৫) অজিদের সাথেই।

ব্যতিক্রমী ব্যাটিং স্টান্সের কারনে কাভার ড্রাইভ বা ফ্লিকের বদলে গালি বা স্লিপের উপর দিয়ে কাট আর পুল ছিলো তার পছন্দের শট। ষাটের দশকের ভয়ংকর পেস বোলিং-এর বিরুদ্ধে কোন ব্যাটসম্যান গালি অঞ্চলে কাট করার সাহস পেতেন না, আর সেই কাজটাই সফলতার সাথে করে বারলো’র নাম হয় “এলিয়েন”। “স্থুল” হলেও দারুন সব ক্যাচ নিতেন তিনি, স্লিপে তার হাত থেকে ক্যাচ মিস হতো কমই।

১৯৭৬ সালে ডার্বিশায়ারে যোগ দিয়ে প্রথম মৌসুমেই অধিনায়কত্ব পান পয়েন্ট তালিকার তলানিতে থাকা ক্লাবটির। একবছর পর সাত নাম্বারে উঠিয়ে আনেন দলকে (১৯ দলের ভেতর) এবং ১৯৭৮ সালে তার ক্যাপ্টেন্সিতে ডার্বিশায়ার লর্ডসে ফাইনাল খেলে! মাত্র দুই বছরে বিপ্লব ঘটিয়ে দেন প্লেয়ারদের মানসিকতায়। দারুন ফিট দল হয় ডার্বি। তার দল থেকে সেই বছরই তিনজন ইংল্যান্ড দলে চান্স পায়।

সাউথ আফ্রিকা নিষিদ্ধ হলে তিনি মূলত ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন বাকি সময়টা। এরই ভেতর বিশ্ব একাদশের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকসহ পাঁচ বলে চার উইকেট তুলে নেন। সিরিজে করেন দুটি সেঞ্চুরী।

কোচিং ক্যারিয়ারঃ

কোচ হিসেবে তিনি গ্লোস্টারশায়ারের দায়িত্ব নেন কাউন্টি ক্রিকেটে। এছাড়া সাউথ আফ্রিকায় ওরেঞ্জ ফ্রি স্টেট এবং ট্রান্সভালের কোচিং করান। এছাড়া ওয়েস্টার্ন প্রোভিন্স এবং বোলান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পরেও হুইলচেয়ারে বসে ওয়েলসের দুটি একাডেমিতে কোচিং করাতেন।

ডিজএবেলড ক্রিকেটঃ

হুইলচেয়ারে বসেই বারলো ডিজএবেলড ক্রিকেটের কোচিং শুরু করেন। বর্তমানে ডিজএবেলড ক্রিকেটের অবস্থানের পেছনে বারলো’র রয়েছে স্মরনীয় ভূমিকা। ডিজএবেলড ক্রিকেটের শুরুর দিকের নিয়মিত কোচ ছিলেন বারলো।

এছাড়া সাউথ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হবার পর থেকেই বারলো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, কনফারেন্সে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অংশ নেন।

এডি বারলো শুধু বাংলাদেশ নয় সাউথ আফ্রিকা এবং বিশ্ব ক্রিকেটের একজন শ্রদ্ধাভাজন মানুষ। বাংলাদেশ ক্রিকেটে তার রয়েছে অতুলনীয় অবদান।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top