ফ্লাডলাইট

একটি ‘রাজনৈতিক’ স্টেডিয়াম!

neon aloy রাজনৈতিক স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয়

রাজনীতিবিদেরা তাদের এলাকায় কত কিছুই না বানান- স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ব্রিজ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দ রাজাপক্ষ গোটা একটা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম বানিয়েছিলেন।

বলছিলাম শ্রীলংকার হাম্বানটোটায় অবস্থিত মহিন্দ রাজাপক্ষ স্টেডিয়ামের কথা। নিজের নির্বাচনী এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে ঘন জঙ্গলের মাঝে গোটা একটা স্টেডিয়াম বানিয়েছিলেন তিনি ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে। হাম্বানটোটার মূল জনপদ থেকে বাসে যেতেও প্রায় ৪৫ মিনিট লাগে। বিশেষ বাস সার্ভিস ছাড়া ওই স্টেডিয়ামে যাওয়া খুবই কঠিন। আশেপাশে জনবসতি নাই, অন্য কোন স্থাপনা নাই। এক কথায় দূর্গম বনের ভেতর একটা স্টেডিয়াম।
বানানোর সময়ই এর নাম হয়েছিলো “সাদা হাতি”। ওই দূর্গম এলাকায় না হয় দর্শক না যেতে চায় কোন দল। ফলাফল রাজাপক্ষ নির্বাচনে হারার পর থেকে পাঁচ বছরে একটি মাত্র ওয়ানডে হয়েছে সাম্প্রতিক শ্রীলংকা-জিম্বাবুয়ে সিরিজের আগে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হাতির আক্রমন! রাত বিরাতে স্টেডিয়ামের বেড়া ভেঙে ভেতরে চলে আসে বুনো হাতির দল, স্টেডিয়ামের ভেতরের চেয়ার, বিজ্ঞাপন বোর্ড, আউট ফিল্ড, পিচ সব তছনছ করে চলে যায়। খেলা দেখতে আসা দর্শকদের উপর কড়া নিষেধ জঙ্গলের ভেতর যাওয়া যাবেনা। সেটা না হয় না-ই গেলো, কিন্তু হাতির পাল নিজেই যখন রাস্তায় চলে আসে? দর্শকের গাড়ি, পাবলিক বাস সবই আক্রমনের শিকার হয়। এমনকি ২০১৫ সালে পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের বহনকারী বাস ৩০ মিনিট আটকা পড়ে যখন হাতির পাল রাস্তায় রোদ পোহাচ্ছিলো। ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড দলকে নিতে হয়েছিলো হেলিকপ্টারে করে। নাহয় তারা খেলতে রাজি হচ্ছিলো না।

neon aloy রাজনৈতিক স্টেডিয়াম নিয়ন আলোয়

মনের খুশিতে মহিন্দ রাজাপক্ষ স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে হেঁটে বেড়াচ্ছে হাতির পাল

আরো সমস্যা আছে! ডে নাইট ম্যাচে সন্ধ্যার পর ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমন ঘটে জঙ্গল থেকে। ড্রেসিংরুম থেকে গ্যালারী, মশা আর মশা। গ্যালারীতে অতিরিক্ত ঢোল, বাঁশি, চিৎকারে আতংকিত হয়ে যায় হাতি এবং হনুমানের দল, হঠাৎ হঠাৎ ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠলেও পাগলামি শুরু করে আতংকে। সন্ধ্যার পর বয়ে চলা শক্তিশালী ক্রস উইন্ড বা বাতাসে স্পিনারদের লাইন লেংথ ঠিক থাকেনা, ব্যাটসম্যানদের শট ঠিকানা পায়না জায়গামত, কখনো বাতাস যেদিকে থাকে সেদিকে টপ এজ ছয় হয়ে যায় আবার বাতাসের বিপরীতে বল ছক্কা না হয়ে আগায়ই না, ক্যাচ হয়ে যায় বাউন্ডারি লাইনে। আর যদি নামে বৃষ্টি! জঙ্গলে বৃষ্টি নামলে সহজে থামেনা।

স্টেডিয়ামের রক্ষনাবেক্ষন খরচ বছরে ২৫ লাখ শ্রীলংকান রুপী। দুই বছর ধরে বাতিল পড়ে থাকায় সব স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো। কথা ছিলো বাংলাদেশের সাথে সিরিজের দুইটা ওয়ানডে হবে। কিন্তু সংস্কারকাজে সময় লাগায় সম্ভব হয়নি।

“সাদা হাতি” ফেলে না রেখে সিরিজ দিয়েছে জিম্বাবুয়ের সাথে। তবে ডে ম্যাচ। দুই বোর্ড সমঝতা করেছে ম্যাচের অবস্থা যা-ই হোক, ফ্লাডলাইট জ্বলবে না। প্রয়োজনে আলোক স্বল্পতায় ম্যাচ বাতিল হবে তবুও না। ফ্লাডলাইটের খরচ কে দিবে? এমনিতেই সিরিজের জন্য দশজন বন্যপ্রানী বিষয়ে এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়েছিলো শ্রীলংকা, যাদের কাজ যেকোন উপায়ে হাতির আক্রমন ঠেকাতে হবে। অতিরিক্ত খরচ যত কমানো যায়।

স্টেডিয়ামটা বর্তমানে বিয়ের অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সমাবেশ, আর্মি ট্রেনিং ইত্যাদি কাজে ভাড়া দিয়ে খরচ ওঠানো হচ্ছে। অবশ্য স্টেডিয়ামের নির্মানখরচ রাজাপক্ষ সরকার কখনোই প্রকাশ করেনি।

শ্রীলংকা ক্রিকেটের গলার কাঁটা এই স্টেডিয়ামে কয়েকদন আগেই হয়ে যাওয়া পাঁচ ম্যাচ সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে রান তাড়া করার অসাধারন ক্যালকুলেশন দেখিয়েছিলো জিম্বাবুয়ে। ৩০১ রানের টার্গেট, বৃষ্টির পূর্বাভাস, মেঘলা আকাশে আলোক স্বল্পতা, ফ্লাডলাইট জ্বলবে না আগেই জানা ছিলো তার উপর জঙ্গলে বৃষ্টি একবার নামলে আর থামে কি না! তাই ডি/এল মেথড মাথায় রেখে শুরু থেকেই আক্রমন শুরু করেছিলো সফরকারীরা। ১৮ ওভারেই ১২৮/৩, আকাশে ঘন মেঘ। তা দেখেই শ্রীলংকা শুরু করলো নাটক। জিম্বাবুয়ে ডি/এল মেথডে এগিয়ে আছে, যেভাবে সম্ভব সময় নষ্ট করা যায়। বোলার রুমাল ফেলে দেয়, বল মুছে, ফিল্ডিং সাজায়, পরিকল্পনা করে কত কি। বিশতম ওভারে হলো সবচেয়ে বড় নাটক! লাসিথ মালিঙ্গা প্রথম দুই বল করতেই নিলেন ৪ মিনিট, পুরা ওভারে ১১ মিনিট (স্বাভাবিক ৫ মিনিট বড়জোর)। লাভের লাভ হয়নি, বৃষ্টি আসলো ২১ তম ওভারে, জিম্বাবুয়ে তখন ১৩৯/৩, নয় রানে এগিয়ে ডি/এল মেথডে।

পরে অবশ্য খেলা শুরু হয়েছে প্রায় অন্ধকারে, ৩১ ওভারে ২১৯ টার্গেট। ফ্লাডলাইট জ্বলবেনা, অন্ধকারে খেলা বন্ধ হতে পারে যেকোন সময়। তাই সবসময় ডি/এল মেথডে এগিয়ে থাকতে হয়েছে জিম্বাবুয়েকে। শেষ পর্যন্ত ক্রেগ আরভিনের ৬৯* (৫৫) রানে ম্যাচটা ১৬ বল হাতে রেখেই জিতেছে জিম্বাবুয়ে। তবে বৃষ্টি নামার আগেই নিজেদের কাজটা সহজ করে রাখে সলেমান মিরে ৪৩ (৩০)। যার কারণে পরে রিভাইজড টার্গেট দাঁড়ায় বেশ সোজা, সাত উইকেট হাতে দশ ওভারে আশি রান।

এই ম্যাচ জিতে সিরিজে ২-২ সমতায় ফেরা জিম্বাবুয়ে পরবর্তী ম্যাচটাও জিতে ঐতিহাসিক এক সিরিজ জিতে নেয়! শেষ ম্যাচে তো সিরিজ হারের সাথে সাথে আরো লজ্জাজনক ঘটনার জন্ম দেয় শ্রীলংকান ক্রিকেট বোর্ড। খেলা উপলক্ষ্যে গ্রাউন্ড স্টাফ হিসেবে স্থানীয় কিছু লোককে অস্থায়ী নিয়োগ দেয় বোর্ড। খেলা চলাকালীন সময় তাদের ইউনিফর্ম সরবরাহ করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শেষ ম্যাচের শেষে তারা যখন পারিশ্রমিকের জন্য লাইনে দাঁড়ান, তখন তাদের জানানো হয় বোর্ড থেকে সরবরাহ করা পোষাক ফেরত না দিলে তারা টাকা পাবে না। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে গ্রাউন্ড স্টাফদের, তারা তো অতিরিক্ত পোষাক আনেননি সাথে করে। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরেও কাজ হয়নি। নগ্ন হয়ে কিংবা শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরে পোষাক ফেরত দিয়ে তবেই মজুরি পেয়েছিলো তারা!

সব মিলিয়ে বলা যায়, শুধুমাত্র খরচ আর রক্ষণাবেক্ষণের বিড়ম্বনাই নয়, মাঠের খেলা আর মাঠের বাইরের অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে মহিন্দ রাজাপক্ষ স্টেডিয়ামটি শ্রীলংকার জন্য একের পর এক দুঃখ বাড়িয়েই চলেছে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top