ইতিহাস

জীবনের ফেরিওয়ালা: ভ্যান গগ

neon aloy ভিনসেন্ট ভ্যান গগ নিয়ন আলোয়

আমার ভালোলাগার, পছন্দের মানুষ কম, কিন্তু ভালোবাসি ভাবতে ভালো লাগে। ফলাফল হিসেবে নিঃসঙ্গতা ভালোবাসতে শিখতে হয়েছে। এর মাঝেও যে কয়েকজন জীবনে ঝড় তুলেন, কাছে আসেন, প্রেরণা হিসেবে কাজ করেন- তাদের একজন ভ্যান গগ।

ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগকে নিয়ে লেখার সাহস সঞ্চার করতে অনেক ভাবতে হয়েছে। তিনি ঠিক যেভাবে ভেবেছেন, সেই ভাবনাটা তুলে ধরতে পারবো তো? লেখা শেষ করেও এই ভাবনা বিদায় দিতে পারিনি। তাই লেখাটা হয়ে গেছে আমার কাছে ভ্যান গগ যেমন, তেমন।

ভ্যান গগ জন্মাবার ঠিক এক বছর আগে জন্ম নেয় আর একজন ভিনসেন্ট। এই ভিনসেন্ট আমাদের পরিচিত ভিনসেন্ট ভ্যান গগ নন। তিনি ভ্যান গগের বড় ভাই, যিনি জন্মাবার পরপরই মারা যান। আর আমাদের ভ্যান গগ একবছর পর সেই একই দিনে যখন জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর বাবা-মা তাকে নতুন একটা নাম দেবার কথা পর্যন্ত ভাবেননি। ফলে ভ্যান গগের জীবনে শুরু হল নিজের একটা নিজস্ব নাম না পাওয়া কিংবা নিজের জন্মদিনকে বড় ভাইয়ের জন্মদিন ভাবার এক বিষন্ন যাত্রার।

এই দীর্ঘ বিষন্ন যাত্রায় ভ্যান গগ বারবার ভালোবাসা খুঁজেছেন। প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। হতাশ হয়েছেন। তবু ভালোবেসেছেন। কি ভালোবেসেছেন তিনি? খুব ছোটখাট জিনিস। যা আমাদের কাছে অবহেলার, অগুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ছবিগুলোতে তাই বারবার দেখি লতাপাতা, বুনোফুল কিংবা ঘরের টেবিলের ফুলদানিতে রাখা কিছু শুকনো ফুল।

হুমায়ুন আজাদ বলেছেন,

“আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো
ছোট ঘাসফুলের জন্যে
একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে।”

আমাদের জীবন যেখানে কেটে যায় কবিকে উদ্ধৃত করে, তখন তিনি ভ্যান গগ তাঁর পুরো জীবনকে একটা কোটেশন করে ফেলেছেন তাঁর ভালোবাসা দিয়ে।

ছোট বয়সেই দারিদ্র্যের সাথে লড়াইয়ে নেমেছেন। মা’র কাছ থেকে পাওয়া সহজাত চিত্রকরের দক্ষতা নিয়ে ছবি বিক্রির দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সেই ছবির দোকানে বসেই বলেছেন ডিসপ্লের ছবিগুলো কত নিম্নমানের! ফলাফল, চাকুরী থেকে অর্ধচন্দ্র। এই ভ্যান গগ যখন চার্চের জন্য ছবি এঁকেছেন, তখন শুনেছেন তাঁর ছবিগুলোও কতটা নিম্নমানের। একরাশ স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা নিয়ে চার্চের চাকুরী থেকেও বিদায় নিয়েছেন। অবশ্য এর আগেও চার্চের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন তাঁর ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক পড়ালেখার দিনগুলোতে। কারণ, তিনি ল্যাটিন ভাষায় পড়ালেখা করতে চাননি। বলেছেন- ল্যাটিন হল মৃত মানুষের ভাষা। অথচ মাত্র পনের বছর বয়সেই ৪-৫টা ভাষায় তিনি কথা বলতে পারতেন।

neon aloy ভিনসেন্ট ভ্যান গগ নিয়ন আলোয়

Sorrowing Old Man

এত এত প্রত্যাখ্যানেও জীবনকে অনুভব করার বা ভালোবাসার স্বপ্ন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করতে পারেনি। পরবর্তীতে ভালোবাসেছেন তাঁর কাজিনকে। তিনি ভ্যান গগের জীবনে মানিয়ে উঠতে পারেননি। পালিয়ে গিয়েছেন। ভ্যান গগ আবারো অন্য এক মানবীর কাছে হৃদয় সমর্পণ করেন। যিনি ছিলেন তাঁর ছবির মডেল, অন্য পরিচয় পতিতা। তাকে ভালোবেসে বিয়ে করলেন আর প্রচলিত সমাজের কাছে একজন অপরাধী হয়ে গেলেন। বেকার জীবনে পরিবারের অর্থ সাহায্য ছিল তাঁর সম্বল। তারা বললেন- ভালোবাসা বিদায় দেও, নতুবা নিজেই উপার্জনের পথ খুঁজো। তিনি পারেননি ভালোবাসাকে বিদায় দিতে। কিন্তু পেরেছেন ‘বনলতা’র মুখোমুখি বসতে, যা পারেননি আমাদের ভালোবাসার প্রথম পাঠের কবি জীবনানন্দ দাশও। তবে আজন্মকালের বিষন্নতা থেকে তাঁকে মুক্তি দিতে পারেনি সেই ‘বনলতা’। কারণ, তিনি তার পেশাকে বিদায় দিতে পারেননি; হতে পারেননি শুধুই ভ্যান গগের। এ যেন বিধাতার তাঁর সৃষ্টির সাথে অদ্ভুত ছেলেমানুষী। একজন মানুষ অন্তত তার একটা নিজস্ব নামধাম পায়, আর ভ্যান গগ সব পেয়েও কিছু পান না। কখনো ভাইয়ের সাথে নাম-জন্মদিন ভাগাভাগি, আর কখনো অন্য পুরুষের সাথে নিজের প্রেয়সী ভাগাভাগি।

এ এক অদ্ভুত বিষন্নতা!

আমাদের এই বিষন্নতার নায়ক তবু ভালোবেসেছেন, সবকিছু বড় বেশি জীবন দিয়ে অনুভব করতে চেয়েছেন। ফলে জীবনের শেষ দিনগুলোতে যেভাবে জীবনকে অনুভব করতে চেয়েছেন, আমাদের চোখে তা উন্মাদনা বলে ধরা পড়ে। তাঁর জীবনকে অনুভব করার আকুতি আমাদের হৃদয় প্রকোষ্ঠের প্রাচীর ভেদ করে না। অথচ জেনেছি আমাদের নরম হৃদয়কে রক্ষার জন্য কত আয়োজন, কত হাড়ের প্রাচীর তোলা!

জীবনের শেষ তিন বছর ভ্যান গগ প্রচুর ছবি এঁকেছেন। বিষন্নতা থেকে বাঁচতে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য আর হৃদয়ের কথা ভেবে তাঁর ভাই একজন লোক রেখে দেন দেখাশোনা করার জন্য। তবে এই সাবধানতা তাঁকে বাঁচাতে পারেনি। নানা ছলচাতুরীতে এই ভৃত্যকে দূরে রেখেছেন ভ্যান গগ। নিজের হাতে নিজের কান কেটে তা এক পতিতাকে দিয়ে বলেছেন, “খুব যত্ন করে রেখ।” তাঁর কান কাটা নিয়ে প্রচুর গল্প আছে। তবে তা তাঁর পাগলামির উদাহরণ হিসেবে। তাঁর নিজেকে বোঝার ও ভালোবাসার যে চেষ্টা- সেটা আড়ালে পড়েছে। তাই, শহরবাসী একাট্টা হয়ে তাকে শহরছাড়া করেছে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে।

neon aloy ভিনসেন্ট ভ্যান গগ নিয়ন আলোয়

Wheatfield with Crows

জীবনের শেষ দিনগুলোতে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন তাঁর বড় ভাই থিও’র কাছে। তিনি তাঁকে আগলে রাখতে চেয়েছেন, পারেননি। মৃত্যুর আগে যে ছবি এঁকেছেন তাতে বিষন্নতা বারবার এসেছে। ধারণা করা হয় তাঁর শেষ সময়ের আঁকা ছবি (হয়তো শেষ ছবি) ‘Wheatfield with Crows। বিস্তৃত ভুট্টাক্ষেতে বিষন্ন কাকের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য। এই দৃশ্য (সম্ভবত, না হলেও শেষ সময়ের কাছাকাছি থিমের কোন ছবি) সম্পর্কে তাঁর ভাই থিওকে লিখেছেন,

“They are vast stretches of wheat under troubled skies, and I did not have to go out of my way very much in order to try to express sadness and extreme loneliness… I’m fairly sure that these canvases will tell you what I cannot say in words, that is, how healthy and invigorating I find the countryside.”

তাঁর শেষ জীবনের আত্মহত্যা প্রবণতা খেয়াল করে ধারালো সব কিছুই বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এক সকালে বাগানে ঘুরতে যেয়ে খুঁজে পান পুরানো একটা বন্দুক। গুলি করেন হৃদপিন্ড বরাবর। তবুও মারা গেলেন না সাথে সাথে। একদিন ধরে ভুগে ভাইয়ের কোলে মাথা রেখে মারা যান তিনি। তাঁর একটা বিখ্যাত উদ্ধৃতি হল, “I would rather die of passion than of boredom.” এখানেই আমি ভাবতে চাই তিনি শুধু বিষন্নতার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেন নি। তিনি জীবনের কাছে, ভালোবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। যে ভালোবাসায় কোন মানবীর একার অধিকার নেই, যদি থাকে তা জীবনের।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top