নাগরিক কথা

মেডিকেল শিক্ষার বেহাল দশা…

neon aloy মেডিকেল শিক্ষা নিয়ন আলোয়

১.

একটা আজব ঘটনা বলি। ঘটনাস্থল- কোনো এক প্রতিষ্ঠিত পুরাতন সরকারি মেডিকেল কলেজ। সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রছাত্রীরা লেকচার গ্যালারীতে বসে রয়েছে, সপ্তাহখানেক পর ফার্স্ট প্রফ। মেডিকেল লাইফে এই প্রথম এত বড় পরীক্ষা, স্বাভাবিকভাবেই তারা উৎকণ্ঠিত।

এমন সময় এক ম্যাডাম লেকচার গ্যালারীতে ঢুকলেন। পরিচয় দেবার পর ছাত্রছাত্রীরা বিস্মিত, ম্যাডাম নাকি তাদের অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের ডিপার্টমেন্টাল হেড। কষ্ট করে ঢাকা থেকে এসেছেন। প্রফ সামনে, এখন না এলে কেমন দেখায়!

ছাত্রছাত্রীরা ভাগ্যবান বটে! সপ্তাহখানেক পর ফার্স্ট প্রফ, তা না হলে ম্যাডামের বদন দেখার সৌভাগ্যও যে তাদের কোনদিন হতো না!

২.

আবারো রঙ্গমঞ্চে এক সরকারি মেডিকেল কলেজ। থার্ড ও ফোর্থ ইয়ারের এক জায়ান্ট সাবজেক্ট- Pharmacology.

যে মেডিকেলের কথা বলছি, সে মেডিকেলে এই জায়ান্ট সাবজেক্টের লেকচার ক্লাসগুলো নিতেন ENT-এর একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর, প্রয়োজনে আইটেমও নিতেন।

সরকারি এক মেডিকেল কলেজে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সাবজেক্টের ক্লাস নিতে হয় একজন ENT-এর স্যারকে। এই আফসোস কোথায় রাখি!

মেডিকেল কলেজের নামটি আর উল্লেখ করলাম না। যারা ভুক্তভোগী, তারা ইতোমধ্যেই নামটি ধরতে পেরেছেন, সেটা আমি জানি।

৩.

এবার বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে আসি।

লেকচার ক্লাসে এক স্যার তাঁর একটি এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করেছিলেন। প্রফে এক্সটার্নাল হিসেবে এক প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে স্যারকে যেতে হয়েছিলো। বাস থেকে নেমে এক সরু মেঠো পথে হেঁটে স্যারের জীবন যখন যায় যায়- তখন স্যার তাঁর আরাধ্য মেডিকেল কলেজের দেখা পেলেন।

এক্সটার্নাল হিসেবে স্যার তো এলেন, ইন্টার্নালও আছেন, ছাত্রছাত্রীরাও আছে, সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, কাজেই স্যার যতই পরীক্ষার তোড়জোড় করেন, ইন্টার্নাল ততই মিষ্টি হাসি দেন।

মিষ্টি হাসির রহস্য ভেদ হলো, সবই আছে, সবই রেডী, খালি রোগী নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জায়গায় লোক পাঠিয়েছে রোগী ধরে আনার জন্য। বিধি-বাম, রোগী আসতে চাচ্ছে না।

চিকিৎসাবিদ্যায় পরিপক্ক হবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রোগী। সেটার ঘাটতি থেকে গেলে চিকিৎসাবিদ্যা নিশ্চিতভাবেই অসম্পূর্ণ। যে ঘটনাটি বললাম তা ২০০৫-২০০৬ সময়কালের। অবস্থার কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।

৪.

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক সংকট, অবকাঠামো দূর্বলতার কথা বলে কলেবর বাড়াতে চাচ্ছি না। অধিকাংশ সরকারি মেডিকেলেরই যখন করুণ দশা- বেসরকারি মেডিকেলের কথা বলা সেখানে অর্থহীন। তার চেয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ব্যবসায়ী দৃষ্টিভঙ্গির এক জলজ্যান্ত উদাহরণ দেই।

এক আন্টি সারাদিন খালি এটা-সেটা খান আর হিন্দী সিরিয়াল দেখেন। ওজন মোটামুটি ১০০ কেজি’র কাছাকাছি। আমি আড়ালে উনাকে ধূমসী আন্টি বলে ডাকি। যাই হোক, ঘুমাচ্ছিলাম, আন্টির ফোনে ঘুম ভাঙলো।

আন্টিঃ কনক, কি করি বলতো, লামিয়া ( ছদ্মনাম) তো কোথাও চান্স পাইলো না…
আমিঃ (ঘুম ঘুম কণ্ঠে) লামিয়ার যে নাম্বার আসছে শুনলাম, ডাক্তারির চিন্তা বাদ দেন।
আন্টিঃ লামিয়ার তো খুব ইচ্ছা সে ডাক্তারী পড়বে।
আমিঃ ইয়ে, আন্টি নার্সিং-এ পড়ান। নার্স খারাপ না, ডাক্তার-ডাক্তার ভাব আছে!
আন্টিঃ এসব কি ধরণের কথা! কোনো লিঙ্ক থাকলে বলো, তোমার আঙ্কেল টাকার বস্তা নিয়া বইসা আছে…

আমার কোনো লিঙ্ক আজও নেই, তখনো ছিলো না, থাকলেও দিতাম না। তবে টাকার থেকে বড় লিঙ্ক যে আর কিছু হতে পারে না- সেটি আমি পরবর্তীতে বুঝতে পেরেছিলাম। লক্ষ লক্ষ টাকার এক রাতের খেলায় আন্টি তার মেয়েকে F-Premio গাড়িতে চড়িয়ে ঢাকার এক প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে নিয়ে এলো।

৫.

জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলছে। অ্যাডমিশনে ডায়রিয়ার রোগীকে কোন অ্যান্টিবায়োটিক দেয়াটা ভালো হবে, সেটা নিয়ে একেকজন একেক মতামত দিচ্ছেন।

একদিনের ডায়রিয়াতে অ্যান্টিবায়োটিকের Rationality কতটুকু, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে চেয়েও শেষে আর করলাম না।

এক জুনিয়রকে প্রশ্নটা করেছিলাম যে, Davidson অনুযায়ী ডায়রিয়াতে অ্যান্টিবায়োটিকের indication কি কি। জুনিয়রের চোখের চাহনীতে আমি নিশ্চিত ছিলাম কোয়েশ্চেন কমন পড়েনি, গাইডে নেই।

জুনিয়র ডাক্তার সরকারি মেডিকেলের নাকি বেসরকারির সে কূটতর্কে যেতে চাচ্ছি না। তবে ডায়রিয়ার মত কমন প্রেজেন্টিং প্রবলেমে যদি কনফিউশন অ্যারাইজ করে তবে তা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত বৈ কি।

৬.

সিরিয়াস কথায় আসি। চিকিৎসা বিজ্ঞান কোনো ছেলেখেলা না। অন্যান্য গ্রাজুয়েশন কোর্সের সাথে MBBS বা BDS কোর্সকে মেলানোর কোনো সুযোগ নেই।

ডাক্তার হওয়ামাত্র ছেলেমেয়েগুলোকে রোগীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপস্থিত থেকে রোগীর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এরকম কঠিনতম জায়গায় কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করার কোনো সুযোগ নেই। আশ্বর্যের বিষয়, জীবন-মৃত্যুর মত ইস্যুতেও আমাদের দেশে কোয়ালিটির সাথে কম্প্রোমাইজ করা হচ্ছে। স্টুপিডিটির একটা লিমিট থাকা উচিত!

৭.

সরকারের নাকি প্রতি জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ করার প্ল্যান আছে। সরকারি সিদ্ধান্ত, কাজেই সরকারের লোক হয়ে কিছু বলাটা অশোভন দেখায়।

আধুনিক রুশ সাহিত্যের জনক আলেকজান্ডার পুশকিনকে চেনেন? তাঁর একটি কথাকে কোট করিঃ

“আমি মোটেই সাহসী লোক নই, আমি ভীতু। তবে সময় মাঝে মাঝে ভীতুদের সাহসী করে তোলে….”

সময় হয়েছে সাহসী হবার, সাহস করে একটা কথা বলিঃ আগে মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যেতো, যদি সরকারি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় তবে বলে রাখি শ’য়ে শ’য়ে মানুষ চিকিৎসার কারণে মারা যাবে।

৮.

একটা প্রবাদবাক্য বলিঃ “ইতরপ্রাণির প্রজনন ক্ষমতা বেশী”।

এবার একটা তথ্য দেই। ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ৪৭টি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গড়ে প্রতি ২ মাসে এই ছোট দেশে একটি করে মেডিকেল কলেজ হয়েছে।

কিছু বোঝার থাকলে বুঝে নিন….

৯.

তিন-চার মাস আগে পেপারে দেখলাম BSMMU-এর সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলছেন,

“মান চাইলে ৭৫ শতাংশ বেসরকারী মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিতে হবে। আবার কিছু সরকারী মেডিকেল কলেজ আছে, একটি আলমারি- সেটাই অ্যানাটমী বিভাগ…..”

মানহীন এই মেডিকেল কলেজগুলোতে একদিন আমাকে বা আপনাকে চিকিৎসা নিতে হবে। সেখানে চিকিৎসা নিতে আমরা কি মানসিকভাবে প্রস্তুত?

কোয়ালিটি যদি নিশ্চিত করা না যায়- তবে সেই সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো বন্ধ করা হচ্ছে না কেন? কার স্বার্থে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে?

যারা এইসব মেডিকেল কলেজগুলোর অনুমোদন দিয়েছেন এবং এখনো অবৈধভাবে এগুলো চালু রাখছেন- তাদেরকে একটা আপ্তবাক্য স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-

“Everybody is paid back by his own coin”….প্রত্যেককে তার নিজস্ব মুদ্রায় হিসেব দিতে হবে।

১০.

এদেশ রত্নগর্ভা। চিকিৎসাশাস্ত্রেও রত্নের কখনো অভাব ঘটেনি। সমস্যা হলো, দুধে এক ফোঁটা লেবুর রস পুরো দুধকে নষ্ট করতে যথেষ্ঠ। নৌকার ফুঁটো বড় হবার আগেই তা মেরামত করা তাই জরুরী।

থার্মোডায়নামিক্সের দ্বিতীয় সূত্রকে সহজ করে বললে দাঁড়ায়- ‘মহাবিশ্বে এনট্রপি বাড়ছে’। এনট্রপি বিশৃঙ্খলার পরিচায়ক। এই দেশের মেডিকেল সায়েন্সে এনট্রপি বৃদ্ধির যে কালান্তক নগ্ন পদধ্বনি- তার সমাধানে কোনো কান্ডারী কি এগিয়ে আসবেন?

Every cloud has a silver lining। আমি আশাবাদী মানুষ। কান্ডারীর অপেক্ষায় রইলাম…..

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top